ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে উত্তেজনার পারদ এখন চরমে। ভারতের দিল্লি, কলকাতা, মুম্বাই, আগরতলাসহ সেদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের অন্য মিশনের সামনে কয়েকদিন ধরেই বিক্ষোভ করছে দেশটির হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো। তারা জোর করে মিশনের ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করে যাচ্ছে। এই ঘটনায় ভারতের বিভিন্ন শহরে বাংলাদেশ মিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। নিরাপত্তা বিবেচনায় ভিসাসেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে উদ্বেগ জানিয়েছে বাংলাদেশ। ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মাকে তলব করে ভারতে অবস্থিত বাংলাদেশের সব মিশনের নিরাপত্তা বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে ঘটনার তদন্ত চেয়েছে ঢাকা। এদিকে ঢাকার পাল্টা ব্যবস্থা নিয়েছে নয়াদিল্লি। তারা সেখানকার বাংলাদেশ হাইকমিশনারকে তলব করেছে।
ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের এই চরম উত্তেজনা কোনদিকে মোড় নিচ্ছে এবং এর সমাধানই বা কী, এ নিয়ে মুখ খুলেছেন দেশি-বিদেশি কূটনীতিক ও বিশ্লেষকরা। ঢাকায় নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেকসান্দার গ্রিগোরিয়েভিচ খোজিনও সোমবার সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে জানান, ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে বিরাজমান উত্তেজনা আর বাড়তে দেওয়া উচিত নয়। তিনি এই উত্তেজনা দ্রুত কমানোর আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘প্রতিবেশী দুটি রাষ্ট্রের সম্পর্ক পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাসের ওপর পরিচালিত হওয়া উচিত।’
ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের উত্তেজনা প্রশমন করার লক্ষ্যে দু-দেশের শীর্ষ পর্যায়ে আলোচনা করা দরকার বলে খবরের কাগজকে জানান, আঞ্চলিক সংস্থা বিমসটেকের সাবেক মহাসচিব ও রাষ্ট্রদূত শহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ-ভারত চলমান উত্তেজনা কতদূর বাড়তে দেওয়া যায়, সে বিষয়ে উভয় দেশকে চিন্তা করতে হবে। যদিও দু-দেশের বর্তমান অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে কূটনীতিতে।’ তিনি বলেন, ‘ভারতেও নির্বাচন আসন্ন, তাই মোদি সরকারের ওপর জনগণের চাপ আছে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু ইস্যু নিয়ে। আবার বাংলাদেশেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওপর চাপ আছে, কেন ভারতকে কিছু বলা হচ্ছে না। তবে কূটনৈতিক কথাবার্তায় যাতে উত্তেজনা না বাড়ে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে উভয় পক্ষকে।’ শহিদুল ইসলাম আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের আগে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের উন্নতি করা সম্ভব না হলেও যাতে তা স্বাভাবিক থাকে, সে চেষ্টা করতে হবে। কেননা, প্রতিবেশী দু-দেশের মধ্যে এ অবস্থা কারও জন্যই শুভ নয়।’
ভারতের নয়াদিল্লিসহ অন্য শহরে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশন চত্বরের বাইরে সহিংস বিক্ষোভের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মাকে আবারও তলব করে গভীর উদ্বেগের কথা জানায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম তাকে তলব করে ভারতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনগুলোর বিরুদ্ধে পূর্বপরিকল্পিত সহিংসতা বা ভীতি প্রদর্শনের নিন্দা জানান, যা শুধু কূটনৈতিক কর্মকর্তাদের নিরাপত্তাকেই হুমকির মুখে ফেলে না, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, শান্তি ও সহনশীলতার মূল্যবোধকেও ক্ষুণ্ন করে। তিনি এই ঘটনার তদন্ত চান এবং এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ভারতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশন ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য দিল্লির প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সরকার আশা করে, ভারত সরকার কূটনৈতিক কর্মী, প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা ও নিরাপত্তা রক্ষায় আন্তর্জাতিক এবং কূটনৈতিক বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী অবিলম্বে যথাযথ পদক্ষেপ নেবে।
এ নিয়ে গত ১০ দিনে প্রণয় ভার্মাকে দুইবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করা হলো। আর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বিভিন্ন ঘটনায় এ নিয়ে অন্তত ৬ বার তলব করা হলো প্রণয় ভার্মাকে। পরে বলা হয়, বাংলাদেশ এ ধরনের পরিকল্পিত সহিংসতা বা কূটনৈতিক স্থাপনার প্রতি হুমকিমূলক কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানায়। এসব কর্মকাণ্ড কেবল কূটনৈতিক কর্মীদের নিরাপত্তাই বিপন্ন করে না, বরং পারস্পরিক সম্মান, শান্তি ও সহনশীলতার মূল্যবোধকেও ক্ষুণ্ন করে।
ওদিকে ভারতের নয়াদিল্লিতে গতকালও বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে বিক্ষোভ করে হিন্দুত্ববাদী সংগঠন বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) এবং বজরং দল। বিক্ষোভ সামনে রেখে সকাল থেকেই নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশন প্রাঙ্গণ ঘিরে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। পুরো এলাকা তিন স্তরের ব্যারিকেড দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রচুর পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়।
বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ তুলে কয়েক দিন ধরে ভারতে বিক্ষোভ চলছে। ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে ১৮ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের ভালুকায় পোশাক কারখানার শ্রমিক দীপু চন্দ্র দাসকে পিটিয়ে হত্যার পর তার লাশ আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এরপর হিন্দুত্ববাদীরা বিক্ষোভ শুরু করে।
এ ছাড়া কলকাতায় বাংলাদেশ উপদূতাবাসের বাইরে গতকালও বিক্ষোভ করেছে উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা। বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, এবিভিপি ও হিন্দু জাগরণ মঞ্চসহ সংঘ পরিবারের একাধিক সংগঠনের ডাকে বিক্ষোভকারীরা প্রথমে কলকাতার বেকবাগান এলাকায় জড়ো হন। এরপর মিছিল নিয়ে তারা বাংলাদেশ উপদূতাবাসের দিকে অগ্রসর হলে পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে তাদের আটকে দেয়। বিক্ষোভকারীদের দাবি, তারা ময়মনসিংহে দীপু চন্দ্র দাসকে পিটিয়ে হত্যার প্রতিবাদ জানাতে এই কর্মসূচি পালন করছেন। এ সময় বিক্ষোভকারীরা পুলিশের ব্যারিকেড ভাঙতে চাইলে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ লাঠিচার্জ করে। একপর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ধস্তাধস্তি শুরু হয় এবং বেশ কয়েকজনকে টেনেহিঁচড়ে প্রিজনভ্যানে তুলে নেয় পুলিশ। গতকাল মুম্বাইয়ে বাংলাদেশ মিশনের সামনেও বিক্ষোভের ঘটনা ঘটে।
এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এসএম মাহাবুবুল আলম জানান, ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনারকে তলব করে বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে গভীর উদ্বেগ ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। এ সময় ভারতের পক্ষ থেকে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। ভারতে বাংলাদেশের কোন কোন মিশনে ভিসা সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে- এমন প্রশ্নের উত্তরে মাহাবুবুল আলম বলেন, ‘নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয় বিবেচনায় নয়াদিল্লি, আগরতলা ও শিলিগুড়িতে বাংলাদেশের ভিসা সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।’
পাল্টা তলব ভারতের
দিনভর বিভিন্ন মিশনের সামনে বিক্ষোভ আর প্রতিবেশী দুই দেশের কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনারকে পাল্টা তলব করেছে ভারত। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহকে ডেকে পাঠায় দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
তাকে তলবের কথা জানিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, তলবের পর হাইকমিশনারের সঙ্গে কথা বলেন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বাংলাদেশ ও মিয়ানমার বিভাগের প্রধান বি শ্যাম।
ভারতের বিভিন্ন স্থানে বাংলাদেশ মিশনের সামনে দিনভর বিক্ষোভ ও উত্তেজনার মধ্যে বার্তা সংস্থা এনআইকে উদ্ধৃত করে রিয়াজ হামিদুল্লাহকে তলব করার খবর দিয়েছে ভারতের সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে।
এর আগে গতকাল সকালে ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মাকে তলব করে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তাকে ডেকে দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে শনিবারের বিক্ষোভ এবং শিলিগুড়িতে বাংলাদেশ ভিসা সেন্টার ভাঙচুরের ঘটনায় ঢাকার উদ্বেগের কথা তুলে ধরেন পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম। এ নিয়ে ১০ দিনের মধ্যে দুইবার করে তলব ও পাল্টা তলবের ঘটনা ঘটল।
গত ১৪ ডিসেম্বর ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনারকে তলব করেছিল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এরপর ১৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশের হাইকমিশনারকে দিল্লিতে পাল্টা তলব করা হয়েছিল।