জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জননিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে লুট হওয়া বিপুল আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে দেশের বিভিন্ন থানা-ব্যারাকসহ সরকারি স্থাপনা থেকে লুট করা এসব মারণাস্ত্র নির্বাচনের মাঠেও ব্যবহারের আশঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশ্লেষকরা।
সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, লুট হওয়া মোট আগ্নেয়াস্ত্রের মধ্যে এখনো ১ হাজার ৩৪০টি অস্ত্র উদ্ধার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এসব আগ্নেয়াস্ত্র সন্ত্রাসী ও নাশকতাকারীদের হাতে থাকতে পারে বলে ধারণা বিশ্লেষকদের। অন্যদিকে লুট হওয়া গোলাবারুদের মধ্যে এখনো ২ লাখ ৫৭ হাজার ২৮০টি গুলির হদিস মেলেনি। এর বাইরেও প্রতিনিয়িত অবৈধ দেশি-বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্রের মজুত গড়ছে সন্ত্রাসী বা বিভিন্ন গোষ্ঠী। সব মিলিয়ে এসব অস্ত্র-গোলাবারুদ অপরাধীদের হাতে থাকায় সামনের জাতীয় নির্বাচন এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে বলে মন করছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।
এ প্রসঙ্গে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ওমর ফারুক খবরের কাগজকে বলেন, যেকোনো ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র বাইরে (সাধারণ মানুষ বা অপরাধী) থাকাটাই রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে এখনো যেগুলো উদ্ধার হয়নি সেগুলো অবৈধ কাজে ব্যবহার হওয়ার দৃঢ় আশঙ্কা রয়েছে। এর বাইরে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন দেশ থেকে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র চোরাইপথে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। সংখ্যার হিসাব করলে দেখা যাবে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লুট হওয়া অস্ত্রের চেয়েও অনেক বেশি পরিমাণে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র যেকোনোভাবে অপরাধীদের হাতে যাচ্ছে। আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখেও অবৈধ অস্ত্রের মজুত বাড়ছে, যা শেষ মুহূর্তে ব্যবহার হতে পারে। এরই মধ্যে আগ্নেয়াস্ত্রের ঝনঝনানিও আমরা দেখতে পাচ্ছি। সব মিলিয়ে সহিংসতা-নৃশংসতার ঘটনা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে রাষ্ট্র তথা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে লুট হওয়া অস্ত্র বা অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। অন্যথায় এসব আগ্নেয়াস্ত্র নির্বাচনে যেমন ভীতিকর হবে, তেমনি সাধারণ মানুষের জানমালও ঝুঁকিপূর্ণ হবে।
সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গুলি করে হত্যার বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে। গত ১৭ নভেম্বর রাতে রাজধানীর পল্লবীতে একটি দোকানের ভেতরে ছয়জন সন্ত্রাসী প্রকাশ্য গুলি করে পল্লবী থানা যুবদলের সদস্য সচিব গোলাম কিবরিয়াকে (৫০) হত্যা করে। হত্যার পর পালানোর সময় স্থানীয় জনতার ওপর অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা এলোপাতাড়ি গুলি চালালে একজন রিকশাচালকও গুলিবিদ্ধ হন। তার এক সপ্তাহ আগে ১০ নভেম্বর পুরান ঢাকায় দিনের বেলায় জনাকীর্ণ স্থানে পেশাদার শুটাররা গুলি করে হত্যা করে ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ তারিক সাইফ মামুনকে। এর বাইরেও সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন স্থানে গুলি করে হত্যা বা আহত করার বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে।
অন্যদিকে ঢাকার বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনসহ একাধিক স্থানে অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকটি ছোট-বড় অস্ত্র বা গোলাবারুদের চালান আটক করে সেনাবাহিনী, পুলিশ তথা যৌথ বাহিনী, যেগুলোর বেশির ভাগের গন্তব্য ছিল ঢাকামুখী। গত ২ নভেম্বর নরসিংদী শহর থেকে ৪০টি ককটেল উদ্ধার করে সেনাবাহিনী। একই দিনে চট্টগ্রামের রাউজানে একটি মজুতখানায় অভিযান চালিয়ে বিপুল অস্ত্র-গোলাবারুদ উদ্ধার করে র্যাব। তার আগে ২৬ অক্টোবর দুপুরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ঢাকাগামী বনলতা এক্সপ্রেস ট্রেনের একটি বগিতে অভিযান চালিয়ে ৮টি বিদেশি অস্ত্র, বিপুলসংখ্যক গুলি ও বিস্ফোরক উদ্ধার করে সেনাবাহিনী।
লুণ্ঠিত অস্ত্র-গোলাবারুদ উদ্ধার প্রসঙ্গে গত ৫ নভেম্বর সেনাবাহিনীর আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে সেনাসদরের মিলিটারি অপারেশন পরিদপ্তরের (ডিএমও) পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেওয়ান মোহাম্মদ মনজুর হোসেন জানান, লুট হওয়া বা খোয়া যাওয়া ৮১ ভাগ অস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। পাশাপাশি এই সময়ের মধ্যে ৭৩ ভাগ গোলাবারুদও উদ্ধার হয়েছে বলে জানান তিনি।
এ প্রসঙ্গে সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোহাম্মদ নুরুল হুদা গতকাল খবরের কাগজকে বলেন, ‘লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র সন্ত্রাসী বা সাধারণ মানুষের হাতে থাকার কোনো সুযোগ নেই। এটা খুবই স্পর্শকাতর বিষয়। এসব আগ্নেয়াস্ত্র বাইরে থাকলে বা অপরাধীদের হাতে থাকলে যেকোনো সময় তারা প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারে। সামনে জাতীয় নির্বাচন বা রাজনৈতিক কোন্দলেও এসব লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের আশঙ্কা রয়েছে। ফলে লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আলাদা করেই দেখতে হবে।’
প্রায় একই ধরনের মন্তব্য করেছেন সামাজিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের এই সহযোগী অধ্যাপক গতকাল খবরের কাগজকে বলেন, ‘লুট হওয়া এসব অস্ত্র ও গোলাবারুদের অধিকাংশই পেশাদার সন্ত্রাসীদের হাতে রয়েছে বলে ধারণা করা যায়। এর সঙ্গে দেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়েও বাংলাদেশে অবৈধ অস্ত্র ঢুকছে বলেও খবর পাওয়া যাচ্ছে। এসব আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে রাজনৈতিক খুনোখুনি-সন্ত্রাসমূলক কর্মকাণ্ড আরও অনেক গুণ বেড়ে যেতে পারে। ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে যেকোনো মূল্যে এসব আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করে নিজেদের আয়ত্তে নিতে হবে। তা না হলে আইনশৃঙ্খলার অবনতিসহ নৃশংস ঘটনাগুলো ব্যাপক বেড়ে যেতে পারে।’
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যমতে, গত বছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের বিভিন্ন থানা, ফাঁড়ি ও স্থাপনায় হামলা চালায় বিক্ষুব্ধরা। এ সময়ে পুলিশের ৫ হাজার ৭৬৩টি আগ্নেয়াস্ত্র লুট হয়। লুট হওয়া এসব অস্ত্রের মধ্যে গত ১০ নভেম্বর পর্যন্ত মোট ৪ হাজার ৪২৩টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। সে হিসেবে বাকি ১ হাজার ৩৪০টি আগ্নেয়াস্ত্রের এখনো হদিস নেই। উদ্ধার না হওয়া এসব অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে- ১১৩টি চায়নিজ রাইফেল, ৩১টি চায়নিজ সাব মেশিন গান (এসএমজি), চায়নিজ পিস্তল ২০৭টি, পিস্তল (৯x১৯ মিমি) ৪৫৫টি, ১২ বোরের শটগান ৩৯২টি, গ্যাস গান (সিঙ্গেল শট) ১২৯টি, বাংলাদেশি রাইফেল ১টি, চায়নিজ লাইট মেশিনগান (এলএমজি-টি ৫৬) ৩টি, টিয়ারশেল লঞ্চার (সিক্স শট) ৭টি এবং সিগন্যাল পিস্তল ২টি।
এছাড়া লুণ্ঠিত ৬ লাখ ৫২ হাজার ৮টি গুলির মধ্যে ৩ লাখ ৯৪ হাজার ৭২৮টি গুলি উদ্ধার হয়েছে। এখনো ২ লাখ ৫৭ হাজার ২৮০টি গুলির হদিস মেলেনি। পুলিশের বাইরেও স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের (এসএসএফ) বেশ কিছু অস্ত্র-গোলাবারুদ ওই সময়ে লুট বা খোয়া যায়, সেগুলোও সব উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি বলে জানা যায়।
এ প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (গণমাধ্যম ও জনসংযোগ) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন গতকাল খবরের কাগজকে বলেন, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান প্রেক্ষাপটে লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে ৭৭ শতাংশ আগ্নেয়াস্ত্র এরই মধ্যে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। বাকি ২৩ শতাংশ অস্ত্র উদ্ধারে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে।’
শাহাদাত হোসাইন বলেন, ‘অস্ত্রের সঙ্গে বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ লুট বা খোয়া যায়। সেগুলো অনেকটা উদ্ধার করা হয়েছে। মাঝেমধ্যেই পরিত্যক্ত অবস্থায় অস্ত্র উদ্ধার করা হচ্ছে। তবে লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্রের বিষয়ে সবচেয়ে বেশি নজর দেওয়া হচ্ছে। কেননা, অস্ত্র না থাকলে শুধু গোলাবারুদ দিয়ে কোনো কাজ হবে না। পুলিশ এ বিষয়ে সবসময় নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছে।’