নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পুলিশবাহিনীতে আবারও রাজনৈতিক ‘ট্যাগিং’ (তকমা লাগানো) তৎপরতা শুরু হয়েছে। এতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কট্টর সমর্থক, ঘরানার বা সহযোগী আখ্যা দিয়ে বেশ কিছু পুলিশ কর্মকর্তার নামে নতুন করে কথিত তালিকা তৈরি করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট অনেকে বলছেন, কথিত এসব তালিকায় কর্তৃপক্ষ বিভ্রান্ত হলে টার্গেট হওয়া কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলক অবসর বা বরখাস্ত হওয়ার প্রেক্ষাপট তৈরি হতে পারে। পুলিশ সদর দপ্তর বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ‘অফিশিয়ালি’ এই ধরনের তালিকার বিষয়ে অবগত নয় বলে জানিয়েছে। তার পরও এই ধরনের অপতৎপরতার কারণে উদ্বিগ্ন পেশাদার কর্মকর্তারা।
২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়েই আওয়ামী লীগের কট্টর সমর্থক বা সহযোগী অভিযোগে বেশ কিছু ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর পাঠায়। অনেককে বরখাস্ত বা বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। এ ছাড়া বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে বা প্রতিষ্ঠানে সংযুক্ত (ওএসডি) করে রাখা হয়। এরই মধ্যে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর এখন আবারও জোরালো আলোচনা শুরু হয়েছে রাজনৈতিক তকমা দিয়ে পুলিশে কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলক অবসর বা বরখাস্তের বিষয়টি।
খোঁজ নিয়ে জানা যাচ্ছে, কথিত এই তালিকা যতটা না প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দেখা হচ্ছে, তার চেয়ে বেশি তৎপরতা চলছে ব্যক্তিকেন্দ্রিক। ফলে পুলিশবাহিনীর ভেতরে নতুন করে বিভ্রান্তি ও অনিশ্চয়তা বা পেশাদার কর্মকর্তা-সদস্যদের মনোবল দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
অভিযোগ উঠেছে, একশ্রেণির কর্মকর্তা তুলনামূলক ভালো পদপদবি, সুবিধামতো পোস্টিং বা বাহিনীতে প্রভাব সৃষ্টির জন্য নিজ স্বার্থে বিভিন্ন ব্যাচের কর্মকর্তাদের নামের সঙ্গে আওয়ামী লীগের তকমা জুড়ে দিয়ে তালিকা তৈরি করছেন। সে রকম কিছু ছোট-বড় তালিকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন কর্মকর্তার টেবিলেও পাঠানো হয়।
পুলিশ সদর দপ্তর ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকার বদল হলেই এই জাতীয় রাজনৈতিক তকমা লাগানোর তৎপরতা বাড়ে। এর জন্য একশ্রেণির পুলিশ কর্মকর্তা দায়ী। নতুন করে কথিত তালিকায় অনেক কর্মকর্তাকে আওয়ামী লীগ সরকারের সহযোগী উল্লেখ করা হচ্ছে। কিন্তু নিরপেক্ষতার দৃষ্টিতে দেখলে তাদের অনেকেই পেশাদার কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত। অনেকে মনে করছেন, নীতিনির্ধারকদের বিভ্রান্ত করে টার্গেট করা কিছু কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া বা বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর মাধ্যমে নিজেদের ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করা হচ্ছে। সেই প্রচেষ্টা হিসেবে এসব তালিকা তৈরি করা হয়ে থাকতে পারে।
এ প্রসঙ্গে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোহাম্মদ নুরুল হুদা খবরের কাগজকে বলেন, ‘পুলিশের মতো এমন একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীর সদস্যদের যদি এভাবে রাজনৈতিক ট্যাগ দেওয়া হয়, তবে বাহিনীর অভ্যন্তরীণ পরিবেশ ধরে রাখা মুশকিল হয়। এমন তালিকা করা হয়ে থাকলে তার প্রতিকূল বা নেতিবাচক মনোভাব পড়বে বাহিনীতে। তাছাড়া এ ধরনের চেষ্টা বা তৎপরতা বাহিনীর জন্য সার্বিকভাবে ভালো হবে না। সবকিছু পেশাদারত্বের সঙ্গে দেখা জরুরি।’
সম্প্রতি পুলিশের ২৭ জন কর্মকর্তার একটি তালিকাও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন দপ্তরে পাওয়া গেছে, যার একটি কপি খবরের কাগজের কাছেও সংরক্ষিত রয়েছে।
ওই তালিকায় বিসিএস (পুলিশ) ক্যাডারের ১৫তম ব্যাচের ২ জন, ১৭তম ব্যাচের ৭ জন এবং ১৮তম ব্যাচের ১৮ জন কর্মকর্তার নাম দেখা গেছে। যদিও সেই তালিকাটি কোন দপ্তর থেকে তৈরি, কে বা কারা তৈরি করেছে, কোন দপ্তর থেকে অনুমোদন বা পদক্ষেপ নেওয়া হবে– সেগুলো কিছুই উল্লেখ নেই। সেদিক থেকে তালিকাটি গুরুত্ব বহন করে না। কিন্তু প্রত্যেক কর্মকর্তার নামের পাশে তাদের ‘বিপি’ নম্বর, পদক বা বিশেষ ডিগ্রিসহ কে কোথায় কর্মরত সবই এমনভাবে উল্লেখ রয়েছে, যা অফিশিয়াল কাগজপত্রে সাধারণত ব্যবহার হয়ে থাকে।
ওই তালিকায় শিরোনামের মতো করে উল্লেখ রয়েছে– ‘২৫ বছর পূর্ণ হওয়ায় বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়ার লক্ষ্যে কট্টর আওয়ামী লীগপন্থি এবং অবৈধভাবে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখতে সহায়তাকারী কর্মকর্তাগণের তালিকা।’
এমন তালিকা প্রসঙ্গে গতকাল পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হলে তারা এ বিষয়ে গণমাধ্যমে খোলামেলা কথা বলতে রাজি হননি। তবে তারা বলেছেন, আওয়ামী লীগ দীর্ঘ ১৬ বছর ক্ষমতায় থাকায় অনেকেই এই দলটির অনুসারী, সমর্থক বা সহযোগীর ভূমিকায় ছিলেন। আবার অনেকে বাধ্য হয়েছেন। তার মাঝেও কেউ কেউ পেশাদারত্ব বজায় রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে গেছেন।
অন্যদিকে টানা শাসনামলের শুরুতে সরকার গঠন করেই আওয়ামী লীগও বেশ কিছু পুলিশ কর্মকর্তাকে বিএনপি-জামায়াতপন্থি আখ্যা দিয়ে বাধ্যতামূলক অবসর, বরখাস্ত বা ওএসডি করেছিল। সবমিলে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ কর্মকর্তাদেরও রাজনৈতিক ট্যাগের মাধ্যমে এক ধরনের শাস্তির মুখোমুখি হওয়ার ‘রেওয়াজটি’ দীর্ঘদিন ধরেই চলে আসছে। কিন্তু এ ধরনের সংস্কৃতি সুশৃঙ্খল বাহিনীর জন্য খুবই নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করে। কোনো বাহিনীতে এই ধরনের রাজনৈতিক দলাদলি বা রাজনৈতিক তকমা লাগানোর বিষয়টি খুবই দৃষ্টিকটু।
এ প্রসঙ্গে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ওমর ফারুক খবরের কাগজকে বলেন, “পুলিশ সরকারের কথামতো কাজ করবে– এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু রাজনৈতিক দলের হয়ে ‘নেতা-কর্মীর’ মতো কাজ করার বিষয়টি খুবই অপেশাদারমূলক এবং অনৈতিক। অনেকে ভালো পদপদবি, পদোন্নতি বা প্রভাব ও সুযোগ-সুবিধা বাগিয়ে নিতে এক ধরনের অনৈতিক প্রতিযোগিতা করে থাকেন। অনেকে দলীয় নেতা-কর্মীদের মতো আচরণ প্রকাশ করে থাকেন, যা বাহিনীর মর্যাদাকে হেয় করে। পুলিশের ভেতরে রাজনৈতিক দলের তকমার বিষয়টি অনেক দিন ধরেই দেখা যাচ্ছে। এতে পুলিশবাহিনীর নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। অন্যদিকে পেশাদার কর্মকর্তারাও বিব্রতকর পরিস্থিতির শিকার হন। কোনো কোনো সময় পেশাদার কর্মকর্তাদেরও রাজনৈতিক তকমা দিয়ে নিজের সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করে থাকে সুবিধাভোগীরা। ফলে সার্বিকভাবে এই জাতীয় ট্যাগ বা তকমা সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। সুবিধাভোগী পুলিশ কর্মকর্তা বা সদস্যদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাহিনীর অভ্যন্তরে জবাবদিহি-স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। এ বিষয়ে সরকারের তথা রাজনৈতিকভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।”
পুলিশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে কর্মরত এসপি পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা পেশাদারত্বের সঙ্গে কাজ করতে চাই। কিন্তু যদি হঠাৎ করে বলা হয়– আপনি অমুক রাজনৈতিক ঘরানার, তখন নিজের প্রকৃত অবস্থান প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এই ভয় এখন অনেকের মধ্যেই তাড়া করছে।’
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা খবরের কাগজকে জানান, কিছু ব্যক্তি নিয়মিতভাবে বিভিন্ন ব্যাচ বা কর্মকর্তাদের নিয়ে অভিযোগ পাঠাচ্ছেন। তারা বিষয়টি এমনভাবে উপস্থাপন করছেন, যেন প্রশাসনের ভেতরে বড় ধরনের রাজনৈতিক সমস্যা রয়েছে।
এই মন্ত্রণালয়ের আরেকজন কর্মকর্তা বলেন, যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো অভিযোগকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
পুলিশবাহিনীর অনেকে বলেছেন, বর্তমানে যে ধরনের তালিকার কথা শোনা যাচ্ছে, সেখানে শুধু কথিত আওয়ামী ঘরানার নয়, জাতীয়তাবাদী ঘরানার বলে পরিচিত কয়েকজন কর্মকর্তার নামও রয়েছে। ফলে রাজনৈতিক বিবেচনার চেয়ে মূলত ব্যক্তিগত আক্রোশ, দ্বন্দ্ব বা পদপদবির প্রতিযোগিতা থেকেই এসব তালিকা তৈরি করা হতে পারে বলে মনে করেন তারা।
তাদের মতে, যোগ্যতা, দক্ষতা বা পেশাদারত্বের পরিবর্তে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে মূল্যায়নের সংস্কৃতি চলতে থাকলে পুলিশবাহিনীর ভেতরে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে যেসব কর্মকর্তা অতীতে দুর্নীতি বা নানা বিতর্কের কারণে পদোন্নতি পাননি, তাদের কেউ কেউ ক্ষোভ থেকে নিজেকে বঞ্চিত সাজিয়ে নতুন পরিস্থিতিতে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।