বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে পারমাণবিক বোমার পরে সবচেয়ে বড় আশঙ্কার বিষয় জলবায়ু সঙ্কট। বাড়তে থাকা সমুদ্রপৃষ্টের উচ্চতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে দুশ্চিন্তা। প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতি এই সঙ্কট মোকাবিলায় নানাভাবে ইতিবাচক অবদান রাখছে। বিশ্বের সার্বিক কার্বন নিঃসরণ পরিমাপ থেকে শুরু করে জলবায়ুর ভবিষ্যতদ্বাণীতে প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার করছে উন্নত দেশগুলো। আধুনিক প্রযক্তির নতুন সংযোজন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) বা কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা। অভাবনীয় ক্ষমতাসম্পন্ন এই সম্পদ দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে জলবায়ু সঙ্কট মোকাবিলায় ইতিবাচক ভূমিকা পালন করছে কী? নাকি মাউসের ক্লিকে ফোঁটায় ফোঁটায় আর্কটিকের বরফ গলাচ্ছি আমরা? জলবায়ু সঙ্কটে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলতেই এই লেখা।
সঙ্কট মোকাবিলায় আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের সহায়তা বিষয়ক আলোচনার ফাঁকে এআইয়ের মাধ্যমে জলবায়ুর ক্ষতিসাধনের বিষয়টি চাপা পড়ে যাচ্ছে। জলবায়ুর জটিল হিসাবের উদ্দেশ্য এই প্রযুক্তিকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হলেও খোদ এআই জলবায়ু সঙ্কট ত্বরান্বিত করার প্রক্রিয়ায় অবদান রাখছে। এ বিষয়ে দুশ্চিন্তার জন্ম নিয়েছে পরিবেশবাদীদের মধ্যে।
এক গবেষণায় উঠে এসেছে - চ্যাটজিপিটিকে কয়েক ডজন প্রশ্ন করার প্রক্রিয়ায় যে যান্ত্রিক উত্তাপ উৎপন্ন হয়, তা সামলাতে প্রায় দুই গ্লাস পানি খরচ হচ্ছে। এই ইন্টারনেট টুলের পুরাতন সংস্করণকে প্রশিক্ষণ দিতে প্রতিদিন কয়েক মিলিয়িন লিটার পানি অপচয় হয়। দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে এই তথ্য পাঠকের কপালে ভাঁজ তোলার পক্ষে যথেষ্ট।

ভারতের উত্তরাঞ্চলে, পাকিস্তানের করাচিতে অথবা বাংলাদেশের রাজধানীর দিকে তাকালে সুপেয় পানি সংকটের চিত্র স্পষ্ট হয়।
এই পরিস্থিতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পেছনে ব্যবহৃত পানিকে অপব্যয় বললেও ভুল হবে না। দক্ষিণ এশিয়ায় অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের মতো বাড়তে থাকা সঙ্কট মোকাবিলায় এআইয়ের ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবহার জরুরি হয়ে পড়েছে।
এ বিষয়ে ন্যাশনাল জিওগ্রাফি চ্যানেলের এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিক জ্যাকি স্নো বলেন, ‘বর্তমান পৃথিবীতে সবচয়ে বড় সমস্যার নাম জলবায়ু সঙ্কট। এ ক্ষেত্রে কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার মতো প্রযুক্তির ব্যবহারে সতর্ক হতে হবে।’
এদিকে ওপেনএআই-এর সিইও স্যাম অল্টম্যান জানিয়েছেন, বড় ধরণের উদ্ভাবন ছাড়া এই সমস্যার সমাধান অদূর ভবিষ্যতে সম্ভব নয়।
জলবায়ু সঙ্কট মোকাবিলায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তা
জলবায়ু সঙ্কট মোকাবিলায় এআই-এর সবচেয়ে কার্যকরি ব্যবহার হয় জলবায়ুবিষয়ক বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে। উদাহরণ হিসেবে গুগলের ‘ফুড হাবের’ কথা উল্লেখ করা যেতে পারে।
এই প্রযুক্তির মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়াসহ প্রায় ৮০ দেশের বন্যা পরস্থিতি সম্পর্কে পূর্বাভাস পাওয়া যায়।
কৃষিক্ষেত্রে পানি ও সারের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে এআই-এর অবদান প্রশংসনীয়।
মেশিন লার্নিংয়ের মাধ্যমে দাবানলে আক্রান্ত অঞ্চল পর্যবেক্ষণ করছেন ক্যালিফর্নিয়ার দমকল বাহিনী।
এদিকে গ্লোবাল ফরেস্টের মতো এআই টুলের স্যাটেলাইট চিত্রের সাহায্যে বন নিধন মোকাবিলা করা সম্ভব হচ্ছে।
যানবাহন নিয়ন্ত্রণে এআই ব্যবহারের পর থেকে শহরাঞ্চলে প্রায় ১০ শতাংশ কার্বন নিঃসরণ কমেছে।
এ ছাড়া দ্য ওয়ার্ল্ড মেট্রোলজিক্যাল অর্গানাইজেশনের তথ্যমতে, এআই-এর ওয়ার্নিং সিস্টেমের সাহায্যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি সফলতা পাচ্ছেন আবহাওয়াবিদরা।

এআই-এর নেতিবাচক প্রভাব
এআই-এর যান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সৃষ্ট জলবায়ু বিপত্তি চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জিপিটি-৩ এর মতো পুরাতন সংস্করণের টুলের প্রশিক্ষণে প্রায় এক হাজার ২৮৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ খরচ হয়েছে। এ বিদ্যুৎ দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার সাধারণ পরিবার প্রায় দুই হাজার বছর ঘরের সব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে পারবে।
এই প্রক্রিয়ায় যে পরিমান কার্বন নিঃসরণ হয়েছে তা নিইউইয়র্ক থেকে বেইজিংয়র ১২৫ টি ফ্লাইট থেকে নিঃসরিত কার্বনের সমান।
এদিকে ইন্ট্রন্যাশনাল এনার্জি অ্যাজেন্সির মতে, এআই-এর কারণে ২০২৬ সাল নাগাদ গ্লোবাল ডেটা সেন্টারের বৈদ্যুতিক চাহিদা বর্তমানের তুলনায় দ্বিগুনে পরিণত হবে।
আধুনিক ডেটা সেন্টারগুলোতে ব্যবহৃত পানির পরিমান দুশ্চিন্তার আরেকটি বিষয়। যন্ত্র ঠান্ডা রাখতে একেকটি প্রতিষ্ঠান দিনে প্রায় ৫ লাখ গ্যালন পানি ব্যবহার করছে।
‘ কয়েকবছরের মধ্যেই হয়তো দেখা যাবে বৃহদাকার এআই সেন্টারগুলোতে একটা পুরোতে দেশের চাহিদার সমপরিমান পানি ব্যবহার করছে।’, বলেন গবেষক কেট ক্রফোর্ড।
তবে এই তথ্য ঢালাওভাবে সবক্ষেত্রে খাটানোর সুযোগ নেই। ফিনল্যান্ডে অবস্থিত গুগলের ডেটা সেন্টারের প্রায় ৯৭ শতাংক যন্ত্রই কার্বন নিঃসরণ থেকেন মুক্ত। তবে দক্ষিণ এশিয়ার ডেটা সেন্টারগুলোতে এই সংখ্যা মাত্র ৪ থেকে ১৮ শতাংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার টেকসই পরিবর্তনের উপায়
উদ্ভাবণ ও সুষম পরিকল্পনার মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জলবায়ু সহনীয় পরিবর্তন সম্ভব। অ্যামাজন, মাইক্রোসফট, মেটা ও গুগলের মতো প্রতিষ্ঠান এই সঙ্কট মোকাবিলায় ইতোমধ্যেই বিপুল পরিমান অর্থের বরাদ্দ দিয়েছে। এই অর্থ নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পে ব্যবহার করা হবে।
গুগলের নবাগত টেনসর প্রসেসিং ইউনিটগুলো (টিপিইউ) গতানুগতিক সার্ভারগুলোর তুলনায় ৯৩ শতাংশ বেশি বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী।
এদিকে কানাডার কিউবেক শহরের প্রতিষ্ঠানগুলো পানির স্রোত থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এ ছাড়া যান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সৃষ্ট তাপ শহরের বিভিন্ন ঘর উষ্ণ রাখার ক্ষেত্রে ব্যবহারের মাধ্যমে জলবায়ু ও প্রযুক্তির সামঞ্জস্যপূর্ন অবস্থান নিশ্চিত করা হচ্ছে।
এআই গবেষকরাও প্রযুক্তির সঙ্গে আপস না করেই কীভাবে জলবায়ুর ক্ষতিরোধ করা যায় এ বিষয়ে কাজ করছেন।
এদিকে এআই-এর যান্ত্রিক কার্যক্রমে পানির অপচয় রোধে বেশ কিছু প্রকল্প হাতে নিয়েছে মেটা। ডেটাসেন্টারগুলোতে আগে তুলনায় ৪০ শতাংশ কম পানি ব্যবহার হচ্ছে বলে জানা গেছে।

দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপট
পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার চারভাগের একভাগ দক্ষিণ এশিয়ার বাসিন্দা। এই অঞ্চলে তাই জলবায়ু সঙ্কটের প্রভাবও বেশি ভয়ঙ্কর। এআই এর কাজে যে পরিমান পানি খরচ হচ্ছে, ভবিষ্যতে এ অঞ্চলের মানুষ সুপেয় পানির অভাবে পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে যুক্তরাজ্যের মেশিন লার্নিং-বিষয়ক গবেষক ড. কাশিফ তালপুর বলেন, ‘এআই শক্তিশালী করতে গিয়ে যে পরিমান প্রাকৃতিক ক্ষতি হচ্ছে একটা সময় গিয়ে হয়তো আমাদের কাছে প্রযুক্তি থাকবে কিন্তু ব্যবহার করার মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না।’
তবুও, এআই-এর সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যারের উন্নতিতে আশা দেখছেন অনেকেই।
‘নিভিডিয়ার মতো অত্যাধুনিক এআই চিপ ব্যবহারের মাধ্যমে এক সময় প্রাকৃতিক ক্ষতির হার কমিয়ে আনা সম্ভব হবে’, বলেন তালপুর।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যত সম্ভাবনা
দক্ষিণএশিয়ার কথা চিন্তা করলে জলবায়ু সহায়ক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকল্প নেই। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার, পানি সংরক্ষণ ও কার্যকরি এআই সংস্করণ উদ্ভাবণের মাধ্যমে এই সঙ্কট মোকাবিলা করা সম্ভব।
এ ছাড়া দেশীয় যুবাদের জলবায়ু সহায়ক প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহী করে তুলতে এই অঞ্চলের সরকারগুলো প্রচেষ্টা আবশ্যক।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সত্যিই আমাদের দোটানায় ফেলেছে। আধুনিকতার পথে আগাতে গেলে জলবায়ুর সঙ্গে আপস করতে হচ্ছে। এদিকে জলবায়ুকে প্রাধান্য দিতে গেলে প্রযুক্তির অগ্রযাত্রা স্থবির হয়ে পড়ছে।
তবে যথাযথ পরিকল্পনা ও বৃহত্তর প্রেক্ষাপট বিবেচনায় রেখে সবাই নিজের জায়গা থেকে সদিচ্ছা দেখালেই এই সঙ্কট নিরসন সম্ভব।
সুত্র: ইউনাইটেড ন্যাশনস এনভায়রনমেন্ট প্রোগ্রাম, এমআইটি ক্লাইমেট অ্যান্ড সাসটেইনিবিলিটি কনসর্টিয়াম, প্ল্যানেট ডিট্রয়েট অরগানাইজেশন, দ্য ডন
নাইমুর/অমিয়/