সারা দেশে শহিদ মুক্তিযোদ্ধা এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সমাধিস্থল সংরক্ষণ করার জন্য ২০ হাজার সমাধি নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার। ২০১৮ সালে ১০ ফেব্রুয়ারি ‘শহিদ মুক্তিযোদ্ধা ও অন্য বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সমাধিস্থল সংরক্ষণ ও উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রথমে এর ব্যয় ধরা হয় ৪৬১ কোটি টাকা। দীর্ঘ ৭ বছরে বাস্তবায়ন হয়েছে ৪ হাজার ৩৭১টি সমাধিস্থল। আর্থিক অগ্রগতির দিক থেকে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৮২ কোটি টাকা। কিন্তু এবার সেই টাকা পানিতে গেল। কারণ প্রকল্পটি সম্প্রতি অসম্পূর্ণ রেখে সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। সম্পূর্ণ সরকারি অর্থে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্বে ছিল মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও গণপূর্ত অধিদপ্তর।
প্রকল্পটি বাতিলের ব্যাপারে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ও প্রকল্প পরিচালক পলি কর খবরের কাগজকে বলেন, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম প্রকল্পটি স্থগিত করার নির্দেশ দেন। তার নির্দেশে প্রকল্পটি বাতিল করা হয়েছে। নিয়ম মেনেই অসম্পূর্ণ প্রকল্পটি ২০২৫ সালের জুনে সমাপ্ত করা হয়েছে। পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ তাতে অনুমতি দিয়েছেন। পদ্ধতি অনুযায়ী সম্প্রতি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সদস্যদের বিষয়টি অবহিত করার জন্য উপস্থাপন করা হয়।
প্রকল্পটির উদ্দেশ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের স্থানীয় দোসরদের মাধ্যমে শহিদ মুক্তিযোদ্ধা এবং অন্য বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সমাধিস্থল সংরক্ষণ ও উন্নয়ন এবং বিভিন্ন সময়ে মৃত্যুরবণকারী বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সমাধিস্থল সংরক্ষণ ও উন্নয়ন। প্রকল্পটি ঢাকা, রাজশাহী, চট্রগ্রাম, খুলনা, রংপুর, বরিশাল, ময়মনসিংহ ও সিলেট এই আট বিভাগে বাস্তবায়নের জন্য নির্ধারণ করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটির প্রথমে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪৬০ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছিল তিন বছর অর্থাৎ ২০১৮ সালের জুলাই থেকে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত। কিছুটা কাজও হয়। কিন্তু প্রথম সংশোধনীর মাধ্যমে ১৫ কোটি টাকা খরচ কমিয়ে ধরা হয় ৪৪৫ কোটি ২৩ লাখ টাকা। সময় বাড়ানো হয় তিন বছর, অর্থাৎ ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত। পরে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের আওতায় বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সুপারিশে আরও এক বছর সময় বাড়ায় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শহিদ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সমাধি নির্মাণ প্রকল্পটি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। দায়সারাভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছিল। প্রকল্প পরিচালক (পিডি) বদল হয়েছেন অন্তত পাঁচবার। পলি কর ছিলেন শেষ পিডি। চাহিদা অনুযায়ী বাজেটও দেওয়া হতো না। তাই প্রকল্পের অগ্রগতি একেবারে হয়নি। দুবার সংশোধন করে নির্ধারিত সময়ে গত ৩০ জুন কাজের অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ১৮ শতাংশ। প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি (ব্যয়) হয়েছে ৮১ কোটি ৭৩ লাখ টাকার মতো।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকারের পরিবর্তন হলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ২৩ মার্চ বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়ন অগ্রগতির সভায় তার দপ্তরে বলেন, সমাধি নির্মাণের জন্য জমি পাওয়া যাচ্ছে না। এ কারণে সমাধি নির্মাণের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছেন তারা। প্রকল্পের আওতায় পাঁচ হাজার সমাধি করার সিদ্ধান্ত হয় গণপূর্ত অধিদপ্তরের দেওয়া তালিকা অনুযায়ী। আর ১৫ হাজার সমাধি করার কথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) দেওয়া তালিকা অনুযায়ী। এভাবে মোট ২০ হাজার স্মৃতিসোধ নির্মাণের লক্ষ্য ধরা হয়।
প্রকল্পটির ধীরগতির কারণে সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প নজরদারি করা সংস্থা আইএমইডি কয়েক মাস আগে পরিদর্শনের পর প্রতিবেদন তৈরি করে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পটি অনুমোদনের পর থেকে এ পর্যন্ত গণপূর্ত অধিদপ্তরের তালিকায় দেওয়া ৫ হাজার স্মৃতিসৌধের মধ্যে ৪ হাজার ৩৭১টির কাজ শেষ হয়েছে। এতে গত জুন মাস পর্যন্ত আর্থিকভাবে খরচ হয়েছে ৮১ কোটি ৭৩ লাখ টাকা, অগ্রগতির হার মাত্র ১৮ শতাংশ। সমাধির নকশা নিয়ে জটিলতার কারণে প্রকল্পের অগ্রগতি সন্তোষজনক ছিল না বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনী এবং তাদের স্থানীয় দোসরদের হাতে দেশের বিভিন্ন স্থানে বীর মুক্তিযোদ্ধারা শহিদ হন। মূলত সেসব স্থানে সমাধি নির্মাণের পরিকল্পনা থেকে প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়েছিল। সমাধি নির্মাণ করতে গিয়ে চারটি সমস্যা দেখা যায়। সেগুলো হচ্ছে- ১. সমাধির জায়গা চিহ্নিত করা যাচ্ছে না, ২. অন্যত্র সমাধি করতে গেলে জমি পাওয়া যায় না, ৩. সমাধির নকশায় ত্রুটি আছে এবং ৪. প্রতিবছরের জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। এসব কারণে অনুমোদনের পর আট বছরে প্রকল্পের অগ্রগতি হয়েছে মাত্র এক-চতুর্থাংশেরও কম।
অসমাপ্ত প্রকল্পটি যেভাবে সমাপ্ত
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের আইএমইডিসংশ্লিষ্ট সাবেক পরিচালক (উপসচিব) নিশাত জাহান খবরের কাগজকে বলেন, ‘অফিসের নির্দেশ মোতাবেক প্রকল্পের আওতাধীন বিভিন্ন সমাধিস্থল পরিদর্শন করা হয়। এ নিয়ে তৈরি একটি প্রতিবেদন আইএমইডি সচিবের কাছে জমা দেওয়া হয়। তখন অগ্রগতি ১৮ শতাংশ হয়েছিল। প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় কী সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা আমার জানা নেই।’
তবে পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম গত ২৩ মার্চ তার দপ্তরে বলেন, সমাধি নির্মাণের জন্য জমি পাওয়া যাচ্ছে না। এ কারণে সমাধি নির্মাণের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছেন তারা। এরপর অসম্পূর্ণ রেখে প্রকল্পটি সমাপ্ত করার জন্য উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পাঠানো হয় পরিকল্পনা কমিশনে। সেটা যাচাই করতে পরিকল্পনা কমিশনে গত ৯ জুলাই প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় কিছু ব্যাপারে আপত্তি করা হলে তা সংশোধন করে ডিপিপি পাঠানো হয় পরিকল্পনা কমিশনে। এরপর সংশ্লিষ্ট সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. কাইয়ুম আরা বেগম প্রকল্পটি বাতিলের ব্যাপারে তার মতামতে বলেন, ৮১ কোটি ৭৩ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি ২০১৮ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত সময়ে অসাপ্ত থেকে সমাপ্তকরণে অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হলো। তার সুপারিশের পরই পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ গত ২০ অক্টোবর এর অনুমোদন দেন।