‘দইয়ের হাঁড়িতে দই থাক, ঘিয়ের হাঁড়িতে ঘি’–সমস্যা অনুসারে আলাদা আলাদা ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া অতিসাধারণ এই প্রবাদ বুঝতে মাসের পর মাস সময় নিচ্ছে রাজধানীর মহাখালীতে অবস্থিত সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল। ফলে সরকারি এই হাসপাতালটি নিজেই সংক্রমণ ছড়াচ্ছে।
কারণ হাসপাতালটি একই ওয়ার্ডে হাম, নিউমোনিয়া, জলবসন্তসহ সংক্রামক বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা দিচ্ছে রোগীদের। বিভিন্ন ধরনের রোগী ও তাদের স্বজনদের এমন মাখামাখিতে নতুন নতুন রোগে সংক্রমিত হচ্ছেন তারা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে মিল রেখে বাংলাদেশে চলতি ২০২৬ সালের মধ্যে হামের সংক্রমণ বন্ধ করার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা ছিল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ঢাকা কার্যালয়ের দেওয়া তথ্যানুসারে বছর বছর সংক্রমণ কমিয়ে সেই লক্ষ্যের দিকেই এগোচ্ছিল বাংলাদেশ। প্রতি ১০ লাখ জনসংখ্যায় হামের সংক্রমণের হার দেখিয়ে সংস্থাটি গণমাধ্যমের কাছে সম্প্রতি একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরে। এতে দেখানো হয়েছে, ২০২২ সালে সংক্রমণের হার ছিল ১ দশমিক ৪১, ২০২৩ সালে ১ দশমিক ৬০, ২০২৪ সালে ছিল ১ দশমিক ৪৩। সর্বশেষ ২০২৫ সালে তা ১-এর নিচে শূন্য দশমিক ৭২-এ নামে। যদিও বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে হামের টিকাদান অব্যাহত না রাখার কারণে বর্তমানে তা ১৬-এর ওপরে চলে যায়।
১০০ শয্যাবিশিষ্ট সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. এ আর এম সাখাওয়াত হোসেন জানান, এই হাসপাতালে অন্য সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীদের জন্য শয্যা বরাদ্দ আছে মাত্র ১০টি। কিন্তু গত ফেব্রুয়ারি থেকে দেশে হাম সংক্রমণ বাড়ার পরিপ্রেক্ষিতে অন্যান্য হাসপাতালের মতো এখানেও চাপ বাড়ে। উপরন্তু এটি সংক্রামক ব্যাধির জন্য স্থাপিত হওয়ায় অন্যান্য হাসপাতাল হামের বাড়তি রোগী এই হাসপাতালে পাঠাতে থাকে এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও বাড়তি রোগী ভর্তি নিতে থাকে। কিন্তু এসব রোগীকে অন্যান্য রোগীর সঙ্গে ভর্তি রেখেই চিকিৎসা দেওয়া হয়।
এর ফলে একজন রোগী সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র নিয়ে গেলেও অন্য রোগের জীবাণু নিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি আছে। এমনকি রোগী সুস্থ হলেও তার সঙ্গে আসা স্বজনদের (অ্যাটেনডেন্ট) অন্য রোগে আক্রান্ত হয়ে যাওয়ার উদাহরণ আছে। এমন পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে হাসপাতালের এই কনসালট্যান্ট বলেন, ‘বিষয়টি আমরাও লক্ষ করেছি। আমাদের কাছেও এমন উদাহরণ আছে।’
তাহলে হাম রোগীদের ওয়ার্ড আলাদা করা হচ্ছে না কেন–প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আগামীকাল (আজ রবিবার) থেকে করব।’ তা ছাড়া হাসপাতালের নোংরা পরিবেশ, ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে বিড়ালের অবাধ বিচরণের চিত্র তুলে ধরলে তিনি বলেন, ‘এখানে ডাক্তার-নার্স থেকে শুরু করে নিরাপত্তা প্রহরীর পর্যন্ত সংকট আছে। দোতলার জানালা দিয়ে চোর ঢুকে রোগী বা তাদের স্বজনদের মোবাইল ফোনসহ মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে। আমরা এসব বিষয় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।’
তিনি বলেন, ‘অন্যান্য হাসপাতাল বাড়তি রোগী আমাদের এখানে পাঠিয়ে দিচ্ছে। বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে রোগীরা আমাদের এখানে আসে। আমরাও মুখের ওপর না বলতে পারি না। শয্যার অতিরিক্ত প্রায় ৫০ শতাংশ রোগী ভর্তি আছে আমাদের এখানে। হামসহ অন্যান্য রোগীও আছে। বাড়তি রোগীদের মেঝেতে শুইয়ে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।’
গত শুক্রবারের একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরে ডা. এ আর এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ভর্তি থাকা রোগীদের মধ্যে যখন ৯১ জনকে শয্যা দেওয়া সম্ভব হয়েছে, তখন ৪৯ জনকে রাখতে হয়েছে মেঝেতে।
আরেক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘এখানে আমাদের কাছে তো মনে হচ্ছে এটি মহামারি। তবে সার্বিক বিবেচনায় এমন ঘোষণা দেওয়া যায় কি না, তা বিবেচনার এখতিয়ার কেন্দ্রের।’
শিশুরা হামে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে উল্লেখ করে অভিভাবকদের সচেতন হওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। শিশুস্বাস্থ্যবিষয়ক এই কনসালট্যান্ট জানান, হামের টিকা শিশুর ৯ মাস পূর্ণ হলে প্রথমবার দেওয়া হয়। দ্বিতীয়বার দেওয়া হয় ১৫ মাস পূর্ণ হলে। যদিও কোনো কোনো অভিভাবক দুই ডোজ দেওয়ার পর বুস্টার ডোজ দেওয়ার ক্ষেত্রে হেলাফেলা করেন।
তিনি বলেন, বুস্টার ডোজ প্রতি পাঁচ বছর পরপর দেওয়ার কথা। বুস্টার ডোজ সর্বশেষ দেওয়া হয়েছে ২০২০ সালে। সেই হিসাবে ২০২৫ সালে আবারও দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গত বছর ২০২৫ সালের শুরুর দিকে যে টিকা দেওয়ার কথা ছিল, সেটা না দেওয়ায় এবার হামের প্রকোপ বেড়েছে বলে মনে হচ্ছে।