জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের শেষ ৪৮ ঘণ্টার কাউন্টডাউন শুরু হয়েছে। আজ সকাল সাড়ে ৭টায় শেষ হয়েছে সব প্রচার। গত কয়েক দিনে আচরণবিধি লঙ্ঘন নিয়ন্ত্রণে নির্বাচন কমিশন ও ইসির ভূমিকা যথেষ্ট ধারালো ছিল না।
ভোটের মাঠের প্রেক্ষাপট বলছে, নির্বাচনি আচরণবিধি রক্ষায় পুরোপুরি সফল হতে পারেনি নির্বাচন কমিশন ইসি। নির্বাচন কমিশন দাবি করেছে, তারা আইনের আওতায় থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে। অপরদিকে নির্বাচন বিশ্লেষক ও সুশীল সমাজের বড় একটি অংশের মতে, আচরণবিধি বাস্তবায়নে ইসির উদ্যোগ অনেক ক্ষেত্রেই ছিল সাড়াদানমূলক, আগাম প্রতিরোধমূলক নয়।
গণভোটের প্রচারে ইসির কড়া বার্তা
গত ২৯ জানুয়ারি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদ্দেশে ইসির নির্দেশনায় বলা হয়– প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত কেউ গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-এর পক্ষে ভোট চাওয়ার আহ্বান জানাতে পারবেন না; এমন কার্যক্রম দণ্ডনীয় অপরাধ। গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর ২১ ধারা এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও), ১৯৭২-এর ৮৬ ধারা উদ্ধৃত করে ইসি জানায়, সরকারি পদমর্যাদা ব্যবহার করে গণভোটের ফল প্রভাবিত করার চেষ্টা দণ্ডনীয় অপরাধ।
ইসির নির্দেশনা খুব স্পষ্ট ছিল, কিন্তু মাঠে এই নির্দেশনা বাস্তবায়নে ইসির দৃশ্যমান কঠোরতা ছিল সীমিত। ইসির নির্দেশনার পরও মাঠপর্যায়ে সরকারের ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার অব্যাহত ছিল। ইসির নিষেধাজ্ঞা ছিল আইনের আওতায়। তবে সেই আইন লঙ্ঘন করায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ইসি কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
আচরণবিধি বাস্তবায়নের হালচিত্র
ইসির তথ্য অনুযায়ী, হাজার হাজার অবৈধ পোস্টার-ব্যানার অপসারণ করা হয়েছে। শতাধিক প্রার্থীকে সতর্ক করে নোটিশ দেওয়া হয়। কিছু ক্ষেত্রে অর্থদণ্ড আরোপ করা হয়েছে। কিন্তু প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও সরকারি প্রচার বন্ধে ইসির কার্যকর হস্তক্ষেপ সীমিত ছিল। বিশেষ করে গণভোট ইস্যুতে সরকারি সম্পদের ব্যবহার ও উপদেষ্টাদের সফর নিয়ে ইসি প্রকাশ্য কোনো কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি।
আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনাবলি
ঢাকাসহ দেশজুড়ে ছিল রঙিন ব্যানার ও নতুন মোড়কে নিষিদ্ধ পোস্টারের ছড়াছড়ি। নিষেধাজ্ঞা এড়াতে প্রচারে প্রার্থীরা কৌশল বদলেছেন, উদ্দেশ্য বদলাননি। পোস্টার নিষিদ্ধ থাকলেও ‘শুভেচ্ছা’, ‘ধন্যবাদ’ বা ব্যক্তিগত ছবি ব্যবহার করে কালার ব্যানার ও ফেস্টুন দেখা গেছে বিভিন্ন এলাকায়। ইসি এসব অপসারণে উদ্যোগ নিলেও তা ছিল খণ্ডিত ও এলাকানির্ভর। এ ছাড়া বিভিন্ন স্থানে সংঘাত সংঘর্ষের ঘটনাসহ নানা অভিযোগের পাহাড় থাকলেও নিষ্পত্তির হার প্রশ্নের মুখে। নির্বাচনি প্রচারের সময়জুড়ে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ আসে বিভিন্ন সূত্র থেকে। তফসিল ঘোষণার পর থেকে সারা দেশে সংঘর্ষ ও হামলার ঘটনায় ৫ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন প্রায় ১ হাজার মানুষ। নির্ধারিত সময়ের বাইরে প্রচার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সভা, প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের প্রকাশ্য উপস্থিতি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পক্ষপাতমূলক প্রচার ছিল অভিযোগের প্রধান বিষয়। অনেক অভিযোগ তদন্তাধীন থাকলেও দ্রুত সিদ্ধান্ত না আসায় মাঠে বার্তা গেছে–লঙ্ঘনের ঝুঁকি তুলনামূলক কম।
বিধি বাস্তবায়নে ইসির পদক্ষেপ
ভ্রাম্যমাণ আদালত, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, মনিটরিং টিম ও হটলাইন চালু করেছিল ইসি। কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, আইনি সীমাবদ্ধতা ও বাস্তব পরিস্থিতির কারণে অনেক ক্ষেত্রে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি। কাঠামো ছিল, কিন্তু প্রয়োগে ছিল দ্বিধা। প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও কমিশনাররা একাধিক সংবাদ সম্মেলনে ‘শূন্য সহনশীলতা’র কথা বললেও বাস্তবে অনেক সিদ্ধান্তে ধীরগতি দেখা গেছে। ইসি সচিবালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, আইনগত সীমাবদ্ধতা ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্লেষকের মূল্যায়ন, ইসির ব্যাখ্যা
ইসির সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও নির্বাচন বিশ্লেষক জেসমিন টুলী খবরের কাগজকে বলেন, ‘২৯ জানুয়ারির চিঠি ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রশ্ন হলো–এর পর কী হলো? বড় কোনো দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না হওয়ায় মাঠে বার্তা গেছে, এটি মূলত নৈতিক চাপ, আইনি নয়।’ তার মতে, ইসির সদিচ্ছা থাকলেও সাহসী প্রয়োগের ঘাটতি ছিল স্পষ্ট।
নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ বলেছেন, ‘গণভোট ও নির্বাচন একসঙ্গে হওয়ায় পরিস্থিতি জটিল। আমরা আইন অনুযায়ী নির্দেশনা দিয়েছি এবং নজরদারি করেছি। আমরা সংবিধান ও আইনের সীমার মধ্যে থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। কোথাও লঙ্ঘনের প্রমাণ পেয়েছি, সেখানে ব্যবস্থা নিয়েছি। সব অভিযোগ যে গণমাধ্যমে আসে, তা নয়। নির্বাচন একটি চলমান প্রক্রিয়া, এখানে ধাপে ধাপে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তার মতে, অভিযোগের পাশাপাশি সীমাবদ্ধতাও ছিল। তারপরও অভিযোগ অনুযায়ী বিধি বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছে কমিশন। তিনি জানান, শেষ সময়ে কমিশনের নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে।