বিশ্বকাপের উত্তাপ ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে ফুটবল দুনিয়ায়। আর সেই আবহেই নিজের স্বপ্ন, হতাশা, সাহস আর ইংল্যান্ডের শিরোপা জয়ের আকাঙ্ক্ষার কথা বললেন হ্যারি কেইন। ইংল্যান্ড অধিনায়ক মনে করেন, বিশ্বকাপই একজন ফুটবলারের জীবনের সবচেয়ে বড় মঞ্চ। কাতারের হতাশা ভুলে এবার নতুন বিশ্বাস নিয়ে উত্তর আমেরিকার বিশ্বকাপের দিকে তাকিয়ে আছেন তিনি। পাশাপাশি জানিয়েছেন তরুণদের সাহসী ফুটবল খেলতে অনুপ্রাণিত করার কথাও।
ফিফার সঙ্গে দীর্ঘ আলাপে কেইন বলেছেন, ‘বিশ্বকাপই আমাদের জীবনের আসল লক্ষ্য। ছোটবেলা থেকেই আমরা এই মঞ্চের স্বপ্ন দেখি। এখানে এসে ভয় পেলে চলবে না। ভুল করার ভয়, ব্যর্থ হওয়ার ভয়; এসব জীবনেই থাকে। কিন্তু এই মুহূর্তগুলোর জন্যই তো আমরা প্রতিদিন অনুশীলন করি।’
২০২২ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে পেনাল্টি মিসের দুঃসহ স্মৃতি এখনো তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। ম্যাচের শেষ দিকে সমতায় ফেরার সুযোগ পেয়েও বল উড়িয়ে মেরেছিলেন ক্রসবারের ওপর দিয়ে। ইংল্যান্ড হেরেছিল ২-১ গোলে।
সেই মুহূর্ত নিয়ে কেইন বলেন, ‘এটা আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোর একটি ছিল। মানসিকভাবে খুব শক্ত থাকতে হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত মনে হয়েছে, ওই অভিজ্ঞতা আমাকে আরও ভালো খেলোয়াড় বানিয়েছে।’
বিশ্বকাপের পর থেকেই যেন আরও ভয়ংকর হয়ে উঠেছেন ইংল্যান্ডের এই স্ট্রাইকার। তিন মাস পরই ওয়েম্বলিতে ওয়েন রুনির গোলের রেকর্ড ভেঙে ইংল্যান্ডের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হন তিনি। এখন জাতীয় দলের হয়ে তার গোল সংখ্যা আরও বেড়েছে। ক্লাব ফুটবলেও দুর্দান্ত সময় কাটাচ্ছেন কেইন। বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে এই মৌসুমে ৫০টির বেশি গোল করেছেন তিনি।
বিশ্বকাপ নিয়ে নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে কেইন বলেন, ‘একজন পেশাদার ফুটবলারের জীবনে বিশ্বকাপই সর্বোচ্চ জায়গা। এটা আমার তৃতীয় বিশ্বকাপ হবে। কিন্তু উত্তেজনা কমেনি বরং আরও বেড়েছে। কারণ আপনি জানেন এই টুর্নামেন্ট কত বড়, কত বিশেষ।’
ইংল্যান্ড গত কয়েক বছরে বড় টুর্নামেন্টে খুব কাছ থেকে শিরোপা হারিয়েছে। ইউরোর দুটি ফাইনাল, বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল; সবই যেন অপূর্ণ স্বপ্ন। তবে এই হতাশাই নতুন প্রেরণা দিচ্ছে বলে মনে করেন কেইন, ‘এত কাছে গিয়ে ট্রফি না জিততে পারাটা খুব কষ্টের। আমরা জানি, ইংল্যান্ডের মানুষ কতটা অপেক্ষা করছে। যদি আমরা জিততে পারি, সেটা সবার জীবনের স্মৃতি হয়ে থাকবে।’
ইংল্যান্ডের সমর্থকদের প্রত্যাশা নিয়েও কথা বলেছেন তিনি, ‘মানুষ এখন আমাদের কাছ থেকে শিরোপা আশা করে। কারণ আমরা বারবার শেষ দিকে পৌঁছেছি। এই চাপটা থাকবেই। তবে এটাও বড় দলের অংশ।’
ফুটবলের বাইরে আমেরিকান ফুটবলের প্রতিও রয়েছে কেইনের বিশেষ টান। সেই ভালোবাসার শুরু কিংবদন্তি টম ব্র্যাডিকে দেখে, ‘আমি তখন ১৬-১৭ বছরের। টম ব্র্যাডির একটি প্রামাণ্যচিত্র দেখেছিলাম। ওর মানসিকতা আমাকে ভীষণ অনুপ্রাণিত করে। এরপর থেকেই আমেরিকান ফুটবল অনুসরণ করা শুরু করি।’
বিশ্বকাপে আমেরিকান ফুটবলের বিশাল স্টেডিয়ামে খেলতে মুখিয়ে আছেন কেইন। বিশেষ করে বোস্টনে খেলার অপেক্ষা তার কাছে অন্যরকম, ‘ওই স্টেডিয়ামগুলোতে খেলাটা অসাধারণ অভিজ্ঞতা হবে। আমি আগে কখনো যাইনি। তাই এটা আমার জন্য খুব বিশেষ।’ ভবিষ্যতে আমেরিকান ফুটবল খেলবেন কি না, এমন প্রশ্নে হাসতে হাসতেই উত্তর দেন তিনি, ‘হয়তো! হয়তো কিকার হিসেবে। তবে ওই খেলায় সফল হতেও প্রচুর পরিশ্রম লাগে। দেখা যাক ভবিষ্যতে কী হয়।’
ইংল্যান্ড দলের অধিনায়ক হিসেবে নিজেকে অনেক বদলে যাওয়া মানুষ মনে করেন কেইন, ‘অধিনায়ক হওয়া বিশাল সম্মানের। শুরুতে আমি অনেক তরুণ ছিলাম। এখন অভিজ্ঞতা বেড়েছে। আমি আগের চেয়ে অনেক বেশি শিখেছি।’ দলের ঐক্য ও পারস্পরিক সম্পর্ককে বিশ্বকাপের বড় শক্তি মনে করেন তিনি। কোচ টমাস টুখেলের প্রশংসাও করেছেন কেইন।
তিনি বলেন, ‘একসঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটানোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সম্পর্ক। আমরা সবাই একে অপরকে বুঝি। সবাই একই স্বপ্ন নিয়ে এগোচ্ছি।’ ১৯৬৬ সালের পর ইংল্যান্ড আর বিশ্বকাপ জিততে পারেনি। সেই ইতিহাস বদলানোর স্বপ্ন নিয়েই এবার মাঠে নামবে কেইনের দল। তার মতে, ‘ইংল্যান্ডের মানুষ অনেক দিন ধরে বিশ্বকাপের অপেক্ষায়। আমরাও চাই ইতিহাসের অংশ হতে। তবে সেখানে পৌঁছাতে হলে অনেক ত্যাগ, কঠোর পরিশ্রম আর লড়াই করতে হবে।’
চঞ্চল/অনিক/