প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের এক অতুলনীয় উদাহরণ চট্টগ্রামের ফুলতলী সমুদ্রসৈকত। সমুদ্রের কলকল ধ্বনি আর বাতাসের স্নিগ্ধতায় মন কেড়ে নেয় এ পর্যটনকেন্দ্র। পড়ন্ত বিকেলে গোধূলির ছোঁয়ায় বিমোহিত হয় প্রতিটি পর্যটক। সমুদ্রসৈকত থেকে সূর্যাস্ত দেখা অনেক আনন্দদায়ক। আবহাওয়া যেমনই হোক পর্যটকদের ভিড় সব সময় দেখা যায় ফুলতলী সমুদ্রসৈকতে। এই মন জুড়ানো এই পর্যটনকেন্দ্র সম্পর্কে বিস্তারিত জানাচ্ছি আপনাদের।
ফুলতলীর পটভূমি
ফুলতলী সমুদ্রসৈকত এই নামকরণ ছিল স্থানীয় পূর্বপুরুষদের। যা সংক্ষেপে ফুলতলী হিসেবেই পরিচিত। এটি চট্টগ্রাম জেলার আনোয়ারা থানার ৩ নম্বর রায়পুর ইউনিয়ন উত্তর পরুয়া পাড়া গ্রামের পশ্চিমে বঙ্গোপসাগরের পূর্বতীরে অবস্থিত। এক যুগ আগে ও বর্তমান ফুলতলীর মধ্যে রয়েছে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। কেউ স্বপ্নেও ভাবেনি যে ঘন ঝোপঝাড় আর নির্জনতা কেটে ফুলতলী হয়ে উঠবে পর্যটনকেন্দ্র। ২০১৭ সালে ঘূর্ণিঝড় মোরার প্রভাবে ক্রিস্টাল গোল্ড নামে একটি বিদেশি জাহাজ আটকে পড়ে আনোয়ারা পারকি সমুদ্রসৈকতে। যার ফলে আশপাশে জেগে ওঠে বিশাল চর। জাহাজটি পর্যটকদের জন্য দর্শনীয় হলেও ক্ষতি হয়েছে পার্শ্ববর্তী ফুলতলী সমুদ্রসৈকতের। জাহাজটির কারণে জোয়ারভাটার স্রোত পরিবর্তন হয়ে আঘাত হানে উত্তর পরুয়া পাড়া গ্রামের বেড়িবাঁধে। বাতিঘর রাস্তা থেকে জেলেঘাট পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় চর থেকে বালু সরে যায়। স্রোতের ধাক্কায় ভেঙে যায় বেড়িবাঁধ। পরবর্তী সময়ে তৎকালীন সরকার কর্তৃক বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতায় বেড়িবাঁধটি সংস্কার করা হয়। সংস্কারের চার বছর পর স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি মো. সালেহ দখলীয় খাস জায়গায় একটি মনোমুগ্ধকর ছাউনি তৈরি করে। যেটি তৈরি করা হয়েছিল লাল টিনশেড, চারদিকে কাঠের রেলিং এবং রঙিন বাতি দিয়ে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এটি ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। কৌতূহল জাগে নেটিজেনদের মনে। স্থানীয় পর্যটক থেকে শুরু করে বিভিন্ন জেলা থেকে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড় শুরু হয় ফুলতলী সমুদ্রসৈকতে। পর্যটকদের চাহিদা লক্ষ্য করে নির্মিত হয় রাজকুটির নামে একটি রেস্টুরেন্ট। যার নির্মাণশৈলী সবাইকে মুগ্ধ করে। স্থানীয়রা অনুপ্রাণিত হয়ে দিয়েছেন কফি শপ ও টি স্টল। দিন দিন পর্যটকদের ভিড় বেড়ে চলছে ফুলতলীতে। যার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে।
মন ভোলানো দৃশ্য
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ফুলতলীর দৃশ্যেরও পরিবর্তন হয়। সকালবেলায় পর্যটকের সংখ্যা থাকে খুব কম। কোলাহলমুক্ত পরিবেশে টি স্টল থেকে গরম গরম চা খাওয়া সমুদ্র দেখে দেখে। বিকেল ৩টা থেকে শুরু হয় পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড়। সমুদ্রে ভাটা পড়লে সবাই নেমে যায় সৈকতে। অনেকেই খেলে ফুটবল আবার অনেকেই ব্যস্ত থাকে সেলফি ফটোশুট নিয়ে। খালি পায়ে হেঁটে বেড়ায় ভেজা বালুতে। অনেকে দৌড়ে ঝাঁপিয়ে গোসল করে সমুদ্রে। সমুদ্রসৈকত থেকে সূর্যের বাড়ি ফেরা দেখে সবাই। সন্ধ্যা হলে সবাই উঠে আসে রাস্তায়। পাসের টি স্টল থেকে গরম গরম নাশতা নিয়ে জমে উঠে গানের আড্ডা। হিমেল বাতাসে জুড়ে যায় সবার মন। রাতে সমুদ্র দেখার অনুভূতি পায় পর্যটকরা। স্রোতের আওয়াজ পর্যটকদের সারা দিনের ক্লান্তি মুছে দেয়।
খাওয়া-দাওয়া
চট্টগ্রামের ফুলতলী সমুদ্রসৈকত ভ্রমণ মানেই শুধু নীল জলরাশি আর ঢেউয়ের শব্দ নয়, সঙ্গে রয়েছে মুখরোচক খাবারের আকর্ষণ। সমুদ্র দেখার পাশাপাশি কোথায় কী খাবেন- এই প্রশ্ন অনেক পর্যটকের মনেই আসে। ফুলতলী এলাকায় খাবারের ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে সহজলভ্য এবং বৈচিত্র্যময়। সৈকতের আশপাশে সারি সারি ছোট হোটেল ও অস্থায়ী খাবারের দোকান রয়েছে, যেখানে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের ভিড় লেগেই থাকে। এখানে সবচেয়ে জনপ্রিয় খাবার হলো তাজা সামুদ্রিক মাছ ও চিংড়ি দিয়ে তৈরি ভাজি, ভুনা কিংবা ঝাল ঝোল। কোরাল, লইট্টা, পোয়া মাছের পদ বেশ সুস্বাদু এবং দামও তুলনামূলক সাশ্রয়ী।
হালকা খাবার হিসেবে ভাজা চানাচুর, ফুচকা, চটপটি, ঝালমুড়ি কিংবা ভুট্টা খুব সহজেই পাওয়া যায়। সন্ধ্যার দিকে এসব খাবারের কদর আরও বেড়ে যায়। যারা একটু পরিপাটি পরিবেশে খেতে চান, তারা কাছাকাছি স্থানীয় রেস্টুরেন্ট বা গেস্টহাউস-সংলগ্ন খাবার হোটেল বেছে নিতে পারেন। সেখানে ভাত, মাছ, মাংস, সবজি- পূর্ণাঙ্গ বাঙালি খাবার পাওয়া যায়।
তবে খাবার বেছে নেওয়ার সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দিকে নজর দেওয়া জরুরি। সম্ভব হলে সদ্য রান্না করা খাবার খান এবং বোতলজাত পানি ব্যবহার করুন। সব মিলিয়ে, ফুলতলী সমুদ্রসৈকত ভ্রমণে খাবার নিয়ে দুশ্চিন্তার সুযোগ নেই, সঠিক জায়গা বেছে নিলেই ভ্রমণ হবে আরও আনন্দময়।
যাতায়াত
ফুলতলী সমুদ্রসৈকতে যাতায়াতের অনেক উপায় রয়েছে। যেমন চট্টগ্রাম কর্ণফুলী ব্রিজ থেকে ২৫ টাকা বাস ভাড়ায় যেতে হবে চাতুরী চৌমহনি। সেখান থেকে সিএনজি অটোরিকশায় ফুলতলী সমুদ্রসৈকতে আসা যায় (লোকাল ভাড়া ৫০ টাকা)। কর্ণফুলী টানেল দিয়ে আসলে কান্তির হাট দক্ষিণবন্দর উচ্চবিদ্যালয়ের সামনে নেমে সিএনজি বা অটোতে করে সেন্টার আসতে পারবেন, ভাড়া ১০ টাকা। সেখান থেকে সিএনজি অটোরিকশায় করে ফুলতলীতে আসা যায়, (ভাড়া ৪০ টাকা। যদি বটতলী শাহ মোহসেন আউলিয়া মাজারপথে আসেন, তাহলে বটতলী থেকে সিএনজি অটোরিকশায় গুদারপাড়া রাস্তার মাথায় নামতে হবে, ভাড়া ৩০ টাকা। সেখান থেকে ১০ থেকে ১৫ মিনিট হেঁটে, খাইরিয়া মাদরাসার পাশের রোড দিয়ে অনায়াসে আসতে পারবেন ফুলতলী সমুদ্রসৈকতে।
সতর্কতা
প্রতিটি জায়গায় সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। ফুলতলী সমুদ্রসৈকতে দিনের বেলায় সতর্কতা হলো, সমুদ্রে গোসল করার সময় দেখে নিতে হবে সমুদ্রের স্রোত ও পানির পরিমাণ। পানি যদি একেবারেই কাছে চলে আসে তাহলে গোসল করা সম্পূর্ণ নিষেধ। কারণ বড় বড় পাথরের যে ব্লকগুলো আছে, পানির স্রোতে ধাক্কা লেগে মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা আছে।
হঠাৎ করে ব্লকের ওপর উঠে ছবি তুলবেন না। যদি হাত ফসকে মোবাইল বা অন্য কিছু পড়ে যায় তাহলে সেটা আর পাওয়া সম্ভব হবে না। ব্লকের ওপর দিয়ে সমুদ্রসৈকতে নামবেন না। কারণ পা পিছলে গেলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
রাতের ৮টা থেকে ৯টার ভেতর সৈকত থেকে ফিরে যাবেন। গভীর রাতে ফুলতলীতে অবস্থান করলে সেনাবাহিনী বা কোস্টগার্ডের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ ছাড়া পকেটমার বা হাইজ্যাকারের সম্মুখীন হওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, ফুলতলী সমুদ্রসৈকতে পর্যটকদের আনাগোনা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই পর্যটনকেন্দ্রটি আনোয়ারার দর্শনীয় স্থানের মধ্যে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। ফুলতলী সমুদ্রসৈকত হাজার হাজার পর্যটকের মন ভালো করার ঠিকানা।



