চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় অবস্থিত দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম পারকি সমুদ্রসৈকত। দীর্ঘ দুই যুগ ধরে অপার সম্ভাবনাময় এই সৈকতে পর্যটকদের প্রধান সংকট ছিল মানসম্মত আবাসিক হোটেল ও মোটেল। সেই সংকট দূর করতে এবং পারকি সৈকতকে বিশ্বমানে রূপ দিতে প্রায় ৭২ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি আধুনিক পর্যটন কমপ্লেক্স নির্মাণের উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন।
দফায় দফায় মেয়াদ ও বাজেট বাড়ানোর পর দীর্ঘ আট বছর পেরিয়ে অবশেষে আলোর মুখ দেখতে চলেছে প্রকল্পটি। আগামী জুন মাসেই এর নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ হবে।
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) মাজেদুর রহমান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
ধাপে ধাপে মেয়াদ ও বাজেট বৃদ্ধি
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, পারকি সমুদ্রসৈকত আধুনিকায়নের লক্ষ্যে ২০১৮ সালে ১৩ দশমিক ৩৬ একর জমিতে ৬২ কোটি টাকা বরাদ্দে এই পর্যটন কমপ্লেক্সের নির্মাণকাজ শুরু হয়। শুরুতে প্রকল্পের মেয়াদ ছিল দুই বছর। তবে ২০২০ সালের নভেম্বরের মধ্যে তিনটি যৌথ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজের মাত্র ২০ শতাংশ শেষ করতে সক্ষম হয়।
পরবর্তীতে ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রথম দফায় মেয়াদ বাড়ানো হয় এবং বাজেট বাড়িয়ে করা হয় ৭১ কোটি ২৫ লাখ টাকা। কাজের ধীরগতির কারণে এরপরও যথাসময়ে কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। ধাপে ধাপে মেয়াদ বাড়িয়ে প্রথমে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর এবং সর্বশেষ ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সময় নির্ধারণ করা হয়।
যা থাকছে এই বিশ্বমানের কমপ্লেক্সে
সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রকল্প এলাকার মূল অবকাঠামো নির্মাণকাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। সীমানাপ্রাচীর, প্রবেশদ্বার ও পার্কিং জোনের কাজও সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে চলছে রঙ ও অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ।
জানা যায়, এই পর্যটন কমপ্লেক্সে থাকছে ১০টি সিঙ্গেল কটেজ (প্রতিটি ৮০০ বর্গফুটের), ১ হাজার ৩৫০ বর্গফুটের চারটি ডুপ্লেক্স কটেজ এবং তিনতলাবিশিষ্ট মাল্টিপারপাস ভবন। সেখানে থাকবে অফিস ভবন ও রেস্তোরাঁ। প্রতিটি তলার আয়তন ৬ হাজার ৩২৩ বর্গফুট।
এছাড়া তিনতলাবিশিষ্ট সার্ভিস ব্লক, সাবস্টেশন ভবন (১ হাজার ৫০ বর্গফুট), অভ্যন্তরীণ সড়ক, সিকিউরিটি রুম এবং দুটি পিকনিক শেড নির্মাণ করা হয়েছে। প্রতিটি পিকনিক শেডে টয়লেট ও রান্নাঘরসহ ১ হাজার ৭০৮ বর্গফুট জায়গা রয়েছে।
পাশাপাশি প্রকল্প এলাকায় হ্রদ ও শিশুদের খেলাধুলার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
কাজের মান নিয়ে স্থানীয়দের ক্ষোভ
দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই প্রকল্পটির কাজ শেষ পর্যায়ে এলেও এর নির্মাণসামগ্রীর মান নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা।
পারকি বিচ ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম অভিযোগ করেন, ‘কাজের শুরু থেকেই নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ ছিল। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে কমপ্লেক্সের উত্তর পাশের সীমানাপ্রাচীর হেলে পড়ে। এরপর ২০২৪ সালের আগস্টে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় দক্ষিণ পাশের প্রাচীরও ধসে যায়। এমনকি বর্তমানেও প্রকল্প এলাকায় লবণাক্ত মাটি দিয়ে ভরাটের কাজ চালানো হচ্ছে।’
তবে এসব ত্রুটি সংস্কার করা হয়েছে দাবি করে প্রকল্পের প্রকৌশলী অসীম শীল বলেন, ‘গত বছর নতুন করে ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হলেও বাজেট বাড়ানো হয়নি। ঠিকাদারদের কারণে কাজে কিছুটা সময় বেশি লেগেছে। দেয়ালে কিছু সমস্যা দেখা দিলেও তা পরবর্তীতে মেরামত করা হয়েছে।’
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) মাজেদুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘প্রকল্পের অবকাঠামোগত কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। এখন শুধু সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ চলছে। আগামী জুন মাসেই এই প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ কাজ শেষ হয়ে যাবে। তবে কাজ শেষে এটি বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া হবে নাকি টেন্ডারের মাধ্যমে পরিচালনা করা হবে, সে বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।’
স্থানীয়দের আশা, দীর্ঘ আট বছরের ধীরগতি কাটিয়ে জুনে এই পর্যটন কমপ্লেক্সটি চালু হলে পারকি সৈকতে পর্যটক সমাগম বহুগুণ বাড়বে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
অমিয়/



