ভারতের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাণিজ্য সমঝোতা হয়েছে। এতে দেশটির সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের শিল্প খাত প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে সক্ষমতা কমবে বলে আশঙ্কা সরকারি ও বেসরকারি খাতের সংশ্লিষ্টদের। এ ধাক্কা সামলাতে বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে পুরোনো চুক্তিগুলো হালনাগাদ করার পাশাপাশি নতুন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করতে যোগাযোগ করছে। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব জানা গেছে।
সরকারসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের শিল্প খাত প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের সক্ষমতা বাড়াতে অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করছে। আশা করি, এর সুফল পাওয়া যাবে।
বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘৯ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক কমানো নিয়ে আমাদের বৈঠক হবে। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের নতুন বাণিজ্য বাড়ানোর ক্ষেত্রে সমঝোতার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি আমাদের সঙ্গে অন্য দেশের পুরোনো চুক্তিগুলো হালনাগাদ করে বাংলাদেশের সুবিধা বাড়াতে আলোচনা চলছে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের শিল্প খাত প্রতিযোগী হতে পারবে। বাংলাদেশ বিভিন্ন ধরনের সুবিধা পাবে। বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের খরচ কমবে।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা খবরের কাগজকে বলেন, ‘এরই মধ্যে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, নেপালসহ বেশ কিছু দেশের সঙ্গে নতুন করে বাংলাদেশের বাণিজ্য সুবিধা বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিতীয় দফা আলোচনা শেষ হয়েছে। এই বছরের মধ্যে তাদের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর হবে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের কাছেও আমরা এফটিএর জন্য প্রস্তাব পাঠিয়েছি।’
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) আগামী তিন মাসের মধ্যে চূড়ান্ত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশ সম্প্রতি জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) করেছে। এতে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটিতে বাংলাদেশের ৭ হাজার ৩০০-এর বেশি পণ্য শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। এ অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অন্য দেশের সঙ্গেও একই ধরনের আলোচনা এগিয়ে নিতে চায় সরকার। জাপানের সঙ্গে ইপিএ হলে বাংলাদেশের শিল্প-ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়বে। এতে রপ্তানি বাড়বে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে এফটিএ হলে আমাদের বাজার আরও বাড়বে। স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বাংলাদেশ বিদ্যমান বাণিজ্য সুবিধা হারাতে পারে। তাই এফটিএ নিয়ে আলোচনা শুরু করা জরুরি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে চুক্তি হলে বাংলাদেশে ইউরোপীয় বিনিয়োগ বাড়বে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।’
রবিবার (১ ফেব্রুয়ারি) ঢাকার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় বাংলাদেশে ইউরোপীয় চেম্বার অব কমার্সের (ইউরোচেম) চেয়ারপারসন নুরিয়া লোপেজের সঙ্গে বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ইইউর সঙ্গে দ্রুত এফটিএ নিয়ে আলোচনা শুরুর আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘বর্তমানে বিদ্যমান শুল্কমুক্ত সুবিধার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও যেন বাংলাদেশের রপ্তানি, বিশেষ করে তৈরি পোশাক ইইউর বাজারে অব্যাহতভাবে প্রবেশাধিকার থাকে। এ জন্য এখনই প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।’
দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ভারতের সঙ্গে ইইউর এফটিএ কার্যকর হলে ইইউর বাজারে তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য, হিমায়িত মাছ ও চিংড়ি, প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন পণ্যে ভারত শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। এতে বাজারটিতে বাংলাদেশের এসব পণ্যের রপ্তানি কঠিন হবে।
এফটিএ বাস্তবায়িত হলে ইইউ থেকে আমদানি করা ৩০ শতাংশ পণ্যের ওপর ভারতীয় শুল্ক তাৎক্ষণিক শূন্য হবে। ভারতে রপ্তানি করা ৯৬ দশমিক ৬ শতাংশ পণ্যে শুল্ক থাকবে না। ইইউ থেকে আমদানি হওয়া গাড়ির ওপর শুল্ক ৩০-৩৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনতে পারবে ভারত। বিমান ও মহাকাশ শিল্পের প্রায় সব পণ্যে শুল্ক থাকবে না। ওয়াইন ও স্পিরিটের ওপর বর্তমান ১৫০ শতাংশ শুল্ক কমে ২০ থেকে ৫০ শতাংশ হবে। অন্যদিকে ভারতের রপ্তানি করা ৯০ শতাংশ পণ্যের ওপর থেকে শুল্ক তুলে নেবে ইইউ কর্তৃপক্ষ। ৭ বছরের মধ্যে এই সুবিধা ৯৩ শতাংশে উন্নীত হবে। ইইউর বাজারে তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য, হিমায়িত চিংড়ি ও মাছ, রাসায়নিক দ্রব্য, প্লাস্টিক, রাবার, রত্ন ও অলংকার রপ্তানিতে তাৎক্ষণিকভাবে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে ভারত।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, বর্তমানে অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা জিএপির অধীনে ইইউতে শুল্কমুক্ত সুবিধা পায় বাংলাদেশ। তবে চলতি বছরের নভেম্বরে এলডিসি তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার কথা বাংলাদেশের। এরপর তিন বছর অর্থাৎ ২০২৯ সাল পর্যন্ত ইইউর বাজারে জিএসপিসুবিধা থাকবে আমাদের। এখনই বাংলাদেশকে এ বিষয়ে উদ্যোগ নিতে হবে।
ইইউ বাংলাদেশি পণ্যের সবচেয়ে বড় বাজার। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। তার মধ্যে ২১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে ইইউর বাজারে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে ৮ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন, কানাডায় ১ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন, জাপানে ১ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে।
অন্যদিকে ইউরোপীয় কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ইইউ ও ভারতের মধ্যকার বাণিজ্য ছিল ১২০ বিলিয়ন ইউরো। ভারত থেকে ইইউ দেশগুলোর আমদানি ছিল ৭১ বিলিয়ন ইউরো। আর ইইউ থেকে ভারত আমদানি করেছে ৪৯ বিলিয়ন ইউরো।
পোশাক খাতের শীর্ষ সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম খবরের কাগজকে বলেন, ইইউ ও ভারতের মধ্যকার এফটিএ কার্যকর হলে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাকশিল্প বড় চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়বে। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশ জিএসপি প্লাস সুবিধা পেলেও তার অধীনে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে না। সে ক্ষেত্রে বিকল্প হচ্ছে ইইউর সঙ্গে এফটিএ করা। না হলে শুল্ক দিয়ে তৈরি পোশাক রপ্তানি করতে হবে। সেটি হলে ইইউর মতো বড় বাজারে রপ্তানি কমতে পারে।