দেশের বিভিন্ন শপিংমলে আজ থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অভিযান শুরু হবে। শপিংমলের দোকানগুলোর অনলাইন ভ্যাট নিবন্ধন আছে কিনা অভিযানে তা যাচাই করা হবে। নিয়মিত ভ্যাট রিটার্ন দাখিল এবং ভ্যাট পরিশোধের তথ্যও খতিয়ে দেখা হবে। কোনো প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট ফাঁকির প্রমাণ পাওয়া গেলে জরিমানাসহ পাওনা আদায় করা হবে। ভ্যাট ফাঁকির পরিমাণ ৫০ লাখ টাকার বেশি হলে ওই প্রতিষ্ঠানের হিসাব জব্দ করা হবে। কোনো দোকান অনলাইন ভ্যাট নিবন্ধন না করলে তাৎক্ষণিক ভ্যাট নিবন্ধন দেওয়া হবে। এনবিআর সূত্রে এসব জানা যায়।
সূত্র আরও জানায়, অভিযান পরিচালনার জন্য প্রতিটা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট থেকে একাধিক টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। টাস্কফোর্সের সদস্যরা বিনা নোটিশে সাধারণ পোশাকে শপিংমলে হাজির হয়ে অভিযান পরিচালনা করবে। অভিযান পরিচালনার সময় বেচাকেনাতে যাতে কোনো ধরনের সমস্যা না হয় তা সর্তকতার সঙ্গে লক্ষ্য রাখা হবে। এনবিআর থেকে হিসাব কষা হয়েছে এসব শপিংমলের ভ্যাট ফাঁকি হাজার কোটি টাকার বেশি হবে।
এনবিআরের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, রাজধানীর বিভিন্ন শপিংমলে সারা বছরই ভালো কেনাবেচা হয়। দুই ঈদ, পয়লা বৈশাখ, পূজাসহ বিভিন্ন পালাপার্বণ ঘিরে বিক্রি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। শপিংমলের দোকানে প্রায় সব জিনিসের দাম বাইরের দোকান থেকে বেশি রাখা হয়। এসব দোকানে ভ্যাট যোগ করে পণ্যের দাম নির্ধারণ করা হয়। ক্রেতাদের বেশির ভাগই কত টাকা ভ্যাট আর কত টাকা পণ্যের প্রকৃত মূল্য তা না জেনেই মোট মূল্য হিসেবে পরিশোধ করে। বিভিন্ন সময়ের অভিযানে দেখা গিয়েছে, আদায় করা ভ্যাট বেশির ভাগ বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের মালিক নিজের কাছে রেখে দেন, একটি অর্থও সরকারি কোষাগারে জমা দেন না। খুব কম দোকানই আদায় করা প্রকৃত ভ্যাট পরিশোধ করে। এসব দোকানের বেশির ভাগেরই অনলাইনে ভ্যাট নিবন্ধন পর্যন্ত গ্রহণ করেনি। অনলাইনে ভ্যাট নিবন্ধন না থাকায় এসব দোকান এনবিআরের নজরদারিতে আসছে না।
এনবিআরের চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, দেশের ভ্যাটযোগ্য কোনো প্রতিষ্ঠান অনলাইনে ভ্যাট নিবন্ধন না নিলে ওই প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করা হবে। ভ্যাট নিবন্ধন দেওয়া হবে। কোনো প্রতিষ্ঠান ভালো ব্যবসা করেও অনলাইনে ভ্যাট নিবন্ধন না করলে এবং ভ্যাট ফাঁকি দিলে তা কোনোভাবে মেনে নেওয়া হবে না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা খবরের কাগজকে বলেন, প্রতিবেদন থেকে শপিংমলের ভ্যাট ফাঁকির এমন তথ্য পাওয়া যায়। তবে রাজধানীসহ সারা দেশেই এ অভিযান শুরু হবে। এনবিআরের লোকবলের সংকটে একটি এলাকাতে বিভিন্ন শপিংমলে পর্যায়ক্রমে অভিযান পরিচালনা করা হবে।
এনবিআর থেকে জানা যায়, যমুনা ফিউচার পার্ক, বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্স, সেন্টার পয়েন্ট (উত্তরা), সীমান্ত স্কয়ার (ধানমন্ডি), পুলিশ প্লাজা কনকর্ড (গুলশান-১), ইস্টার্ন প্লাজা শপিং কমপ্লেক্স (হাতিরপুল / এলিফ্যান্ট রোড), নিউ মার্কেট (আজিমপুর), মৌচাক মার্কেট (মালিবাগ), রাজলক্ষ্মী কমপ্লেক্স (উত্তরা), গুলশান পিঙ্ক সিটি (গুলশান), রাপা প্লাজা (ধানমন্ডি), টোকিও স্কয়ার (ঢাকা), মাসকট প্লাজা (উত্তরা), এসকেএস টাওয়ার (মহাখালী), রাজউক ট্রেড সেন্টার (উত্তরা), নাভানা শপিং কমপ্লেক্স (গুলশান), গুলশান ডিসিসি মার্কেট (গুলশান-১), প্লাজা সেন্ট্রাল শপিং মল (গুলশান-২), শাহ আলী প্লাজা (মিরপুর-১০), মাল্টিপ্ল্যান সেন্টার (এলিফ্যান্ট রোড), আড়ংয়ের বিভিন্ন শাখা, ইস্টার্ন মল্লিকাসহ রাজধানীর বিভিন্ন শপিংমলে অভিযান পরিচালনা করা হবে।
এনবিআরের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এর আগে গুলশান-২-এর পিংক সিটিতে ভ্যাট নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর থেকে অভিযান চালিয়ে দেখা যায়, এখানে দুই শতাধিক দোকান ভ্যাট প্রদানে সক্ষম হলেও মাত্র ৬৪টি দোকান ভ্যাট নিবন্ধন নম্বর গ্রহণ করেছে। এ শপিং মলের মাত্র ৪০টি প্রতিষ্ঠান সঠিক হিসাবে ভ্যাট পরিশোধ করলেও বাকিরা মিথ্যা তথ্যে পাওনা ভ্যাটের অতি সামান্য পরিশোধ করেছে। এ শপিংমলে ভ্যাট ফাঁকি উদঘাটন হয় প্রায় ২৪১ কোটি টাকার। চট্টগ্রামের বিভিন্ন শপিংমলে অভিযান চালিয়ে দেখা যায় ভ্যাট ফাঁকির উৎসব চলছে।
দোকানে চোরাই পণ্য আছে কি না যাচাই করা হবে এবারের অভিযানে দোকানে চোরাই পণ্য রাখা হয়েছে কি না তাও যাচাই করা হবে। বিশেষভাবে পোশাক, অলংকার এবং ইলেকট্রোনিকস পণ্য কোথা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে তা দেখা হবে। বিশেষ নজর দেওয়া হবে মোবাইল ফোনের ক্ষেত্রে। অন্যদিকে সোনা ও রুপার গয়না কোথা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। পুরানো সোনা ভেঙে বানানো হয়েছে না কি না অথবা বিদেশ থেকে আনা হয়েছে কি না তাও দেখা হবে। বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়েছে নাকি ব্যাগেজ রুলে আনা হয়েছে তা বিশেষভাবে দেখা হবে। পোশাকের ক্ষেত্রেও কোথা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে তা যাচাই করা হবে। দোকানে রাখা পণ্যের ঠিকমতো ভ্যাট, শুল্ক কর পরিশোধ করার প্রমাণ পাওয়া না গেলে তা জরিমানাসহ আদায় করা হবে।