ঢাকা ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
শেরপুরে নিখোঁজ ৫ ছাত্রের ৩ জনকে জীবিত উদ্ধার তনু হত্যা: দুই আসামিকে গ্রেপ্তারে ইন্টারপোলে রেড নোটিশের নির্দেশ বোয়ালখালীতে ওমান প্রবাসীকে হত্যা: শোকে পাথর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী ও মা মবতন্ত্র ও উচ্ছৃঙ্খল রাজনীতি বাড়ছে: যুবদল সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা ইউনুছ হাওলাদার আর নেই মরিশাসের শ্রমবাজার খুলতে সমঝোতা চুক্তিতে সম্মত টিআইবি প্রকৃত ঘটনা জাজ করে স্টেটমেন্ট দেয় না: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নারীর নিরাপত্তা নিয়ে অস্বস্তিকর বাস্তবতা ঈশ্বরগঞ্জে অটোরিকশাচাপায় শ্রমিকের মৃত্যু গণতন্ত্রে হতাশা এবং নেতৃত্বে অসন্তোষ শরীয়তপুরে প্রধান শিক্ষকের ওপর মব হামলা, আদালতে মামলা কন্যাশিশু নির্যাতন: আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক সংকট মনপুরায় ‘জয় বাংলা’ স্লোগানকে কেন্দ্র করে মামলা, ছাত্রলীগ নেতা কারাগারে বাজেট বাস্তবায়নে ছলচাতুরি চলবে না: চরমোনাই পীর আকাশসীমা পুনরায় খুলে দিয়েছে ইরাক ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে: মাহদী আমিন যেকোনো সাফল্যে যে দোয়া পড়তেন বিশ্বনবি (সা.) রৌমারীতে বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে নারীর মৃত্যু ইন্টার্ন ও ট্রেইনি চিকিৎসকদের কর্মবিরতি প্রত্যাহার ইসরায়েলবিরোধী সামরিক অভিযান স্থগিতের ঘোষণা ইরানের শেরপুরে ১২ দিনে পাঁচ শিক্ষার্থী নিখোঁজ, অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ জঙ্গল সলিমপুরে সড়ক নির্মাণকাজ শুরু করেছে সেনাবাহিনী ভাঙ্গায় বিয়েবাড়িতে খাবার নিয়ে সংঘর্ষে আহত ৭ হালুয়াঘাটে ছুরিকাঘাতে প্রাণ গেল যুবকের কালিহাতীতে ট্রেনে কাটা পড়ে গৃহবধূর মৃত্যু, পাশে মিলল আরেক নারীর মরদেহ ঝিনাইদহে ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিল জাতীয় মুট কোর্ট প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন ঢাবি পবিপ্রবিতে নতুন উপাচার্য অধ্যাপক ড. এস এম হেমায়েত জাহান পঞ্চগড় সীমান্তে পুশইনের চেষ্টায় ১০ জনকে ফিরিয়ে নিলো বিএসএফ গাজীপুরে চাঁদাবাজির অভিযোগে জনতার হাতে যুবদল নেতা আটক
Nagad desktop

মেঘনার পেটে মেঘনা

প্রকাশ: ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১০ এএম
আপডেট: ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:২৮ এএম
মেঘনার পেটে মেঘনা
খবরের কাগজ ইনফোগ্রাফ

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে মেঘনা নদীর বিশাল অংশ দখলে নিয়েছে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ। প্রতিষ্ঠানটি নদীর শাখা খালগুলোও দখল করে গড়ে তুলেছে একাধিক কারখানা। প্রায় তিন দশকের বেশি সময় ধরে ধীরে ধীরে আধিপত্য বিস্তারের মাধ্যমে এই দখল-প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। স্থানীয় এমপিসহ অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তির নদী তীরবর্তী বাপ-দাদার আমলের জমি দখল করেছে মেঘনা গ্রুপ। বিভিন্ন সময়ে এই দখলের কাজে তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছে সরকারি কর্মকর্তা, প্রতাপশালী রাজনীতিকসহ স্থানীয় নিজস্ব বাহিনী।

দেশের অন্যতম বড় নদী মেঘনা। নদীটি কেবল জলধারা নয়, দেশের অর্থনীতিতে রয়েছে এর ব্যাপক অবদান। পরিবেশ-প্রতিবেশ রক্ষায় নদীটি যুগ যুগ ধরে ভূমিকা পালন করে আসছে। অথচ এখন নদীর জায়গা দখল করে নিচ্ছে মেঘনা গ্রুপ। দেশের অন্যতম শীর্ষ দখলবাজ মেঘনা গ্রুপের নদী দখল ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে অনুসন্ধান করেছে খবরের কাগজ।

সরকারি নকশা ও নথিপত্রে থাকা মেঘনা নদীর অনেকাংশ এখন বাস্তবে স্থলভূমিতে রূপান্তরিত করা হয়েছে। নদী দখল নিয়ে অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, মেঘনা গ্রুপ নদীর অংশ দখল করে বানিয়েছে স্থলভূমির বিস্তীর্ণ করিডর। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও অঞ্চলসংলগ্ন মেঘনা নদীর প্রায় ১২ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে মেঘনা গ্রুপ দখল-আধিপত্যের ‘রাজত্ব’ কায়েম করেছে। নদী তীরবর্তী অঞ্চল দখল করে একাধিক কারখানা গড়ে তুলেছে এই প্রতিষ্ঠান। দীর্ঘ সময় ধরে সরকারি সংস্থাগুলোর কাছে এসব তথ্য-প্রমাণ সংরক্ষিত রয়েছে। তবে ‘অজ্ঞাত’ কারণে বিভিন্ন সময়ে নদী উদ্ধারে ব্যর্থ হয়েছে প্রশাসন। এমনকি বাস্তবায়িত হয়নি উচ্চ আদালতের রায়। উপেক্ষিত হয়েছে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের হুকুম-পরামর্শ। সংশ্লিষ্টদের মতে, বিভিন্ন সময়ে সরকারের প্রভাবশালী মহলে প্রভাব বিস্তার করে মেঘনা গ্রুপ বছরের পর বছর ধরে উচ্ছেদ অভিযান ঠেকিয়ে রেখেছে ও নিত্যনতুন পন্থায় দখল ‘অভিযান’ চালিয়ে যাচ্ছে।

মেঘনা গ্রুপের অফিশিয়াল (নিজস্ব) তথ্যমতে, সোনারগাঁওয়ে মেঘনা নদীর তীরসংলগ্ন মেঘনা ইকোনমিক জোন গড়ে তুলেছে মেঘনা গ্রুপ।  প্রায় ২৪৫ একর জায়গাজুড়ে শিল্পকারখানা গড়ে তুলেছে প্রতিষ্ঠানটি। এর মধ্যে রয়েছে পেপার, টিস্যু, কেমিক্যাল, ফুড, এলপিজি, তেল, খাদ্য, প্যাকেজিং, সিমেন্ট, গার্মেন্টস ও রাসায়নিক কারখানা। রয়েছে পাওয়ার প্ল্যান্টও।

মেঘনার দখলের শুরু ১৯৮৯ সালে
সোনারগাঁ উপজেলার পিরোজপুর ইউনিয়নের মেঘনা ঘাট এলাকায় প্রথম কারখানা স্থাপন করে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ। ১৯৮৯ সালে ছোট পরিসরে মেঘনা নদীর তীরে মেঘনা ভেজিটেবল অয়েল কারখানা যাত্রা শুরু করে। পরে বছরের পর বছর ধরে (১৯৯০-২০০৫ পর্যন্ত) নদীর তীরে একের পর এক কারখানা প্রতিষ্ঠা করে মেঘনা গ্রুপ। ২০০৫ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত নদীর অংশ (স্থানভেদে) ভরাট করে গড়ে তোলে শিল্প ক্লাস্টার। এরপর ২০১৬ সালে ওই এলাকাকে অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘোষণার পর বেড়ে যায় নদীর অংশ দখল। গড়ে ওঠে শিল্প ও পাওয়ার প্ল্যান্ট জোন। প্রায় ৩৭ বছরে এ অঞ্চলে তাদের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছাড়িয়েছে পঁচিশ।

অনুসন্ধানের শুরু মেঘনা নদীর নকশা-জরিপ থেকে
দেশে এখন নদ-নদীর ব্যবস্থাপনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও সুরক্ষার দায়িত্ব সরকারি সাতটি দপ্তরের। এর মধ্যে নদী-নালা ও খাল-বিলের নকশা, ভূমি জরিপ রেকর্ড, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও বিআইডব্লিউটির হাইড্রোগ্রাফিক সার্ভেসহ বিভিন্ন নথিতে (রেকর্ডকৃত) শনাক্ত হয়েছে মেঘনা গ্রুপের নদী দখলের ভয়াবহ চিত্র।

নদী-ভূমির নকশা: (ভূমি জরিপ রেকর্ড)
নদী-চর-ফ্লাডপ্লেইন করিডর নিয়ে ভূমি রেকর্ড, সরকারি জরিপসহ নথিপত্রে নদী-ভূমির প্রকৃতি স্থলভূমিতে রূপান্তরিত হওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

মেঘনা নদীর উজানের আষাঢ়িয়ার চর থেকে ইসলামপুরে নদী বাঁক নিয়ে আনন্দ বাজার পর্যন্ত প্রায় ১০-১২ কিমি বিস্তৃত। অপর প্রান্তে দুধঘাটা থেকে (পূর্ব-উত্তর) ঝাউচর পর্যন্ত মধ্যবর্তী নদীর সীমানা প্রায় ৬-৭ কিমি। এই পুরো অঞ্চলে মেঘনা গ্রুপ আধিপত্য বিস্তার করেছে।

এর মধ্যে আষাঢ়িয়ার চর থেকে ইসলামপুর হয়ে ঝাউচর দিয়ে নদী সীমানার দুধঘাটা অংশ পর্যন্ত প্রায় ১১ কিলোমিটার নদীর তীর ও নদী-ভূমিতে মেঘনা গ্রুপের স্থাপনা রয়েছে। এ ছাড়া মেঘনা নদীর আনন্দ বাজার এলাকায় ১ কিলোমিটারের বেশি জলাশয়ের ওপরে মেঘনা গ্রুপের এলপিজি কারখানাসহ শিপইয়ার্ড স্থাপন করা হয়েছে। এই অঞ্চলের মধ্যে ঝাউচর, আষাঢ়িয়ার চর (স্থানভেদে) এলাকায় প্রায় ০.৮–১.৫ কিলোমিটার বিস্তৃত জলধারা ছিল। মেঘনা গ্রুপের দখলের ফলে এখন তা নেমে এসেছে ২০০-৫০০ মিটার খণ্ডিত চ্যানেলে। দখলের ফলে ইসলামপুর ও দুধঘাটা অংশে নদীর প্রস্থ প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত কমে গেছে। এ ছাড়া আনন্দ বাজার অংশে নদী কমে এখন দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০০-৮০০ মিটার চ্যানেলে। এ অংশে নদীর ১ কিলোমিটারের নিচে রয়েছে জলাশয় ও চর। জমি ভরাটের কারণে এখানে প্রাকৃতিক প্রস্থ কমে সংকুচিত হয়ে গেছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের জরিপ ও বিআইডব্লিউটির হাইড্রোগ্রাফিক সার্ভে অনুসারে, মেঘনা নদীর ইসলামপুর থেকে আনন্দ বাজার পর্যন্ত দেখানো হয়েছে বিস্তীর্ণ করিডর—যে করিডরের ভেতরে রয়েছে চর রমজান, আষাঢ়িয়ার চর, পিরোজপুর, ছয়হিস্যা ও দুধঘাটা মৌজা। গত তিন দশকে এই অঞ্চলে নদীর কার্যকর জলধারার অংশ ৩০ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত সংকুচিত হয়ে গেছে।

১৯৮৯ সালে ইসলামপুর (চর রমজান) অংশে নদীর প্রস্থ ছিল প্রায় ১.২-১.৫ কিমি। ২০২৬ সালে এটি কমে দাঁড়ায় মাত্র ৩০০-৫০০ মিটারে। চর রমজান (ঝাউচর) এলাকায় ১৯৮৯ সালে নদীর প্রস্থ ছিল প্রায় এক কিলোমিটার। ২০২৬ সালে এই প্রস্থ নেমে আসে ২৫০-৪০০ মিটারে। আষাঢ়িয়ার চর এলাকায় ১৯৮৯ সালে নদীর প্রস্থ ছিল ১.২ থেকে ১.৩ কিলোমিটার পর্যন্ত। ২০২৬ সালে এই প্রস্থ নেমে দাঁড়ায় ৪০০ থেকে ৬০০ মিটারের মধ্যে। দুধঘাটা এলাকায় ১৯৮৯ সালে নদীর প্রস্থ ছিল ০.৯-১.১ কিলোমিটারের মধ্যে। ২০২৬ সালে সেই প্রস্থ নেমে দাঁড়ায় ২০০-৪০০ মিটারে। এ ছাড়া পিরোজপুরে ১৯৮৯ সালে নদীর প্রস্থ ছিল প্রায় ১.১ কিলোমিটার। ২০২৬ সালে সেই প্রস্থ কমে দাঁড়ায় ৩০০ থেকে ৫০০ মিটারে। ছয়হিস্যা এলাকায় ১৯৮৯ সালে নদীর প্রস্থ ছিল প্রায় ১ কিলোমিটার। ২০২৬ সালে সেই প্রস্থ কমে দাঁড়ায় ২৫০-৪৫০ মিটারে।

১৯৮৯ সালে আনন্দ বাজার অংশে থাকা নদী করিডরের জলাধার ও চর ছিল ২ থেকে ৪ কিলোমিটার চওড়া। প্রবাহের স্থান ছিল ১ থেকে ১.৫ কিলোমিটারের মতো। ২০২৬ সালে তা কমে প্রায় ১.৫-২.৫ কিমিতে দাঁড়িয়েছে। খোলা পানির প্রবাহ কমে নদীর প্রাকৃতিক বিস্তার ছোট হয়ে গিয়েছে। মূল চ্যানেল এখন ১ কিলোমিটারের নিচে চলে এসেছে।

স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, মেঘনা নদীর আষাঢ়িয়ার চর, চর রমজান, পিরোজপুর, ছয়হিস্যা ও দুধঘাটা মৌজা এলাকায় (১৯৮৯-২০২৬) নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে স্থায়ী ভূমি ও অবকাঠামোতে রূপান্তরিত হয়েছে। এর আগে ১৯৮৮ সালের মেঘনা নদী ছিল অনেক প্রশস্ত। নদীর বুকজুড়ে ছিল চর, আর তীরবর্তী এলাকায় বসতি ছিল সীমিত।

ঘটনাস্থল পরিদর্শন, সরকারি নকশা-রেকর্ড-নথিপত্র-স্যাটেলাইট চিত্র ইত্যাদি যাচাই-বাছাই করে প্রমাণিত হয়, উপজেলার বিভিন্ন মৌজার অধীনে চর বলাকি থেকে মেঘনা ঘাট হয়ে উজানের আনন্দ বাজার পর্যন্ত নদী ও তীরবর্তী অঞ্চল দখল করেছে মেঘনা গ্রুপ।

নদীর পাড়ে মেঘনা গ্রুপ জেটি/বার্জ লোডিং ডক, সারি সারি বড় স্টোরেজ ট্যাংক ও পাওয়ার প্ল্যান্ট ব্লক, ফ্রেশ সিমেন্ট ফ্যাক্টরি, ভোজ্যতেল পরিশোধন কারখানাসহ বেশ কয়েকটি কারখানা প্রতিষ্ঠা করেছে। এগুলোর সীমানা সরাসরি নদীর ভেতরে বলে প্রমাণিত হয়েছে। আনন্দ বাজারে নদীর অংশ ভরাট করে মেঘনা গ্রুপ নির্মাণ করেছে এলপিজি ইউনিট। 

মেঘনার ঝাউচর-প্রতাবের চর অংশে নদীর প্রবেশমুখে ভরাট করে এখনো স্থাপনা নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। মেঘনা গ্রুপ নদীর এই অংশ থেকে  কয়েক কিলোমিটারজুড়ে দেয়াল দিয়েছে। এখানে টিস্যু-প্যাকেজিং থেকে শুরু করে বিভিন্ন কারখানা নির্মাণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

পশ্চিম প্রান্তে শাখা নদীর (চর বলাকি-আষাঢ়িয়ার চরের পূর্ব প্রান্ত) মেঘনা গ্রুপ ফ্রেশ সিরামিক স্থাপন করেছে। এভাবে দখল করে কারখানা স্থাপন করায় নদী এখন সংকুচিত হয়ে পড়েছে। ফলে বন্ধ হয়ে গেছে নিয়মিত নৌযান চলাচল। নদীর দুই পাশেই এখন মেঘনা গ্রুপের স্থাপনা রয়েছে। আষাঢ়িয়ার চরের দক্ষিণ সীমানায় নদীর অংশ ভরাট করে মেঘনা গ্রুপ একাধিক বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট স্থাপন করেছে। 

গজারিয়ায় চর ও কান্দারগাঁয়ে মেঘনা গ্রুপ
সোনারগাঁও-গজারিয়া সীমান্তে মেঘনা নদীর অংশ ভরাট করে সরকারি জমি ও চর দখল শুরু করেছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। ফলে সেখানে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। নৌ চলাচল ও পরিবেশ, উভয়ই হুমকির মুখে পড়ছে। সরকারি নথিপত্র অনুসারে, এ অঞ্চলে নতুন করে নদীর তীরবর্তী কয়েক শ একর জমি কিনেছে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে মেঘনা গ্রুপ অন্যতম।

এ ছাড়া নদীর পাড়ে কান্দারগাঁয়ে বিশাল এলাকাজুড়ে বালু ভরাট করেছে মেঘনা গ্রুপ। এর বিস্তৃতি ছড়িয়েছে নদী পর্যন্ত। মেঘনা ঘাটের ইসলামপুর থেকে আনন্দ বাজার পর্যন্ত বিস্তীর্ণ করিডরে দীর্ঘদিন বালু ভরাট, চর দখল ও স্থায়ী নির্মাণ কার্যক্রম নদীর স্বাভাবিক গতিপথকে বদলে দিয়েছে। ২০২০ সালে নদী ও চর এলাকার বড় অংশ স্থায়ী ভূমিতে রূপান্তরিত হওয়ায় এখন নদীর প্রাকৃতিক চ্যানেল পুরোপুরি সংকুচিত। মেঘনা নদীর আষাঢ়িয়ার চর থেকে ঝাউচর পর্যন্ত বিস্তীর্ণ নদী-ভূমিতে মেঘনা গ্রুপের পরিকল্পিত ও ধারাবাহিক দখল-ভরাটে এলাকাটি পূর্বের চেহারা হারিয়ে প্রায় অচেনা রূপ নিয়েছে।

মেঘনা গ্রুপের নদী দখল-আধিপত্য
মেঘনা নদী দখল হতে দেখেছেন নদী তীরবর্তী এমন ৪৩ জন স্থানীয় নারী-পুরুষ বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলেছে খবরের কাগজ। তাদের অধিকাংশই একই তথ্য ও বিবরণ (মেঘনা নদীর বিস্তীর্ণ অঞ্চল মেঘনা গ্রুপ দখল করেছে)  দিয়েছেন। এর মধ্যে দুজনের বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো।

দুধঘাটা গ্রামের বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব আবদুল লতিফ খবরের কাগজকে বলেন, মেঘনা গ্রুপ যখন এখানে আসেনি, তখন নদীটি ছিল বিশাল প্রমত্তা নদী। নদীর পাড়ে ছিল চর, স্থানীয় লোকজনের জমিও ছিল সেখানে। গত ১৬ বছরে উপজেলা আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল) সহসভাপতি ও পিরোজপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মাসুদুর রহমান মাসুম মেঘনা গ্রুপের হয়ে নদী ভরাটে যুক্ত হন। মাসুমের আগে মেঘনা গ্রুপের হয়ে নদী ভরাটের কাজ করেন সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি রফিকুল ইসলাম (বিডিআর)। মাসুম ও রফিক শুধু নদী ভরাটই করেননি, চরগুলোও দখল করে মেঘনা গ্রুপের কাছে হস্তান্তর করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয়দের জমিও তারা মেঘনা গ্রুপের হয়ে জোর করে দখল করেছেন। স্থানীয়দের জমি দখলে এই নেতারা দীর্ঘদিন ধরে মেঘনা গ্রুপের বিশ্বস্ত অনুচর হিসেবে কাজ করেছেন। 

৩০ বছর আগের নদীর সীমানা দেখিয়ে আষাঢ়িয়ার চরের স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুর রহিম বলেন, ‘ফ্রেশ কোম্পানি (মেঘনা গ্রুপ) প্রথমে নদীর সীমানা ঘেঁষে জমি কেনে। তারপর নদীর অংশ দখল করা শুরু করে।’

তিনি বলেন, ‘মেঘনার শাখা নদীটি দুধঘাটা হয়ে আষাঢ়িয়ার চর হয়ে দুভাবে ঝাউচরে গিয়ে মিলিত হয়েছে। এই শাখা নদীর দুই পাশই এখন মেঘনা গ্রুপের দখলে। এ কারণে শাখা নদীটি সরু হয়ে গেছে।’

স্থানীয়দের অভিযোগের বিষয়ে আওয়ামী লীগ নেতা মাসুদুর রহমান মাসুমের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হয়। তবে তাকে পাওয়া যায়নি। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে তিনি পলাতক। তবে উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি রফিকুল ইসলাম দাবি করেন, তিনি নদী নয়, চর ভরাট করেছেন।

এমপির ৩০ বিঘা জমিও মেঘনা গ্রুপের দখলে
স্থানীয় সংসদ সদস্য (নারায়ণগঞ্জ-৩ আসন) আজহারুল ইসলাম মান্নান বলেন, ‘মেঘনা গ্রুপ আমার জমি দখল করেছে।’ তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের সময় মেঘনা গ্রুপ আমার জায়গা দখল করে নিছে। আমার ৩০ বিঘা জমি এখনো মেঘনা গ্রুপের দখলে আছে।’

নদী দখলে মেঘনা গ্রুপ ক্ষমতাধর উল্লেখ করে মান্নান বলেন, আসলে স্থানীয়ভাবে বড় কোম্পানির সঙ্গে পারা যায় না। কিন্তু এই সরকার পারবে, কারণ তারা জনগণের সরকার। মেঘনা নদীর দখল নিয়ে সরকারের সকল পর্যায়ে ও জাতীয় সংসদে বিষয়টি উপস্থাপন করা হবে।

নদী থেকে খাল, সবখানে দখল মেঘনা গ্রুপের
মেঘনা গ্রুপের দখলের হাত থেকে রক্ষা পায়নি এর শাখা খালগুলোও। মেঘনা নদী থেকে সৃষ্ট তিনটি খালই এখন মেঘনা গ্রুপের দখলে। খালের অংশ দখল করে কারখানা গড়ে তুলেছে মেঘনা গ্রুপ। যেটুকু বাকি আছে, সেটুকুও দখল হয়ে আছে মেঘনা গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বর্জ্যে। 

৩ খালে কারখানা 
সরকারি নদী-নালা ও খাল-বিলের নকশা এবং ভূমি জরিপ রেকর্ড অনুসারে, বৈদ্যেরবাজার ইউনিয়নের বসুন্দরদি নকশায় পাওয়া গেছে হরিগঞ্জ খাল। প্রায় ৪০০ বছরের পুরোনো এই খালের প্রস্থ ছিল ২৫-৩০ ফুট। দখলের ফলে খালটির অনেক জায়গাই এখন ৫ থেকে ৮ ফুটের সরু ড্রেনে পরিণত হয়েছে। একই ইউনিয়নের নরসুলদি নকশায় রয়েছে রামদির খাল। নকশায় খালের প্রস্থ প্রায় ২০-৩০ ফুট। এখন এটিও সরু ড্রেনে পরিণত হয়েছে। এর মধ্যে হরিগঞ্জ খালের অংশে মেঘনা গ্রুপের এলপিজি কারখানা ও রামদির খালের সীমানায় নির্মাণ করা হয়েছে মেঘনা শিপইয়ার্ড।

অপর প্রান্তে রয়েছে মোগরাপাড়া ইউনিয়নের কুশাসন মৌজায় অবস্থিত ঝিউরতলা খাল। গত শতকের নব্বইয়ের দশকে প্রায় ২০-৪০ ফুট চওড়া ছিল ঝিউরতলা খাল। দখলের কারণে এখন এটি একটি সরু খালে রূপ নিয়েছে। এই ঝিউরতলা খালের অংশেই গড়ে তোলা হয়েছে মেঘনা ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইকোনমিক জোন।

ভোগান্তিতে খালপাড়ের বাসিন্দারা
হরিগঞ্জ খালের মুখ পুরোপুরি দখল করা হয়েছে বলে জানালেন আনন্দ বাজার এলাকার বাসিন্দা মহিবুল্লাহ প্রধান। তিনি বলেন, ‘হরিগঞ্জ খালের মাথায় মেঘনা নদীর সীমানা। ওই অংশটি দখলে নিয়ে মেঘনা গ্রুপ তাদের এলপিজি কারখানা নির্মাণ করেছে। এ অংশে তারা নদীর সীমানাও দখল করেছে। খাল দখলের বিরুদ্ধে গ্রামবাসী প্রতিবাদ করেছে। তবে মেঘনা গ্রুপ স্থানীয় নেতা ও সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের লোকজন দিয়ে প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে মামলাসহ নানা হয়রানি করেছে।’

রামদি খালের অংশবিশেষ দখলে নিয়েছে মেঘনা গ্রুপ। এ বিষয়ে মামরতপুর গ্রামের বাসিন্দা সানাউল্লাহ ব্যাপারী বলেন, ‘খালের সঙ্গে যেখানে নদীর সীমানা মিলেছে, সেখানেই মেঘনা গ্রুপ শিপইয়ার্ড বানিয়েছে।’ 

কামারগাঁও হয়ে ঝিউরতলা পর্যন্ত বয়ে যাওয়া খালও মেঘনা গ্রুপের দখলে বলে জানান এই গ্রামের বাসিন্দা আব্দুর রহমান। তিনি বলেন, ‘এখানে মেঘনা গ্রুপ ইকোনমিক জোন বানানোর সময় ঝিউরতলা খালের অংশবিশেষ দখল করে নিয়েছে। খালের তিন ভাগের বেশির ভাগই তাদের দখলে। তারা এখানে দেয়াল তুলে খাল দখল করে রেখেছে। আর এই খালের বাকি অংশ দিয়ে তারা কারখানার বর্জ্য ফেলে।’

মেঘনা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামাল প্রেস কাউন্সিলে একটি জাতীয় দৈনিকের সম্পাদক ও একজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে করা এক মামলায় জানিয়েছেন, আষাঢ়িয়ার চর মৌজায় তার প্রকল্প এলাকার দৈর্ঘ্য ১.১৮ কিলোমিটার এবং প্রস্থ ০.২১ কিলোমিটার। তিনি সেখানে আরও জানান, আষাঢ়িয়ার চর মৌজায় কোম্পানির কেনা জমির পরিমাণ ২১০ বিঘা এবং সরকারের কাছ থেকে বন্দোবস্তপ্রাপ্ত জমি ৭.৩৩ বিঘা। অর্থাৎ এই মৌজায় মোট জমির পরিমাণ ২১৭.৩৩ বিঘা। অথচ নামজারিতে মেঘনা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামালের নামে রয়েছে ৪৮.০২ বিঘা জমি। এটি মাত্র একটি মৌজার হিসাব। অন্যগুলোতেও অনুরূপ চিত্র পাওয়া যায়।

গুগল আর্থ: চিত্র বিশ্লেষণ
বিভিন্ন সময়ের চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মেঘনা নদীর আষাঢ়িয়ার চর, চর রমজান, পিরোজপুর, ছয়হিস্যা, দুধঘাটা ও নরসুলদী মৌজা এলাকায় (১৯৮৯-২০২৬) নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে স্থায়ী ভূমি ও অবকাঠামোতে রূপান্তরিত হয়েছে। মেঘনা গ্রুপ নদীর ১২ কিলোমিটারের বেশি এলাকা ভরাট করে কারখানা স্থাপন করেছে। এর আগে ১৯৮৮ সালের মেঘনা নদী ছিল অনেক প্রশস্ত। নদীর বুকে ছিল একচিলতে চর। মেঘনা গ্রুপ সেখানে এসে ধীরে ধীরে চারদিক দখল ও ভরাট করে কারখানা প্রতিষ্ঠা করে। 

ভূমি কর্মকর্তার বক্তব্য
হোসেনপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের ভূমি সহকারী  কর্মকর্তা (তহশিলদার) হাবিবুর রহমান মুন্সী বলেন, আষাঢ়িয়ার চর ও চর রমজান মৌজায় মেঘনা গ্রুপ নামজারি করা সম্পত্তির খাজনা (রাজস্ব) প্রদান করে আসছে। কিন্তু এখানে ‘ক’ তফসিলভুক্ত (সরকারি সম্পত্তির অংশ) বন্দোবস্ত নেওয়ায় সেগুলোর রাজস্ব তারা দেয় না। এর বাইরে নদীর দখলি অংশের কোনো রাজস্ব আসেনি।

মোগরাপাড়া ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মো. আনোয়ার জানান, মেঘনা গ্রুপ শুধু নামজারি করা জমির রাজস্ব প্রদান করে। মেঘনা ইকোনমিক জোনের রাজস্ব মওকুফ করা আছে। এ ছাড়া কামারগাঁও, কুশাসন মৌজায় খালের অংশ মেঘনা গ্রুপের দখলে। এখান থেকে কোনো রাজস্ব আসে না।

প্রতিবাদ করায় পরিবেশকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা-হয়রানি
মেঘনা গ্রুপের বিরুদ্ধে নদী-খাল দখল ও দূষণ নিয়ে বহুবার প্রতিবাদ জানিয়েছে স্থানীয় পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়ন সোসাইটি। বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কাছে অভিযোগপত্র পাঠান তারা। সংগঠনের সভাপতি মোহাম্মদ হোসাইন অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেন, ‘মেঘনা গ্রুপ মেঘনা নদীর অংশবিশেষ অবৈধভাবে দখল করে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছে, যা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ।’

হোসাইন খবরের কাগজে বলেন, ‘মেঘনা গ্রুপের দখল ও দূষণের বিরুদ্ধে প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করায় আমিসহ অনেকের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা করা হয়েছে। তাদের অন্যায় কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও প্রতিবেদন করলেই মামলা করা হয়। এ কারণে কেউ সংবাদ প্রকাশ করে না।’

নদী রক্ষায় বর্তমান সরকারের কাছে মেঘনা গ্রুপের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান মাসুম।

তিনি বলেন, ‘নদী-নালা ও খাল-বিল রক্ষার দায়িত্বে থাকা সরকারি কর্মকর্তা ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা মেঘনা গ্রুপের কাছ থেকে সুবিধা ও টাকা নিয়ে পৃষ্ঠপোষক হিসেবে সহযোগিতা করছেন। আওয়ামী লীগ (কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল) আমলে নদীকে ধ্বংস করে মেঘনা গ্রুপ। এবার তাই শীর্ষ দখলবাজ মেঘনা গ্রুপের বিরুদ্ধে জনগণের সরকারের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। নয়তো একসময় মেঘনা গ্রুপ আর মেঘনা নদীই রাখবে না।’

নদী রক্ষা কমিশনের তদন্ত
২০১৯ সালে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন, ভূমি মন্ত্রণালয়, পরিবেশ অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ কয়েকটি দপ্তর নিয়ে গঠিত হয় ১২ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি। কমিটির তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, সোনারগাঁও এলাকায় অন্তত ৩০০ থেকে ১৬০০ বিঘা পর্যন্ত মেঘনা নদীর জমি বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠী দখল করেছে। এর মধ্যে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ হচ্ছে শীর্ষ দখলবাজ। পরে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের উদ্যোগে ২০১৯-২০২১ সাল পর্যন্ত দুই বছর তদন্ত চালানো হয়। তাদের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, সোনারগাঁও এলাকায় মেঘনা নদী ও প্লাবনভূমি অবৈধভাবে দখল ও ভরাট করেছে মেঘনা গ্রুপ। তাদের অন্তত ৭টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান সরাসরি নদীর অংশে নির্মিত। কমিশনের তদন্তে নদী দখলকারী মেঘনা গ্রুপের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা ও উচ্ছেদ অভিযান চালাতে বলা হয় স্থানীয় প্রশাসনকে। 

মেঘনা নদী দখল-ভরাটে মামলা
২০১৪ সালে সোনারগাঁওয়ের মেঘনা নদী ও আশপাশের জলাভূমি ভরাট ও দখলের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির  (বেলা) পক্ষে রিট মামলা করেন সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারে তিনি উপদেষ্টা ছিলেন। ওই মামলায় ২০১৮ সালে হাইকোর্ট নতুন ভরাট, দখল বা নির্মাণ বন্ধ করার আদেশ দেন।

২০২০ সালে হাইকোর্টের চূড়ান্ত রায়ে সোনারগাঁওয়ের ৬টি মৌজায় প্রায় ১৮৬৮ বিঘা জমি ও মেঘনা নদীর অংশ ভরাটকে অবৈধ ঘোষণা করা হয় এবং ভরাট করা জমি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দেওয়া হয়। হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে ২০২১ সালে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করে প্রতিষ্ঠানটি। 

২০২৩ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ সোনারগাঁওয়ের ৬টি মৌজায়—মেঘনা নদীর অংশ, কৃষিজমি, নিম্নভূমি ও জলাভূমিতে মাটি ভরাটের ওপর পুনরায় নিষেধাজ্ঞা দেন। অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্ট হাইকোর্টের রায় বহাল রাখাসহ নতুন করে ভরাট বন্ধ রাখতে বলে। স্থানীয় প্রশাসনকে এই আদেশ বাস্তবায়ন করতে বলা হলেও এখন পর্যন্ত তা কার্যকর হয়নি।

বাস্তবায়ন হয়নি উচ্চ আদালতে নির্দেশ, উদ্ধার হয়নি নদী
বারবার হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্ট নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পরও নতুন করে ভরাট ও দখল চালিয়ে যাচ্ছে মেঘনা গ্রুপ। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের প্রতিবেদনের নির্দেশ মেনে কোনো উচ্ছেদ অভিযান চালায়নি জেলা-উপজেলা প্রশাসন, বিআইডব্লিউটিএ, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও পরিবেশ অধিদপ্তর। কেউই প্রয়োগ কিংবা বাস্তবায়ন করেনি নদী রক্ষা আইন; বরং মেঘনা গ্রুপের দখলীয় নথিপত্র গোপন করতে দপ্তরের কর্মকর্তারা যোগাযোগ রাখেন মেঘনা গ্রুপের সঙ্গে।

৩৬ বছরে দুবার, সরকারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থা
নদী ও খাল দখল নিয়ে মেঘনা গ্রুপ উচ্চ চাপে পড়ে এ পর্যন্ত মাত্র দুবার জরিমানা ও উচ্ছেদের মুখোমুখি হয়েছে। ২০১৯ সালে বিআইডব্লিউটিএ মেঘনা নদী দখলে রাখা মেঘনা গ্রুপের প্রায় ৩৫টি স্থাপনা উচ্ছেদ করে ও কাঠামো ভেঙে দেয়। এর আগে ২০১২ সালে আনন্দ বাজার এলাকায় (গ্রুপের এলপিজি ইউনিট) প্রায় ৩০ একর নদীতীর ও জলাভূমি ভরাট করার অপরাধে পরিবেশ অধিদপ্তর মেঘনা গ্রুপকে ৩০ লাখ টাকা জরিমানা করে। একই সঙ্গে ভরাট করা অংশ নদীরূপে ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেয়, যা আজও বাস্তবায়ন হয়নি।

এবার নদী রক্ষক ও স্থানীয় প্রশাসন কী করবে
সোনারগাঁওয়ে নদী ও খাল দখল নিয়ে বহুবার জেলা, উপজেলা প্রশাসনসহ সরকারি সংস্থাগুলো তালিকা প্রস্তুত করেছে। তবে কার্যকর কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি কখনো। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের তদন্তের পর ব্যবস্থা নিতে বলা হলেও তা করতে পারেনি স্থানীয় প্রশাসন।

দীর্ঘদিন ধরে মেঘনা নদীর ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা বিআইডব্লিউটির মেঘনা নদীবন্দরের উপপরিচালক রেজাউল করিমের কাছে মেঘনা গ্রুপের নদী দখলের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, নদী দখল বন্ধে তদারকি চলমান আছে। এখানে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বিষয় নয়, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নির্দেশ দিলে সেগুলো উচ্ছেদ করা হবে।  

সরকারের নির্দেশে দখল হওয়া নদী ও খালগুলো উদ্ধারে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে বলে জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শুভ আহাম্মেদ। পাউবোর সীমানায় কেউ স্থাপনা নির্মাণ করে থাকলে সেগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে বলে দৃঢ়তার সঙ্গে জানান তিনি।

নদী-খাল দূষণ করায় মেঘনা গ্রুপের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন পরিবেশ অধিদপ্তরের নারায়ণগঞ্জের উপপরিচালক এ এইচ এম রাসেদ। তিনি বলেন, মেঘনা গ্রুপের বিরুদ্ধে দূষণের অভিযোগ দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। তাদের দূষণের বিরুদ্ধে অভিযান চলমান থাকবে।

নদী ও পরিবেশ রক্ষায় এবার প্রশাসন সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাবে বলে জানান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আসিফ আল জিনাত। তিনি বলেন, এখানকার নদী ও খালগুলো সংরক্ষণ করতেই হবে। তাই মেঘনা নদী ও খাল দখলের বিষয়ে যদি কোনো অভিযোগ বা প্রতিবেদন পাই, সেটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখবে উপজেলা প্রশাসন। সরকারি নকশা-নথিপত্রে তথ্যে মিল পেলে উচ্চতর কর্তৃপক্ষের সহায়তায় আইনানুগ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

মেঘনা গ্রুপের নদী দখল ও দূষণের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না–জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক রায়হান কবির বলেন, ‘আগের কোনো জেলা প্রশাসক এ নিয়ে কোনো ব্যবস্থা নিয়েছেন কি না, তা আমার জানা নেই। তারা যদি এখনো নদী-জমি দখলে রাখে, তাহলে জেলা প্রশাসন বিষয়টি দেখবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।’

মেঘনা গ্রুপের কর্মকর্তাদের দাবি
নদী দখলের অভিযোগ ও সরকারি নোটিশের বিষয়ে জানতে চাইলে মেঘনা গ্রুপের আইন বিভাগের কর্মকর্তা (ম্যানেজার লিগ্যাল) আশফাকুল ইসলাম বলেন, ‘আমার জানামতে নদী দখলের বিষয়ে মেঘনা গ্রুপের বিরুদ্ধে বর্তমানে কোনো মামলা নেই। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নোটিশ বা যদি কোনো উচ্ছেদ অভিযান হতো, তবে সেটি সংবাদমাধ্যমের অগোচরে থাকার কথা নয়।’ নদী বা জায়গা দখলের বিষয়ে কথা বলার এখতিয়ার তার নেই জানিয়ে আশফাকুল ইসলাম ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ বা মুখপাত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করার অনুরোধ করেন।

মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক (টেকনিক্যাল) কার্তিক চন্দ্র দাস এ অঞ্চলের দায়িত্বে আছেন। কার্তিক চন্দ্র দাসের সঙ্গে মুঠোফোনে বহুবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। খুদে বার্তা দিয়েও উত্তর পাওয়া যায়নি। মেঘনা ইকোনমিক জোনে অবস্থিত তার অফিসে গেলেও সেখানে এই প্রতিবেদককে ঢুকতে দেওয়া হয়নি।

মেঘনা গ্রুপের দখলদারত্বের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক (এডমিন) তৌফিক উদ্দিন আহমেদ গতকাল শনিবার খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমি সাবেক একজন জেলা প্রশাসক। গত তিন বছর যাবৎ মেঘনা গ্রুপে দায়িত্ব পালন (চাকরি) করছি। এসব বিষয় আমি দেখি না, আমি গ্রুপের গাড়ি বা এ-সংক্রান্ত বিষয়গুলো দেখি। এর বাইরে কোনো খবর আমি রাখি না। অন্য কারও বক্তব্য নিতে পারেন।’

আরও পড়ুন:
>> পাচার করা অর্থে বিদেশে রাখঢাক ছাড়াই মেঘনা গ্রুপের বিনিয়োগ
>> মেঘনা গ্রুপ ৮৬২ কোটি টাকার গ্যাস বিল দিচ্ছে না
>> মেঘনা গ্রুপ পাচার করেছে ৮০ হাজার কোটি টাকা
>> মেঘনা গ্রুপের বিরুদ্ধে ৮০ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ তদন্তে দুদক
>> মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান ও তার পরিবারের ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ

বিদ্যুতে হাজার হাজার কোটি টাকা লোকসান চুরি, সিস্টেম লস ও ভর্তুকিতে ঘুরপাক

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬, ০৯:৪৯ এএম
চুরি, সিস্টেম লস ও ভর্তুকিতে ঘুরপাক
বছরের পর বছর সাধারণ মানুষের পকেট কেটে ভর্তুকির ওপর নির্ভর করেই টিকে আছে পুরো বিদ্যুৎ খাত। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত যুগ যুগ ধরেই লোকসানে রয়েছে। চুরি, সিস্টেম লস, অপচয়, দুর্নীতি এবং ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতার কারণে প্রতিবছরে এই খাতে রাষ্ট্রকে গুনতে হচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি। বছরের পর বছর সাধারণ মানুষের পকেট কেটে ভর্তুকির ওপর নির্ভর করেই টিকে আছে পুরো বিদ্যুৎ খাত। উপাদন সক্ষমতা বাড়লেও বিতরণব্যবস্থার দুর্বলতা, অবৈধ সংযোগ, মিটার কারসাজি এবং বিভিন্ন অনিয়মের কারণে বিদ্যুৎ খাত এখনো বড় চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদ্যুৎ চুরির অন্যতম প্রধান উৎস হলো অবৈধ সংযোগ বা ‘হুকিং’। দেশের বিভিন্ন এলাকায় বাসাবাড়ি, দোকানপাট, বাজার এবং অস্থায়ী স্থাপনায় সরাসরি বিদ্যুতের লাইন থেকে সংযোগ নেওয়ার ঘটনা ঘটছে। এ ছাড়া মিটার টেম্পারিং, বাইপাস সংযোগ, বিলিং জালিয়াতি এবং ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অটোরিকশার অবৈধ চার্জিং স্টেশন থেকেও বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ চুরি হচ্ছে। অনুমোদনহীন এসব চার্জিং পয়েন্টে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হলেও এর বড় অংশের কোনো বৈধ হিসাব থাকে না।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে অসাধু কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তাদের কারসাজিতে হচ্ছে অনিয়ম-দুর্নীতি। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ওই সব অসাধু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ভুতুড়ে বিল, মিটার জালিয়াতি, অবৈধ সংযোগ, সিস্টেম লসের নামে অনিয়ম এবং ক্রয় প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। কার্যকর জবাবদিহি ও শাস্তির নজির না থাকায় পরিস্থিতিরও তেমন উন্নতি হচ্ছে না। অন্যদিকে, বছর বছর বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে ভোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করা হলেও খাতটির আর্থিক সংকট কাটছে না। 

তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে বিদ্যুতের সিস্টেম লস সাধারণত ২ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও বাংলাদেশে তা ১০ থেকে ১৩ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) ও বিতরণ সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, পুরোনো অবকাঠামো, দুর্বল ট্রান্সফরমার, জরাজীর্ণ লাইন এবং অদক্ষ ব্যবস্থাপনার কারণে প্রযুক্তিগত ক্ষতির পাশাপাশি চুরি ও অনিয়ম মিলিয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুতের অপচয় হচ্ছে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে মোট ৯ হাজার ৫৪৩ কোটি ইউনিট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হলেও গ্রাহকদের কাছে পৌঁছেছে ৮ হাজার ৮১৯ কোটি ইউনিট। ফলে ৭২৪ কোটির বেশি ইউনিট বিদ্যুৎ সিস্টেম লস হিসেবে অপচয় হয়েছে। প্রতি ইউনিটের গড় মূল্য হিসাব করলে এই ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৬ হাজার ৪৮৯ কোটি টাকা।

বিতরণ সংস্থাগুলোর মধ্যে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ডেসকোর বিদ্যুৎ অপচয়ের হার ছিল ৫ দশমিক ৫০ শতাংশ, ডিপিডিসির ৫ দশমিক ৬, পিডিবির ৬ দশমিক ৬৮, ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ৭ দশমিক ২৬ এবং পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) ৮ দশমিক ৫১ শতাংশ।

একই সময়ে বিপিডিবির আর্থিক অবস্থা আরও নাজুক হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সংস্থাটির নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ২১ কোটি টাকা, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল ৮ হাজার ৭৬৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে লোকসান বেড়েছে ৯৪ শতাংশেরও বেশি।

বিদ্যুৎ সরবরাহে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিপিডিবির মোট ব্যয় ছিল ১ লাখ ২১ হাজার ৪২০ কোটি টাকা। এর বিপরীতে বিদ্যুৎ বিক্রি করে আয় হয়েছে ৬৯ হাজার ৩৮৩ কোটি টাকা। ঘাটতি কমাতে অর্থ বিভাগ থেকে ৩৮ হাজার ৬৩৬ কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত ১৭ হাজার ২১ কোটি টাকার নিট লোকসান হয়েছে সংস্থাটির।

তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ কেনা হয়েছে বেসরকারি আইপিপি কেন্দ্রগুলো থেকে। এ খাতে ব্যয় হয়েছে ৭২ হাজার ৭১ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১৪ হাজার ৬৯৪ কোটি টাকা বেশি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আইপিপি থেকে বিদ্যুৎ কেনা হয়েছিল ৫৭ হাজার ৩৭৭ কোটি টাকার। অথচ জাতীয় বাজেটে এ খাতে ব্যয়ের প্রাক্কলন ধরা হয়েছিল মাত্র ৪৩ হাজার ৯৮৭ কোটি টাকা।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেসরকারি খাত থেকে ১ লাখ ৩০৯ মিলিয়ন কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ কেনা হয়েছে। প্রতি ইউনিটের গড় দাম পড়েছে ১৪ টাকা ৪৫ পয়সা, যা আগের বছরের তুলনায় ইউনিটপ্রতি ১ টাকা ৪০ পয়সা বেশি। ফলে বিদ্যুতের গড় উৎপাদন খরচও বেড়ে ১২ টাকা ১০ পয়সায় পৌঁছেছে, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল ১১ টাকা ৩৫ পয়সা।

বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি নিয়েও রয়েছে তথ্যগত অসংগতি। বিপিডিবির হিসাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদ্যুতে ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে ৩৮ হাজার ৬৩৬ কোটি টাকা। তবে বিদ্যুৎ বিভাগের এক নথি অনুযায়ী একই সময়ে ভর্তুকির পরিমাণ ছিল ৫৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বকেয়াসহ বিদ্যুৎ খাতে মোট ভর্তুকি ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫৯ হাজার কোটি টাকা এবং প্রতি মাসে গড়ে ৩ হাজার ২৫০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশের মোট জ্বালানির প্রায় ৯৭ থেকে ৯৮ শতাংশই জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর এবং এর প্রায় ৬০ শতাংশ আমদানি করতে হয়। ফলে আমদানি নির্ভরতা কমানো না গেলে বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক চাপও কমবে না। বিপিডিবির হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে সম্ভাব্য আর্থিক ঘাটতি প্রায় ৬২ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।

অন্যদিকে বিদ্যুতের দাম একাধিকবার বাড়ানো হলেও আর্থিক সংকট কাটছে না। চলতি মাসে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ, গ্রাহক পর্যায়ে গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ এবং সঞ্চালন (হুইলিং) চার্জ ২৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর আগে ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি নির্বাহী আদেশে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম সাড়ে ৮ শতাংশ এবং পাইকারি দর ৬ টাকা ৭০ পয়সা থেকে ৫ শতাংশ বাড়িয়ে ৭ টাকা ৪ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছিল। 

বিদ্যুৎ খাতে লোকসানের পেছনে বিতরণ সংস্থার কর্মকর্তাদের ‘চুরি’র কারণে সংকট কাটছে না বলে মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ খাত একটি অসাধু সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তাদের লাগামহীন দুর্নীতি ও চুরির কারণে দেশের বিদ্যুৎ খাতে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। বর্তমান সরকারের কারণেও এই সংকট বাড়ছে।

তিনি বলেন, বিদ্যুৎ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে এমন ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, যারা ভোক্তাবিরোধী ও গণবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে বিচারের কোনো নজির নেই। ফলে সংকটও কাটছে না।

অধ্যাপক শামসুল আলমের মতে, বিদ্যুৎ খাতের ঘাটতি কমানোর কথা বলে বারবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলেও বাস্তবে আর্থিক ঘাটতি কমছে না, বরং প্রতিবছরই তা বাড়ছে। তিনি বলেন, সরকারের প্রধান দায়িত্ব জনগণকে সেবা দেওয়া, মুনাফা অর্জন নয়। তাই শুধু দাম বাড়ানোর নীতি অনুসরণ না করে সাধারণ মানুষের স্বার্থে বিদ্যুতের মূল্য যৌক্তিক পর্যায়ে রাখার উদ্যোগও প্রয়োজন।

বিএনপির ১৩ নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হবে

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬, ০৯:২৪ এএম
বিএনপির ১৩ নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হবে
খবরের কাগজ ইনফোগ্রাফ

দেশের অর্থনীতি সংকটে আছে। রাজস্ব আদায়ে রেকর্ড ঘাটতি হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি নেই। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সর্বনিম্ন। এমন প্রেক্ষাপটেও আগামী অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় বিএনপির ১৩ নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কথা থাকছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেটবিষয়ক প্রতিবেদন থেকে এসব জানা যায়। 

প্রতিবেদন থেকে আরও জানা যায়, বাজটে বক্তৃতায় প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়ানো, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডের মতো কর্মসূচির কথা থাকছে। এলাকাভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে জোর দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এভাবে একগুচ্ছ বিষয় অন্তর্ভুক্ত করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়নের জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে। 

সূত্র জানায়, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অঙ্কের বাজেট দিতে যাচ্ছে তারেক রহমানের সরকার। গতকাল পর্যন্ত এ বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এই বাজেটে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ে হিসাব কষা হয়েছে। ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা।

সরকারের নীতিনির্ধারকরা বলেছেন, সরকার বিভিন্ন সংকটে আছে। আর তাই আগামী বাজেটে বিএনপি সরকারের নির্বাচনি সব প্রতিশ্রুতি অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব না হলেও বেশির ভাগই থাকছে। এসব প্রতিশ্রুতির বেশির ভাগই সম্পূর্ণ বাস্তবায়নের পরিবর্তে পাইলট প্রকল্প হিসেবে আনা হবে। 

অর্থনীতির সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েই রেকর্ড ঘাটতির বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছে সরকার। একই সঙ্গে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বড় অঙ্কের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে। বাজেটে অর্থায়নে যে সূত্র আঁকা হয়েছে, তা সফল না হলে সমগ্র অর্থনীতি চাপে পড়বে। 

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর খবরের কাগজকে বলেন, বর্তমান সরকার জনগণের সরকার। বিএনপি নির্বাচনের আগে যেসব অঙ্গীকার করেছে, আগামী বাজেটে তার বেশির ভাগই থাকবে। অনেক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন আগামী বাজেট থেকে শুরু করা হবে। পরে ধাপে ধাপে সম্পূর্ণ বাস্তবায়নে যাবে। 

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, দেশের অর্থনীতি এ যাবৎকালের মধ্যে সবচেয়ে সংকটে আছে। বিগত দুই সরকারের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে ভঙ্গুর অর্থনীতি পেয়েছি। এমন পরিস্থিতিতেও বড় অঙ্কের বাজেট দেওয়া হবে। এই বাজেট বাস্তবায়নে রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে। রাজস্ব আদায় বাড়াতে আয়ের খাত বাড়ানো হয়েছে। 

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘বড় অঙ্কের বাজেটে অর্থায়ন করতে হলে রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে। কিন্তু আমরা জানি চলতি অর্থবছরের গত ১১ মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রেকর্ড রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে। আগামীতে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে তা অর্জন করা প্রায় অসম্ভব বলে মনে করছি। এতে অর্থনীতি ঝুঁকিতে পড়বে।’ 

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেছেন, দেশের অর্থনীতি সংকটে ছিল। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দেশের অর্থনীতির সংকট বেড়েছে। সরকার ও ব্যক্তি খাত–দুই খাতই ভালো নেই। এমন পরিস্থিতিতে প্রকল্প বাস্তবায়ন, উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন হবে। তবে সরকার যত সংকটেই থাকুক না কেন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও ভর্তুকি খাতে বরাদ্দ দিতে হবে। নির্বাচনের আগে বিএনপি যেসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কথা বলেছে, তার বেশির ভাগ আগামী বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও সব বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না। আগামী অর্থবছরে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডের মতো প্রতিশ্রুতি পাইলট প্রকল্প হিসেবে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। 

আগামী অর্থবছরের বাজেটের আকার, কোন খাতে কত ব্যয় ধরা হবে, কোন খাত থেকে কত আয় করা হবে, এনবিআর ও এনবিআরবহির্ভূত খাত থেকে আয় নির্ধারণসহ বাজেটের বিভিন্ন হিসাব নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী কয়েক দফা বৈঠক করেন। অনেক বিষয় নিয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকেও আলোচনা হয়। এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খানসহ বাজেট প্রস্তুত কমিটির কর্মকর্তাদের সঙ্গেও পৃথকভাবে প্রধানমন্ত্রী বৈঠক করেন। সবার মত নিয়ে যাচাই-বাছাই করে প্রস্তাবিত বাজেটের সারসংক্ষেপ প্রণয়ন করা হয়েছে। 

আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপনের পর ৩০ জুন পর্যন্ত আলোচনা হবে। এরপর তা চূড়ান্ত করে ১ জুলাই থেকে বাস্তবায়ন করা হবে। 

অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি। আসন্ন অর্থবছরের বাজেট ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। শতকরা হিসাবে চলতি বাজেটের তুলনায় ১৮.৭৩ শতাংশ বেশি, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে রেকর্ড বৃদ্ধি। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে মোট ১ লাখ ৩৮ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা ভাবা হচ্ছে, যা আগের বছরের তুলনায় অন্তত ১২ হাজার কোটি টাকা বেশি। উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়ানোর হিসাব পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

বাজেটে সরকারের পরিচালন ও অন্যান্য ব্যয় ধরা হচ্ছে ৬ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর বাইরে উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা। রাজস্ব আদায়ের এনবিআর থেকে ৬ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা, নন-এনবিআর ২৫ হাজার কোটি টাকা এবং এনটিআর খাত থেকে ৬৬ হাজার কোটি টাকা ধার্য করা হয়েছে। অর্থায়নের ক্ষেত্রে বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা ও অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছে। অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ খাতের মধ্যে ব্যাংকিং খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা এবং ব্যাংকবহির্ভূত খাত থেকে ১৫ হাজার টাকা ধরা হয়েছে। আগামী অর্থবছরের বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। 

প্রতিষ্ঠিত সন্তানের বাবা-মায়ের শেষ ঠিকানা কেন বৃদ্ধাশ্রম?

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬, ০৮:৪৯ এএম
আপডেট: ০৮ জুন ২০২৬, ০৯:০৭ এএম
প্রতিষ্ঠিত সন্তানের বাবা-মায়ের শেষ ঠিকানা কেন বৃদ্ধাশ্রম?
ছবি: খবরের কাগজ

মিরপুরের ৭৫ বছর বয়সী নূরজান বেগম। মৃত্যুর পর কয়েক দিন তার মরদেহ পড়ে ছিল ঘরের ভেতর। কয়েক দিন পর একই এলাকায় ৫৫ বছর বয়সী আফরোজা নামের আরেক নারীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তাদের সন্তানরা কেউ রাষ্ট্রের উচ্চপদে কর্মরত, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কেউ বিদেশে প্রতিষ্ঠিত জীবন গড়েছেন।

অন্যদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক তারেক শামসুর রেহমানও দীর্ঘদিন উত্তরার নিজ ফ্ল্যাটে একা থাকতেন। স্ত্রী ও একমাত্র মেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করতেন। শিক্ষক, গবেষক ও বিশ্লেষক হিসেবে তিনি ছিলেন দেশের পরিচিত মুখ। অথচ জীবনের শেষ মুহূর্তে তিনিও ছিলেন নিঃসঙ্গ। এই ঘটনাগুলো শুধু কয়েকজন মানুষের মৃত্যুর গল্প নয়। এগুলো এমন এক সমাজের প্রতিচ্ছবি, যেখানে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটছে, জীবনযাত্রার মান বাড়ছে, কিন্তু পারিবারিক সম্পর্কের উষ্ণতা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। 

দ্রুত বাড়ছে প্রবীণ জনগোষ্ঠী। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ১ কোটি ৪ লাখেরও বেশি, যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬.১৪ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী কয়েক দশকে এই সংখ্যা আরও দ্রুত বাড়বে। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (UNFPA) এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা সাড়ে তিন থেকে চার কোটির বেশি হবে। তখন দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ থেকে ২২ শতাংশই হবেন প্রবীণ।

অর্থাৎ আগামী বাংলাদেশ হবে অনেক বেশি বয়স্ক মানুষের বাংলাদেশ। কিন্তু সেই মানুষের জন্য কি দেশ প্রস্তুত?

সাবেক উপদেষ্টা ও সমাজকর্মী ফরিদা আখতার মনে করেন, আলোচনায় আসা ঘটনাগুলো কেবল দৃশ্যমান অংশ। তিনি বলেন, ‘মিরপুরের ঘটনাটি সামনে এসেছে, তাই আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু সারা দেশে এমন অনেক ঘটনা ঘটছে, যা আমাদের সামনে আসে না। অনেক বৃদ্ধ-বৃদ্ধা একাকিত্বে জীবন কাটাচ্ছেন। কেউ তাদের খোঁজ রাখছেন না।’

তার মতে, যৌথ পরিবার ভেঙে যাচ্ছে, পরিবার ছোট হচ্ছে, ছেলেমেয়েরা বিয়ের পর আলাদা হয়ে যাচ্ছে। ফলে পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ছে। ‘বাবা-মা সন্তানকে আদর-যত্ন করে বড় করলেন, লেখাপড়া শিখিয়ে প্রতিষ্ঠিত করলেন। অথচ সেই সন্তান যদি বৃদ্ধ বয়সে বাবা-মায়ের খোঁজ না রাখে, সেটি শুধু অমানবিক নয়, সামাজিক অন্যায়ও’ বলেন তিনি।

তার মতে, যেসব সন্তান সচেতনভাবে বাবা-মায়ের দায়িত্ব এড়িয়ে যান, তাদের বিরুদ্ধে সামাজিক ও আইনগত জবাবদিহি থাকা প্রয়োজন।

সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, বিষয়টিকে শুধু সামাজিক অবক্ষয় বলে ব্যাখ্যা করলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। একদিকে রয়েছে বিশ্বায়ন, কর্মসংস্থানের জন্য দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়া, নগরজীবনের ব্যস্ততা, ছোট পরিবার ও জীবনযাত্রার পরিবর্তন। অন্যদিকে রয়েছে দায়িত্ববোধের ঘাটতি, সম্পর্কের দূরত্ব এবং প্রবীণদের মানসিক চাহিদাকে অবহেলা করার প্রবণতা।

বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই বাবা-মায়ের জন্য অর্থ পাঠান, চিকিৎসার খরচ বহন করেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৃদ্ধ বয়সে মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন কেবল অর্থ নয়, সঙ্গ-কথা বলার মানুষ এবং মানসিক নিরাপত্তা।

ঢাকার একাধিক বৃদ্ধাশ্রমের দায়িত্বশীলরা জানান, সেখানে বসবাসকারী অনেক প্রবীণের সন্তান দেশ-বিদেশে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু নিয়মিত যোগাযোগ করেন না। কেউ কেউ মাসের পর মাস বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করতেও আসেন না।

বাংলাদেশে বৃদ্ধাশ্রমকে এখনো অনেকেই নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখেন। কিন্তু বাস্তবতা দ্রুত বদলাচ্ছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আনজুমান আরা মনে করেন, আধুনিক সমাজে বৃদ্ধাশ্রমের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, ‘জাপান, থাইল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের অনেক দেশে ওল্ড হোম বা বৃদ্ধাশ্রম খুবই স্বাভাবিক একটি ব্যবস্থা। আমাদের দেশেও এখন অনেক আধুনিক বৃদ্ধাশ্রম গড়ে উঠছে। সেখানে সাবেক সচিব, শিক্ষক, চিকিৎসকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ থাকছেন।’

তার মতে, সন্তানরা কর্মজীবন বা উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যেতেই পারেন, সেটি অপরাধ নয়। তবে বাবা-মায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।

তিনি বলেন, ‘যাদের সামর্থ্য আছে, তারা চাকরিজীবনের শুরু থেকেই ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনা করতে পারেন। পেনশন বা আয়ের একটি অংশ প্রবীণ বয়সের নিরাপদ আবাসনের জন্য সঞ্চয় করা যেতে পারে।’

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘস্থায়ী একাকিত্ব মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। একাকিত্ব হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, বিষণ্নতা, উদ্বেগ, স্মৃতিভ্রংশ এবং অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

প্রবীণদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত সামাজিক যোগাযোগ, পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সময় কাটানো এবং কমিউনিটি কার্যক্রমে অংশগ্রহণ প্রবীণদের সুস্থ জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশে বাবা-মায়ের ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩ রয়েছে। এই আইনে বলা হয়েছে, সক্ষম সন্তানদের বাবা-মায়ের ভরণপোষণের দায়িত্ব পালন করতে হবে। দায়িত্ব পালনে অবহেলা করলে শাস্তির বিধানও রয়েছে।

তবে বাস্তবে খুব কম মানুষই আইনের আশ্রয় নেন। কারণ অধিকাংশ বাবা-মা সন্তানের বিরুদ্ধে মামলা করতে চান না। তারা শাস্তি নয়, সন্তানের ভালোবাসা ও উপস্থিতি চান।

বাংলাদেশ দ্রুত উন্নয়নের পথে এগোচ্ছে। মাথাপিছু আয় বাড়ছে, শিক্ষার হার বাড়ছে, বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম। কিন্তু একই সঙ্গে একটি প্রশ্নও সামনে আসছে, আমরা কি সম্পর্কের বিনিময়ে উন্নয়ন কিনছি?

যে মা রাত জেগে সন্তানের জ্বর দেখেছেন, যে বাবা নিজের প্রয়োজন বিসর্জন দিয়ে সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়েছেন, তাদের জীবনের শেষ সময় কি একটি নীরব ফ্ল্যাটে একা কাটার কথা?

কর্মজীবনের ব্যস্ততা, বিদেশে বসবাস কিংবা ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতা থাকতেই পারে। কিন্তু সেই সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বাবা-মায়ের নিরাপত্তা ও সঙ্গ নিশ্চিত করার দায়িত্ব থেকে সন্তানরা মুক্ত নন। মৃত্যুর পর কয়েক দিন ধরে বন্ধ ঘরে পড়ে থাকা কোনো বৃদ্ধ বা বৃদ্ধার মরদেহ শুধু একটি পারিবারিক ট্র্যাজেডি নয়; এটি আমাদের সমাজ, মূল্যবোধ ও মানবিকতার জন্যও এক গভীর প্রশ্নচিহ্ন।

যে বাবা-মা এক দিন সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখিয়েছেন, তাদের জীবনের শেষ আলোটুকু যেন নিঃসঙ্গতার অন্ধকারে নিভে না যায়। সন্তানের কাছেই হোক তাদের শেষ আশ্রয়। আর যদি তা সম্ভব না হয়, তবে অন্তত এমন নিরাপদ ও মানবিক ব্যবস্থা গড়ে উঠুক, যেখানে কোনো মা-বাবাকে আর একা, নিভৃতে, অযত্নে মৃত্যুবরণ করতে না হয়। কারণ একটি সভ্য সমাজের প্রকৃত পরিচয় তার আকাশচুম্বী ভবনে নয়, বরং সে তার প্রবীণ মানুষকে কতটা সম্মান, নিরাপত্তা ও ভালোবাসা দিতে পারে সেখানেই।

আনোয়ারা: দল বদলায়, রক্ষাকবচে অত্যাচার থামে না

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬, ০৮:৩৯ এএম
আপডেট: ০৮ জুন ২০২৬, ০৯:০২ এএম
আনোয়ারা: দল বদলায়, রক্ষাকবচে অত্যাচার থামে না
চট্টগ্রামের আনোয়ারার উপকূলীয় গহিরা প্যারাবন কেটে প্রথমে মাঠ বানানো হয় (বায়ে)। পরে মাটি কেটে মাছের ঘের তৈরি করা হয়। ছবি: খবরের কাগজ

১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল। জলোচ্ছ্বাস আর ঘূর্ণিঝড় কেড়ে নিয়েছিল লাখো প্রাণ। লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছিল চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপকূলের গহিরা, রায়পুরসহ বিস্তীর্ণ জনপদ। সেই মহাবিপর্যয়ের পর উপকূলবাসীকে রক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়। বন বিভাগের পক্ষ থেকে ‘সবুজ দেওয়াল’ গড়ে তোলার প্রক্রিয়া শুরু হয়। প্রায় ২৫০ একর এলাকাজুড়ে রোপণ করা হয় কেওড়া, গেওয়া, বাইনসহ বিভিন্ন প্রজাতির লাখো গাছ। তিন দশকে প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা সেই গহিরা প্যারাবনই এখন আনোয়ারা উপকূলের রক্ষাকবচ। অথচ এই বনকেই ধীরে ধীরে সাবাড় করা হচ্ছে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগ আমলে এই বনের গাছ কাটা হয়েছে। বর্তমানে কাটা হচ্ছে মাটি। দল বদলায়, ক্ষমতার পালাবদল হয়, অথচ বনের ওপর অত্যাচার থামে না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রভাবশালী এক মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠজনদের থাবায় বনের প্রায় ১৫ একর এলাকার গাছ কেটে সাবাড় করা হয়। আর বর্তমানে স্থানীয় বিএনপির নামধারী একশ্রেণির প্রভাবশালী সিন্ডিকেট প্রকাশ্যে ভেকু মেশিন (মাটি কাটার যন্ত্র) বসিয়ে বনের মাটি কেটে বিক্রি করছে। ফলে উপকূলের রক্ষাকবচ এই প্যারাবন এখন নিজেই নিঃশেষের পথে। 

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গহিরা প্যারাবনের ওপর নির্যাতনের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে তৎকালীন স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আমিন শরীফের সরাসরি আশ্রয়ে জকু মাঝি নামের এক ব্যক্তি বনের ভেতরে তাণ্ডব চালান। সাগরের গুরুত্বপূর্ণ মোহনায় ঢাল হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকা বনের ভেতরের গাছ কেটে, চারপাশে মাটির বাঁধ দিয়ে পানি আটকে বিশাল ঘের তৈরি করেন।
সরেজমিনে গহিরা উপকূলে গিয়ে দেখা যায়, ওই মাছের ঘেরগুলোর ভেতরে এখনো কেটে ফেলা শত শত কেওড়া ও বাইন গাছের গোড়া (অবশিষ্টাংশ) পানির ওপর জেগে আছে। প্রায় ১৫ একর বনভূমির সবুজবেষ্টনী সম্পূর্ণ উজাড় করা হয়েছে। 

স্থানীয়দের অভিযোগ, ৫ আগস্টের পর বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ও তাদের অনুসারীরা একজোট হয়ে এই সংরক্ষিত প্যারাবনের মাটি কেটে বিক্রি করছেন। বনের ভেতর ও সংলগ্ন এলাকার মাটি কেটে নেওয়ার কারণে সেখানে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে।
গহিরা এলাকার সত্তরোর্ধ্ব বাসিন্দা ইদ্রিস আলী বলেন, ‘আওয়ামী লীগের নেতা পরিচয়ে এসে বনের গাছ কাটল, মাছের ঘের বানাইল। ভাবছিলাম সরকার বদলালে বনটা বাঁচবে। এখন দেখি বিএনপির নাম দিয়ে আরেক দল এসে দিন-রাত মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছে। বনটা শেষ হয়ে গেলে সাগরের পানি আমাদের ঘরবাড়ি ভাসিয়ে নেবে।’

অনুসন্ধানে জানা যায়, বর্তমানে আনোয়ারার গহিরা এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) অধীনে একটি উপকূলীয় বেড়িবাঁধের নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। এই কাজের ঠিকাদার ‘মেসার্স শেখ এমদাদুল হক মামুন’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। জানা গেছে, এই ঠিকাদারের কাছ থেকে স্থানীয় বিএনপি নেতা সাহেদ, আব্দুল মজিদসহ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি সাব-কন্ট্রাক্ট (উপ-ঠিকাদার) হিসেবে কাজ নিয়েছেন।

সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্য দূরবর্তী কোনো স্থান বা ব্যক্তিমালিকানাধীন জায়গা থেকে মাটি কিনে বাঁধে দেওয়ার কথা। অথচ খরচ বাঁচিয়ে শতভাগ লাভ তুলে নিতে উপ-ঠিকাদার সংরক্ষিত প্যারাবনকে বেছে নিয়েছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, বনের ভেতরে বিশাল আকৃতির ভেকু দিয়ে দিন-রাত মাটি কাটা হচ্ছে। ডাম্প ট্রাকে করে সেই মাটি বেড়িবাঁধে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। মাটি কাটার ফলে বনের ভেতরের জোয়ার-ভাটার প্রাকৃতিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক গাছের শিকড় উপড়ে গেছে।
বনের বর্তমান অবস্থা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা নূরনাহার বেগম (৪৫) বলেন, ‘চোখের সামনে বনটা শেষ হয়ে যাচ্ছে। আমরা বাধা দিলে মামলা-হামলার ভয় দেখানো হয়।’

অভিযোগের বিষয়ে উপ-ঠিকাদার ও মাটি কাটার সঙ্গে জড়িত স্থানীয় বিএনপি নেতা সাহেদ (উপজেলা বিএনপির আহ্বায়কের ছেলে) মোবাইলফোনে বলেন, ‘ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমি জড়িত নই। দায়িত্বপ্রাপ্ত মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানই বনের মাটি কেটে বেড়িবাঁধে দিচ্ছে। এ বিষয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলুন। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আমাদের জড়িয়ে এসব ছড়ানো হচ্ছে।’
তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স শেখ এমদাদুল হকের দায়িত্বপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তার মোবাইলফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। এসএমএস পাঠিয়েও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িতরা বর্তমানে পলাতক থাকায় তাদের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ও পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, ‘ম্যানগ্রোভ বা প্যারাবন উপকূলীয় এলাকার জন্য প্রাকৃতিক সুরক্ষাপ্রাচীর। এই বন শুধু সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের গতি কমায় না, বরং মাটিকে ধরে রাখে।’
তিনি বলেন, ‘বিগত সময়ে মাছ চাষের নামে এখানে যে গাছ কাটা হয়েছে, তা পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি। আর এখন বনের ভেতর থেকে মাটি কেটে নিয়ে পুরো এলাকাকে যদি খালে রূপান্তর করা হয়, তবে সমুদ্রের জোয়ার ও ঢেউয়ের আঘাতে অবশিষ্ট বনও ধসে পড়বে। ফলে পুরো উপকূলীয় অঞ্চল দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী ঝুঁকিতে পড়বে।’

সংরক্ষিত বনাঞ্চল কেটে বেড়িবাঁধের কাজ চললেও এর দায় নিতে নারাজ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। সংস্থাটির নির্বাহী প্রকৌশলী শওকত ইবনে শহীদ বলেন, ‘আমরা মূল প্রকল্পের নকশা এবং কাজের গুণগত মান তদারকি করি। ঠিকাদার কোথা থেকে মাটি আনছেন, সেই বিষয়টি আমাদের সব সময় লিখিতভাবে জানানো হয় না। তবে স্থানীয়দের কিছু আপত্তির কথা আমরা শুনেছি। ঠিকাদারকে নির্দেশ দিয়েছি, যাতে তারা সংরক্ষিত বন বা উপকূলীয় এলাকা থেকে মাটি না কেটে দূরবর্তী স্থান থেকে এনে সরবরাহ করেন।’ 

বাঁশখালী রেঞ্জের ডেপুটি রেঞ্জার খায়রুল আলম বলেন, ‘আমি এই রেঞ্জে নতুন এসেছি। মাটি কাটার বিষয়টি লোকমুখে শুনে একবার পরিদর্শনে গিয়েছিলাম। বিষয়টির বিস্তারিত আমার জানা নেই। নথিপত্র দেখে বলতে হবে, ওটা বন বিভাগের গেজেটভুক্ত জায়গা কি না।’

চট্টগ্রাম উপকূলীয় বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এম এ হাসান বলেন, ‘বিষয়টি আমার বিস্তারিত জানা নেই। আমি দ্রুত তদন্ত টিম পাঠাচ্ছি। বিন্দুমাত্র প্রমাণ মিললে জড়িতদের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে আইনানুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ 

আলোচিত না হলেই তদন্ত ও বিচারে ধীরগতি

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬, ০৮:১৩ এএম
আপডেট: ০৮ জুন ২০২৬, ০৮:১৭ এএম
আলোচিত না হলেই তদন্ত ও বিচারে ধীরগতি
খবরের কাগজ গ্রাফিকস

আলোচিত না হলেই ধর্ষণ ও শিশুহত্যার মতো বর্বরোচিত ঘটনাগুলোর তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া যেন থমকে যায়। বিশেষ করে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ধরনের যেসব ঘটনা ব্যাপক আলোচিত বা ‘ভাইরাল’ হয়, সেসব ঘটনায় করা মামলার ক্ষেত্রে তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া তুলনামূলক অনেক বেশি গুরুত্ব পায়। কিন্তু যেসব ঘটনা তেমন আলোচনায় নেই সেগুলোর মামলার ক্ষেত্রে তেমন একটা গুরুত্ব দেওয়া হয় না বলে নানা পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে।

  • মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতার কারণ হচ্ছে দক্ষ জনবলের অভাব: সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক
  • বিচারব্যবস্থায় এমন বৈষম্য থাকলে একে সুষ্ঠু বিচারব্যবস্থা বলে না: আইনজীবী মনজিল মোরসেদ
  • প্রচারের মাত্রায় নয়, অপরাধের গুরুত্বের ভিত্তিতেই সব মামলায় সমান অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা জরুরি: মানবাধিকারকর্মী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির
  • রাষ্ট্রের দায়িত্ব সব নাগরিককে সমানভাবে দেখা, সমান গুরুত্ব দেওয়া: অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক
  • শিশুহত্যা মামলার তদন্ত প্রক্রিয়ায় গাফিলতির কোনো সুযোগ নেই: এআইজি (মিডিয়া), পুলিশ সদর দপ্তর

রবিবার (৭ জুন) আলোচিত শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও বীভৎসভাবে হত্যার মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ড ঘটার মাত্র ১৯ দিনের মাথায় গতকাল আদালত অভিযুক্ত সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন। এর মধ্য দিয়ে দ্রুত বিচারের একটি অনন্য নজির স্থাপন করা গেল। 

কিন্তু বিশ্লেষকরা মনে করেন, এ ধরনের প্রতিটি ঘটনা ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর কাছে সমান কষ্টের ও বেদনার। ফলে সবার ক্ষেত্রেই দ্রুততম সময়ে বিচার সম্পন্ন হোক–সেটাই কাম্য। অথচ গণমাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি না হলে একই ধরনের অপরাধ বা হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে সে তুলনায় গুরুত্ব দেওয়া হয় না। শুধু আলোচিত বা চাঞ্চল্যের ওপর ভিত্তি করে একই ধরনের জঘন্য অপরাধমূলক ঘটনার মামলার তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ায় বৈষম্যের শিকার হচ্ছে অনেক ভুক্তভোগী পরিবার। ফলে ব্যক্তি, স্থান বা প্রচারের মাত্রায় নয়, অপরাধের গুরুত্বের ভিত্তিতেই সব মামলায় সমান অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে মাগুরায় ঘটা আলোচিত শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলার চার্জশিট (অভিযোগপত্র) জমা দেওয়া হয়েছিল এক মাসের মধ্যেই। অভিযোগ গঠনের পর মাত্র ২৪ দিনের মাথায় সংশ্লিষ্ট আদালত এই ঘটনায় ঐতিহাসিক রায় দেন। যদিও বর্তমানে রায়-পরবর্তী আপিলের ধাপটি হাইকোর্টে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। অন্যদিকে গত ২১ মে চট্টগ্রাম নগরীর বাকলিয়া থানা এলাকায় গুদাম কক্ষে চার বছরের শিশুকে ধর্ষণের ঘটনায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয় এবং মাত্র ১৩ দিনের মাথায় (গত ৪ জুন) একমাত্র আসামি মনির হোসেনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। এ ছাড়া সর্বশেষ গত ১৯ মে পল্লবীতে ঘটা শিশু স্কুলছাত্রী রামিসা ধর্ষণ-হত্যার ওই মামলায় চার্জশিট জমা দেওয়ার পর মাত্র পাঁচ কর্মদিবসে শুনানি শেষ হয় এবং ষষ্ঠ কর্মদিবসে গতকাল রায় ঘোষণা করেন বিচারক। এর আগে সরকারপ্রধান তথা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেও আলোচিত এই হত্যা মামলার রায় মাত্র এক মাসের মধ্যেই ঘোষণা করা হবে বলে এক অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে বলেছিলেন। 

বিশ্লেষকরা মনে করেন, শিশু আছিয়া বা রামিসা হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার এবং জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করার পক্ষে প্রায় সবাই। কিন্তু এমন অসংখ্য আছিয়া-রামিসা, যারা সমাজের মানুষরূপী হায়নাদের বর্বরতার শিকার হয়ে নির্মমভাবে প্রাণ হারিয়েছে, তাদের ক্ষেত্রেও তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া কতটা দ্রুত হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারগুলো তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ায় গুরুত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন কি না, তা সংশ্লিষ্টদের খতিয়ে দেখা দরকার বলে মত দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। 

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে, গত পাঁচ বছরে (২০২১ থেকে ২০২৫) সারা দেশে বিভিন্নভাবে ২ হাজার ৫৮১ শিশু হত্যার শিকার হয়েছে, যাদের মধ্যে ১৬৭ জনকে ধর্ষণের পর খুন করা হয়। এর মধ্যে ২০২৫ সালে খুন হয় ৪১০ শিশু, যাদের মধ্যে ধর্ষণসহ হত্যার শিকার হয় ৩২ জন। তার আগে ২০২৪ সালে ৫৭৪ শিশু, ২০২৩ সালে ৪৮৫ জন, ২০২২ সালে ৫১৬ জন এবং ২০২১ সালে ৫৯৬ শিশু খুন হয়েছে।

 অন্যদিকে বিভিন্ন সূত্রমতে, চলতি বছরের মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত অন্তত ১২০ শিশু খুন হয়েছে, যাদের মধ্যে প্রায় অর্ধশত শিশু ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যার শিকার হয়। ফলে যে হারে দেশের বিভিন্ন স্থানে শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা ঘটেছে, সে অনুসারে সমান গুরুত্ব দিয়ে এসব ঘটনার দ্রুত তদন্ত বা বিচার প্রক্রিয়া শেষ করার কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই কারও কাছেই। 

এ প্রসঙ্গে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) জ্যেষ্ঠ সমন্বয়ক ও মানবাধিকারকর্মী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির গত সোমবার খবরের কাগজকে বলেন, আইনের শাসন ও মানবাধিকারের মৌলিক নীতি হলো, সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং প্রতিটি ভুক্তভোগী সমান গুরুত্ব পাওয়ার অধিকার রাখে। কোনো ঘটনা বেশি আলোচিত হওয়ায় দ্রুত বিচার হবে, আর একই ধরনের ঘটনায় দুর্বলের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা থাকবে– এটি ন্যায়বিচারের চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কাজেই আমাদের এমন ব্যবস্থা প্রণয়ন করতে হবে যেন দ্রুততম সময়ে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা যায়।
আবু আহমেদ ফয়জুল কবির আরও বলেন, ‘যেকোনো আলোচিত ঘটনার পাশাপাশি প্রত্যন্ত অঞ্চল বা কম আলোচিত এলাকায় সংঘটিত শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যা মামলাগুলোর ক্ষেত্রেও সমান গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত ও বিচার করতে হবে। ব্যক্তি, স্থান বা প্রচারের মাত্রায় নয়, অপরাধের গুরুত্বের ভিত্তিতেই সব মামলায় সমান অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। আমরা রামিসাসহ সব সহিংসতার শিকার শিশুর জন্য ন্যায়বিচার দেখতে চাই।’

বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ না করার ক্ষেত্রে বিচারকের স্বল্পতাসহ বেশ কিছু কারণকে চিহ্নিত করেছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক। তিনি গতকাল খবরের কাগজকে বলেন, ‘মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতার কারণ হচ্ছে দক্ষ জনবলের অভাব। লাখ লাখ মামলার মধ্যে কয়টা আর মিডিয়াতে আসে। জনবহুল এই দেশে বিচারক আছেন মাত্র ১৮০০ থেকে ১৯০০ জন। বিচার বিভাগের জন্য জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ হয় এক শতাংশেরও কম। তা ছাড়া মামলা নিষ্পত্তি করা তো শুধু আদালতের বিষয় না। মামলার তদন্ত করে পুলিশ। এসব সমস্যা সেখানেও আছে।’

একই প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘বাংলাদেশে আইনের শাসনের এটি একটি দুর্বলতা। যেই মামলার বিষয়ে মিডিয়াতে খুব হইচই পড়ে যায়, দেশের প্রধানমন্ত্রী হস্তক্ষেপ করেন, তখন সেটি ফার্স্ট ট্র্যাকে কয়েক দিনের মধ্যে বিচার হয়ে যায়। আর এমন অনেক অসহায় বা অন উল্লেখ্য লোক আছেন, যাদের তেমন কোনো লোকজন নেই, তখন মিডিয়াতে তেমন হইচই পড়ে না, প্রধানমন্ত্রী হস্তক্ষেপ করেন না–তাদের মামলার নিষ্পত্তি কবে হবে কেউ বলতে পারেন না। এটা এক ধরনের বৈষম্য। বিচারব্যবস্থায় এমন বৈষম্য থাকলে একে সুষ্ঠু বিচারব্যবস্থা বলে না। আইনের শাসন সুনিশ্চিত করতে গেলে অবশ্যই সব মামলা নিষ্পত্তির ধারাবাহিকতা একই হতে হবে। তাই সরকারের উচিত, সব মামলাই যেন দ্রুত নিষ্পত্তি করা যায়, সুবিচার নিশ্চিত করা যায়, সে জন্য মহাপরিকল্পনা নেওয়া।’

গতকাল শিশু স্কুলছাত্রী রামিসা হত্যার রায় ঘোষণা করার পর সচিবালয়ে সাংবাদিকদের কাছে প্রতিক্রিয়া জানান আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘মাত্র পাঁচ কার্যদিবসে এই মামলার বিচারকাজ সম্পন্ন করে রায় দেওয়া হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দ্রুততম সময়ে রায় ঘোষণার রেকর্ড।’

তবে অতীতের আলোচিত বা এই ধরনের অন্য মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে মন্ত্রী বলেন, ‘বিচারব্যবস্থার একটি সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তিনি বলেন, অন্য মামলাগুলো যাতে দ্রুত নিষ্পত্তি করা যায়, সে জন্য ইতোমধ্যেই প্রয়োজনীয় আলোচনা শুরু হয়েছে।’

এ বিষয়ে সামাজিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক খবরের কাগজকে বলেন, ‘বর্তমান সমাজে বিভিন্ন ক্ষেত্রে মিডিয়া বা গণমাধ্যমের এক ধরনের প্রভাব লক্ষ করা যাচ্ছে, যা শিশুহত্যার মতো ঘটনার তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রেও এক ধরনের ভূমিকা রাখছে। মিডিয়া ক্ষেত্রবিশেষে কোনো কোনো ঘটনাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে বা দিতেই পারে, কিন্তু রাষ্ট্রের দায়িত্ব সব নাগরিককে সমানভাবে দেখা, সমান গুরুত্ব দিয়ে আইনি সুরক্ষা ও সেবা দেওয়া। কিন্তু বাস্তবতায় আমরা তেমনটা দেখতে পাই না। প্রতিটি ভুক্তভোগী পরিবারের কাছেই তাদের সন্তান ছিল অত্যন্ত প্রিয়। ফলে কোনো হত্যার বিচার কয়েক দিনেই হবে। আবার কোনো হত্যার বিচার বছরের পর বছর ঝুলে থাকবে–সেটা হলে নাগরিকের মধ্যে হতাশার সৃষ্টি হবে। এখান থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি।’

এ প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরের গণমাধ্যম শাখার সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন খবরের কাগজকে বলেন, ‘শিশুহত্যা মামলার তদন্ত প্রক্রিয়ায় গাফিলতির কোনো সুযোগ নেই। এ ধরনের মামলায় পুলিশ অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে তদন্ত করে থাকে। তবে সব মামলায় সমানভাবে চার্জশিট জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে সময় নির্ধারণ করা যায় না। অনেক সময় সাক্ষ্য, প্রমাণ, আলামতের রিপোর্টসহ নানা কারণে কিছুটা বিলম্ব হয়ে থাকে। তবে শিশুহত্যা মামলার মতো স্পর্শকাতর তদন্তগুলোর আইনি বাধ্যবাধকতা অনুসারে পুলিশ যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করে থাকে। এ জন্য ঊর্ধ্বতনরা নিয়মিত তদারকি করে থাকেন।’