আট হাজার মিটার (২৬ হাজার ২৪৬ ফুট) বা ততোধিক উচ্চতার পর্বত আছে পৃথিবীতে মোট ১৪টি। ২০২৫ সাল পর্যন্ত এর মধ্যে চারটি পর্বতের চূড়া স্পর্শ করেছিলেন পর্বতারোহী বাবর আলী- যে কীর্তি আর কোনো বাংলাদেশির নেই। আর গত ২ মে বাবর নিজেকে নিয়ে গেলেন আরও এক ধাপ উচ্চতায়। বাংলাদেশ সময় ভোর ৫টা ৪৫ মিনিটে তিনি নিজের পঞ্চম আট-হাজারি পর্বত হিসেবে স্পর্শ করেন বিশ্বের পঞ্চম উচ্চতম শৃঙ্গ মাউন্ট মাকালুর চূড়া। নেপালের মহালাঙ্গুর হিমালয়ে অবস্থিত ৮ হাজার ৪৮৫ মিটার (২৭ হাজার ৮৩৮ ফুট) উচ্চতার এই পর্বতে এটিই প্রথম বাংলাদেশি সফলতা।
দেশে ফিরে আজ ‘এক্সপিডিশন মাকালু : দ্য ফিফথ ফ্রন্টিয়ার’ শীর্ষক এই ঐতিহাসিক অভিযানের গল্প শোনান বাবর আলী।
রবিবার (১৭ মে) বেলা ১১টায় চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে অভিযান-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলন ও পতাকা প্রত্যর্পণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে অভিযানের আয়োজক পর্বতারোহণ ক্লাব ভার্টিক্যাল ড্রিমার্স।
এতে পর্বতারোহী বাবর আলীর পাশাপাশি পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠান ভিজুয়াল নিটওয়ার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহমেদ নুর ফয়সাল উপস্থিত ছিলেন। তিনি ভবিষ্যতেও বাবর আলীর পাশে থাকার আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সামুদা স্পেক-কেম লিমিটেড সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে এই অভিযানে পৃষ্ঠপোষক হিসেবে যুক্ত হয়েছে বলে জানান প্রতিষ্ঠানটির ব্র্যান্ড ম্যানেজার ইমতিয়াজ ইবনে ইমাম। এছাড়া এই দুঃসাহসিক অভিযানে আরও পৃষ্ঠপোষকতা করেছে চন্দ্রবিন্দু প্রকাশন, মাই হেলথ ও রহমান গ্রোসারি’জ।
অনুষ্ঠানে ক্লাবের সভাপতি ফরহান জামান বলেন, ‘বিশ্বের পঞ্চম উচ্চতম পর্বত মাকালুতে বাবরের সৌজন্যে উড়েছে আমাদের গর্বের লাল-সবুজ পতাকা। এটি জাতি হিসেবে আমাদের জন্য বিশাল গর্বের। পর্বতারোহণের মতো কঠিন স্পোর্টসেও আমরা যে অসাধারণ কিছু করতে পারি, বাবর তার উজ্জ্বল উদাহরণ। যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা পেলে সে এই স্পোর্টসের মাধ্যমে দেশকে আরও অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।’
নিত্যনতুন চ্যালেঞ্জ নিতে অভ্যস্ত বাবর এর আগেও আরও উচ্চ কিংবা কঠিন পর্বত আরোহণ করেছেন। তবে টেকনিক্যালি অত্যন্ত দুর্গম মাউন্ট মাকালু জয় দেশের পর্বতারোহণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
সংবাদ সম্মেলনে বাবর বলেন, ‘এ বছর আমার ইচ্ছে ছিল কারাকোরাম হিমালয়ে অবস্থিত বিশ্বের নবম উচ্চতম শৃঙ্গ নাঙ্গা পর্বত আরোহণের। কিন্তু প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবসহ নানা কারণে শেষ মুহূর্তে লক্ষ্য স্থির করি মাউন্ট মাকালুকে। এর আগে কয়েকটি আট-হাজারি শৃঙ্গ আরোহণ করলেও এই পর্বতের মতো ভয়ংকর ঠান্ডা ও বাতাসের মুখোমুখি কোথাও হতে হয়নি। ভয়াবহ ঠান্ডা আর হাড় হিম করা বাতাসের কারণে এখানে কাটানো প্রতিটি মিনিটই ছিল অত্যন্ত কঠিন।’
তিনি আরও বলেন, ‘মাকালুর আবহাওয়াও খুব রহস্যময় আচরণ করেছে পুরো অভিযানে। এখানে আবহাওয়া মুহূর্তেই বদলে যায়, যার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া খুব সহজ নয়। এছাড়া এই অভিযানে আমি হারিয়েছি আমার আমেরিকান বন্ধু শেলি জোহানসেনকে। চূড়া থেকে নামার পথে তুষারধসে প্রাণ হারান তিনি। আরেক বন্ধু রুশ পর্বতারোহী কন্সট্যান্টিন তুষারক্ষতের শিকার হয়েছেন। তাঁর সঙ্গে এই অভিযানে সবচেয়ে বেশি সময় কাটিয়েছি আমি। হাত-পায়ের বেশ কয়েকটি আঙুল হারিয়েছেন তিনি। পর্বত মাঝে মাঝে খুবই নিষ্ঠুর আচরণ করে।’
বাবর বলেন, ‘সব মিলিয়ে এই পর্বত আরোহণের অনুভূতি খুবই মিশ্র। লাল-সবুজ পতাকা হাতে চূড়ায় ওঠার আনন্দ যেমন আছে, তেমনি এসব দুর্ঘটনার কষ্টও রয়েছে। আমি বিশ্বাস করি, প্রতিটি পর্বতচূড়ায় যখন কেউ বাংলাদেশের পতাকা হাতে দাঁড়ায়, তখন দেশটাও কিছুটা হলেও আরও ওপরে উঠে যায়। তবে পর্বতে যাওয়াটা কোনো খেয়ালি ব্যাপার নয়। এর পেছনে দীর্ঘ প্রস্তুতি ও সাধনা প্রয়োজন। সবাই যেন প্রস্তুতির দিকে আরও বেশি মনোযোগ দেয়, সেটাই আমার প্রত্যাশা।’
তিনি জানান, তার স্বপ্ন বিশ্বের সব ১৪টি আট-হাজারি পর্বত আরোহণ করা। এখন পর্যন্ত পাঁচটি হলো, বাকি আছে আরও ৯টি। পর্যাপ্ত পৃষ্ঠপোষকতা পেলে লাল-সবুজ পতাকা হাতে বাকি শৃঙ্গগুলোতেও দাঁড়াতে চাই, বলেন তিনি।
‘গ্রেট ব্ল্যাক ওয়ান’ বা ‘মহা-কালো’ নামে পরিচিত মাকালু জয় করতে বাবর ৭ এপ্রিল দেশ ছাড়েন। প্রস্তুতি শেষে ৯ এপ্রিল বিমানে টুমলিংটার হয়ে গাড়িতে পৌঁছান সেদুয়া গ্রামে। সেখান থেকে ট্রেকিং শুরু করে ১৭ এপ্রিল পৌঁছান উচ্চতর বেসক্যাম্পে।
উচ্চতার সঙ্গে শরীরকে মানিয়ে নিতে ২১ এপ্রিল তিনি ক্যাম্প-১ এবং পরদিন ক্যাম্প-২-এ অবস্থান করেন। সাত হাজার মিটার উচ্চতা স্পর্শ করে পরে নেমে আসেন বেসক্যাম্পে। দ্বিতীয় দফায় ২৭ এপ্রিল আবার ক্যাম্প-২-এ একদিন কাটিয়ে ফিরে আসেন নিচে। এরপর শুরু হয় অনুকূল আবহাওয়ার অপেক্ষা।
অবশেষে আবহাওয়া কিছুটা অনুকূলে এলে ৩০ এপ্রিল তিনি আবার আরোহণ শুরু করেন। সেদিন সরাসরি উঠে যান ৬ হাজার ৬০০ মিটার উচ্চতার ক্যাম্প-২-এ। পরদিন পৌঁছান ৭ হাজার ৪০০ মিটার উচ্চতার ক্যাম্প-৩-এ। সেখান থেকে মাঝরাতে শুরু হয় শিখর অভিযাত্রা। একটানা ১ হাজার ১০০ মিটারেরও বেশি ভয়ংকর চড়াই পেরিয়ে ভোরে পৌঁছে যান মাকালুর চূড়ায়। সফল আরোহণ শেষে সেদিনই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ফিরে আসেন বেসক্যাম্পে।
পর্বতারোহণে বাবরের পথচলা শুরু ২০১৪ সালে। ট্রেকিংয়ের জগতে তাঁর হাতেখড়ি হয় ২০১০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন পাহাড়ে ঘোরাঘুরির মধ্য দিয়ে। তিনি চট্টগ্রামের পর্বতারোহণ ক্লাব ভার্টিক্যাল ড্রিমার্স-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও বর্তমান সাধারণ সম্পাদক।
২০১৭ সালে ভারতের উত্তর কাশীর নেহরু ইন্সটিটিউট অব মাউন্টেনিয়ারিং থেকে মৌলিক পর্বতারোহণ প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেন তিনি।
২০২২ সালে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে তিনি আরোহণ করেন আমা দাবলাম (২২ হাজার ৩৪৯ ফুট)। ২০২৪ সালে একই অভিযানে বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট (২৯ হাজার ৩৫ ফুট) এবং চতুর্থ সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট লোৎসে (২৭ হাজার ৯৪০ ফুট) জয় করেন। একই অভিযানে দুটি আট-হাজারি শৃঙ্গ আরোহণের কৃতিত্ব আর কোনো বাংলাদেশির নেই।
২০২৫ সালের এপ্রিলে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে তিনি আরোহণ করেন বিশ্বের দশম উচ্চতম পর্বত অন্নপূর্ণা-১ (২৬ হাজার ৫৪৫ ফুট)। একই বছরের সেপ্টেম্বরে কৃত্রিম অক্সিজেন ছাড়াই জয় করেন বিশ্বের অষ্টম উচ্চতম পর্বত মাউন্ট মানাসলু (২৬ হাজার ৭৮১ ফুট)। এটি ছিল কোনো বাংলাদেশির প্রথম অক্সিজেন ছাড়াই আট-হাজারি শৃঙ্গ আরোহণের কীর্তি।
মাউন্ট মাকালু জয়, বিশ্বের ১৪টি আট-হাজারি শৃঙ্গ স্পর্শের স্বপ্নপথে বাবর আলীর পঞ্চম সাফল্য।
অমিয়/



