দুয়ারে কড়া নাড়ছে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির নবম আসর। হাইব্রিড মডেলে পাকিস্তান ও দুবাইয়ে ১৯ ফেব্রুয়ারি শুরু হবে ৮ দলের এই আসর। বাংলাদেশ খেলবে ‘এ’ গ্রুপে পাকিস্তান, ভারত ও নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে। অপর গ্রুপে খেলবে অস্ট্রেলিয়া, আফগানিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ইংল্যান্ড। দুই গ্রুপের সেরা ২ দল খেলবে সেমিফাইনালে। ৯ মার্চ অনুষ্ঠিত হবে ফাইনাল।
চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির বর্তমান চ্যাম্পিয়ন পাকিস্তান। সর্বশেষ ২০১৭ সালে ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত এই আসরে তারা প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। বাংলাদেশও চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ইতিহাসে তাদের সেরা সাফল্য দেখিয়েছিল সেমিফাইনালে উঠে। সেমিতে ভারতের কাছে ৯ উইকেটে হেরে থেমে গিয়েছিল বাংলাদেশের সেই অগ্রযাত্রা।
৭ বছর পর আবার যখন এই আসর শুরু হতে যাচ্ছে, তখন বাংলাদেশের অবস্থা খুব একটা ভালো না। কারণ একসময় তিন ফরম্যাটের ক্রিকেটের মাঝে একমাত্র ওয়ানডেতেই বাংলাদেশ তুলনামূলক ভালো ছিল। কিন্তু এখন আর সে সুদিন নেই। ওয়ানডেতেই বাংলাদেশের অবস্থা ভালো না। সর্বশেষ ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে তারা তিন ম্যাচের সিরিজে হোয়াইটওয়াশ হয়েছিল। এরপর তারা আর কোনো ওয়ানডে ম্যাচ খেলেনি। তাই কোনো রকম ওয়ানডে ম্যাচের প্রস্তুতি ছাড়াই তারা খেলতে যাবে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি।
তাই বলে বাংলাদেশ দলের ক্রিকেটাররা যে ম্যাচ খেলায় ছিলেন না, তা কিন্তু নয়। বিপিএল খেলেই তারা প্রস্তুতি সেরে নিয়েছেন। ১৫ সদস্যের স্কোয়াডে বিপিএলের সাতটি দলের হয়ে সবাই খেলেছেন। সবচেয়ে বেশি ৫ জন ছিলেন বরিশালের। তারা হলেন নাজমুল হোসেন শান্ত, মুশফিকুর রহিম, মাহমুদউল্লাহ, তাওহীদ হৃদয় ও রিশাদ হোসেন। খুলনা, ঢাকা ও সিলেটের হয়ে খেলেছেন দুজন করে। তারা হলেন মেহেদী হাসান মিরাজ ও নাসুম আহমেদ ঢাকার, নাহিদ রানা ও সৌম্য সরকার রংপুরের ও জাকের আলী অনিক ও তানজিদ হাসান তামিম সিলেটের। এ ছাড়া চিটাগং থেকে পারভেজ হোসেন ইমন ও রাজশাহী থেকে তাসকিন আহমেদ খেলেছেন।
একমাত্র অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত ছাড়া বাকি সবাই-ই ছিলেন নিয়মিত খেলার মাঝে। কিন্তু সেখানেও তারা নিজেদের নামের প্রতি সুবিচার করতে পারেননি, বিশেষ করে ব্যাটাররা। দুই-তিনজন ব্যাটারের কথা বাদ দিলে বাকি সবাই অনেকটা রান খরায় ভুগেছেন। তবে বোলারদের আবার সেই কাতারে ফেলা যাবে না। তারা ব্যাটারদের তুলনায় মোটামুটি সফল ছিলেন।
একজন অধিনায়কের কাছে দল যেমন সঠিক নেতৃত্ব প্রত্যাশা করে থাকে, তেমনি তার কাছ থেকে পারফর্মও চায়। এখানে অধিনায়ক ব্যর্থ হলে তার প্রভাব দলের মাঝে খুবই বাজেভাবে পড়ে। এবারের চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে বাংলাদেশ দল অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তকে নিয়ে বেশ ভুগার শঙ্কা আছে। বরিশালের হয়ে নাম লেখানো নাজমুল শান্ত এবার খেলেছেন চ্যাম্পিয়ন ফরচুন বরিশালের হয়ে। কিন্তু তিনি সেরা একাদশেই জায়গা করে নিতে পারেননি। মাত্র ৫টি ম্যাচ খেলে রান করেন মাত্র ৫৬।
অভিজ্ঞ দুই ক্রিকেটার মুশফিকুর রহিম ও মাহমুদউল্লাহকে রানের জন্য সংগ্রাম করতে হয়েছে। মুশফিক ১৪ ম্যাচে ১৮৪ রান ও মাহমুদউল্লাহ ২০৬ রান করেন। মাহমুদউল্লাহর একটি হাফ সেঞ্চুরির ইনিংস থাকলেও মুশফিকের কোনো হাফ সেঞ্চুরি ছিল না। অবশ্য ওয়ানডেতে দলীয় ব্যর্থতার মাঝেও মাহমুদউল্লাহ ছিলেন সফল। সর্বশেষ চার ম্যাচেই আছে তার হাফ সেঞ্চুরি। একই দলের হয়ে খেলা অপর ক্রিকেটার তাওহীদ হৃদয় শুরুতে ছিলেন একেবারে ব্যর্থ। একটু বিলম্বে তিনি কিছুটা রানের দেখা পান। ৮২ রানের অপরাজিত একটি হাফ সেঞ্চুরিসহ ১৪ ম্যাচে তিনি রান করেন ৩১২।
তাওহীদের মতোই শুরুতে রানের দেখা পাননি রানার্সআপ চিটাগং কিংসের ওপেনার পারভেজ হোসেন ইমন। আসরের শেষের দিকে তার ব্যাটে রানের দেখা মিলে। দুটি হাফ সেঞ্চুরি ও সে সময় পাওয়া। ১৩ ম্যাচ তার রান ৩৩৮। পয়েন্ট টেবিলে সবার তলানিতে থাকা সিলেট স্ট্রাইকার্সের হয়ে খেলা জাকের আলীও নামের প্রতি সুবিচার করতে পারেননি। ১২ ম্যাচ খেলে কোনো হাফ সেঞ্চুরি করতে পারেননি। রান করেন ২৪৭।
সেই তুলনায় মেহেদী হাসান মিরাজ অনেক ভালো করেন। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট জাতীয় দলে যেখানে তার স্থান পাওয়াই কঠিন, সেখানে তিনি ১৪ ম্যাচ খেলে দুই হাফ সেঞ্চরিতে রান করেন ৩৫৫। জাতীয় দলের ব্যাটারাদের মাঝে তার রান দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। সবার ওপরে আছেন এবারের আসরের সবচেয়ে আলোচিত দল ঢাকা ক্যাপিটালসের হয়ে খেলা ওপেনার তানজিদ হাসান তামিম। ১২ ম্যাচে এক সেঞ্চুরি ও চার হাফ সেঞ্চুরিতে তার ব্যাট থেকে আসে ৪৮৫ রান। সর্বোচ্চ ইনিংস ছিল ১০৮ রানের।
জাতীয় দলের ব্যাটারদের মাঝে একমাত্র তার ও মিরাজের ব্যাটেই ছিল আস্থার চিহ্ন। আস্থা রাখা যেতে পারে সৌম্য সরকারের ওপরও। ইনজুরির কারণে প্রথম দিকে খেলতে না পারলেও শেষের দিকে চার ম্যাচ খেলে ১০৫ রান করেন। যেখানে ছিল ৭৫ রানের একটি ইনিংসও। ব্যাটারদের মতো অবস্থা আবার বোলারদের নয়। তাসকিন তো ছিলেন সেরা ফর্মে। ঢাকা ক্যাপিটালসের হয়ে খেলে এক ম্যাচে ১৯ রানে ৭ উইকেট নেয়া ছাড়াও আসরের সবচেয়ে ২৫ উইকেটের মালিক তিনি।
সিলেট স্ট্রাইকার্সের হয়ে ৯ ম্যাচে ১৬ উইকেট নিয়ে তানজিম হাসান সাকিবও নিজের প্রস্তুতিটা ভালো সেরে নিয়েছেন। এরপর ১৩টি করে উইকেট নিয়েছেন মোস্তাফিজুর রহমান, মেহেদী হাসান মিরাজ ও নাসুম আহমেদ। মোস্তাফিজ আবার নামের প্রতি সুবিচার করতে পারেননি। মিরাজের অলরাউন্ড পারফরম্যান্স বাংলাদেশের জন্য আশার আলো। গতি দিয়ে নজর কাড়া নাহিদা রানাকে নির্বাচকরা শুধু টেস্টের জন্য বিবেচনা না করে সব ফরম্যাটেই যাচাই করে দেখছেন। নাসুম ছিলেন মন্দের ভালো। টি-টোয়েন্টিতে নাহিদ রানা বেশ ভালোভাবেই সেই পরীক্ষায় উতরে গেছেন ১২ ম্যাচে ১০ উইকেট নিয়ে। তবে হতাশ করেছেন রিশাদ হোসেন ১১ ম্যাচে মাত্র ৭ উইকেট নিয়ে।
একেত ওয়ানডে ক্রিকেটে বাংলাদেশ দলের সময় ভালো যাচ্ছে না, সেখানে আবার প্রস্তুতির জন্য খেলেনি কোনো ম্যাচ, তার ওপর ব্যাটারদের ব্যাটে নেই রান- সব মিলিয়ে এবারের আসর বাংলাদেশ দলের জন্য বেশ ভাবনার!