‘গরমে প্রচণ্ড পিপাসা লাগে। ধারেকাছে যা পাই তাই খাই। এভাবে বাদাম, চানাচুর, রাস্তার ধুলাবালি খেয়েই পার করতে হয়েছে ৩ ঘণ্টা। দীর্ঘ এ সময়ে টয়লেটও পায়। কিন্তু যেতে পারিনি। সে সুযোগ হয়নি। কারণ লাইন ছাড়লে অন্যরা তো আমাকে সাইডে ফেলে এগিয়ে যাবে। এভাবেই চরম ভোগান্তি শেষে অবশেষে ৫০০ টাকার তেল পেলাম।’
রাজধানীর বনশ্রী এলাকার বাসিন্দা বাইকচালক নাজমুল হোসেন আসাদগেটের সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনে রবিবার (১২ এপ্রিল) বেলা ৩টায় এই ভোগান্তির কথা জানান। তার মতো বহু চালক ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেন বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে তেল পাওয়ার আশায়। চৈত্রের রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে অপেক্ষা করতে হয় তাদের। তবুও সহজে মেলে না তেল।
গতকাল বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে ঘুরে এমনই চিত্র দেখা গেছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু সম্প্রতি জাতীয় সংসদে বলেছেন, ‘দেশে পর্যাপ্ত জ্বালানি তেল মজুত রয়েছে। জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই ।’ তার পরও ডিপো থেকে পাম্পমালিকরা চাহিদামতো পাচ্ছেন না তেল। যতই দিন যাচ্ছে দেশে জ্বালানি তেলের সংকট ততই তীব্র হয়ে উঠছে। আগে দুই-চার ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তেল পাওয়া গেলেও এখন সেখানে কোনো কোনো চালককে টানা ১৫ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার খবরও পাওয়া গেছে।
চালক নাজমুল হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমি অনলাইনে মাছের ব্যবসা করি। বাইকই আমার শেষ ভরসা। রাতে চলাচল করি। এই সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনে আসার আগে তেল ফুরিয়ে যাওয়ায় ভ্যানে করে বাইক আনতে হয়। কারণ দেড় ঘণ্টা এক পাম্পে লাইন দিয়ে কাছে গেলে বলা হয় তেল শেষ। পাম্প বন্ধ। তেল নিতেই বহু সময় চলে যাচ্ছে। ভোগান্তির কোনো শেষ নেই, টয়লেটের চাপ এলে তা আটকে রাখতে হয়। তাই পাম্পে তেল পাওয়ার পরই টয়লেটে যাই। দুপুরে ভাত খাওয়ার সুযোগ হয়নি। এটা-সেটা খেয়ে ৫০০ টাকার তেল নিতে ৮০ টাকা খরচ হয়ে গেছে। তারপরও পেট ভরেনি। এখন দুপুরের খাবার খাব।’
এই ফিলিং স্টেশনে রুহুল আমিন নামে এক বাইকচালক বলেন, ‘আমি হেমায়েতপুর থেকে এসেছি। পথে কোনো সুযোগ পাইনি। তাই এই পাম্পে লাইন দিই। টাউন হলে লাইন শুরু হয়। এরপর সড়কে বাইক ঠেলতে ঠেলতে ঘণ্টা তিনেক লাগে। তারপরও ৫০০ টাকার তেল পেলাম। এই দীর্ঘ সময়ে ক্ষুধা লাগলেও তেমন কিছু মনে হয়নি। প্রস্রাবও চেপে রাখতে হয়েছে। এটি বড়ই কষ্টের। তাই তেল পেয়েই টয়লেটে দৌড় দিই।’ শুধু দিনের বেলায় নয়, গভীর রাত পর্যন্ত তেল পেতে এই ভোগান্তি দেখা গেছে এ ফিলিং স্টেশনে।
দেখা গেছে, এই পাম্পে বাইকে ৫০০ টাকার, ব্যক্তিগত গাড়িতে ২ হাজার ও মাইক্রোতে ৩ হাজার টাকার তেল দেওয়া হচ্ছে। এ ব্যাপারে পাম্পের ম্যানেজার সজীব সরকার শংকর খবরের কাগজকে বলেন, ‘ঢাকা শহরে মুষ্টিমেয় কয়েকটা পাম্প থেকে তেল দেওয়া হচ্ছে। এ জন্য লাইন আগের তুলনায় বড় হচ্ছে। আমরা চেষ্টা করছি কম করে হলেও সবাই তেল পাক। কেউ যেন ঘুরে না যান। যতক্ষণ তেল থাকছে সবাইকে দেওয়া হচ্ছে।’ অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিদিন কত তেল পাচ্ছি, কত বিক্রি হচ্ছে, দিন শেষে অবশিষ্ট কত থাকছে তার তালিকাও দেওয়া যাচ্ছে। যাতে সবাই প্রকৃত তথ্য জানতে পারেন। ট্যাগ অফিসাররা এসে এসব তথ্য দেখেছেন।’
এই ফিলিং স্টেশনের অপর পাশে তালুকদার ফিলিং স্টেশনে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। পাম্প বন্ধ। রশি দিয়ে পথ আটকানো। তার পরও চালকরা গেটের বাইরে অপেক্ষা করছেন। বেলা ৩টায় দেখা যায় চালকদের সেই লাইন গণভবন মোড় ঘুরে জিয়া উদ্যান ছাড়িয়ে গেছে।
এ সময় খালেক নামে এক ব্যক্তিগত গাড়ির চালক বলেন, ‘উত্তরা থেকে সকাল ৮টায় এসে লাইনে দাঁড়িয়েছি। আশায় আশায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছি। কখন তেল পাব জানি না। তার পরও ছেড়ে যাচ্ছি না। কারণ ওই দিকে কোনো তেল পাইনি। ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনেও দীর্ঘ লাইন। তাই এখানে পাওয়ার আশায় অপেক্ষা করছি।’
ফিলিং স্টেশনের সংশ্লিষ্টরা বলেন, ‘শনিবার সন্ধ্যার দিকে তেলের গাড়ি আসে। রাতেই শেষ হয়ে যায়। তাই পাম্প বন্ধ। আবার তেলের গাড়ি আসলে পাম্প খোলা হবে।’
ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে কথা হয় বনশ্রীর মোটরবাইকচালক রহিমের সঙ্গে। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘দুপুর ১২টার দিকে দেখি আমাদের এলাকার অধিকাংশ পাম্প বন্ধ। তাই তেলের জন্য প্রথমে তেজগাঁও যাই। কোনো সুযোগ পাইনি। পরে আসাদগেটের সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনে তেলের জন্য লাইনে যাওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু দেখি লাইন টাউন হলে গিয়ে ঠেকেছে। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলেও লাইন আগায় না। বাধ্য হয়ে রমনা ফিলিং স্টেশনে আসি দুপুর ২টার দিকে। কিন্তু পেলাম মাত্র ৫০০ টাকার তেল। কয় দিন যায় বলা মুশকিল। আবার ভোগান্তির লাইনে দাঁড়াতে হবে।’
রাজধানীর মহাখালী, তেজগাঁও, নীলক্ষেত, কল্যাণপুর ফিলিং স্টেশনেও দেখা যায় অভিন্ন দৃশ্য। তেল না থাকায় অধিকাংশ সময় বন্ধ থাকছে। তার পরও চালকরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে তেলের জন্য অপেক্ষা করছেন।