‘পুলিশ আইলে (এলে) দৌড় দিয়া যামুগা। আমার মতো অন্য সবাইও সইরা যাইব-গা। আমার ট্যাকা (টাকা) নাই, মার্কেটে দোকান নেওয়ার মতো সামর্থ্য নাই। কী আর করুম, পেটের দায়ে ফুটপাতে দোকান লইয়া বইছি।’
এমনটাই বলছিলেন রাজধানীর ফার্মগেট এলাকার ফুটওভারব্রিজের নিচের ফুটপাতে শরবতের টেবিল নিয়ে বসা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মোহাম্মদ সাইফুল। কয়েক দিন আগে যেখান থেকে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) সাইফুলের দোকানসহ আশপাশের ফুটপাতের সব দোকানিকে উচ্ছেদ করেছিল। কিন্তু পুলিশ চলে যাওয়ার পরপরই পুনরায় ফুটপাত দখল করে দোকান বসিয়েছেন তারা। শুধু ফার্মগেট এলাকা নয়, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ফুটপাত পুনরায় হকার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা দখলে নিয়েছেন। এ যেন চোর-পুলিশের খেলা।
ফুটপাতে ব্যবসা বসাতে হলে এখন চাঁদা দিতে হয় কি না, উত্তরে শরবত বিক্রেতা সাইফুল খবরের কাগজকে বলেন, “চাঁদা দিমু মানে! আমার ‘দল’ ক্ষমতায় আর আমি চাঁদা দিমু। কন কি আমার কাছ থেকে কেডা চাঁদা নিতে আইবো, তার খবর আছে। গত ১৭ বছর অনেক কষ্ট করছি, এখন ‘দল’ ক্ষমতায়...।”
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, মহাখালী, বনানী, বনানী কাঁচাবাজার, উত্তরা হাউসবিল্ডিং, আজমপুর, মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোর ফুটপাত হকার, ভাসমান দোকানি ও ব্যবসায়ীদের দখলে। চলছে জমজমাট ব্যবসা। রাজধানীর ফুটওভারব্রিজগুলোর ওপরেও হকারদের বসতে দেখা যায়।
গত ১-৫ এপ্রিল পর্যন্ত পাঁচ দিনব্যাপী ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগের পক্ষ থেকে রাজধানীজুড়ে ফুটপাত দখলমুক্ত করতে অভিযান চালানো হয়। সম্প্রতি উচ্ছেদ করা ফুটপাতগুলো আবারও দখল হয়ে গেছে। কোথাও ফলমূলের দোকান, কোথাও পোশাক, আবার কোথাও খাবারের দোকান বসিয়ে জমজমাট ব্যবসা চলছে। এতে পথচারীদের বাধ্য হয়ে মূল সড়ক দিয়ে হাঁটতে হচ্ছে, যা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।
গতকাল এ প্রসঙ্গে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘ফুটপাত দখলমুক্ত করা একটি চ্যালেঞ্জিং বিষয়। এটি অনেক দিনের সমস্যা। তবে আমরা এ বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি। হকার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বসার জন্য হলিডে মার্কেট এবং লাইট মার্কেটের আওতায় নিয়ে আসা যায় কি না, তা নিয়ে কাজ করছি। পাশাপাশি তাদের রেজিস্ট্রেশন বা তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়ায় আনা যায় কি না, তা খতিয়ে দেখছি। এতে তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হতো।’
ফার্মগেট এলাকায় ফুটপাতে বিভিন্ন পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছেন ভাসমান ব্যবসায়ীরা। এদিকে ফার্মগেটের হোটেল আনন্দ হোটেলের সামনে ফুটপাত দখল করে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন দোকানিরা। সেখানে ফলের দোকানও বসানো হয়েছে। ফুটওভার ব্রিজের সিঁড়ির গোড়ায় বসানো হয়েছে ফলের দোকান। ফুটওভার ব্রিজের ওপরে রয়েছেন ভাসমান দোকানিরা।
পান্থপথে বসুন্ধরা সিটি শপিংমলের সামনের সড়কের দুই পাশের ফুটপাত রয়েছে দোকানি ও ভাসমান ব্যবসায়ীদের দখলে। মেট্রো স্টেশনের সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে ফুটপাতে চা, পান-সিগারেটের দোকান, মোবাইল সামগ্রীর দোকান, ফুচকা, শরবতসহ বিভিন্ন পণ্যের পসরা সাজানো থাকতে দেখা যায়। অন্যদিকে বিপরীত পাশের সড়কের ফুটপাত দখল করে বসেছে জুতোর দোকান। এসব দোকান কারওয়ান বাজার গোলচত্বর সিগনাল থেকে শুরু করে পান্থপথ মোড় পর্যন্ত বিস্তৃত।
গতকাল বনানী সিগনাল থেকে কামাল আতাতুর্ক সড়ক ধরে গুলশানের দিকে যেতে দেখা যায়, ফুটপাতে একটি টেবিল ও চেয়ার নিয়ে বসানো হয়েছে বাসের টিকিট কাউন্টার। এ ছাড়া মূল সড়ক ছেড়ে ভেতরের গলিপথগুলোর ফুটপাতে বসেছে চা, পান-সিগারেটের দোকান। বনানী কাঁচাবাজার এলাকায় প্রায় সড়কের ফুটপাত হকার, ভাসমান ব্যবসায়ী ও দোকানিদের দখলে থাকতে দেখা যায়।
বনানী মাঠের বিপরীত পাশে সড়কে ফুটপাত দখল করে বসেছিলেন হকাররা। কেউ জুতো বিক্রেতা, কেউ চা বিক্রেতা। কামাল আতাতুর্ক অ্যাভিনিউয়ের সড়কের পাশে হাবীব মেনশন। ভবনটি মূল সড়কের পাশে। সামনে রয়েছে ফুটপাত। তবে সেটি খালি দেখা যায়। ভবনটির নিচে রয়েছে হাবীব ফ্রুট শপ নামে একটি ফলের দোকান। দোকানটি ভবনের এক কোণে থাকায় এর দুই পাশে ফুটপাত রয়েছে। সামনের অংশ পরিচ্ছন্ন থাকলেও পাশের অংশ ছিল ওই দোকানের ফলের ঝুড়ি ও ফলের ডালার দখলে। এর পাশের ভবনের নিচে রয়েছে লাকী জেনারেল স্টোর। সেই দোকানের বিভিন্ন পণ্য দোকানের বাইরে ফুটপাতে রাখা ছিল। বাইরে ফুটপাতে রয়েছে পান-সিগারেটের দোকান। এর পাশের সড়কের পুরো ফুটপাতজুড়ে বেশ কয়েকটি ফলের দোকান।
অন্য দিকে বনানী কামাল আতাতুর্ক সড়কের এফ আর টাওয়ারের সামনে টিনের ছাউনির নিচে ফুটপাতে শার্ট, প্যান্টসহ বিভিন্ন পণ্যের দোকান দেখা যায়। সেখানে দড়ি টাঙিয়ে হ্যাঙারে ঝুলানো ছিল শার্ট ও কাপড়। শার্ট বিক্রেতা রুবেল বলেন, ভ্যানে করে মাল (কাপড়) নিয়ে এসেছি। এখানে বসছি, হাঁটা-চলার মধ্যে যদি দুই একটা বিক্রি হয়। পেটের দায়ে ফুটপাতে বসেছি।
উত্তরা হাউসবিল্ডিং এলাকায় নর্থ টাওয়ারের পাশে ফুটপাত পুনরায় হকার ও ভাসমান ব্যবসায়ীদের দখলে গেছে। নর্থ টাওয়ারের পেছনের সড়কজুড়ে বসেছে বিভিন্ন পোশাকের দোকান। অন্যদিকে উত্তরা আজমপুরে এবি সুপার মার্কেটের পেছনে ২ নম্বর সড়কের দুই পাশই হকার ও ভাসমান ব্যবসায়ীদের দখলে। ব্যবসায়ীরা জানান, এই সড়কে ব্যবসা করতে হলে চাঁদা গুনতে হয়। চাঁদা না দিলে সড়কে বসতে দেওয়া হয় না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ব্যবসায়ী জানান, স্থানীয় রাজনৈতিক পাতি নেতারা এখানে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা নেন। পথচারীরা বলছেন, কিছুদিন আগে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে রাজধানীজুড়ে ফুটপাত থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। কিন্তু উচ্ছেদের পরপরই পুনরায় ফুটপাত দখল হয়ে গেছে।