জেরুজালেমের আল-আকসা মসজিদে ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী কট্টর ডানপন্থী নেতা ইতামার বেন- গভিরের কর্মকাণ্ডকে ‘উসকানিমূলক’ আখ্যা দিয়ে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে সৌদি আরব।
সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রবিবার( ৩ আগস্ট) এক বিবৃতিতে সতর্ক করেছে—এ ধরনের কর্মকাণ্ড পুরো অঞ্চলজুড়ে সংঘাতের আগুনে ঘি ঢেলে দেবে।
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘সৌদি আরব বারবার দৃঢ় ভাষায় আল-আকসা মসজিদে ইসরায়েলি দখলদার সরকারের কর্মকর্তাদের উসকানিমূলক আচরণের নিন্দা জানায় এবং জোর দিয়ে বলছে, এসব আচরণ এই অঞ্চলে সংঘাত আরও উসকে দেয়।’
এর আগে বেন গভির বিতর্কিত আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণে প্রার্থনা করেছেন বলে দাবি করেন। তার আগে এ বছরের ২৬ মে ‘জেরুজালেম দিবস’-এর মিছিল চলার সময় উগ্রবাদী ইহুদিরা আল-আকসায় ঢুকে যায়। ১৯৬৭ সালে ছয় দিনের যুদ্ধের পর জেরুজালেমের নিয়ন্ত্রণ ইসরায়েলের হাতে চলে যাওয়ার দিনকে ‘জেরুজালেম দিবস’ হিসেবে উদ্যাপন করে কট্টরপন্থী ইহুদিরা।
ইসরায়েলের স্থানীয় গণমাধ্যমগুলোর তথ্যমতে, আল-আকসা মসজিদ কম্পাউন্ডের ভেতরে কমপক্ষে দুই হাজার ইসরায়েলিকেও সেদিন ইতামার বেন-গভির নেতৃত্ব দেন।
আল-আকসায় বেন গভিরের এই প্রার্থনা মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম সংবেদনশীল স্থানটির বিদ্যমান নিয়মের প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘদিনের এক সংবেদনশীল ‘স্থিতাবস্থার’ আওতায়, জর্ডানের ধর্মীয় ফাউন্ডেশন মসজিদটি পরিচালনা করে এবং ইহুদিরা সেখানে প্রবেশ করতে পারলেও প্রার্থনা করতে পারেন না।
সৌদি আরবের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে আরও বলা হয়েছে, ‘সৌদি আরব আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি অব্যাহত আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করছে—আন্তর্জাতিক আইন ও বিধান লঙ্ঘন এবং অঞ্চলের শান্তি প্রচেষ্টাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে ইসরায়েলি দখলদার কর্মকর্তাদের এমন আচরণ বন্ধ করতে হবে।’
আরব নিউজ জানিয়েছে, আল-আকসা মসজিদের পবিত্রতা লঙ্ঘনের মতো ঘটনা ঘটলে সৌদি সরকার বরাবরই নিন্দা জানিয়ে এসেছে। সৌদি আরবের মতো জর্ডানও বেন গভিরের এমন আক্রমণাত্মক প্রবেশের কঠোর নিন্দা জানিয়েছে।
জর্ডানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে এই ঘটনাকে ‘আন্তর্জাতিক আইন ও মানবিক আইনের চরম লঙ্ঘন, অগ্রহণযোগ্য উসকানি এবং উত্তেজনা সৃষ্টিকারী নিন্দনীয় কাজ’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
জর্ডানের বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘আল-আকসা মসজিদ/আল-হারাম আল-শরিফের ওপর ইসরায়েলের কোনো সার্বভৌম অধিকার নেই।’
জর্ডানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সুফিয়ান কুদাহ বলেন, ‘কট্টর ওই মন্ত্রীর ধারাবাহিক উসকানিমূলক আগ্রাসন এবং ইসরায়েলি পুলিশের সহায়তায় বসতি স্থাপনকারীদের বারবার মসজিদে প্রবেশ করানোকে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান ও নিন্দা করে জর্ডান।’
জেরুজালেমে মুসলিম ও খ্রিষ্টানদের পবিত্র স্থানের বিরুদ্ধে এই ধরনের উসকানি ও আইনের চরম লঙ্ঘনের পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করেন কুদাহ। তিনি বলেন, ‘এসব আচরণ অধিকৃত পশ্চিম তীরে একতরফা পদক্ষেপ এবং আরও বিপজ্জনক উত্তেজনার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।’
ইসলাম ধর্মে তৃতীয় পবিত্র স্থান হিসেবে বিবেচিত এই মসজিদে উপস্থিত হয়ে সামাজিক মাধ্যম এক্সে একটি ভিডিও পোস্ট করেন তিনি। ওই ভিডিওতে তার সঙ্গে ইসরায়েলি পার্লামেন্টের সদস্য ইৎজাক ক্রুজার এবং নেগেভ ও গালিলি অঞ্চলের মন্ত্রী ইৎজাক ভাসেরলফকেও দেখা যায়।
ভিডিওতে বেন-গভির বলেন, ‘প্রার্থনা করেছি যেন এই যুদ্ধে আমরা জয়লাভ করতে পারি। পাশাপাশি হামাসের হাতে জিম্মি সবাইকে ইসরায়েলি ভূখণ্ডে ফেরত আনা এবং শিন বেতের নতুন প্রধানের সফলতা চেয়েছি।’
বেন-গভিরের এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে উসকানিমূলক আখ্যা দিয়েছে বিভিন্ন মহল।
এএফপির এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৬ মে পুরাতন জেরুজালেমের মুসলিম কোয়ার্টারের পাশ দিয়ে ‘জেরুজালেম মার্চ’ নামে শোভাযাত্রা করে ইসরায়েলিরা। এ সময় তারা ‘আরব নিপাত যাক’, ‘তোদের বসতি জ্বলুক’ - এ ধরনের স্লোগান দেয়।
শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারীদের বেশির ভাগই জেরুজালেম ও পশ্চিম তীরে বসবাসকারী দখলদার ইসরায়েলি। আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে তারা ওই অঞ্চলের অবৈধ বাসিন্দা হিসেবে চিহ্নিত।
১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর ইসরায়েল পূর্ব জেরুজালেম দখল করলেও, আন্তর্জাতিক চাপের কারণে ইসরায়েল ঘোষণা দেয়, ইসলাম ধর্মীয় স্থানগুলোর প্রশাসন মুসলিম কর্তৃপক্ষের অধীনেই থাকবে, যদিও নিরাপত্তার দায়িত্ব থাকবে ইসরায়েলের হাতে। এই ব্যবস্থাকে বলা হয় ‘স্থিতাবস্থার নীতি’।
এর আওতায়, চত্বরে শুধু মুসলিমদেরই প্রার্থনার অনুমতি আছে, সেখানে অমুসলিমদের প্রবেশ সীমিত এবং প্রার্থনা নিষিদ্ধ। এই চত্বরের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ রয়েছে জর্ডান সরকারের নিযুক্ত ইসলামিক ওয়াকফ কাউন্সিলের হাতে। ওয়াকফ কর্তৃপক্ষ এর তত্ত্বাবধান করে থাকে।
এই মসজিদ চত্বরকে ধর্মীয় পবিত্রতা ও মুসলিম অধিকার রক্ষার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ১৯৯৪ সালে ইসরায়েল ও জর্ডানের মধ্যকার শান্তিচুক্তিতেও এই দায়িত্বের স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
ইসরায়েলি সুপ্রিম কোর্টও আল-আকসা চত্বরে ইহুদিদের প্রার্থনায় নিষেধাজ্ঞার পক্ষে রায় দিয়েছে। এ ছাড়া, জাতিসংঘসহ অধিকাংশ আন্তর্জাতিক সংস্থা পূর্ব জেরুজালেমকে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড হিসেবে বিবেচনা করে এবং সেখানে ইসরায়েলের হস্তক্ষেপকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হয়।
সুলতানা দিনা/