পবিত্র ঈদুল আজহা সামনে রেখে রাজধানীতে বসতে যাচ্ছে ২৪টি অস্থায়ী পশুর হাট। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকায় ১২টি অস্থায়ী হাটের পাশাপাশি থাকবে গাবতলীর স্থায়ী পশুর হাট। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায় বসানো হবে ১১টি অস্থায়ী পশুর হাট।
ঈদুল আজহা উপলক্ষে ঢাকায় ২৪টি অস্থায়ী পশুর হাট বসছে; ডিএনসিসিতে ১২টি ও ডিএসসিসিতে ১১টি হাটের পাশাপাশি থাকবে গাবতলীর স্থায়ী হাট।
ডিএনসিসির হাট ইজারা নিয়ে স্বজনপ্রীতি, কম দরদাতাকে ইজারা দেওয়া ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগ উঠেছে; কয়েকটি হাট নিয়ে সংঘর্ষ ও একজন শীর্ষ সন্ত্রাসী হত্যার ঘটনাও ঘটেছে।
ডিএসসিসিতে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের মধ্যে হাট নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উত্তেজনা ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে।
প্রতিবছরের মতো এবারও পশুর হাট ইজারা নিয়ে বিতর্ক থেকেই যাচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, সরকারদলীয় বিএনপি-সমর্থিত ডিএনসিসির বর্তমান প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খানের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরাই অধিকাংশ হাটের ইজারা পেয়েছেন। স্বজনপ্রীতির কারণে কয়েকটি হাট সরকারি নির্ধারিত মূল্যের চেয়েও কম দরদাতারও ইজারা পেয়েছেন। আবার কিছু হাটে নামমাত্র মূল্য বাড়িয়েই ইজারা পেয়েছেন প্রভাবশালীরা। ইতোমধ্যে ইজারার অর্থ সিটি করপোরেশনের ব্যাংকে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে স্থানীয় রাজনৈতিক কোন্দল ও বিরোধের কারণে ডিএনসিসির চারটি হাটের ইজারা কার্যক্রম আপাতত স্থগিত রয়েছে। এসব হাটের নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক প্রভাবশালী চক্রের পাশাপাশি আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসীরাও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। হাটের ইজারাকে কেন্দ্র করে একজন শীর্ষ সন্ত্রাসীকে হত্যার ঘটনাও ঘটে। এসব হাটে নতুন করে দরপত্র আহ্বানের পাশাপাশি দেন-দরবার চলছে।
অন্যদিকে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের হাটের ইজারা এখনো চূড়ান্তভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। তবে সেখানে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ না থাকলেও রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের মধ্যে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া দক্ষিণ সিটির একমাত্র স্থায়ী পশুর হাট সারুলিয়ায় এবার হাট বসছে না। কারণ ওই জায়গাটি পানি উন্নয়ন বোর্ড অধিগ্রহণ করেছে। তবে সব বিতর্কের মধ্যেও দুই সিটি করপোরেশনই আশা করছে, অস্থায়ী পশুর হাটগুলো থেকে এবার সরকারের কয়েক কোটি টাকার রাজস্ব আয় হবে।
উত্তর সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, ডিএনসিসি এলাকায় ১২টি অস্থায়ী হাটের মধ্যে ৪টির ইজারা এখনো দেওয়া হয়নি। এর মধ্যে ভাটারা সুতিভোলা খাল এলাকায় নির্ধারিত সরকারি দর ৩ কোটি ১২ লাখ ৭৬ হাজার টাকা। মোহাম্মদপুরের বছিলা এলাকায় ৪০ ফুট সড়কসংলগ্ন খালি জায়গার হাটের দর ১ কোটি ৯৬ লাখ ২০ হাজার টাকা। খিলক্ষেত বাজারসংলগ্ন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নিচের খালি জায়গার হাটের দর নির্ধারণ করা হয়েছে ১ কোটি ৫১ লাখ টাকা এবং মেরুল বাড্ডা কাঁচাবাজারসংলগ্ন খালি জায়গার সরকারি দর ১৪ লাখ টাকা।
বাড্ডার ভাটারা এলাকার হাটটি কাগজে-কলমে ইজারা দেওয়া না হলেও অভিযোগ উঠেছে, ওই এলাকার পশুর হাট ইজারা প্রক্রিয়াকে ঘিরে ভুয়া পে-অর্ডার এবং পূর্বনির্ধারিত সিন্ডিকেটের মাধ্যমে হাট বরাদ্দ হয়েছে। বিএনপি নেতা আতাউর রহমান ও তুহিনুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ লোকেরাই ওই হাটের ইজারা পাচ্ছেন বলে জানা গেছে। তারা সবাই ডিএনসিসি প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন এবং প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা শওকত ওসমানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। সাবেক বিতর্কিত প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এই শওকত ওসমানের নামে পূর্বে বহু অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগ রয়েছে। সাংবাদিকরা যেন তার দুর্নীতির বিষয়ে প্রশ্ন করতে না পারেন, তাই চতুর শওকত ইতোমধ্যে সিটি করপোরেশনের ওয়েবসাইট থেকে নিজের মোবাইল নম্বরও সরিয়ে নিয়েছেন।
মোহাম্মদপুরের বছিলা এলাকায় ৪০ ফুট সড়কসংলগ্ন খালি জায়গার ইজারাকে কেন্দ্র করে শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন খুন হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বাকি দুটিতেও উত্তেজনা রয়েছে।
অন্যদিকে ডিএনসিসির বাকি আটটি হাট ইতোমধ্যে সর্বোচ্চ দরদাতাদের পাশাপাশি সরকারি মূল্যের কম দরদাতার ইজারা পেয়েছেন। উত্তরা ১০ নম্বর সেক্টরের রানাভোলা হাটে সিটি করপোরেশনের সরকারি দর ৮৮ লাখ ২০ হাজার ৭৫০ টাকা। সেখানে একমাত্র দরদাতা মো. নুরে আলমের প্রতিষ্ঠান মেসার্স লামিয়া এন্টারপ্রাইজ ২০ হাজার ৭৫০ টাকা কম দিয়ে ইজারা পেয়েছেন। তিনি ৮৮ লাখ টাকার প্রস্তাব দিয়েছে, যা নির্ধারিত দরের চেয়ে কম। তবে প্রশাসকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে তিনি এমন সুবিধা পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
মিরপুরের কালশী বালুর মাঠের (১৬ বিঘা) হাটে সরকারি দর ছিল ৩০ লাখ টাকা, সেখানে রেদওয়ান রহমান মাত্র ১১ হাজার টাকা বেশি দিয়ে ইজারা পেয়েছেন। ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব হাজিপাড়া এলাকায় ইকরা মাদ্রাসার পাশের খালি জায়গার হাটে সরকারি দর ১৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা হলেও এম আসলাম মাত্র ৩ হাজার টাকা বেশি দিয়ে ইজারা পেয়েছেন।
অন্যদিকে মিরপুর-৬ নম্বর সেকশনের হাটে ইসলাম এন্টারপ্রাইজের সিরাজুল ইসলাম ১ কোটি ৭৯ লাখ টাকার দর প্রস্তাবে ইজারা পেয়েছেন, যার সরকারি দর ছিল ১ কোটি ৭৬ লাখ ২৭ হাজার ৮৫৮ টাকা।
তেজগাঁও পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটসংলগ্ন হাটে সরকারি দর ১ কোটি ১৩ লাখ ৫ হাজার ৯০০ টাকার বিপরীতে শিকদার এন্টারপ্রাইজের মালিক আমিনুল ইসলাম ৩ কোটি ৮৭ লাখ টাকার সর্বোচ্চ দর দিয়েছেন। উত্তরা দিয়াবাড়ি ১৬ ও ১৮ নম্বর সেক্টরসংলগ্ন বউবাজার এলাকার হাটে সর্বোচ্চ ১৪ কোটি ৫ লাখ ১০ হাজার টাকার দরপ্রস্তাব পাওয়া গেছে, যেখানে সরকারি দর ছিল ৮ কোটি ৩০ লাখ ৩৩ হাজার ৩৩৪ টাকা। এ দরপ্রস্তাব দেন এসএফ করপোরেশনের মালিক ও মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক শেখ ফরিদ হোসেন।
খিলক্ষেত থানার মস্তুল চেকপোস্টসংলগ্ন পশ্চিমপাড়ার হাটে সরকারি দর ৯৩ লাখ ২২ হাজার টাকা থাকলেও বিল্লাল হোসেন ৩ কোটি ৬০ হাজার টাকার দর দিয়ে হাটটি পেয়েছেন।
এ ছাড়া ৪৪ নম্বর ওয়ার্ডে কাঁচকুড়া বাজারসংলগ্ন রহমাননগর আবাসিক এলাকার হাটে সরকারি দর ছিল ১৫ লাখ ৫ হাজার টাকা, সেখানে রফিকুল ইসলাম সর্বোচ্চ ২৭ লাখ টাকার দর দিয়েছেন। জানা গেছে, এসব হাটের ইজারাদারদের মধ্যে বেশির ভাগই স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মী।
উত্তর সিটি করপোরেশনের বক্তব্য
জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের একান্ত সচিব ও নিরীক্ষা কর্মকর্তা (উপসচিব) মোহাম্মদ আবদুল্লাহ খবরের কাগজকে বলেন, প্রাথমিকভাবে কয়েকটি হাট ইজারা দেওয়া হয়েছে। ইজারার অর্থ সিটি করপোরেশনের ব্যাংক হিসাবে জমা দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের আহ্বান জানানো হয়েছে। তাদের সামর্থ্যও যাচাই-বাছাই কার্যক্রম চলছে। যেসব হাট এখনো ইজারা দেওয়া হয়নি, সেগুলোর বিষয়েও আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
কম দরদাতারা কীভাবে ইজারা পাচ্ছেন–এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এমন হওয়ার কথা নয়। যদি কোথাও এমন ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে বিষয়টি আবারও যাচাই করা হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বক্তব্য
এদিকে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পশুর হাটসংক্রান্ত প্রাথমিক বিজ্ঞপ্তিতে ‘সারুলিয়া’ স্থায়ী হাটটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের আপত্তির কারণে হাটটি বাদ দিয়ে পুনরায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে হয়েছে। সারুলিয়ার হাটের জায়গা পানি উন্নয়ন বোর্ড অধিগ্রহণ করায় এ সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে সিটি করপোরেশন।
ডিএসসিসির বাকি অস্থায়ী হাটগুলোর মধ্যে পোস্তগোলা শ্মশানঘাটের পশ্চিম পাশে নদীর তীরবর্তী খালি জায়গায় নির্ধারিত ইজারা দর রাখা হয়েছে ২ কোটি ৮৫ লাখ ৪৮ হাজার ১০০ টাকা। উত্তর শাহজাহানপুর মৈত্রী সংঘ ক্লাবের খালি জায়গার হাটের দর ধরা হয়েছে ১ কোটি ৯১ লাখ ৮২ হাজার ২০১ টাকা। রহমতগঞ্জ ক্লাবের খালি জায়গার হাটের জন্য সিটি করপোরেশন নির্ধারণ করেছে ৭ কোটি ৮২ হাজার ৪৫১ টাকা।
এ ছাড়া আমুলিয়া মডেল টাউনের খালি জায়গায় হাটের দর ৫৯ লাখ ৬২ হাজার ১০০ টাকা এবং শ্যামপুর-কদমতলী ট্রাকস্ট্যান্ড এলাকার খালি জায়গার জন্য দর নির্ধারণ করা হয়েছে ৬৬ লাখ ৪৬ হাজার ২৫০ টাকা। শিকদার মেডিকেল কলেজসংলগ্ন আমিন মোহাম্মদ গ্রুপের খালি জায়গায় অস্থায়ী হাটের দর ধরা হয়েছে ৪ কোটি ৪১ লাখ ৮৪ হাজার ৬০০ টাকা। কাজলা ব্রিজ থেকে মাতুয়াইল মৃধাবাড়ি পানির পাম্পসংলগ্ন রাস্তার অব্যবহৃত জায়গায় হাটের দর নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ কোটি ৮৩ লাখ ৯৮ হাজার ৬০০ টাকা।
সাদেক হোসেন খোকা মাঠের দক্ষিণ পাশের খালি জায়গায় হাটের দর রাখা হয়েছে ২ কোটি ৯৪ লাখ ৫৬ হাজার ৬০০ টাকা। মোস্তমাঝি মোড়সংলগ্ন অস্থায়ী হাটের দর নির্ধারণ করা হয়েছে ৭৩ লাখ ৬৪ হাজার ৬০০ টাকা। ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাবের দক্ষিণ-পূর্ব পাশের খালি জায়গার হাটের দর ধরা হয়েছে ১ কোটি ৪৭ লাখ ২৮ হাজার ৬০০ টাকা। এ ছাড়া গোলাপবাগ আউটার স্টাফ কোয়ার্টারের উত্তর পাশের খালি জায়গায় অস্থায়ী কোরবানির পশুর হাটের দর নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৬ লাখ ৭৪ হাজার ৪০১ টাকা।
ডিএসসিসি সূত্রে জানা গেছে, গত ২৭ এপ্রিল সংস্থাটির সম্পত্তি বিভাগের সামনে সরকারি দল বিএনপি ও জামায়াত নেতাদের মধ্যে হাতাহাতি হয়। যাত্রাবাড়ীর কাজলা, পোস্তগোলা শ্মশানঘাট ও শ্যামপুর-কদমতলী ট্রাকস্ট্যান্ডসংলগ্ন পশুর হাটের দরপত্র সংগ্রহকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে এই উত্তেজনা তৈরি হয়। শ্যামপুর থানা জামায়াতের আমির মোহাম্মদ মহিউদ্দিনসহ দলীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে শ্যামপুর থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক কাজী মাহবুব মওলা হিমেল ও যাত্রাবাড়ী থানা বিএনপির নেতা শ্যামলের অনুসারী সমর্থকদের মধ্যে হাতাহাতি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা (উপসচিব) মোহাম্মদ মোবাশ্বের হাসান খবরের কাগজকে বলেন, পশুর হাটগুলো নিয়ে ব্যাপক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে এবং দরদাতাদের মধ্যে ভালো প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এতে উল্লেখযোগ্য রাজস্ব আদায়ের সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি জানান, যেখানে প্রতিযোগিতা, সেখানে উত্তেজনা থাকে। তবে কোনো হাটে সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা নেই। কোনো কারণে কোনো হাটে ইজারা না মিললে সেগুলো সিটি করপোরেশন নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় (খাস আদায়) পরিচালনা করবে। এ বিষয়ে সব ধরনের প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।