২০২৫ সাল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী বছর। ২০২৪ সালের আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সাড়ে আট মাসের সংলাপের পর ‘জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫’ প্রণয়ন করেছে, যা সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় সংস্কারের একটি রোডম্যাপ। এখন এটি চূড়ান্ত বাস্তবায়নের জন্য গণভোটের মাধ্যমে জনগণের রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে। এ প্রক্রিয়াটি দেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে, যেখানে জনগণের মতামতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে।
কমিশন গঠনের পটভূমি
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তীব্র গণ-আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের পর তিন দিনের মাথায় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। দায়িত্ব গ্রহণের শুরুতেই সরকার ঘোষণা দেয়–নির্বাচন আয়োজনের আগে রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো সংস্কারে মোট ১১টি কমিশন গঠন করা হবে। দেশের বিভিন্ন খাতে বড় ধরনের সংস্কারের সুপারিশ তৈরি এবং রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করা গুরুত্বপূর্ণ কমিশনগুলো হলো–নির্বাচনব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, সংবিধান, পুলিশ প্রশাসন, দুর্নীতি দমন ও জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন। এসব কমিশনের কাজকে রাজনৈতিক ঐকমত্যে রূপ দিতে ২০২৫ সালের শুরুতে গঠিত হয় জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। তবে সরকার গঠিত বাকি পাঁচটি (স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য, নারী ও শিশু, শ্রম অধিকার এবং গণমাধ্যমবিষয়ক) কমিশনের সংস্কার কার্যক্রম এই কমিশনের আওতাভুক্ত করা হয়নি।
দীর্ঘ সংলাপ ও বৈঠকের ধারাবাহিকতা
গঠনের পর থেকে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন প্রায় সাড়ে আট মাস ধরে রাজনৈতিক দল ও জোটগুলোর সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করে। এ সময়ে কমিশনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর একাধিক দফায় বৈঠক হয়–কখনো পৃথকভাবে, কখনো জোটভিত্তিক। প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গেও দুই দফায় দলগুলোর বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এসব বৈঠকে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), হেফাজতে ইসলাম, ইসলামী আন্দোলনসহ ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত দলগুলো অংশ নিলেও ২০২৪ সালের নির্বাচনে অংশ নেওয়া নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধিত ২৮টি দল পুরো প্রক্রিয়ার বাইরে থাকে। এই অন্তর্ভুক্তিহীনতাই শুরু থেকেই ঐকমত্য প্রক্রিয়ার একটি বড় সীমাবদ্ধতা হিসেবে আলোচিত হয়।
জুলাই জাতীয় সনদ: ঐক্যের দলিল
ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকে আলোচনার ফল হিসেবে প্রথমে তৈরি হয় ৮৪ দফা সংস্কার প্রস্তাব। পরে এই প্রস্তাবগুলোর ভিত্তিতে ১৭ অক্টোবর ২০২৫ রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষরে গৃহীত হয় ‘জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫’। সংসদ ভবনে বিশাল আয়োজনে এক মঞ্চে দাঁড়িয়ে ২৪টি দল ও জোট সনদে স্বাক্ষর করে, যা সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল দৃশ্য। এক দিন পর ১৯ অক্টোবর আলাদাভাবে জুলাই সনদে সই করে গণফোরাম। এই সনদে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগুলো সংস্কারের নীতিগত রূপরেখা নির্ধারণ করা হয়। এই পর্যায়ে সংস্কারের লক্ষ্য ও নীতিতে ঐকমত্য থাকলেও বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে মতভেদ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সংসদের মাধ্যমে সংস্কার হবে, নাকি গণভোটের মাধ্যমে–এই প্রশ্নে দলগুলো বিভক্ত হয়ে পড়ে।
সুপারিশ, নোট অব ডিসেন্ট ও বিতর্ক
২৮ অক্টোবর জাতীয় ঐকমত্য কমিশন তাদের চূড়ান্ত সুপারিশ প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দেয়। এতে দুটি বাস্তবায়ন বিকল্প তুলে ধরা হয় এবং গণভোট ও সংসদের ভূমিকা নির্ধারণে ২৭০ দিনের সময়সীমা প্রস্তাব করা হয়। এই ধাপে সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয় ছিল–নোট অব ডিসেন্ট (ভিন্নমত) নথিগুলো চূড়ান্ত প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত না করা। রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন, বিচার বিভাগ ও দুর্নীতি দমন কমিশনের ক্ষমতাসহ অন্তত ৯টি বিষয়ে দলগুলোর ভিন্নমত থাকলেও কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে তা অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ঐক্যের দলিল রক্ষার যুক্তিতে ভিন্নমত বাদ দেওয়ার সরকারি এই সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন ওঠে।
গণভোটের সময়কাল নিয়ে বিভক্তি
কমিশনের সুপারিশের পর সরকার রাজনৈতিক দলগুলোকে সাত দিনের সময় দেয়–গণভোট নির্বাচনের আগে না পরে হবে, সে বিষয়ে তাদের ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত চাওয়া হয়। কিন্তু দলগুলো এ বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়। কেউ নির্বাচনের আগে গণভোট চায়, কেউ পরে। এই অনৈক্যের প্রেক্ষাপটেই সরকার নিজ দায়িত্বে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পথে এগোয়।
নির্বাচনের সঙ্গে গণভোট করার সিদ্ধান্ত
গণভোট ইস্যুতে দলগুলো ঐকমত্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হওয়ায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। গত ১৩ নভেম্বর জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ঘোষণা দেন–ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে অনুষ্ঠিত হবে। তিনি জানান, ৮৪ প্রস্তাবের মধ্যে শেষ পর্যন্ত ৩০টিতে ঐকমত্য হয়েছে। বাকি চারটি মূল ইস্যু—শাসনব্যবস্থার ধরন, নির্বাচন কমিশনের গঠন, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ ও বিচার বিভাগের নিয়োগ ও জবাবদিহি–একক প্রশ্নে ‘হ্যাঁ-না’ ভোটে জনগণের রায়ের জন্য তোলা হবে। একই সঙ্গে অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে জুলাই জাতীয় সনদ সংবিধানে অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া শুরুর ঘোষণা আসে, যা বাংলাদেশের সংবিধান ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা।
নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল
সর্বশেষ ১১ ডিসেম্বর নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তফসিল ঘোষণার মাধ্যমে স্পষ্ট হয় বাংলাদেশ একই দিনে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের পথে হাঁটছে। এরই মধ্যে একই দিনে রাষ্ট্রে গুরুত্বপূর্ণ এ দুটি ভোট একসঙ্গে আয়োজনের সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে সংস্থাটি। কাজেই ২০২৫ সালটি শুধু একটি ব্যতিক্রমী রাজনৈতিক বছর নয়, এটি রাষ্ট্র সংস্কারের পরীক্ষামূলক এক যুগান্তকারী সময়। কমিশনের সংলাপ, দলগুলোর সই, ভিন্নমত, সরকারের সিদ্ধান্ত ও জনগণের রায়ের অপেক্ষা–সব মিলিয়ে প্রক্রিয়াটি গণতান্ত্রিক যাত্রায় এক নতুন দিকনির্দেশনা দিচ্ছে। এটি গণতন্ত্রের অনুশীলনে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।