জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হলেও নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সামনে এখন সব থেকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে অস্ত্র-হামলার মহড়া, রাজনৈতিক সহিংসতা-হানাহানি, টার্গেট কিলিং, পেশাদার অপরাধীদের নানামুখী তৎপরতার কারণে নির্বাচনের মাঠ ব্যাপক অস্থিতিশীল বা ভীতিকর হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশ্লেষকরা।
গতকাল জুমার নামাজের পর রাজধানীর পল্টন এলাকায় দুর্বৃত্তদের হামলায় গুলিবিদ্ধ হয়েছেন ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি, যিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সম্মুখসারির নেতা এবং ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র। এর বাইরেও সম্প্রতি রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হত্যা-আহতসহ একাধিক ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনাকে জাতীয় নির্বাচনের আগে অশনিসংকেত হিসেবেও দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
এ প্রসঙ্গে গতকাল পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোহাম্মদ নুরুল হুদা খবরের কাগজকে বলেন, ‘এবারের জাতীয় নির্বাচন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক বা নিয়ন্ত্রণে রাখাই হবে এই নির্বাচনের প্রধান চ্যালেঞ্জ। চব্বিশের এত বড় একটি ঘটনার (জুলাই অভ্যুত্থান) পর পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অনেকটা স্তিমিত রয়েছে। তবে সেটা কাটিয়ে ওঠা জরুরি, না হলে নির্বাচন সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।’
ওসমান হাদির গুলিবিদ্ধ হওয়ার প্রসঙ্গ এনে সাবেক এই আইজিপি বলেন, ‘হাদির গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। এই সময়ে (নির্বাচনকালে) দুষ্কৃতিকারী বা পেশাদার অপরাধীদের তৎপরতা বেড়ে যায়। টার্গেট হামলা-কিলিংসহ নানা ঘটনা ঘটতে পারে। তাই পুলিশসহ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে আরও সজাগ থাকতে হবে।’
গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন। তবে জুলাই অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লুট হওয়া প্রায় ১ হাজার ৩৪০টি আগ্নেয়াস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এমনকি ওই সময়ে জেল ভেঙে পালিয়ে যাওয়া অন্তত ৭০০ জন দুর্ধর্ষ আসামি লাপাত্তা অবস্থায় বাইরে রয়ে গেছে। এর বাইরেও পেশাদার অপরাধী, শুটার বা আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসীরাও মাঝেমধ্যে নিজের অবস্থান জানান দিচ্ছে। এসব মিলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও উৎসবমুখর করা কতটা সম্ভব, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষকরা।
এ প্রসঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. আল মাসুদ হাসানুজ্জামান গতকাল সন্ধ্যায় খবরের কাগজকে বলেন, ‘সুষ্ঠু-অবাধ নির্বাচনের পূর্বশর্ত হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখা। কিন্তু আমরা দেখলাম, তফসিল ঘোষণার পরই রাজনৈতিক সহিংসতা ঘটছে। একে অশনিসংকেত হিসেবে দেখছি। এসব ঘটনা নির্বাচনের মাঠে রাজনৈতিক সহাবস্থানকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। সহনশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা খুব জরুরি।’
অধ্যাপক ড. আল মাসুদ হাসানুজ্জামান আরও বলেন, ‘নির্বাচন আয়োজনের সঙ্গে ইসিসহ যাদের বিভিন্ন ধরনের ভূমিকা বা সম্পৃক্ততা রয়েছে, তাদের প্রত্যেককে আন্তরিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। অপরাধীদের তৎপরতা রোধে জনগণকেও সচেতন করতে হবে।’
গতকাল বিকেলে রাজধানী ঢাকার ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, বাংলামোটর, শাহবাগসহ বিভিন্ন পয়েন্টে পুলিশকে ব্যাপক তল্লাশি চালাতে দেখা যায়। বিশেষ করে ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার প্রেক্ষাপটে মোটরসাইকেল আরোহী বা যাত্রীদের তল্লাশির কবলে পড়তে হয় বেশি। অনেকের সঙ্গে থাকা ব্যাগ ও শরীর পর্যন্ত তল্লাশি করতে দেখা গেছে। রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে পুলিশের সতর্ক অবস্থান ছিল চোখে পড়ার মতো।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী খবরের কাগজকে বলেন, ‘চব্বিশের অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসেবে পুলিশের এত বড় বিপর্যয় আর কখনো ঘটেনি। কিন্তু সেখান থেকে এই দেড় বছরেও পুলিশ বাহিনী সেভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। এ ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ পর্যায়ে ব্যবস্থা গ্রহণের যথেষ্ট ঘাটতি দেখা গেছে। এ রকম দুর্বল অবস্থার মাঝেও পুলিশ যা করেছে তা সন্তোষজনক। কিন্তু জাতীয় নির্বাচনের মতো আয়োজনে শুধু পুলিশের ওপর ভরসা করার সুযোগ নেই। তবুও এখানে সামরিক বাহিনী মোতায়েন থাকছে, বিজিবি থাকছে। সরকার বা রাষ্ট্রকে এখন তাদের দায়িত্ব পালনের বিষয়টা বুঝতে হবে। এখানে সক্ষমতা প্রদর্শনের বিষয়টিও জরুরি। দ্রুত সক্ষমতা না দেখালে বিপদ বাড়বে।’
ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী আরও বলেন, ‘আমরা দেখছি এখনো আইন হাতে তুলে নেওয়া হচ্ছে। ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হলেন। এর আগে নুরুল হক নুর হামলার শিকার হন। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষককে প্রকাশ্যে লাঞ্ছিত করা হলো। একজন শিক্ষক যতই খারাপ হোন না কেন, তাকে এভাবে কি লাঞ্ছিত করা যায়? কিন্তু এসব প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেই। বিচারও হচ্ছে না। এসব কারণে অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে। সার্বিক পরিস্থিতি খুব ভালো মনে হচ্ছে না।’
একই প্রসঙ্গে সামাজিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক খবরের কাগজকে বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা দেশের সবচেয়ে বড় আয়োজন। তবে যে প্রেক্ষাপটে এবারের জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, তাতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক বা নিয়ন্ত্রণে রাখার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, বৈধ বা লাইসেন্স করা আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণে রাখা, চিহ্নিত বা পেশাদার অপরাধীদের গ্রেপ্তারসহ এজাতীয় বিষয়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখাতে হবে, না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।’
কারা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জুলাই অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন কারাগার থেকে মোট ২ হাজার ২৫০ বন্দি পালিয়ে যান। তাদের মধ্যে পরে আত্মসমর্পণ এবং গ্রেপ্তার হয়েছেন ১ হাজার ৫৫০ জন। এখন পর্যন্ত পলাতক রয়েছেন আরও ৭০০ জন। এদের মধ্যে প্রায় ১০০-এর মতো রয়েছেন সাজাপ্রাপ্ত বন্দি বা কয়েদি। বাকিরা হত্যা, মাদক, সন্ত্রাসবিরোধী আইনসহ বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগে বিচারাধীন মামলায় হাজতি হিসেবে কারাগারে ছিলেন।
অন্যদিকে পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যমতে, গত বছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের বিভিন্ন থানা, ফাঁড়ি ও স্থাপনায় হামলা চালায় বিক্ষুব্ধরা। এ সময় পুলিশের ৫ হাজার ৭৬৩টি আগ্নেয়াস্ত্র লুট হয়। লুট হওয়া এসব অস্ত্রের মধ্যে গত ১০ নভেম্বর পর্যন্ত ৪ হাজার ৪২৩টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। সে হিসাবে বাকি ১ হাজার ৩৪০টি আগ্নেয়াস্ত্রের এখনো হদিস নেই।