জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর থেকে সরস আলোচনায় রয়েছে ‘বটবাহিনী’। নির্বাচনের আগে বেড়ে গিয়েছিল ‘বটবাহিনী’র তাণ্ডব। তবে নির্বাচনের ফল নির্ধারণে ‘বটবাহিনী’র প্রভাব খুব একটা দেখা যায়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘বটবাহিনী’ অনলাইনে অনেক কিছু করলেও বুথে গিয়ে তো আর ভোট দিতে পারে না।
নির্বাচনের আগে পর্যবেক্ষকদের অনেকেই মনে করতেন, বটের প্রভাবে সাধারণ মানুষের ভোট ব্যাপকভাবে যেকোনো একদিকে ঝুঁকে পড়তে পারে। তবে নির্বাচনের ফলাফলে সে রকম প্রভাব দেখা যায়নি। তারা বলছেন, দিন শেষে মানুষ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, কম্পিউটার-মোবাইল ফোনের স্ক্রিন থেকে মুখ তুলে স্থানীয় নেতাদের বক্তব্য-বর্ণনায় মনোযোগ দিয়েছেন।
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর তানভীর হাসান জোহা তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ। গতকাল বৃহস্পতিবার খবরের কাগজকে তিনি বলেন, ‘‘জনগণ ভুল সিদ্ধান্ত নেয় না। বটের প্রভাবে কারও পক্ষে বা বিপক্ষে একটা হাইপ তোলা যায়। কিন্তু ভোটের আগে সাধারণ মানুষ স্থানীয় নেতাদের বয়ান-বিবরণ শুনে সিদ্ধান্ত নেয়। শেষ পর্যন্ত মানুষ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে, নারীর সম্মানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ‘বটবাহিনী’ একটা হাইপ তুলতে পারে, কিন্তু বট তো ভোট দিতে পারে না।’’
প্রসঙ্গত, নির্বাচনে ভোট গ্রহণের আগে খবরের কাগজ ‘বটবাহিনী’ নিয়ে দুটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এর মধ্যে সর্বশেষ গত ২৫ জানুয়ারি ‘আরও আগ্রাসী বটবাহিনী’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনে তানভীর হাসান জোহার উদ্ধৃতি ছিল, ‘‘ইংরেজি রোবট (Robot) শব্দের শেষাংশ থেকে এই বট শব্দটি এসেছে। রোবট যেমন স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করে, এই ‘বটও স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করে। এতে প্রোগ্রাম সেট করে যদি কমান্ড দিয়ে দেওয়া হয়, বিভিন্ন ফেসবুক অ্যাকাউন্টের কমেন্টের ঘরে গিয়ে ওমুককে গালি দিতে (বা নির্দিষ্ট করে অন্য কিছু বলতে), সে তাই করবে। আবার যদি বলা হয়, অমুক অমুক ফেসবুক পোস্টে গিয়ে ‘লাইক’ দিতে, সে তাই করবে। হাজার হাজার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে এ ধরনের পোস্ট, লাইক, ডিসলাইক (হাসির ইমো) বা কমেন্ট দেওয়া যায়। সামনে ভোট। ভোটে এর মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে। কারণ এই বটের প্রভাবে একজন প্রার্থীর পক্ষে বাস্তবতার বাইরে গিয়ে অস্বাভাবিক ইতিবাচক বা নেতিবাচক আবহ তৈরি করা সম্ভব, যা দেখে সাধারণ ভোটাররা প্রভাবিত বা প্রতারিত হতে পারেন, বিভ্রান্ত হতে পারেন।’’
তিনি বলেন, ‘একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট সাধারণত একজন মানুষের হয়, এটি মানুষ পরিচালনা করে। তবে বটের অ্যাকাউন্টগুলো আলাদাভাবে কোনো মানুষ পরিচালনা করে না। সেট করে দেওয়া প্রোগ্রাম/কমান্ড অনুসারে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করে।’
কিন্তু নির্বাচনের ফলাফলে তো বটের তেমন প্রভাব চোখে পড়েনি। এমন প্রশ্নের জবাবে নিজের ব্যাখ্যা মনে করিয়ে দিয়ে এই তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘বট ভোটের ফলাফল ওলট-পালট করে দিতে পারেনি, ঠিক আছে। কারণ বট তো আর বুথে গিয়ে ভোট দিতে পারে না। কিন্তু এর কোনো প্রভাব নেই, তা কিন্তু নয়। বট কোনো রাজনৈতিক পক্ষ ব্যবহার করতো, তা কমবেশি সবাই বোঝে। লক্ষ্য করবেন, তারা প্রত্যাশার চেয়েও ভালো করেছে।’
‘বটবাহিনী’র এসব অপতৎপরতা মোকাবিলা করেছেন রাজনৈতিক দলের মাঠপর্যায়ের তরুণরা। তারা তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বয়োবৃদ্ধদের তুলনায় ভালো বোঝেন। তাদের একজন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. ওমর ফারুক (শাকিল চৌধুরী) গতকাল খবরের কাগজকে বলেন, ‘‘তরুণ প্রজন্ম অনেক সচেতন, তারা জেনে গেছে কারা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ‘বটবাহিনী’র মাধ্যমে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়েছে, এবং কারা ‘বটবাহিনী’র মাধ্যমে প্রোপাগান্ডা বা অপপ্রচার চালাচ্ছে। ভোট দেওয়ার সময় মানুষ তাদের কথায় কর্ণপাত করেনি। তাদের স্বরূপ মানুষের কাছে ভোটের আগেই উন্মোচিত হয়ে গেছে, পরিষ্কার হয়ে গেছে।’’