ভাই হত্যার মামলা থেকে রেহাই পেতে এবং প্রতারণা ও শেয়ার জালিয়াতির একাধিক মামলা ধামাচাপা দিতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলকে শতকোটি টাকা ঘুষ দিয়েছেন ট্রান্সকম গ্রুপের সিইও সিমিন রহমান। মামলা বন্ধ করতে ঘুষ লেনদেনের জন্য গণভবনেই শেখ হাসিনার সঙ্গে তিন দফা বৈঠক করেন সিমিন। বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুসারে সিমিন রহমানের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে চেকের মাধ্যমে শেখ মুজিব জাদুঘর ট্রাস্টে ৫০ কোটি এবং সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের উন্নয়ন সংস্থা সূচনা ফাউন্ডেশনে ২৫ কোটি টাকা দেওয়া হয়। বাকি ২৫ কোটি টাকা শেখ হাসিনাকে নগদে পরিশোধ করেন সিমিন রহমান। এর পরিপ্রেক্ষিতে সিমিন রহমানকে গ্রেপ্তার ও তার বিরুদ্ধে মামলার প্রক্রিয়া বন্ধ করা হয়। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ইতোমধ্যে দুদকের উপপরিচালক এ কে এম মাহবুবুর রহমান প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছেন।
অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শেখ হাসিনা ও সিমিন রহমানের মধ্যে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়েছে কমিশন। গত ৫ নভেম্বর কমিশনের নিয়মিত বৈঠকে অভিযোগটি অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত হয়।
দুদকের বিধিমালা অনুযায়ী, ৪৫ দিনের মধ্যে অনুসন্ধান শেষ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে নির্ধারিত সময়ে অনুসন্ধান শেষ না হলে অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কমিশন চাইলে অতিরিক্ত ৩০ দিন সময় দিতে পারে।
গত বছরের মার্চে গণভবনে শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠক শেষে সিমিন রহমানের স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে দুটি চেক ইস্যু করা হয়। এর মধ্যে ১৮ মার্চ ২৫ কোটি টাকার একটি চেক সূচনা ফাউন্ডেশনের অ্যাকাউন্টে এবং ২৭ মার্চ ৫০ কোটি টাকার আরেকটি চেক শেখ মুজিব জাদুঘর ট্রাস্টে নগদায়ন করা হয়।
ট্রান্সকম গ্রুপের মালিক লতিফুর রহমানের মৃত্যুর পর সম্পত্তি নিয়ে পারিবারিক দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এরই অংশ হিসেবে কোম্পানির সম্পত্তি ও শেয়ারসংক্রান্ত বিরোধের জেরে ট্রান্সকম গ্রুপের প্রয়াত চেয়ারম্যান লতিফুর রহমানের মেয়ে শাযরেহ হক বাদী হয়ে তার বড় বোন ও ট্রান্সকম গ্রুপের বর্তমান সিইও সিমিন রহমান এবং গ্রুপের বর্তমান চেয়ারম্যান তাদের মা শাহনাজ রহমানসহ ট্রান্সকমের আট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পৃথক তিনটি মামলা করেন। এরপর গত বছরের মার্চে লতিফুর রহমানের ছেলে আরশাদ ওয়ালিউর রহমানকে হত্যার অভিযোগে সিমিন রহমানের বিরুদ্ধে ঢাকার গুলশান থানায় মামলা করেন শাযরেহ হক। এতে সিমিন রহমান ছাড়াও ১০ জনকে আসামি করা হয়। মামলায় বলা হয়, ‘বড় ভাই আরশাদ ওয়ালিউর রহমান ২০২৩ সালের ১৬ জুন রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে মারা যান। সম্পত্তির লোভে তার বোন সিমিন রহমানসহ অপর আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে ভাই আরশাদ ওয়ালিউর রহমানকে বিষ প্রয়োগ বা শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছেন।
অর্থ আত্মসাৎ মামলা
এ মামলায় শাযরেহ হক উল্লেখ করেন, তার বাবা বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও এফডিআরে প্রায় ১০০ কোটি টাকা রেখে মারা গেছেন। সেসব অ্যাকাউন্টের নমিনি ছিলেন তার মা শাহনাজ রহমান। ২০২০ সালের ১ জুলাই লতিফুর রহমান মারা যাওয়ার পর ওই টাকা তার উত্তরাধিকারীদের (ওয়ারিশ) মধ্যে ‘বণ্টন করে দেওয়ার কথা থাকলেও’ বড় বোন সিমিন রহমান সব টাকা তার নিজের ও মায়ের অ্যাকাউন্টে সরিয়ে ফেলেন। সিমিন রহমান ট্রান্সকম ইলেকট্রনিকসের ১৮ শতাংশ শেয়ার কিনে নেওয়ার কথা বলে ২০২০ সালের ৩ আগস্ট ওই ১০০ কোটি টাকা থেকে ৬০ কোটি টাকা নিজের নামে সরিয়ে নেন। এ মামলায় শাহনাজ রহমান, সিমিন রহমান ছাড়া পরিবারের বাইরে ট্রান্সকমের করপোরেট অ্যাফেয়ার্স (আইন) বিভাগের নির্বাহী পরিচালক মো. ফখরুজ্জামান ভূঁইয়া, পরিচালক (প্রাক্তন কোম্পানি সেক্রেটারি) মো. কামরুল হাসান ও পরিচালক (করপোরেট ফাইন্যান্স) আবদুল্লাহ আল মামুনকে আসামি করা হয়। আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে টান্সকমের প্রয়াত মালিক লতিফুর রহমানের অন্য উত্তরাধিকারীদের বঞ্চিত করে ওই পরিমাণ টাকা আত্মসাৎ করে নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেন।
শেয়ার জালিয়াতির মামলা
এ মামলায় সিমিন রহমান ছাড়াও ট্রান্সকমের করপোরেট অ্যাফেয়ার্স (আইন) বিভাগের নির্বাহী পরিচালক মো. ফখরুজ্জামান ভূঁইয়া, অ্যাসিস্ট্যান্ট কোম্পানি সেক্রেটারি মোহাম্মদ মোসাদ্দেক ও কোম্পানি সেক্রেটারি অফিসের ম্যানেজার আবু ইউসুফ মো. সিদ্দিককে আসামি করা হয়েছে। এজাহারে শাযরেহ হক বলেন, ‘আমার পিতা লতিফুর রহমান তার জীবদ্দশায় ট্রান্সকম লিমিটেডের ২৩ হাজার ৬০০টি শেয়ারের মালিক থাকা অবস্থায় মারা যান। তার ২৩ হাজার ৬০০টি শেয়ার থেকে আমাকে এবং আমার ভাই আরশাদ ওয়ালিউর রহমানকে বঞ্চিত করার জন্য অবৈধভাবে নিজের নামে বেশি শেয়ার ট্রান্সফার করেন সিমিন রহমান। এ ক্ষেত্রে সিমিন রহমান ট্রান্সকম লিমিটেডের করপোরেট অ্যাফেয়ার্স নির্বাহী পরিচালক মো. ফখরুজ্জামান ভূঁইয়া, ট্রান্সকম লিমিটেডের করপোরেট ফাইন্যান্স পরিচালক (প্রাক্তন কোম্পানি সচিব) মো. কামরুল হাসান, ট্রান্সকম লিমিটেডের বর্তমান অ্যাসিস্ট্যান্ট কোম্পানি সেক্রেটারি মোহাম্মদ মোসাদ্দেক, ট্রান্সকম লিমিটেডের কোম্পানি সেক্রেটারি অফিসের ম্যানেজার আবু ইউসুফ মো. সিদ্দিকের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা নেন। এভাবে জালজালিয়াতির মাধ্যমে দলিল হস্তান্তরসহ আরও গুরুত্বপূর্ণ শেয়ার ট্রান্সফারের বিভিন্ন কাগজ আমার এবং আমার ভাইয়ের অজ্ঞাতসারে বিভিন্ন তারিখ ও সময়ে শেয়ার হস্তান্তরের কাগজ তৈরি করেন।’
ভুয়া সমঝোতার দলিল তৈরি
এ মামলায় বোন সিমিন রহমান, মা শাহনাজ রহমান, সিমিন রহমানের ছেলে যারাইফ আয়াত হোসেনকেও আসামি করা হয়। এ ছাড়া মামলাটিতে কোম্পানির কর্মকর্তা ফখরুজ্জামান ভূঁইয়া ও মো. কামরুল হাসানকে আসামি করা হয়েছে। এজাহারে শাযরেহ হক বলেন, “বাবা লতিফুর রহমানের মৃত্যুর পর প্রতিষ্ঠানের সিইও এবং চেয়ারম্যানসহ অপর আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে ট্র্যান্সকম গ্রুপের শেয়ার ও পজিশন নিজেদের অনুকূলে নেওয়ার উদ্দেশ্যে জালজালিয়াতির মাধ্যমে একটি ‘ডিড অব সেটলমেন্ট’ বা সমঝোতার দলিল তৈরি করেন, যেখানে আমার বাবার এবং আমার ভাই আরশাদ ওয়ালিউর রহমানের স্বাক্ষর জাল করেন। এ ক্ষেত্রে জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি সমঝোতা দলিলে আসামিরাই স্বাক্ষর করেন। তারা আমার দুই ছেলে যোহেব আসরার হক ও মিকাইল ইমান হকের স্বাক্ষর জাল করে ডিড অব সেটলমেন্ট তৈরি করেন।”