পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট। এই উচ্চতা বহুদিন ধরেই মানুষের সাহস, সীমা অতিক্রম আর অসম্ভবকে জয় করার প্রতীক। প্রতিবছর শত শত মানুষ জীবন বাজি রেখে ছুটে যান সেই সাদা চূড়ার দিকে। কারও কাছে এটি স্বপ্নপূরণ, কারও কাছে আত্মজয়ের গল্প। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এভারেস্ট যেন আর শুধু রোমাঞ্চের প্রতীক নয়। ধীরে ধীরে তা পরিণত হচ্ছে এক বিপজ্জনক ভিড়ের পাহাড়ে।
চলতি মৌসুমে আবারও সেই ভয়াবহ বাস্তবতা সামনে এল। রেকর্ডসংখ্যক আরোহণের মধ্যেই প্রাণ হারিয়েছেন দুই ভারতীয় পর্বতারোহী। এর আগে আরও তিন নেপালির মৃত্যু হয়েছে। চলতি মাসের শুরুতে মারা যান যুক্তরাষ্ট্র এবং চেক রিপাবলিকের দুজন। সব মিলিয়ে এবারের এভারেস্ট মৌসুম যেন নতুন করে প্রশ্ন তুলছে- মানুষ কি এখন এভারেস্ট জয় করতে যাচ্ছে, নাকি এভারেস্টই মানুষকে হারিয়ে দিচ্ছে?
নিহত দুই ভারতীয় আরোহী সন্দ্বীপ আরে এবং অরুন কুমার তিওয়ারি চূড়ায় উঠতে পেরেছিলেন। অভিযান পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান পিওনার অ্যাডভেনচারের পরিচালক নিভেশ কার্কি নিহত দুই ভারতীয়কে শনাক্ত করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সন্দীপ আরে ২০ মে এবং অরুণ কুমার তিওয়ারি ২১ মে এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছেছিলেন। তবে ফেরার পথে উচ্চতাজনিত অসুস্থতায় আক্রান্ত হন তারা। কার্কি বলেন, ‘নিচে নামার সময় তারা অসুস্থ হয়ে পড়েন। এখন মরদেহ উদ্ধার করার উপায় বের করার চেষ্টা চলছে।’
বলাই যায়, সন্দ্বীপ ও অরুণের স্বপ্নপূরণের সেই মুহূর্ত হয়তো তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল। কিন্তু পর্বতারোহণের নির্মম সত্য হলো- চূড়ায় ওঠা নয়, নিরাপদে ফিরে আসাই আসল জয়। আর এখানেই এভারেস্টের ভয়াবহতা সবচেয়ে বেশি। পৃথিবীর ছাদে অক্সিজেন এতটাই কম যে, সামান্য ভুল কিংবা অতিরিক্ত অপেক্ষাও প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। আর সেই অপেক্ষার অন্যতম কারণ এখন ‘ভিড়’।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিগুলোতে দেখা গেছে, বরফের দেয়াল বেয়ে নির্দিষ্ট দড়িতে ঝুলে আছেন সারি সারি মানুষ। কেউ দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন, কেউ ধীরে ধীরে এক পা করে এগোচ্ছেন। ৮ হাজার মিটারের ওপরে, যেখানে শরীরের প্রতিটি নিশ্বাসই যুদ্ধ, সেখানে এই দীর্ঘ লাইন যেন মৃত্যুর সঙ্গে ধৈর্যের প্রতিযোগিতা। এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন খোদ এভারেস্টের রাজা নামে পরিচিত কামি রিতা শেরপা। চলতি মাসেই ৩২তম বারের মতো এভারেস্ট জয় করে ইতিহাস গড়েছেন তিনি। গত শুক্রবার কিংবদন্তিই এবার বলছেন, ‘এবারের অভিযান একটু বেশি ভিড়পূর্ণ মনে হয়েছে।’
‘এভারেস্ট ম্যান’ নামে পরিচিত শেরপা আরও বলেন, ‘সরকারের বিষয়টি কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা উচিত। শুধু দক্ষ ও মানসম্পন্ন আরোহীদের অনুমতি দেওয়া উচিত। একটা সীমা থাকা দরকার।’ তার কথার ভেতর লুকিয়ে আছে বড় এক সতর্কবার্তা। নেপাল প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক আরোহণের অনুমতি দেয়। এবার বিদেশিদের জন্য দেওয়া হয়েছে রেকর্ড ৪৯২টি পারমিট। কারণ এভারেস্ট শুধু পর্বত নয়, এটি নেপালের অর্থনীতিরও বড় উৎস। গাইড, বহনকারী, ট্রাভেল কোম্পানি, সরঞ্জাম ব্যবসা– হাজারও মানুষের জীবিকা জড়িয়ে আছে এই অভিযানের সঙ্গে।
পর্যটন কর্মকর্তাদের মতে, বৃহস্পতিবার নেপালি দিক থেকে রেকর্ডসংখ্যক পর্বতারোহী ৮,৮৪৯ মিটার (২৯,০৩২ ফুট) উঁচু হিমালয়ের চূড়ায় পৌঁছেছেন। চূড়ান্ত নিশ্চিতকরণের অপেক্ষায় থাকা প্রাথমিক মোট সংখ্যাটি ২৭৫ জন বলে জানানো হয়েছে। বর্তমানে এভারেস্টে ওঠার তিব্বত দিকের উত্তর রুটটি বন্ধ রেখেছে চীন। ফলে অধিকাংশ আরোহীই নেপালের দক্ষিণ রুট ব্যবহার করছেন, যা ভিড় আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকডর্সের তথ্যমতে, একদিনে সর্বোচ্চ ৩৫৪ জন এভারেস্ট জয় করেছিলেন ২০১৯ সালের মে মাসে। নেপালি পর্যটন কর্মকর্তারা বলেছেন, আরোহণগুলো যাচাই করার পর চূড়ান্ত সংখ্যা গণনা করা হবে, যার জন্য আরোহীর অভিযাত্রী সংস্থা এবং গাইডদের কাছ থেকে ছবি ও বিবৃতি প্রয়োজন। গত শুক্রবার সফল আরোহীদের মধ্যে ছিলেন ব্রিটিশ গাইড কেন্টন কুল, যিনি ২০তম বারের মতো চূড়ায় পৌঁছেছেন। তিনি অ-নেপালি হিসেবে বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গে সর্বাধিকবার আরোহণের নিজের রেকর্ডটি আরও বাড়িয়ে নিয়েছেন।
চলতি মৌসুমে বিদেশি আরোহীদের জন্য রেকর্ড ৪৯২টি অনুমতিপত্র দিয়েছে নেপাল। পর্বতের পাদদেশে তৈরি হয়েছে বিশাল তাঁবুর নগরী। অভিযাত্রী ও গাইড মিলিয়ে এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া এই মৌসুমে এখন পর্যন্ত প্রায় ৬০০ জন এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছেছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকার সময় খুব সীমিত। সেই ছোট্ট ‘ক্লাইম্বিং উইন্ডো’তেই শত শত আরোহী একসঙ্গে চূড়ায় ওঠার চেষ্টা করেন। ফলে তৈরি হয় ভয়ংকর জট। আর সেই জটই কখনো কখনো প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। এর আগে ২০১৯ সালে এভারেস্টের ‘ট্রাফিক জ্যাম’-এর ছবি বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তুলেছিল। এবারও একই আশঙ্কা ফিরে এসেছে।
তবু মানুষের স্বপ্ন থেমে নেই। এখনো শত শত অভিযাত্রী সেই চূড়ার দিকে তাকিয়ে আছেন। কিন্তু বাস্তবতাও কঠিন- পৃথিবীর ছাদে জায়গা সবার জন্য নয়। আর সেই কারণেই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এভারেস্ট কি কেবল সাহসীদের পরীক্ষার জায়গা থাকবে, নাকি অতিরিক্ত বাণিজ্যিকতার চাপে একদিন তা পরিণত হবে মৃত্যুর করিডরে?
অনিক/