আসন্ন ঈদুল আজহায় কোরবানির পশুর চামড়ার ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিয়ে চরম আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে সরকারনির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কম দামে চামড়া কিনে একশ্রেণির অসাধু ট্যানারির মালিক ও আড়তদার ‘চামড়া দস্যুতা’ বা নৈরাজ্য চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
- সিন্ডিকেটের কারণে কোরবানির চামড়ার ন্যায্যমূল্য মিলছে না, ফলে মাদরাসা ও এতিমখানাগুলো বড় ক্ষতির মুখে পড়ছে।
- ট্যানারি মালিকরা আর্থিক সংকট ও আন্তর্জাতিক মন্দার কথা বললেও, অভিযোগ রয়েছে তারা কম দামে চামড়া কিনে বেশি দামে বিক্রি করছেন।
- চামড়া নষ্ট হওয়া ও দামের কারসাজি ঠেকাতে সরকার বিনামূল্যে লবণ, সংরক্ষণ প্রশিক্ষণ ও বিশেষ ব্যাংকঋণের ব্যবস্থা করেছে।
অন্যদিকে ট্যানারির মালিকরা আর্থিক সংকট ও আন্তর্জাতিক মন্দার অজুহাত দিচ্ছেন। এই সিন্ডিকেটের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মাদরাসা ও এতিমখানাগুলো, যারা এই চামড়া বিক্রির অর্থ দিয়ে দরিদ্র শিক্ষার্থীদের ভরণপোষণ করে। এবার চামড়া নষ্ট হওয়া রোধে এবং সিন্ডিকেট ভাঙতে সরকার বিনামূল্যে লবণ সরবরাহ ও বিশেষ ব্যাংকঋণের মতো আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে।
আমাদের দেশে সাধারণত কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রি করা অর্থ মাদরাসার দরিদ্র এতিম শিক্ষার্থীদের পেছনে ব্যয় করা হয়। মাদ্রাসার লোকজন পাড়া-মহল্লায় ঘুরে চামড়া সংগ্রহ করে আততদার বা পেশাদার চামড়া সংগ্রহকারীদের কাছে বিক্রি করে থাকেন। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে কোরবানির চামড়ার ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না সংশ্লিষ্টরা। বিভিন্ন অজুহাতে সরকারের বেঁধে দেওয়া দামের চেয়ে কম দামে চামড়া কেনেন ট্যানারির মালিক ও আড়তদাররা। অনেক সময় দাম এত কম বলে যে চামড়া সংগ্রহকারীদের চামড়া পরিবহন খরচও ওঠে না। ফলে তারা ক্ষোভে-হতাশায় পশুর চামড়া ফেলে দেন অথবা নষ্ট করে ফেলে বা মাটির নিচে চাপা দেন।
খুলনার খাদেমুল উলুম মাদরাসার শিক্ষক হাফেজ মওলানা মো. রুম্মান খবরের কাগজকে বলেন, ‘প্রতিবছর কোরবানির সময় মাদরাসার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা ঈদের ছুটি ভোগ না করে পাড়া-মহল্লায় কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ করেন। এ কারণে খুব কম মানুষ আছেন যারা দামাদামি করেন। চামড়া বিক্রি করে আমাদের মাদরাসার এতিম ২০০ থেকে ২৫০ জন ছাত্রের পেছনে ব্যয় করা হয়। পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে আমরা চামড়ার দাম পাই না। বেশির ভাগ চামড়া নষ্ট করে ফেলি। অনেক চামড়া সরকারের দেওয়া দামের চেয়ে কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হই। অথচ এসব চামড়া কিনে ট্যানারির মালিকরা উচ্চমূল্যে বিক্রি করেন। এটিকে একধরনের ডাকাতি বা দস্যুতা বলব। এই নৈরাজ্য বন্ধ করার দাবি জানাই।’
এ অভিযোগ অস্বীকার করে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহিন আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, কোরবানির পশুর ৭৫ লাখ থেকে ৮০ লাখ পিস চামড়া কেনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। গতবার ৯০ লাখ পিস কেনা হয়েছিল। এবার কম চামড়া কিনতে হবে। কারণ আর্থিক সংকট। এবারে ট্যানারির মালিকদের ৮৫ শতাংশই আগের বারের নেওয়া ঋণ পরিশোধ করতে পারছে না। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারও চামড়া খাতের ব্যবসায়ে মন্দা চলছে।
শিল্প, বাণিজ্য এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির খবরের কাগজকে বলেন, ‘অতীতে বিভিন্ন সময়ে কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়া বিক্রি নিয়ে যে ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়, এবার তা যেন না হয় সে জন্য সরকার আগেভাগেই প্রস্তুতি নিয়েছে। আশা করি, সরকারের বেঁধে দেওয়া দামে পশুর চামড়া বিক্রি হবে। পশু কোরবানির পর কাঁচা চামড়া বেশি দিন রাখা যায় না। নষ্ট হয়ে যায়। এবারে সরকার বিনামূল্যে বিভিন্ন মাদরাসায়, এতিমখানায় লবণ সরবরাহ করেছে। এতে কাঁচা চামড়া বেশি সময় সংরক্ষণ করলেও নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা কম থাকবে। ফলে সিন্ডিকেট করে যে চামড়ার দাম কমিয়ে কেনা হয়, এবারে তা হবে না বলে মনে করছি।’
কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে শিল্প মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘প্রতিবছর কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রি ও সংরক্ষণে অব্যবস্থাপনা বা নৈরাজ্য একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকার কাঁচা চামড়ার দাম বেঁধে দিলেও মাঠপর্যায়ে সিন্ডিকেট, মৌসুমি ব্যবসায়ীদের অনাগ্রহ, চামড়া নষ্ট হওয়ার শঙ্কা এবং দাম না পাওয়ার কারণে এই নৈরাজ্য তৈরি হয়।’
অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা দেখেছি কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রি নিয়ে একধরনের নৈরাজ্য চলে। কিছু অসাধু ট্যানারির মালিক ও আড়তদার বিভিন্ন অজুহাতে পশুর কাঁচা চামড়া কম দামে কিনে থাকেন। চামড়া সংগ্রহকারীরা এসব ব্যক্তির কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন। সরকার যদি পশুর চামড়া সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে পারে তবে চামড়া নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় কম দামে বিক্রি করা লাগবে না। সরকারের উচিত এই সিন্ডকেট ভেঙে দিতে ব্যবস্থা নেওয়া।’
বিরাজমান নৈরাজ্যের মূল কারণ হিসেবে শিল্প মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে, সিন্ডিকেটকে দায়ি করে বলেছে, সরকার প্রতি বর্গফুট চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দিলেও মাঠপর্যায়ে আড়তদার ও ট্যানারির মালিকরা তা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মানেন না। ফলে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা ও চামড়া সংগ্রহকারী বিভিন্ন মাদরাসা, এতিমখানা থেকে কম দামে চামড়া কিনতে বাধ্য হন। যিনি কোরবানি দেন তিনিও চামড়ার ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পর্যাপ্ত ও সঠিক সংরক্ষণের অভাবে প্রতিবছর ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ কোরবানির পশুর চামড়া নষ্ট হয়ে যায়। ঈদের দিন গরম ও বৃষ্টির কারণে দ্রুত লবণ না দিলে চামড়ার মান কমে যায়। ছাগলের চামড়ার উপযুক্ত ক্রেতা থাকেন না। অনেক সময় পানির দামে বা বিনামূল্যেও ছাগলের চামড়া বিক্রি করতে হয়।
প্রতিবদনে বলা হয়েছে, চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকার প্রতিবছরের মতো এবারেও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কোরবানির পশুর চামড়ার দাম বেঁধে দিয়েছে। চামড়া যেন নষ্ট না হয়, সে জন্য সরকার মসজিদ, মাদরাসা ও এতিমখানাগুলোতে বিনামূল্যে লবণ সরবরাহ ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছে। চামড়া ব্যবসায়ীদের আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে ব্যাংকঋণের বিশেষ সুবিধা এবং সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।