ঢাকা ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
বিদ্যুৎ-জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি: জীবনযাত্রা হবে আরও ব্যয়বহুল বিদ্যুতের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি নেইমারকে ছাড়াই খেলবে ব্রাজিল সুন্দর পুরুষ টিভিতে আজকের খেলা কেমন হবে মুমিনের হজ-পরবর্তী জীবন জীবন একদিন শেষ হয়ে যায়! ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পিকআপের ধাক্কায় মা-ছেলেসহ নিহত ৩ বিষাদ-বেদনার আঙুলে চুমো খাও নির্বাচনের খরা কাটল মাসুদুজ্জামানের শান্তি নিদ্রা আব্বার সেই ম্লান হাসিটা আমাকে তাড়া করে বেড়িয়েছে বিশ্বকাপে নিষিদ্ধ পানির বোতল যে বই কেউ ছাপতে চায়নি সেই বইয়ের বুকার জয় কেরানীগঞ্জে শ্রমিকের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার ময়মনসিংহ মেডিকেলে হাম উপসর্গে ভর্তি আরও ১৯ শিশু বেড়েছে মুরগি, কাঁচা মরিচ-কাঁচা পেঁপের দাম বাতাসে যেন আগুনের হলকা, কষ্টে প্রাণিকুল তিন ক্যাটাগরিতে রিটেইল এশিয়া অ্যাওয়ার্ডস পেল এপেক্স ফুটওয়্যার গোপালগঞ্জে ইজিবাইকচাপায় স্কুলছাত্র নিহত দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে আবারও যাত্রীবাহী বাস পড়ল পদ্মা নদীতে চুয়াডাঙ্গায় পুত্রবধূকে ধর্ষণের অভিযোগে শ্বশুর গ্রেপ্তার খুলনায় হাসপাতালে বাড়ছে রোগীর ভিড় শাহরাস্তিতে ১৮ মামলার আসামি ‘সাদা আনোয়ার’ গ্রেপ্তার গোপালগঞ্জে দুই বাসের সংঘর্ষ, নিহত ২ ৬ ঘণ্টা পরে ঢাকার সঙ্গে চট্টগ্রাম-সিলেটের ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক কর্মস্থলে গরমে হাঁসফাঁস শাহরাস্তিতে শিশু ধর্ষণের অভিযোগ বৃদ্ধের বিরুদ্ধে ভ্যাট রিটার্ন দাখিলে আসছে ত্রৈমাসিক ব্যবস্থা গোপালপুরে ২ নবজাতকের মরদেহ উদ্ধার, তদন্তে নেমেছে পুলিশ
Nagad desktop

ইসলামী ব্যাংকে হঠাৎ ধস

প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:২১ এএম
আপডেট: ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:২৫ এএম
ইসলামী ব্যাংকে হঠাৎ ধস
খবরের কাগজ ইনফোগ্রাফ

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে একসময় সবচেয়ে লাভজনক ও স্থিতিশীল প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি অর্জন করে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ। বিশেষ করে ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়কালে ব্যাংকটির বিভিন্ন আর্থিক সূচকে (লাভ, বিনিয়োগ, আয়, গ্রাহকভিত্তি ইত্যাদি) ধারাবাহিক ইতিবাচক সাফল্য লক্ষ্য করা যায়। তবে ২০২৪ সালের পরবর্তী সময় বিশেষ করে ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থায় আকস্মিক ধস নামে। ইসলামী ব্যাংকের বেশ কয়েকটি প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এই তথ্য জানা গেছে।

২০১৭ সালের পর থেকে ইসলামী ব্যাংক ক্রমান্বয়ে কার্যক্রম সম্প্রসারণ করে এবং দেশের বৃহত্তম ইসলামী ব্যাংক হিসেবে অবস্থান সুদৃঢ় করে। এই সময়ে ব্যাংকটির বিনিয়োগ আয় এবং কমিশন আয় বাড়ে। শাখার বিস্তৃতি ঘটে এবং আমানতেও উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়। নিয়মিত মুনাফা অর্জনের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। সব মিলিয়ে ব্যাংকটি একটি স্থিতিশীল ও লাভজনক প্রতিষ্ঠানের চিত্র তুলে ধরে। কিন্তু ২০২৪ ও ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ব্যাংকটিতে বড় ধরনের ধস নামে। ২০২৪ সালে ব্যাংকের নিট মুনাফা ৮৩ শতাংশ কমে মাত্র ১০৮ কোটি টাকায় নেমে আসে, যেখানে আগের বছর তা ছিল ৬৩৫ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে মুনাফা আরও ৮১ শতাংশ কমে যায়। এতে স্পষ্ট হয়, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার বড় অবনতি ঘটেছে।

ইসলামী ব্যাংকের একাধিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ব্যাংকের আমানত ৮৫ হাজার কোটি টাকার বেশি বেড়েছে। ১৯৮৩ সাল থেকে যাত্রা শুরুর পর ২০১৬ সাল পর্যন্ত ৩৩ বছরে ব্যাংকের মোট আমানত ছিল ৬৮ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা, যা ২০২৩ সালে বেড়ে দাঁড়ায় এক লাখ ৫৩ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ ৭ বছরে ব্যাংকটির আমানতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২৫ শতাংশ। এদিকে ২০২৪ ও ২০২৫ সালেও ব্যাংকের আমানত বেড়েছে প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা। তবে এই অর্থের অধিকাংশই একটি রাজনৈতিক দলের নির্দেশে তাদের আশীর্বাদপুষ্ট ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বড় ব্যবসায়ীদের মধ্যে বিনিয়োগ করা হয়েছে। এই বিনিয়োগের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ তাদের নির্বাচনি প্রচারে ব্যয় হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। 

২০১৭ সালে রেমিট্যান্স আহরণে ইসলামী ব্যাংকের ব্যাপক অগ্রগতি হয়। এ সময় ইসলামী ব্যাংক দেশের মোট রেমিট্যান্সের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এককভাবে আহরণ করে কিন্তু বর্তমানে গ্রাহকের আস্থা নষ্ট হয়ে তা ২০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে।

একই সময়ে ইসলামী ব্যাংক আমদানি ও রপ্তানিকারকদের প্রথম পছন্দ হয়ে উঠেছিল। পর্যাপ্ত ডলারের জোগান থাকায় বৈদেশিক সরবরাহকারীদের আস্থায়ও এক নম্বরে ছিল ইসলামী ব্যাংক। এমনকি সরকারি ব্যাংকের চেয়েও ইসলামী ব্যাংক ছিল তাদের প্রথম পছন্দ। কিন্তু ২০২৪ সালের শেষার্ধ থেকে অদক্ষ ম্যানেজমেন্ট ও বোর্ড এ ব্যবসায় ধস নামিয়ে দেয়। ২০১৬ সালে যেখানে ব্যাংকটির মাধ্যমে ৩৪ হাজার কোটি টাকার পণ্য ওস বা আমদানি করা হয়, যা ২০২৩ সালের শেষে বেড়ে দাঁড়ায় ৫৭ হাজার কোটি টাকায়। অর্থাৎ মাত্র সাত বছরের মধ্যে ব্যাংকটির আমদানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬৮ শতাংশ। ২০২৪ সালের প্রথম ৯ মাসে তা কিছুটা বেড়ে ৬৪ হাজার কোটি টাকা হয়। ২০২৫ সালে তা আবার কমে ৫৯ হাজার কোটি টাকায় নেমে যায়। ২০১৬ সালে রপ্তানি হয়েছে ২৪ হাজার কোটি টাকার, যা ২০২৩ সালে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ৪২ শতাংশ বেড়ে হয় ৩৪ হাজার কোটি টাকা। তবে এর পরের দুই বছরেই উল্লেখযোগ্য হারে  রপ্তানি কমেছে। 

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০২৩ সময়ে ব্যাংকের মুনাফা ধারাবাহিকভাবে বেড়ে এই খাতে সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জনকারী ব্যাংকে পরিণত হয় ইসলামী ব্যাংক। ২০২৪-এর শেষার্ধ থেকে অদক্ষ বোর্ড ও ব্যবস্থাপনার কারণে বর্তমানে ব্যাংক লোকসানে চলে গেছে। প্রকাশ্যে মুনাফায় থাকা ‘ঘুরে দাঁড়ানো’ ইসলামী ব্যাংক প্রকৃতপক্ষে বড় অঙ্কের লোকসানে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। বর্তমানে ব্যাংকটির ‘গুপ্ত’ লোকসানের পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা। 

যেকোনো ব্যাংকের আর্থিক চিত্র নির্ধারিত হয় ব্যাংকটির মুনাফা দিয়ে। ইসলামী ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত ব্যাংকটি মুনাফায় ছিল শীর্ষে এবং প্রতিবছর তা ক্রমান্বয়ে বেড়েছে। মাঝে করোনার দুটি বছর বাদে প্রতিবছরই সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন করেছে ইসলামী ব্যাংক।

ব্যাংকটির একটি সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত অর্জিত মুনাফার ওপর ভিত্তি করে ২০২৪ সাল শেষে মুনাফা দেখানো হয়েছে, যা প্রকৃত আর্থিক অবস্থার প্রতিফলন নয়। এদিকে ২০২৫ সালের তৃতীয় প্রান্তিকেও মুনাফা দেখিয়েছে ব্যাংকটি। সব ব্যাংক ২০২৫ সালের মুনাফা ঘোষণা করলেও এখন পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংক মুনাফা ঘোষণা করেনি। 

এর কারণ জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ব্যাংকের আইটি বিভাগের একজন নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, ব্যাংক হয়তো তার আর্থিক বিবরণীতে কিছু মুনাফা দেখাবে কিন্তু বাস্তবে বিশাল অঙ্কের লোকসান রয়েছে ব্যাংকটিতে, যা বর্তমানে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি।

তিনি আরও বলেন, সদ্য বিদায়ী গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের দায়িত্বকালে এ রকম তথ্য গোপনের জন্য বিশেষ নির্দেশনা ও সহায়তা পাওয়া যেত। এখন তা না পাওয়াতে মুনাফা ঘোষণা করতে পারছে না ব্যাংকটি। এমন অবস্থায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধার ক্ষেত্রেও ২০২৩ সাল পর্যন্ত ভালো প্রবৃদ্ধি ছিল। কিন্তু এর পরের দুই বছরে ব্যাংকটি তা আর ধরে রাখতে পারেনি।   

এদিকে ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি বিনিয়োগ সব সময় ৪ শতাংশের নিচে থাকলেও ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ব্যাংকটির ম্যানেজমেন্ট ও বোর্ড বিভিন্ন ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর বিনিয়োগ জোরপূর্বক খেলাপি করে। এ কারণে তা ৪৮ শতাংশে পৌঁছায়। অতীতে কখনো ইসলামী ব্যাংক প্রভিশন সংরক্ষণে ব্যর্থ না হলেও ২০২৪ সাল থেকে বিরাট অঙ্কের প্রভিশন ঘাটতিতে পড়ে, যা বর্তমানে টাকার অঙ্কে ৭৮ হাজার ২০৫ কোটি টাকা। এই প্রভিশন ঘাটতি পূরণ বা সংরক্ষণ করতে হলে ব্যাংকের সময় লাগবে মোট ১৪০ বছর যা কার্যত সম্ভব নয়।

সার্বিক বিষয়ে খাতসংশ্লিষ্টরা বলেন, বিগত ১৮ মাসে ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান অদক্ষ বোর্ড ও ম্যানেজমেন্ট মিলে শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তির ব্যাংকটিকে খাদের কিনারায় নিয়ে এসেছে। এভাবে আর কিছুদিন চললে দেশের অর্থনীতির প্রাণ খ্যাত এই প্রতিষ্ঠানটি অস্তিত্বসংকটে পড়বে। এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে দেশের ব্যাংক খাত ও জাতীয় অর্থনীতি এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। তাদের মতে, ভবিষ্যতে ব্যাংকটিকে স্থিতিশীল রাখতে হলে কার্যকর নীতি, কঠোর তদারকি এবং স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

বিদ্যুৎ-জ্বালানির দাম বৃদ্ধি: জীবনযাত্রা হবে আরও ব্যয়বহুল

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ১২:১৬ পিএম
বিদ্যুৎ-জ্বালানির দাম বৃদ্ধি: জীবনযাত্রা হবে আরও ব্যয়বহুল
ছবি: সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমলেও দেশে উল্টো বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বাড়ানোর তীব্র সমালোচনা করেছেন অর্থনীতিবিদ ও ভোক্তা অধিকার কর্মীরা। তারা আশঙ্কা করছেন, এই অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্তের ফলে দেশে চলমান ৮ শতাংশের ওপর থাকা মূল্যস্ফীতি আরও তীব্র আকার ধারণ করবে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বাড়বে। 

বিদ্যুৎ খাতের অপচয় ও চুরি বন্ধ না করে মাত্র তিন কার্যদিবসের মধ্যে তড়িঘড়ি করে সব শ্রেণির গ্রাহক পর্যায়ে এই দাম বাড়ানোকে ‘অযৌক্তিক ও অগ্রহণযোগ্য’ বলে আখ্যা দিয়েছেন তারা। বিশেষ করে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) আপত্তি সত্ত্বেও পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) প্রস্তাবে প্রান্তিক গ্রাহক ও কৃষিতে দাম বাড়ানোর কারণে গ্রামীণ অর্থনীতি ও ক্ষুদ্রশিল্প বড় ধাক্কার মুখে পড়বে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মো. শওকত আলী আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে দেশে চলমান মূল্যস্ফীতি আরও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।

তিনি মনে করিয়ে দেন, দেশে এমনিতেই মূল্যস্ফীতি এখন ৮ শতাংশের ওপরে (বিগত মাসগুলোতে যা ছিল প্রায় ৮.২২ শতাংশ)। এই পরিস্থিতিতে নতুন করে মূল্যবৃদ্ধি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে। খুচরা বা গ্রাহক পর্যায়ে (০ থেকে ৭৫ ইউনিট ব্যবহারকারী) প্রতি ইউনিটে ৯২ পয়সা বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে ‘যুগোপযোগী নয়’ বলে আখ্যা দেন অধ্যাপক শওকত আলী। আগে খুচরা পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ছিল ৫ টাকা ২৬ পয়সা, তা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ টাকা ১৮ পয়সায়। এ ছাড়া কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতেও বিদ্যুতের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়েছে।

ভোক্তা অধিকারের বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘গবেষণায় দেখা গেছে, মানসম্মত সেবার জন্য মানুষ কিছুটা বাড়তি টাকা দিতেও রাজি থাকে। কিন্তু আরইবির অধীনে থাকা গ্রামীণ গ্রাহকরা বাড়তি দাম দিয়েও ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের শিকার হচ্ছেন। বিদ্যুৎ গেলে আর আসার নাম থাকে না, সেবার মানও অত্যন্ত নাজুক। এই অবস্থায় যদি লোডশেডিং থেকেই যায়, তবে বিদ্যুতের এই মূল্যবৃদ্ধি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’

বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ার অজুহাতে দেশের বাজারে অকটেনের দাম প্রতি লিটারে ১২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৪০ টাকা করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে অধ্যাপক শওকত আলী বলেন, ‘কিছুদিন আগে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি কমলেও আমাদের দেশে সেই অনুপাতে দাম কমানো হয়নি। উল্টো সরকারের পক্ষ থেকে দাম আরও বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, যার কোনো যৌক্তিকতা নেই।’

ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত রাখা হলেও সার্বিক মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব থেকে কৃষি ও পরিবহন খাত রেহাই পাবে না বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি কৃষকদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। এর পাশাপাশি পরিবহন খরচ অনেক বেড়ে যাবে। আর পরিবহন খরচ বাড়লে তার চূড়ান্ত প্রভাব গিয়ে পড়বে সাধারণ পণ্যের ওপর, যার ফলে বাজারে বড় ধরনের মূল্যস্ফীতি দেখা দেবে।’

দফায় দফায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধির ফলে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি আরও প্রকট আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শাহাদাৎ হোসেন সিদ্দিকী। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘কিছুদিন আগেই পত্রিকায় দেখলাম আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যারেলপ্রতি অপরিশোধিত তেলের দাম কমেছে। নিয়ম অনুযায়ী বাংলাদেশেও তেলের দাম কমার কথা ছিল। কিন্তু তা না করে সরকার উল্টো অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ১২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৪০ টাকা করেছে।’ জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত উল্লেখ করে তিনি বলেন, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করতে হলে জ্বালানি, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম অপরিবর্তিত রাখা জরুরি ছিল।

অধ্যাপক মুহাম্মদ শাহাদাৎ হোসেন সিদ্দিকী সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘এমনিতেই দেশের ইনফ্লেশন বা মূল্যস্ফীতি ৮ ডিজিটের (৮ শতাংশ) ওপরে, গত মাসের আগের মাসে যা ছিল ৮ দশমিক ২২ শতাংশ। এখন নতুন করে জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়ায় স্বাভাবিকভাবেই পরিবহন খরচ বেড়ে যাবে, যার চূড়ান্ত প্রভাব পড়বে বাজারে এবং ইনফ্লেশন আরও বাড়বে।’

খুচরা গ্রাহক পর্যায়ে (০ থেকে ৭৫ ইউনিট) প্রতি ইউনিটে ৯২ পয়সা বাড়িয়ে নতুন দাম ৬ টাকা ১৮ পয়সা নির্ধারণের প্রসঙ্গে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। পিডিবির (পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড) আপত্তি থাকা সত্ত্বেও আরইবির (পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড) প্রস্তাবে এই দাম বাড়ানো হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে ড. শাহাদাৎ হোসেন বলেন, ‘গ্রাহকরা ভালো সেবার জন্য বেশি টাকা দিতে রাজি থাকেন। কিন্তু আরইবির অধীনে থাকা গ্রামের সাধারণ গ্রাহকরা এমনিতেই ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের শিকার। বিদ্যুৎ গেলে আর আসতে চায় না। এই অবস্থায় সেবার মান না বাড়িয়ে হুট করে দাম বাড়ানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’ তিনি যোগ করেন, যদি এই বাড়তি দাম দেওয়ার পরও লোডশেডিং থেকেই যায়, তবে সাধারণ মানুষ তা মেনে নেবেন না।

কৃষি খাতে বিদ্যুতের দাম ইউনিটপ্রতি ৫ টাকা ২৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৬ টাকা ৪ পয়সা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে (এসএমই) ১১ টাকা ৭৬ পয়সা থেকে ১২ টাকা ৭৩ পয়সা করার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এই অধ্যাপক। তার মতে, কৃষকরা ইরিগেশন বা সেচব্যবস্থার জন্য ডিজেল ও বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। এই দুই খাতের খরচ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে যাবে। এসএমই খাতের অবস্থা দেশের বাজারে এমনিতেই নাজুক, তার ওপর এই বাড়তি বিদ্যুতের বিল তাদের আরও বড় সংকটে ফেলবে।

বিদ্যুতের দাম দফায় দফায় বৃদ্ধির তীব্র প্রতিবাদ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। ক্যাবের সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান খবরের কাগজকে বলেন, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি উৎপাদন ও পরিবহনসহ প্রতিটি খাতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির কাঠামোর সমালোচনা করে এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, ‘এবারের বিদ্যুতের দাম একদম নিম্নবিত্ত থেকে শুরু করে উচ্চবিত্ত–সব পর্যায়েই বাড়ানো হয়েছে। যার ফলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর চাপ সবচেয়ে বেশি পড়বে।’ তিনি সরকারের দ্বিমুখী নীতির দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘একদিকে সরকার কৃষকদের ধান চাষ বা কৃষিকাজের জন্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভর্তুকি ও টাকা দিচ্ছে, আর অন্যদিকে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।’

সরকারি বাসে বেসরকারি থাবা, পকেট ভরছেন শীর্ষ কর্মকর্তারা

প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬, ১০:১৫ এএম
আপডেট: ০৪ জুন ২০২৬, ১০:১৬ এএম
সরকারি বাসে বেসরকারি থাবা, পকেট ভরছেন শীর্ষ কর্মকর্তারা
খবরের কাগজ গ্রাফিকস

রাষ্ট্রীয় গণপরিবহন সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) এখন যেন একশ্রেণির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সিন্ডিকেটের অবাধ লুটপাটের চারণভূমি। সরকারের ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ ও আধুনিকায়ন নীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, স্রেফ পকেট ভারী করতে রাতারাতি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ডিজিটাল পজ মেশিনের টিকিট বুকিং ব্যবস্থা। অ্যানালগ পদ্ধতিতে হাতে লিখে টিকিট বিক্রি করে যাত্রীপ্রতি বাড়তি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার শাটল বাস থেকেও প্রতিদিন গায়েব করা হয়েছে লাখ লাখ টাকার রাজস্ব।

এই প্রাতিষ্ঠানিক হরিলুটের পেছনে খোদ বিআরটিসি চেয়ারম্যান, পরিচালক ও অপারেশন্‌স বিভাগের শীর্ষ কর্তাদের সরাসরি যোগসাজশ ও সুনির্দিষ্ট সিন্ডিকেটের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মিলেছে। 

সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ দায়িত্বশীলরা পুরো বিষয় সম্পর্কে ‘ওয়াকিবহাল’ এবং তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তারপরও মাঠপর্যায়ে বহাল তবিয়তে রয়েছে এই চক্র।

বিতর্কিত পিএসের ‘ঘনিষ্ঠ’ মাহতাব সিন্ডিকেটের তাণ্ডব

রাজধানীর গুলিস্তান এবং ফুলবাড়িয়ায় এখন নির্দিষ্ট কোনো ডিপো নেই। সে কারণে কখনো মতিঝিল, কখনো যাত্রাবাড়ী বা অন্য ডিপো থেকে বাস এনে রুট পরিচালনা করা হচ্ছে। ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনাল থেকে সেই বাসগুলো বিভিন্ন কোম্পানির ব্যানারে পরিচালনা করা হচ্ছে। এই বাসগুলোর মেরামত ও যন্ত্রাংশ সংযোজন; তেল নেওয়ার কাজগুলো দেখভাল করেন মতিঝিল বা যাত্রাবাড়ী ডিপোর কর্মকর্তারা। অথচ এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই বিআরটিসির কর্মকর্তাদের কাছে। রুটে বাস চলাচলে যে লভ্যাংশ অর্জিত হচ্ছে, তারও সঠিক হিসাব দিচ্ছে না ইজারাদার। 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিআরটিসির অপারেশন্‌স বিভাগের ব্যবস্থাপক নূর-ই-আলম এবং উপ-ব্যবস্থাপক (নির্মাণ) মো. মনিরুজ্জামানের প্রত্যক্ষ ছত্রছায়ায় সেখানকার সি-ক্যাটাগরির চালক মো. মাহতাবুল ইসলাম ওরফে মাহতাব গড়ে তুলেছেন এক বিশাল সিন্ডিকেট। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিতর্কিত পিএস হাফিজুর রহমান লিকুর ‘ঘনিষ্ঠজন’ পরিচয়ে মাহতাব এখন গুলিস্তান-দাউদকান্দি এবং গুলিস্তান-নারায়ণগঞ্জ রুট একচ্ছত্রভাবে নিয়ন্ত্রণ করছেন। মাহতাবের সঙ্গী হিসেবে রনি ও বিল্লাহর নাম জানিয়েছেন একাধিক পরিবহন মালিক। বিআরটিসির শ্রমিক-কর্মচারী লীগের একসময়ের সহ-সম্পাদক মাহতাব এখন বিএনপি-সমর্থিত শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছেন। এভাবেই তিনি বিআরটিসিতে চাকরি করেও সেই প্রতিষ্ঠানের বাসই ইজারা নিয়ে ‘সব মহলকে’ সন্তুষ্ট করে আলাদাভাবে ব্যবসা করছেন।

এখানেই শেষ নয়। গুলিস্তান-নারায়ণগঞ্জ রুটে বাস পরিচালনা করে ঢাকা নগর পরিবহন। মাহতাব সিন্ডিকেটের কারণে এই রুটে নির্বিঘ্নে বাস পরিচালনা করতে পারছে না ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ-ডিটিসিএ।

মাহতাব ও তার সঙ্গীরা একাধিকবার ঢাকা নগর পরিবহনের কাউন্টারে ভাঙচুর ও হামলা চালিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, বিআরটিসির আইডি কার্ড ধারণ করে এই হামলা চালানো হয়। এর কিছু ভিডিও ফুটেজও সংগ্রহ করেছে খবরের কাগজ। নারায়ণগঞ্জে ঢাকা নগর পরিবহনের কাউন্টারে ভাঙচুরের পর ফতুল্লা থানায় জিডিও করা হয়েছিল।

এ বিষয়ে মাহতাব খবরের কাগজকে বলেন, ‘ঢাকা নগর পরিবহন কাউন্টারের কারণে আমরা বিআরটিসির বাস পরিচালনা করতে পারছি না। বিআরটিসির বাসের সামনে এসে দাঁড়িয়ে থাকে এই বাস। আমরা যাত্রী নেব না?’ ভাঙচুরের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘এখন আমাদের মধ্যে কোনো গ্যাঞ্জাম নাই। সব ঠিক আছে।’

বিআরটিসির বাস ইজারা নিয়ে পরিচালনার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এগুলো তো আমরাই (বিআরটিসির কর্মচারী) পরিচালনা করছি।’ এ সময় মাহতাবকে রনি ও বিল্লাহর মতো আরও ক’জন সঙ্গীর বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘তারাও আমাদের সঙ্গে থাকে। দাউদকান্দি ও নারায়ণগঞ্জ রুট চালাতে (পরিচালনা) একার পক্ষে কতটা সম্ভব?’ বিআরটিসির স্টাফ হয়ে কীভাবে নিজেই বাস ইজারা নিয়ে রুট পরিচালনা করছেন, এ প্রশ্ন করা হলে তিনি ফোন কেটে দেন। পরে একাধিকবার ফোন করেও তার সঙ্গে আর যোগাযোগ করা যায়নি।

ইজারার মাধ্যমে বেশ কয়েকটি রুটে বাস পরিচালনা করছে বিআরটিসি। তবে এ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি প্রতিনিয়ত নিয়ম লঙ্ঘন করছে। যে রুটে এসব বাস পরিচালনা করা হচ্ছে, সে সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে (যাত্রী ও পণ্যপরিবহন কমিটি বা আরটিসি) কিছুই জানাচ্ছে না সরকারি এই প্রতিষ্ঠানটি। 

গুলিস্তান-ফুলবাড়িয়ার অনিয়ম নিয়ে অভিযুক্ত কর্মকর্তা বিআরটিসির ম্যানেজার নূর-ই-আলম খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমি কোনো মন্তব্য করব না। কারণ আমি এই সেক্টরের (গুলিস্তান-ফুলবাড়িয়া) দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নই। বিআরটিসির নানা বিষয় নিয়ে যে অভিযোগ করছেন, তা নিয়ে বলার জন্য আমি যথোপযুক্ত ব্যক্তি নই। আমার মনে হচ্ছে, কেউ আপনাদের ভুল তথ্য দিচ্ছে। গত ৩৩ মাস ধরে বিআরটিসিতে আমি কোনো ডেস্কেই নেই।’ আরেক অভিযুক্ত কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান খবরের কাগজের বার্তার কোনো উত্তর দেননি।

ডিজিটাল সিস্টেম অচল করে অ্যানালগে ডাকাতি, জিম্মি সাধারণ যাত্রী

ডিজিটাল বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় যেখানে সরকারি গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আধুনিকায়নের জোর চেষ্টা চলছে, সেখানে বিআরটিসির ফুলবাড়িয়া ও গুলিস্তান সিবিএস-২ কাউন্টারে উল্টো চিত্র দেখা গেছে। দীর্ঘদিন ডিজিটাল পস মেশিনের মাধ্যমে টিকিট বিক্রি সচল থাকলেও হঠাৎ করে গত ৯ ফেব্রুয়ারি সেটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। 

বর্তমানে সম্পূর্ণ অ্যানালগ পদ্ধতিতে হাতে লিখে টিকিট বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। হাতে লেখা টিকিট খবরের কাগজের হাতে এসেছে।

ফুলবাড়িয়ার বাস মালিক সমিতির নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঈদযাত্রা উপলক্ষে যাত্রী সাধারণের অতিরিক্ত চাপকে কেন্দ্র করে কাউন্টারের একটি সংঘবদ্ধ চক্র পরিকল্পিতভাবে এই ডিজিটাল ব্যবস্থা বন্ধ করেছে। সরকার-নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অতিরিক্ত টাকা হাতিয়ে নিতেই এই কৌশলের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে বলে জানান তারা। 

বিআরটিসির অফিশিয়াল চার্ট অনুযায়ী ঢাকা-বরিশাল রুটে সর্বোচ্চ ভাড়া ৭৩০ টাকা নির্ধারিত। তবে কাউন্টারে টিকিট প্রতি ৮০০ টাকা বা তারও বেশি আদায় করা হচ্ছে। পস মেশিন সচল থাকলে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার সুযোগ থাকে না। তাই অসৎ উদ্দেশ্য থেকে এটি বন্ধ রাখা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি গাড়ি থেকে গড়ে ১৩ থেকে ১৪ হাজার অতিরিক্ত টাকা যাত্রীদের পকেট থেকে জোর করে নেওয়া হচ্ছে। এই টাকা কাউন্টারের লোকজন ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পকেটে যাচ্ছে। এর ফলে সরকারি কোষাগার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে। 

বিআরটিসির পরিচালক (প্রশাসন) রাহেনুল ইসলাম এসব কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত নন বলে দাবি করেন। তিনি জানান, বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। বিআরটিসির বাসে শিগগির ই-টিকিট ব্যবস্থা চালু হবে। 

বাণিজ্য মেলার শাটল বাসে ‘টিকিট জালিয়াতি’, রাজস্ব লুট 

৩০তম আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার দর্শনার্থীদের জন্য নিয়োজিত শাটল বাস সার্ভিস থেকে লাখ লাখ টাকার রাজস্ব চুরির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে বিআরটিসির শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। এই চোর সিন্ডিকেটের পেছনে বিআরটিসির দুজন শীর্ষ কর্মকর্তার নাম ঘুরেফিরে এসেছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় দায়িত্বপালনকারী বিআরটিসির বিভিন্ন বাসের ট্রিপ-শিট এবং টিকিট বিক্রির খতিয়ানও এসেছে খবরের কাগজের হাতে। 

এরপর বিআরটিসির দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছে খবরের কাগজ। তারা জানান, বাণিজ্য মেলার টিকিট জালিয়াতির মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের এই পুরো প্রক্রিয়াটি দেখভাল করছেন রাজধানীর জোয়ারসাহারা বাস ডিপোর ঊর্ধ্বতন দুই কর্মকর্তা। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিদিন দুপুর ১২টা থেকে ১টার মধ্যে তারা মেলা প্রাঙ্গণ এবং কুড়িল বিশ্বরোড কাউন্টারে যান। সেখানে পজ মেশিন জালিয়াতি করে টাকা চুরি করেন। 

সাধারণ দিনগুলোতে ৬-৭টি মেশিন সারানো হলেও শুক্র, শনি এবং অন্য সরকারি ছুটির দিনে দর্শনার্থীদের উপচেপড়া ভিড়কে কাজে লাগিয়ে ৮ থেকে ১০টিরও বেশি পজ মেশিন এন্ট্রি ছাড়াই পরিবর্তন করা হয়।

এখানেই শেষ নয়, বাণিজ্য মেলায় বিশেষ শাটল বাস সার্ভিস চালু করতে ৫৭ লাখ ৫৫ হাজার টাকার ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছিল। ব্যয়ের খতিয়ান থেকে দেখা যায়, বড় অঙ্কের অর্থ খরচ করা হয়েছিল ডেকোরেশন ও আনুষঙ্গিক ব্যবস্থাপনায়। এর মধ্যে লাইটিং ও ডেকোরেটর খাতে ১০ লাখ টাকা, বিবিধ খরচ ৮ লাখ এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আপ্যায়নে ৫ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছিল। বিপুল অঙ্কের টাকা কোথায় কীভাবে ব্যয় হয়েছে, তা নিয়ে বিআরটিসির সাধারণের মধ্যেও কৌতূহল রয়েছে।

বিআরটিসির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা খবরের কাগজকে বলেন, ‘২৯তম বাণিজ্য মেলায় ১৫ লাখ টাকার মতো উত্তোলন করা হয়েছিল। তাতেও টাকা বেঁচে গিয়েছিল। ৫৭ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে–এটা জেনে আমরাও অবাক হয়েছি।’

সব ভুয়া, সব মিথ্যা: বিআরটিসির চেয়ারম্যান

এসব অনিয়ম সম্পর্কে জানতে বিআরটিসির চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লার সঙ্গে যোগাযোগ করে খবরের কাগজ। তাকে হোয়াটসঅ্যাপ বার্তায় অনিয়মের বিষয়ে প্রশ্ন পাঠানো হয়। এর তিন দিন পরে ফোনে কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘সব অভিযোগ মিথ্যা। কেউ আমাদের সুনাম ক্ষুণ্ন করতে এমন অভিযোগ দিচ্ছে।’ প্রতিবেদক তাকে এসময় জানান, বিআরটিসির অভ্যন্তরীণ নথিতেই এসব অভিযোগের বিষয়ে বলা হয়েছে। তখন আব্দুল লতিফ মোল্লা রাগত স্বরে এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘সব ভুয়া। ভিত্তিহীন অভিযোগের ভিত্তিতে আপনি প্রশ্ন করছেন।’ পরে এই প্রতিবেদক তার কার্যালয়ে যাওয়ার অনুমতি চেয়ে বার্তা পাঠান। কিন্তু তিনি তাতে সাড়া দেননি।

উপকূলীয় এলাকায় বহুমুখী ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র প্রকল্প দুর্যোগে নিশ্চিত হয়েছে নিরাপদ আশ্রয়

প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬, ০৯:২১ এএম
আপডেট: ০৪ জুন ২০২৬, ০৯:৪৪ এএম
দুর্যোগে নিশ্চিত হয়েছে নিরাপদ আশ্রয়
ছবি: সংগৃহীত

আশ্রয়কেন্দ্রগুলো দুর্যোগকালে নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করে প্রাণহানি ও সম্পদহানি কমাতে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত হয়েছে। নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের জীবনরক্ষা সহজ হয়েছে। শুধু তাই নয়, আশ্রয়কেন্দ্রগুলো স্কুল, মাদ্রাসা ও কমিউনিটি সেন্টার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

ফলে স্থানীয় ছেলে-মেয়েদের শিক্ষাগ্রহণের সুযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। অধিকাংশ এলাকায় নিরাপদ ও আর্সেনিকমুক্ত পানি সরবরাহ নিশ্চিত হওয়ায় স্বাস্থ্যঝুঁকি কমেছে। তবে সব সৌরবিদ্যুৎ অকেজো হয়ে পড়েছে। ৩ বিভাগের ১৬ জেলার ৮৬টি উপজেলায় ‘উপকূলীয় ও ঘূর্ণিঝড়প্রবণ এলাকায় বহুমুখী ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ’ শীর্ষক প্রকল্পটি ছয় বছরে অর্থাৎ ২০১৬ সালের জুলাই থেকে ২০২২ সালের জুনে বাস্তবায়ন করা হয়েছে।

এতে খরচ হয়েছে ৪৪৮ কোটি টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

আইএমইডি সূত্রে জানা গেছে, দরিদ্র ও সহায় সম্বলহীন জনগোষ্ঠীকে দুর্যোগকালে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতে বিগত শেখ হাসিনার সরকার ২০১৬ সালের ২০ জুলাই প্রকল্পটির অনুমোদন দেয়।

প্রধান প্রধান কাজ ধরা হয়– ২২০টি বহুমুখী ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, পানি সরবরাহের জন্য প্রতিটি আশ্রয়কেন্দ্রে ১টি করে মোট ২২০টি গভীর নলকূপ স্থাপন, প্রতিটি আশ্রয়কেন্দ্রে দেড় হাজার ওয়াটের করে ২২০টি সোলার সিস্টেম স্থাপন, আশ্রয়কেন্দ্রে সহজে যাতায়াতের জন্য ২৯ কিলোমিটার আরসিসি অ্যাপ্রোচ সড়ক নির্মাণ, প্রতিটি আশ্রয় কেন্দ্রের পাশে দুর্যোগকালে গবাদি পশুর আশ্রয়ের জন্য ক্যাটল শেল্টার নির্মাণ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।

প্রথমে প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছিল ২০১৬ সালের জুলাই থেকে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত। সম্পূর্ণ সরকারি অর্থে খরচ ধরা হয়েছিল ৫৩৩ কোটি টাকা। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় ৩ বিভাগের ১৬ জেলার ৮৬টি উপজেলায় কাজও শুরু হয়।

জেলাগুলো হলো- সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, খুলানা, বরিশাল, বরগুনা, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, পটুয়াখালী, ভোলা, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, চাঁদপুর, কুমিল্লা ও ফেনী। পরে দুই বার সংশোধন করে ৩ বছর সময় বাড়িয়ে ২০২২ সালের জুনে তা শেষ করা হয়। একই সঙ্গে খরচ বাড়িয়ে ধরা হয় ৫৫৬ কোটি টাকা।

লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী সব কাজ শেষ হয়েছে। এতে ৩০৫টি প্যাকেজের মাধ্যমে প্রকৃত খরচ হয়েছে ৫৪৮ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ৯৮ দশমিক ৫৫ শতাংশ। প্রকল্পটির এই আর্থিক বাস্তবায়ন সন্তোষজনক। প্রকল্পটি গ্রহণের আগে সম্ভাব্যতা যাচাই করা হলেও যথাযথ গভীরতা, বাস্তব চাহিদা নিরূপণের দিক থেকে পর্যাপ্ত ছিল না। আবার সময়মতো বাস্তবায়িত না হওয়ায় উপকারভোগী জনগণ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের সময় প্রত্যাশিত সুরক্ষা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

আইএমইডি সম্প্রতি ১৬টি উপজেলায় সরেজমিন পরিদর্শন করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রায় ১ হাজার জনের সঙ্গে কথা বলে প্রকল্পটির প্রভাব নিরূপণ করে খসড়া প্রতিবেদন তৈরি করেছে। ৯৬ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের ফলে দুর্যোগকালে নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত হয়েছে, যা প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল। ৫৫ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা বৃদ্ধি পেয়েছে। 

এগিয়েছে শিক্ষা ও সামাজিক ক্ষেত্র

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রকল্পের আওতায় আশ্রয়কেন্দ্রগুলো স্কুল, মাদ্রাসা ও কমিউনিটি সেন্টার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় এটি একটি বহুমুখী সামাজিক অবকাঠামোতে পরিণত হয়েছে। এর ফলে উপকূলীয় ও দুর্গম এলাকায় শিক্ষার সুযোগ বেড়েছে। নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা সহজ হয়েছে। প্রায় ৭৯ শতাংশ পরিবারের শিক্ষার্থীরা স্থানীয়ভাবে শিক্ষাগ্রহণ করেছে।

শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার কমার প্রবণতা দেখা গেছে। ২৫০ জন পর্যন্ত শিক্ষার্থী রয়েছে কোনো কোনো আশ্রয়কেন্দ্রে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলো শিক্ষা বিস্তার ও সামাজিক উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে।

এ ব্যাপারে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার পল্লী জাগরণী মাধ্যমিক বিদ্যালয় বহুমুখী ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রের প্রধান শিক্ষক মো. হালিম উদ্দিন বলেন, ‘আশ্রয়কেন্দ্রটি নির্মিত হওয়ায় এলাকায় উল্লেখযোগ্য উপকার সাধিত হয়েছে। তবে সোলার প্যানেল অকার্যকর হয়ে পড়েছে। অন্য আশ্রয়কেন্দ্রের শিক্ষকরাও একই মত প্রকাশ করেন।

ক্যাটল শেল্টার ব্যবস্থার মাধ্যমে গবাদি পশু ও গৃহস্থালির মূল্যবান সম্পদ সুরক্ষায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ফলে পানিতে ভেসে যাওয়া, মৃত্যু, চুরি বা কম দামে বিক্রি করার মতো আর্থিক ক্ষতি তুলনামূলকভাবে অনেক কমেছে। কোন নেতিবাচক পরিবেশগত প্রভাব সৃষ্টি হয়নি। ১০০ শতাংশ মানুষই জানিয়েছেন তারা ঘূর্ণিঝড় ও অন্য দুর্যোগের সময় নির্মিত আশ্রয়কেন্দ্রে অন্তত একবার হলেও আশ্রয় গ্রহণ করেছেন।

আশ্রয়কেন্দ্রকে কেন্দ্র করে নতুন নতুন অর্থনৈতিক কার্যক্রম গড়ে উঠেছে। বিশেষ করে আশ্রয়কেন্দ্রে স্কুল ও মাদ্রাসা কার্যক্রম চলাকালে ফুচকা, ঝালমুড়ি, চা ও ছোট খাবারের দোকান গড়ে উঠেছে।

৯১ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন দুর্যোগকালে আশ্রয়কেন্দ্র থেকে তারা বিভিন্ন ধরনের প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেছেন। ৯৯ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন তাদের আশ্রয়কেন্দ্রে গভীর নলকূপ কার্যকর রয়েছে। এটা নিরাপদ পানির উৎস হিসেবে কাজ করছে। ৫৩ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন সামগ্রিকভাবে আশ্রয়কেন্দ্র ব্যবহারে তারা অনেক সন্তুষ্ট।

৪ বছরেই সোলার প্যানেল অকার্যকর

১০০ ভাগ মানুষ জানিয়েছেন, আশ্রয়কেন্দ্রে স্থাপিত সব সোলার বিদ্যুৎব্যবস্থা সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়েছে। বর্তমানে কোনো আলোর সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে না। চাঁদপুর সদরের চরফতেজংপুর ছালেহীয়া ইবতেদায়ী মাদ্রাসা কাম বহুমুখী ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রে বর্তমানে ময়লা আবর্জনার স্তূপ জমেছে।

সোলার প্যানেল অকার্যকর হয়ে পড়েছে। দেওয়ালে ফাটল সৃষ্টি হয়েছে। এই জেলার দক্ষিণ মতলবের লামচরী উচ্চবিদ্যালয় বহুমুখী ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র, রসুলপুর আন-নিছা দক্ষিণ মাদ্রাসার আশ্রয়কেন্দ্র, কালিকাপুর আদর্শ দাখিল বহুমুখী ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র, উত্তর মতলবের দুর্গাপুর জনকল্যাণ উচ্চবিদ্যালয় বহুমুখী ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রের সোলার প্যানেলও অকার্যকর হয়ে গেছে।

এভাবে সব আশ্রয়কেন্দ্রের সোলার প্যানেল অকার্যকর হয়ে গেছে। অনেক আশ্রয়কেন্দ্রের পাম্পমোটর নষ্ট হয়ে গেছে। দেওয়াল স্যাঁতসেঁতে হয়ে প্লাস্টার উঠে গেছে। অতিবৃষ্টিতে জানালা দিয়ে রুমে পানি ঢুকে পড়ে। দেওয়ালে ফাটল।

পরিচালক নিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব

প্রকল্পটি ৫০ কোটি টাকার উপরে হওয়া সত্ত্বেও সরকারি পরিপত্র মেনে পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়নি। ২০১৬ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২২ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ৪ জন যুগ্ম ও অতিরিক্ত সচিবকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয় তিন তলাবিশিষ্ট এসব আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণে।

এর ফলে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, তদারকি ও আন্তসংস্থার সমন্বয় কার্যক্রমে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় মোট ৯টি অডিট আপত্তির একটি– চাঁদপুর জেলার আপত্তি অনিষ্পন্ন রয়েছে।

প্রকল্পের সার্বিক ব্যাপারে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘কোন প্রকল্প প্রণয়ন করা হয় জনগণের জন্য এবং তাদের স্বার্থে। উপকূলীয় এলাকার জনগণের জন্য এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র হয়েছে, শিক্ষার সুযোগ বেড়েছে। এসব ভালো দিক। তবে কয়েক বছর যেতে না যেতেই সোলার প্যানেল অকার্যকর হয়ে গেছে। এটা নেতিবাচক দিক। দ্রুত তা সক্রিয় করা দরকার।’

চট্টগ্রাম নগরীর উন্মুক্ত নালা-খাল যেন মৃত্যুফাঁদ

প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬, ০৮:৩৯ এএম
আপডেট: ০৪ জুন ২০২৬, ০৮:৫০ এএম
চট্টগ্রাম নগরীর উন্মুক্ত নালা-খাল যেন মৃত্যুফাঁদ
চট্টগ্রাম নগরীতে নিরাপত্তাবেষ্টনীবিহীন মহেশখাল। ছবিটি হালিশহরের বড়পোল এলাকা থেকে গতকাল তোলা। মোহাম্মদ হানিফ

চট্টগ্রাম নগরীর ৫৬৩টি ঝুঁকিপূর্ণ নালা ও খালের পাড়ে গত বছর বাঁশের বেষ্টনী দিয়েছিল চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। লক্ষ্য ছিল বর্ষায় দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঝুঁকি কমানো। কিন্তু এক বছরের মাথায় সেই বেষ্টনীর বেশির ভাগই নষ্ট হয়ে গেছে। অনেক জায়গায় এর কোনো চিহ্নও নেই। ফলে বর্ষা শুরুর আগেই আবারও মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে এসব খাল ও নালা।

বাঁশের এসব বেষ্টনী ছিল অস্থায়ী ব্যবস্থা। তবুও গত বর্ষায় তা নগরবাসীকে কিছুটা নিরাপত্তা দিয়েছিল। অনেকের মতে, স্থায়ী সমাধান না হলেও এগুলো কিছুটা কাজে এসেছিল। অন্তত দুর্ঘটনার আশঙ্কা কমেছিল। কিন্তু চলতি বর্ষা মৌসুমে সেই অস্থায়ী নিরাপত্তাব্যবস্থাও আর নেই। ফলে খাল ও নালার পাশের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। পথচারী, শিশু ও স্থানীয় বাসিন্দারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। নগরবাসীর আশঙ্কা, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে ভারী বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার সময় আবারও দুর্ঘটনা এবং প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে পারে।

এ অবস্থায় ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে দ্রুত স্থায়ী নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকরা।

জানা গেছে, চট্টগ্রাম নগরে একের পর এক নালা-খালে পড়ে প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। গত বছর নগরের বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ নালা ও খালের তালিকা তৈরি করে চসিক। তখন ৫৬৩টি স্থানকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এসব স্থানে বাঁশের বেষ্টনী নির্মাণ করা হয়েছিল। কোথাও কোথাও বাঁশ ও লাল ফিতা দিয়ে অস্থায়ী নিরাপত্তাব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু তাতেও প্রাণহানি পুরোপুরি ঠেকানো যায়নি। এ পদক্ষেপের এক বছরের মাথায় নষ্ট হয়ে হারিয়ে গেছে সেই বেষ্টনীগুলো।

সরেজমিনে দেখা যায়, নগরের হালিশহরের বড় এলাকায় খালের পাড় ঘেঁসে দেওয়া হয়েছিল বাঁশের বেষ্টনী। বুধবার সকালে গিয়ে সেই বেষ্টনীর অস্তিত্ব দেখা যায়নি। বর্ষার সময় নগরের খাল-নালাগুলো পানিতে ভরে যায়। অনেক সড়ক ও খাল পানিতে একাকার হয়ে যায়। তখন কোনটি রাস্তা আর কোনটি খাল, তা বোঝা যায় না। এ কারণে দুর্ঘটনা ঘটে।

বায়েজিদ থানা সড়কের শেরশাহ খালের সেতু থেকে উত্তর দিকে প্রায় ৩০০ মিটার এলাকায় বাঁশের বেষ্টনী ছিল। রহমান নগর এলাকাতেও একই ব্যবস্থা  ছিল। এখন সেগুলো আর নেই। খালটির পশ্চিম পাশে একটি সড়ক রয়েছে। বায়েজিদ শিল্প এলাকার কারখানা ছুটি হলে সড়কটি খুব ব্যস্ত হয়ে ওঠে। রিকশা, সিএনজি অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত রিকশা দ্রুতগতিতে চলাচল করে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, বর্ষায় দুর্ঘটনা ঘটলে প্রাণহানি এড়ানো কঠিন হবে।

বায়েজিদ এলাকার পোশাককর্মী মোহাম্মদ রফিক বলেন, ‘ঝুঁকি কমাতে বাঁশের বেড়া ছিল। এখন সেটিও নেই। জলাবদ্ধতা হলে মানুষ অন্তত বাঁশের খুঁটি দেখে চলাচল করতে পারত। এতে কিছুটা উপকার পাওয়া গিয়েছিল। এখন ঝুঁকি আরও বেড়ে গেছে।’

একই এলাকার মুদির দোকানদার মোহাম্মদ সেলিম বলেন, খালের পাশে রাস্তার উন্নয়ন করে স্থায়ী বেষ্টনী দেওয়া দরকার। নালা-খাল নিরাপদ করা দরকার। রহমান নগর এলাকায় বৃষ্টি হলেই খালের পানি সড়কের ওপর উঠে আসে। আগে বাঁশ থাকায় মানুষ তা ধরে পার হতে পারত। এখন সেই সুযোগও নেই। নালা সংস্কারও হয়নি। উন্মুক্ত খালটি যেকোনো সময় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।

এলাকাবাসীর দাবি, উন্মুক্ত খাল ও নালাকে নিরাপদ করতে হবে। লোহার রেলিং দিয়ে নিরাপত্তা বেষ্টনী নির্মাণ করতে হবে, যেন ভবিষ্যতে প্রাণহানি না ঘটে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, গত বছর আমরা চট্টগ্রামের নালা ও খালে ৫৬৩টি ঝুঁকিপূর্ণ স্থান খুঁজে পাই। এর মধ্যে অনেক স্থানে স্থায়ী বাঁধ করা হয়েছে। তবে অধিকাংশ ঝুঁকিপূর্ণ খাল বা নালা এখনো রয়ে গেছে। পরিস্থিতি বিবেচনা করে আবারও নিরাপত্তাবেষ্টনী দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

চসিক সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ১৮ এপ্রিল রাত সাড়ে ৮টার দিকে চকবাজার এলাকায় মায়ের কোলে থাকা ছয় মাস বয়সী শিশুসহ তিনজনকে নিয়ে একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা হিজড়া খালে পড়ে যায়। শিশুটির মা সালমা বেগম ও দাদি আয়েশা বেগম খাল থেকে উঠতে পারলেও শিশু সেহরিশকে খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনার পর নড়েচড়ে বসে সিটি করপোরেশন। বৃষ্টির পানি বা জোয়ারের সময় অরক্ষিত খাল, নালা ও ড্রেনে পড়ে প্রাণহানি ঠেকাতে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোর তালিকা করা হয়। এরপরও একই বছরের ৯ জুলাই হালিশহর এলাকায় নালায় পড়ে হুমায়রা নামে তিন বছরের আরেক শিশু মারা যায়।

চসিকের তালিকা অনুযায়ী, নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডে মোট ৫৬৩টি জায়গাকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে ১ নম্বর জোনে ৪৭টি, ২ নম্বর জোনে ৭৮টি, ৩ নম্বর জোনে ৬৮টি, ৪ নম্বর জোনে ৭৪টি, ৫ নম্বর জোনে ৩৩টি এবং ৬ নম্বর জোনে ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত হয় ২৬৩টি। তালিকা অনুযায়ী, দুর্ঘটনা এড়াতে বিভিন্ন স্থানে ৮৬৩টি স্ল্যাব বসাতে হবে। এ ছাড়া বেষ্টনী নেই ১৫৬টি জায়গায়। সেখানে নিরাপত্তাবেষ্টনী নির্মাণের প্রয়োজন রয়েছে।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত নগরের খাল, নালা ও নর্দমায় পড়ে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৭ সালে একজন, ২০১৮ সালে একজন, ২০২১ সালে পাঁচজন, ২০২২ সালে একজন, ২০২৩ সালে তিনজন, ২০২৪ সালে তিনজন এবং ২০২৫ সালে দুজন মারা গেছেন।

এর আগে ২০২১ সালের অক্টোবরে নগরের ঝুঁকিপূর্ণ খাল, নালা-নর্দমার একটি তালিকা প্রস্তুত করেছিল সিটি করপোরেশন। সেই তালিকায় দেখা যায়, ৪১টি ওয়ার্ডে খাল, নালা ও নর্দমার মোট দৈর্ঘ্য ১ হাজার ১৩৭ কিলোমিটার। এর মধ্যে নিরাপত্তাবেষ্টনী ছাড়া খালের পাড় রয়েছে ১৯ হাজার ২৩৪ মিটার। এ ছাড়া ৫ হাজার ৫২৭টি উন্মুক্ত নালা রয়েছে। সেগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও এখনো অনেক জায়গায় নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়নি।

ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশের (আইইবি) চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সাবেক চেয়ারম্যান দেলোয়ার মজুমদার বলেন, খাল ও নালাকে নিরাপদ করার দায়িত্ব মূলত সিটি করপোরেশন ও সিডিএর। প্রাণহানি রোধে উন্মুক্ত স্থানগুলোতে দ্রুত নিরাপত্তাবেষ্টনী নির্মাণ করা জরুরি।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী নুরুল করিম বলেন, নগরের নালা ও খালগুলোকে ঝুঁকিমুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি। বর্ষাকালে প্রাণহানির আশঙ্কা থাকে, এটিও সত্য। এ বিষয়ে চসিক মেয়রের সঙ্গে আলোচনা করে আবারও নিরাপত্তাবেষ্টনী নির্মাণের কাজ শুরু করা হবে। কিছু কাজ চসিক করবে, কিছু কাজ আমরা করব।

জলবায়ু সংকটে বাংলাদেশ: গরম বাড়বে বৃষ্টি কমবে

প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬, ০৮:১০ এএম
আপডেট: ০৪ জুন ২০২৬, ০৮:১৫ এএম
জলবায়ু সংকটে বাংলাদেশ: গরম বাড়বে বৃষ্টি কমবে
ছবি: খবরের কাগজ

বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের আগুনে ঘি ঢালতে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সক্রিয় হচ্ছে ওশেনিয়া অঞ্চলের আবহাওয়ার বিপজ্জনক ধাপ ‘এল নিনো’। প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশ থেকে উঠে আসা এই উষ্ণ জলরাশি এবার ‘সুপার এল নিনো’ বা ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী রূপ নিতে পারে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও)।

বৈশ্বিক এই মহাবিপর্যয়ের সমান্তরালে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নির্বিচারে বন উজাড় ও জলাশয় ভরাটের মতো আত্মঘাতী কর্মকাণ্ডের কারণে বাংলাদেশ আবহাওয়া, জনস্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে বলে পূর্বাভাস দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

ডব্লিউএমওর সর্বশেষ বুলেটিন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের বাকি সময়জুড়ে (নভেম্বর পর্যন্ত) এই এল নিনো প্রবল শক্তিশালী থাকবে, যার ফলে জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিশ্বের অধিকাংশ অঞ্চলে স্বাভাবিকের চেয়ে চরম তাপমাত্রা বিরাজ করবে। তবে ডব্লিউএমওর তীব্র সতর্কতার বিপরীতে বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তর ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈশ্বিক জলবায়ু চক্রের চেয়েও দেশের ভেতরের মানবসৃষ্ট স্থানীয় বিপর্যয়গুলোই এই দাবদাহকে মানুষের সহ্যক্ষমতার বাইরে নিয়ে যাচ্ছে।

দেশে চলমান তীব্র তাপপ্রবাহ ও আবহাওয়ার অস্বাভাবিক পরিবর্তনের পেছনে বৈশ্বিক কারণগুলোর চেয়ে স্থানীয় কারণ তথা জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নির্বিচারে বন উজাড় ও জলাশয় ভরাটকেই প্রধান দায়ী বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

দেশের আবহাওয়া ও অর্থনীতির ওপর তাপপ্রবাহের প্রভাব নিয়ে গতকাল খবরের কাগজের সঙ্গে কথা বলেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. হুমায়ুন কবির। অন্যদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ শাহিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, বৈশ্বিক ‘এল নিনো’র প্রভাবে দেশে বৃষ্টিপাত কিছুটা কমতে পারে।

স্থানীয় কারণ ও ‘হিট আইল্যান্ড’ সংকট

অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘বর্তমানে ঋতুগত পরিবর্তন অনেক বেশি চরম রূপ ধারণ করেছে। এর পেছনে বৈশ্বিক কারণ থাকলেও বাংলাদেশের জন্য স্থানীয় কারণগুলোই বড় সংকট।’ তিনি জানান, গত ৩০ বছরে বিশ্বের জনসংখ্যা প্রায় ৩০০ কোটি বেড়েছে। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর আবাসন ও শিল্পায়নের জন্য নির্বিচারে বনাঞ্চল ধ্বংস করায় স্থানীয় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণকারী ‘মাইক্রো ক্লাইমেট’ হারিয়ে গেছে।

রাজধানী ঢাকার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ঢাকা এখন একটি ‘হিট আইল্যান্ড’ বা তাপদ্বীপে পরিণত হয়েছে। পুরো শহর কংক্রিটে ঢেকে যাওয়ায় এবং জলাশয় না থাকায় দিনের বেলা এগুলো মরুভূমির মতো তাপ শুষে রাখছে। ফলে থার্মোমিটারে তাপমাত্রা ৩৩-৩৫ ডিগ্রি হলেও বাতাসে অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে ‘ফিলিং টেম্পারেচার’ বা অনুভূত তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রির মতো দেখায়, যা মানুষের সহ্যক্ষমতার বাইরে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. হুমায়ুন কবির বলেন, বাতাসে জলীয় বাষ্প বেশি থাকায় মানুষ অনবরত ঘামছেন এবং গরম বেশি অনুভূত হচ্ছে। এর ফলে মেগাসিটির বস্তিবাসী ও রিকশাচালক, হকার বা দিনমজুরের মতো শ্রমজীবী মানুষের ভোগান্তি বহুগুণ বেড়ে গেছে।

তবে চলতি বছরের আবহাওয়াকে পুরোপুরি ‘অস্বাভাবিক’ বলতে নারাজ অধ্যাপক কবির। তার মতে, এপ্রিল-মে মাসে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রির ওপরে অনুভূত হওয়া আমাদের দেশের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য।

তবে এবারের ব্যতিক্রম ছিল বৃষ্টির ধরনে–জুনের বর্ষা শুরুর আগেই গভীর রাত বা ভোরে কালবৈশাখীর কারণে গ্রীষ্মের নির্ধারিত ১৫ শতাংশ বৃষ্টির কোটা ইতোমধ্যে ২০ শতাংশ ছাড়িয়েছে। জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহে বর্ষা শুরু হলে এই গরমের চক্র কেটে যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

অর্থনীতি ও কৃষিতে দ্বিমুখী আঘাত

তাপপ্রবাহের অর্থনৈতিক প্রভাব সম্পর্কে ড. নজরুল ইসলাম বলেন, এই পরিস্থিতি দেশের কৃষি ও শিল্প খাতকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করছে। আগে কেবল দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল খরাপ্রবণ থাকলেও এখন মধ্যাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলেও প্রচণ্ড গরম পড়ছে, যা সামগ্রিক কৃষি উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দিচ্ছে।

তীব্র গরমের কারণে এসি ও ফ্যানের ব্যবহার বাড়ায় বিদ্যুতের ঘাটতি ও লোডশেডিং হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন শিল্পকারখানার উৎপাদনের ওপর।

অধ্যাপক হুমায়ুন কবিরও এই অর্থনৈতিক বিপর্যয় নিয়ে সতর্ক করে বলেন, ‘দেশের একটি বড় অংশ অনানুষ্ঠানিক খাতের ওপর নির্ভরশীল। তীব্র গরমে শ্রমজীবী মানুষ অসুস্থ হলে তাদের আয় বন্ধ হয়ে যায়, যা অর্থনীতিতে বড় ক্ষতি ডেকে আনে।’

কৃষি খাতের বিষয়ে তিনি বলেন, অনাবৃষ্টির হাত থেকে ফসল বাঁচাতে কৃষকরা এখন ব্যাপকভাবে গভীর নলকূপ ব্যবহার করছেন। এতে সরাসরি উৎপাদন হয়তো ব্যাহত হচ্ছে না, তবে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর মারাত্মকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে এবং সেচ দিতে গিয়ে কৃষকের উৎপাদন খরচও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এল নিনোর প্রভাবে কমতে পারে বৃষ্টি: আবহাওয়া অধিদপ্তর

‘এল নিনো’র কারণে বাংলাদেশে স্বাভাবিকের তুলনায় বৃষ্টিপাত কিছুটা কম হতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। আবহাওয়াবিদ শাহিনুল ইসলাম গতকাল খবরের কাগজকে বলেন, ‘এল নিনো পরিস্থিতির কারণে দেশে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমে যায়, যার ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। তবে বৃষ্টিপাত একেবারে বন্ধ হবে না, হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকবে।’

তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, কোনো নির্দিষ্ট সময়ে দেশে স্বাভাবিকভাবে ১০০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত প্রত্যাশা করা হলে এল নিনোর প্রভাবে তা হয়তো ৮০০ বা ৯০০ মিলিমিটার হতে পারে।’

প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের এই বায়ুমণ্ডলীয় চক্রকে আবহাওয়াবিজ্ঞানের ভাষায় ‘এনসো’ বলা হয়। এর তিনটি ধাপ রয়েছে। শাহিনুল ইসলাম বলেন, ‘এল নিনো সক্রিয় থাকলে বাংলাদেশে বৃষ্টিপাত কমে লা নিনা সক্রিয় থাকলে স্বাভাবিকের চেয়ে প্রচুর বৃষ্টি হয় এবং নিউট্রাল বা নিরপেক্ষ অবস্থায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ একদম স্বাভাবিক থাকে।’