মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ প্রথমবারের মতো গাজায় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত বিতর্কিত এক ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন।
স্টিভ উইটকফ জানান, গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন (জিএইচএফ)-এর একটি কেন্দ্রে তার এই সফরের উদ্দেশ্য ছিল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে সেখানে মানবিক পরিস্থিতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেওয়া এবং গাজার জনগণের জন্য খাদ্য ও চিকিৎসা সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার একটি পরিকল্পনা প্রণয়নে সহায়তা করা।
এই সফরের আগে প্রতিদিনই জিএইচএফ-এর বিতরণ কেন্দ্রগুলোর আশপাশে প্রাণঘাতী গুলির ঘটনার খবর মিলছে। জাতিসংঘ বলছে, এসব কেন্দ্রে গুলির ঘটনায় এখন পর্যন্ত অন্তত ৮৫৯ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তবে জিএইচএফ এ তথ্য প্রত্যাখ্যান করেছে।
ইসরায়েল দাবি করেছে, তাদের সেনারা কেবল সতর্কতামূলক গুলি চালায় এবং বেসামরিক লোকজনকে লক্ষ্য করে ইচ্ছাকৃতভাবে গুলি করা হয় না।
বিবিসির খবর অনুযায়ী, স্টিভ উইটকফ শুক্রবার (১ আগস্ট) গাজার দক্ষিণাঞ্চলীয় রাফাহর কাছে জিএইচএফ-এর একটি ত্রাণকেন্দ্র পরিদর্শন করেন। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েল দূত মাইক হাকাবি এবং ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) সদস্যরা।
পরিদর্শন শেষে এক্স (সাবেক টুইটার)-এ দেওয়া পোস্টে উইটকফ লেখেন, “আজ আমরা পাঁচ ঘণ্টার বেশি সময় গাজার ভেতরে কাটিয়েছি—মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা বুঝে দেখেছি, পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেছি এবং জিএইচএফ ও অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি।”
যুক্তরাষ্ট্রের দূত হাকাবি জানান, তারা আইডিএফ-এর কাছ থেকে ব্রিফিং পেয়েছেন এবং স্থানীয় মানুষের সঙ্গেও কথা বলেছেন। তিনি দাবি করেন, জিএইচএফ প্রতিদিন ১০ লাখের বেশি খাবার সরবরাহ করছে এবং এটিকে অসাধারণ সাফল্য বলে আখ্যায়িত করেন।
জিএইচএফ জানায়, তারা বৃহস্পতিবার তিনটি কেন্দ্রে মিলিয়ে ১৩ লাখ খাবার সরবরাহ করেছে। তবে শুক্রবারের পরিসংখ্যান এখনও প্রকাশ করা হয়নি। জাতিসংঘ বলছে, জিএইচএফ যে পরিমাণ খাবার সরবরাহ করছে তা গাজার জনসংখ্যার চাহিদার তুলনায় অনেক কম।
উল্লেখ্য, ইসরায়েল আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের গাজায় স্বাধীনভাবে প্রবেশ করতে দিচ্ছে না, যার ফলে ত্রাণ বিতরণ ও পরিস্থিতি নিয়ে উত্থাপিত দাবিগুলো যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
গাজার বাসিন্দাদের কেউ কেউ উইটকফের এই সফরকে “মিডিয়া শো” বলে নিন্দা করেছেন। গাজার বাসিন্দা লুয়াই মাহমুদ সংবাদ মাধ্যম বিবিসিকে বলেন, “স্টিভ উইটকফ গাজার অনাহার দেখবেন না, তিনি কেবল ইসরায়েলের দেখানো গল্পটাই দেখবেন। এটি কোনো মানবিক সফর নয়, বরং একটি ফাঁপা মিডিয়া স্টান্ট। তিনি কোনো সমাধান আনেননি, কেবল এমন কিছু কথা বলেছেন যা একটি সহিংস প্রশাসনের ভাবমূর্তি রক্ষার জন্য সাজানো।”
গাজা শহরের বাসিন্দা, দুই সন্তানের বাবা আমের খাইরাত বলেন, গাজার প্রয়োজন আরেকজন দূত কিংবা ক্যামেরার সামনে ছবি তোলা নয়। আমাদের প্রয়োজন অবরোধ তুলে নেওয়া, বোমাবর্ষণ বন্ধ করা এবং এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অন্ধ সমর্থন প্রত্যাহার।
জিএইচএফ কেন্দ্রে কাজ করা এক সাবেক মার্কিন বিশেষ বাহিনীর সদস্য সম্প্রতি জানান, তিনি আইডিএফ সদস্যদের ও যুক্তরাষ্ট্রের ঠিকাদারদের জিএইচএফ কেন্দ্রের আশপাশে ফিলিস্তিনি জনতার ওপর গুলি চালাতে দেখেছেন।
লেফটেন্যান্ট কর্নেল অ্যান্থনি আগুইলার, যিনি মার্কিন সেনাবাহিনীর গ্রিন বেরেটস-এর সাবেক সদস্য, বলেন, “আমি আমার দীর্ঘ সামরিক জীবনে কোথাও এমন বেসামরিক, নিরস্ত্র ও অনাহারক্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর ওপর এতটা নিষ্ঠুরতা ও অপ্রয়োজনীয় শক্তি প্রয়োগ দেখিনি।”
জিএইচএফ আগুইলারের অভিযোগকে সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে দাবি করেছে। সংস্থাটি তাকে ‘অসন্তুষ্ট সাবেক ঠিকাদার’ হিসেবে আখ্যায় দিয়ে বলেছে, তিনি শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে বরখাস্ত হয়েছিলেন—যা আগুইলার অস্বীকার করেছেন।
এদিকে শুক্রবার মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) অভিযোগ করেছে, ইসরায়েলি বাহিনী ও যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত ঠিকাদাররা “ত্রুটিপূর্ণ, সামরিকায়িত ত্রাণ ব্যবস্থা” চালু করেছে, যা সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে এবং রক্তাক্ত পরিণতির জন্ম দিচ্ছে।
সংস্থাটি ইসরায়েলকে আহ্বান জানিয়েছে যেন তারা “বেসামরিক জনতার ওপর ভিড় নিয়ন্ত্রণের নামে প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগ বন্ধ করে।” তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে এই ত্রাণ বিতরণ পদ্ধতি স্থগিত করারও আহ্বান জানিয়েছে।
উল্লেখ্য, গত মে মাসে জাতিসংঘের ত্রাণ বিতরণ ব্যবস্থা বাতিল করে জিএইচএফ-এর মাধ্যমে বিতরণ শুরু হয়, যা আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। ইসরায়েল অভিযোগ করেছিল, হামাস জাতিসংঘের ত্রাণ লুট করছে—যা হামাস অস্বীকার করেছে।
বর্তমানে ইসরায়েলি সামরিক নিয়ন্ত্রিত এলাকায় চারটি জিএইচএফ কেন্দ্র চালু রয়েছে, যেগুলোর পরিচালনায় যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি নিরাপত্তা ঠিকাদাররা নিযুক্ত রয়েছে। এসব কেন্দ্রের আশপাশে একাধিকবার জনতার ওপর ইসরায়েলি বাহিনীর গুলির ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শী ও চিকিৎসাকর্মীরা।
জাতিসংঘ ইতোমধ্যে সতর্ক করেছে, গাজায় এখন একটি মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষের ঝুঁকি প্রকট হয়ে উঠেছে। সূত্র: বিবিসি
মাহফুজ/