মাঠপর্যায়ে পুলিশের কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন বা জবাবদিহি জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) হাতে থাকার পুরোনো প্রস্তাবটি এবারও ডিসি সম্মেলনের আলোচনায় আনা হতে পারে। আগামীকাল বুধবার এ বিষয়টিসহ প্রতিরক্ষা ইস্যু ও দুদকের বিষয়েও ডিসি সম্মেলনে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, গত বছর গাইবান্ধা ও সাতক্ষীরা জেলার ওই সময়ের জেলা প্রশাসকরা (ডিসি) পুলিশের মূল্যায়নের ক্ষমতা দেওয়ার জন্য প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এতে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে পুলিশের সার্বিক কার্যক্রমের ওপর বার্ষিক মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রণয়নের সুযোগ রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়। কিন্তু এ প্রস্তাবটি শেষ পর্যন্ত ‘নিষ্পন্ন’ হিসেবে দেখানো হলেও বাস্তবে তা কার্যকর করা হয়নি। ফলে চলমান ডিসি সম্মেলনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত নতুন প্রস্তাবের গুরুত্ব থাকলেও গত বছরের এই মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সেই সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে মাঠ প্রশাসনে। এতে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের মধ্যে একধরনের মনস্তাত্বিক দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি কার্যকর জবাবদিহির একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হারিয়ে গেছে বলে মনে করেন জনপ্রশাসন বিশ্লেষকরা।
একইভাবে গত বছরের ডিসি সম্মেলনে মাগুরা ও মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসকদের পক্ষ থেকে পুলিশ নিয়োগ কমিটিতে জেলা প্রশাসকের প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাবও বাতিল হয়ে যায়। ওই সিদ্ধান্তের পর প্রশাসনে একধরনের হতাশা দেখা গেছে। বিভিন্ন সময়ে দায়িত্বশীলরা নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও স্থানীয় প্রশাসনের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার সুযোগ নষ্ট হয়েছে বলে মত দিয়েছেন।
গত রবিবার থেকে শুরু হওয়া এবারের ডিসি সম্মেলনে জেলা প্রশাসকদের কাছ থেকে প্রাপ্ত শতাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব আলোচনায় আসছে।
আগামীকাল ডিসি সম্মেলনের চতুর্থ দিনের তৃতীয় অধিবেশনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত বিষয় ও চতুর্থ অধিবেশনে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে ডিসিদের সঙ্গে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
অন্যদিকে দুর্নীতি দমন জোরদার করতে ঝালকাঠি জেলায় পৃথক কার্যালয় স্থাপন ও জনবল নিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে এবারের ডিসি সম্মেলনে। আগামীকাল বুধবার জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনে ঝালকাঠি জেলা প্রশাসকের এই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা শেষে সিদ্ধান্ত নেবে সরকার। ওই জেলার ডিসি জানিয়েছেন, প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে সংশ্লিষ্ট জেলার দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কার্যক্রম মাঠপর্যায়ে দ্রুততর ও কার্যকর হবে।
এ ছাড়া গত বছরের ডিসি সম্মেলনে মাগুরার জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে অপরাধ ডেটাবেজ ও জাতীয় পরিচয়পত্র ডেটাবেজে জেলা প্রশাসনকে প্রবেশাধিকার দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। সেই প্রস্তাবও নিরাপত্তার অজুহাতে নাকচ করা হয়। ফলে মাঠ প্রশাসনের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয় জোরদারের যে প্রত্যাশা ছিল, তা পূরণ হয়নি বলে খবরের কাগজের কাছে অভিযোগ করেছেন একাধিক সাবেক জেলা প্রশাসক। তারা বলছেন, তথ্যপ্রযুক্তির যুগে তথ্য ভাগাভাগির সীমাবদ্ধতা প্রশাসনিক দক্ষতা কমিয়ে দেয়।
গত বছরের সম্মেলনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব ছিল জেলা প্রশাসকের অধীনে ‘Special Dedicated Response Force’ গঠন। কিন্তু সরকার সেটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়নি। এতে দুর্যোগ, সহিংসতা বা জরুরি পরিস্থিতিতে জেলা প্রশাসনের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় সক্ষমতা বাড়ানোর যে উদ্যোগ ছিল, সেটিও থেমে যায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ গ্রহণে এমন একটি বাহিনী কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারত।
ডিসিরা বলেছেন, এসব সিদ্ধান্ত বাতিল বা বাস্তবায়ন না হওয়ায় মাঠ প্রশাসনের সঙ্গে পুলিশ প্রশাসনের সমন্বয়ে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি। বরং প্রশাসনিক ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয় না।
অন্যদিকে এবারের সম্মেলনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত বেশ কিছু নতুন প্রস্তাব গুরুত্ব পাচ্ছে। এর মধ্যে সংশ্লিষ্ট জেলার ডিসিদের দেওয়া প্রস্তাবের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি হলো রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের স্থায়ী সার্কেল অফিস স্থাপন; কিশোরগঞ্জের কারাগার হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত চিকিৎসক নিয়োগ; মুন্সীগঞ্জের কারাগারের বাইরে ওয়াচ টাওয়ার স্থাপন এবং বগুড়ার সারিয়াকান্দির চরাঞ্চলে পুলিশ নৌ-থানা প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা জানান, সম্মেলনে দুর্নীতি দমন থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। তবে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সদিচ্ছা না থাকলে এগুলো বাস্তবায়ন হবে না।