কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির প্রতিযোগিতায় নতুন এক মাত্রা যোগ করেছে চীনা প্রতিষ্ঠান ডিপসিক। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটির এআই চ্যাটবট উন্মোচনের পর যুক্তরাষ্ট্রের টেক ইন্ডাস্ট্রিতে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ডিপসিকের এআই চ্যাটবটের কার্যক্ষমতা দেখে এ খাত সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে, যার প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রের টেক-শেয়ারবাজার এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি মূলধন হারিয়েছে। একে অনেকে এআই প্রযুক্তিতে ‘স্পুটনিক মোমেন্ট’- এর সঙ্গে তুলনা করছেন।
ডিপসিকের মডেল উন্মোচনের পর গত সোমবার প্রযুক্তিনির্ভর শেয়ার বাজার ন্যাসড্যাকের সূচক ৩ দশমিক ১ শতাংশ কমেছে। এআই মডেল তৈরিতে ব্যবহৃত কম্পিউটারের চিপের শীর্ষস্থানীয় প্রস্তুতকারক এনভিডিয়ার ১৭ শতাংশ পর্যন্ত হারিয়েছে, যা মার্কিন শেয়ারবাজারের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় দর পতন। এতে প্রতিষ্ঠানটির বাজারমূল্য প্রায় ৬০০ বিলিয়ন ডলার কমে গেছে। এমনকি টেক জায়ান্ট অ্যাপলও তাদের শীর্ষস্থান হারিয়েছে।
এদিকে গুগলের মূল কোম্পানি অ্যালফাবেট ১০০ বিলিয়ন ডলার ও মাইক্রোসফট ৭ বিলিয়ন ডলার হারিয়েছে। ওয়াল স্ট্রিটের দর পতনের প্রভাবে মঙ্গলবার জাপানি এআই খাত সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম বড় ধরনের ধসের মুখে পড়েছে। অ্যাডভান্টেজের শেয়ার মূল্য ৯ শতাংশের বেশি কমেছে। সফটব্যাংক ৫ শতাংশের বেশি কমেছে।
ডিপসিক এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের অ্যাপ স্টোরের শীর্ষে উঠে এসেছে, এমনকি ওপেন এআইয়ের চ্যাটবট চ্যাটজিপিটিকেও ছাড়িয়ে গেছে।
এদিকে গত সোমবার সাইবার হামলার শিকার হয়েছে ডিপসিক। এ কারণে রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে ডিপসিকে।
ডিপসিকের ‘আর১’ এআই মডেল তুলনামূলক কম শক্তিশালী চিপ ব্যবহার করেও উচ্চমানের পারফরম্যান্স দেখাতে সক্ষম হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, তাদের এআই মডেল তৈরিতে খরচ হয়েছে মাত্র ৫ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলার। এর বিপরীতে পশ্চিমা দেশগুলোর এআই মডেল তৈরিতে এই খরচ কয়েক শ মিলিয়ন থেকে এক বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হয়ে থাকে।
ডিপসিক দাবি করেছে, তাদের এআই মডেল তৈরি করতে প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে কম চিপ ব্যবহার করা হয়েছে। এর ফলে উৎপাদন খরচ কমেছে। ডিপসিকের নভেম্বরের গবেষণাপত্র অনুসারে, এনভিডিয়ার তৈরি কম সক্ষমতার ‘এইচ৮০০’ চিপ ব্যবহার করে নিজস্ব অ্যালগরিদম তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে এনভিডিয়ার সবচেয়ে উন্নত চিপ ‘এইচ১০০’ চীনে রপ্তানি হয় না। এনভিডিয়া চীনের বাজারের জন্য কম শক্তিশালী এইচ৮০০ চিপ তৈরি করেছে, তবে সেটিও পরে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে চীনা বাজারে রপ্তানি বন্ধ করা হয়েছে।
ডিপসিকের সহ-প্রতিষ্ঠাতা লিয়াং ওয়েনফেং জানিয়েছেন, এআই প্রযুক্তি সবার জন্য সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী হওয়া উচিত। তার দাবি, ডিপসিকের প্রযুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের উন্নত এআই মডেলগুলোর কাছাকাছি বা কিছু ক্ষেত্রে এগিয়েও রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ডিপসিকের উত্থানকে এআই খাতে আমেরিকার জন্য একটি ‘সতর্ক সংকেত’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ‘চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো এআই খাতে দ্রুত অগ্রগতি করছে। আমাদের এই প্রতিযোগিতায় জয়ী হতে আরও মনোযোগী হতে হবে।’
এদিকে ওপেনএআইয়ের সিইও স্যাম অল্টম্যান ডিপসিকের এআই মডেলের প্রশংসা করে এটিকে একটি চমকপ্রদ উদ্ভাবন হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
মার্কিন ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট মার্ক অ্যান্ড্রেসেন ডিপসিকের আর১ মডেলের আত্মপ্রকাশকে মার্কিন-সোভিয়েত মহাকাশ প্রতিযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত ‘স্পুটনিক মোমেন্ট’- এর সঙ্গে তুলনা করেছেন।
ডিপসিক দাবি করেছে, তাদের আর১ মডেল ওপেনএআইয়ের ‘ও১-মিনি’ এআই মডেলকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ছাড়িয়ে গেছে। আর্টিফিশিয়াল অ্যানালাইসিসের গবেষণা বলছে, এটি গুগল, মেটা ও অ্যানথ্রপিকের তৈরি এআই মডেলের চেয়েও ভালো।
ডিপসিকের প্রতিষ্ঠাতা লিয়াং ওয়েনফেং এআই মডেল তৈরি করার জন্য ২০২১ সাল থেকে এনভিডিয়া চিপ কিনছিলেন। ২০২৩ সালে তিনি ডিপসিক প্রতিষ্ঠা করেন। কোম্পানিটি শুধু গবেষণার ওপর মনোযোগ দিয়েছে। ডিপসিক এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট ও এর কোড বিনামূল্যে ডাউনলোড করা যায়। ওপেনএআইয়ের ও১ এর চেয়ে ডিপসিকের এআই মডেল পরিচালনা করাও সস্তা।
লিয়াং ওয়েনফেং এক সাক্ষাৎকারে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনা এআইয়ের মধ্যে ব্যবধান মাত্র এক থেকে দুই বছরের।
ডিপসিকের উন্নত এআই মডেলের আত্মপ্রকাশ এআই অবকাঠামোতে বিশাল বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা ও এআই-এ মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ভূমিকা নিয়ে সন্দেহ তৈরি করেছে।
বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারীরা এখন এআই খাতে উচ্চ খরচ এবং তার সঠিক ব্যবহার নিয়ে নতুন করে ভাবছেন। মার্কিন বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাকস এআই খাতে খরচ নিয়ে গত বছর উদ্বেগ প্রকাশ করে একটি নোট প্রকাশ করেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিপসিকের মতো প্রতিষ্ঠান এআই প্রযুক্তিকে আরও উদ্ভাবনী ও সাশ্রয়ী করতে সক্ষম। তবে এটি মার্কিন এআই শিল্পের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি এআই প্রযুক্তির গবেষণায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে। যুক্তরাজ্যের অ্যালান টুরিং ইনস্টিটিউটের পরিচালক ড. অ্যান্ড্রু ডানকান বলেছেন, ‘ডিপসিক দেখিয়েছে, সীমিত সম্পদ দিয়েও দুর্দান্ত কিছু তৈরি করা সম্ভব।’
ডিপসিকের সাফল্য বিশ্বকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে, বড় বাজেট নয়, বরং সৃজনশীলতা ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেও এআই খাতে সফল হওয়া সম্ভব। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান