দক্ষিণ এশিয়ার তিন দেশ- শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপালে ছাত্র ও তরুণদের নেতৃত্বে যেভাবে গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারের পতন ঘটেছে, তা নিয়ে চরমভাবে সতর্ক হয়েছে ভারত। প্রতিবেশী দেশগুলোর এই ধারাবাহিক ঘটনা ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার, বিশেষ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, ভারতে একই ধরনের জেনারেশন জেডের (জেন জি) নেতৃত্বাধীন আন্দোলন হতে পারে। এই আশঙ্কা থেকেই ভবিষ্যতে বড় বিক্ষোভ ঠেকাতে প্রস্তুতি শুরু করেছে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
এ উদ্দেশ্যে অমিত শাহ সম্প্রতি দেশের পুলিশের গবেষণা ও উন্নয়ন ব্যুরোকে (বিপিআরঅ্যান্ডডি) একটি বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ১৯৭৪ সালের পর ভারতের ভেতরে যেসব বড় গণ-আন্দোলন হয়েছে, তার পেছনের কারণ, গতিপ্রকৃতি, ফলাফল ও আর্থিক সংযোগ খতিয়ে দেখে গবেষণা করতে হবে। সেই গবেষণার ওপর ভিত্তি করে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য গণ-আন্দোলন প্রতিরোধে একটি ‘স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর’ (এসওপি) তৈরি করা হবে।
এই গবেষণার জন্য একটি বিশেষ টিম গঠন করা হচ্ছে, যারা রাজ্য পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে পুরোনো মামলার নথিপত্র, সিআইডির প্রতিবেদন এবং অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য বিশ্লেষণ করবে। পাশাপাশি আন্দোলনের আর্থিক দিক খতিয়ে দেখার জন্য ইডি (এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট), এফআইইউ-আইএনডি (ফিন্যানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট) এবং সিবিডিটি (সেন্ট্রাল বোর্ড অব ডিরেক্ট ট্যাক্সেস)-কেও যুক্ত করা হচ্ছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মতে, বর্তমান যুগে আন্দোলন শুধু আদর্শের ভিত্তিতে নয়, বরং এর পেছনে অর্থের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাই আন্দোলনে আর্থিক লেনদেন ও বিদেশি মদদ থাকলে তা আগেভাগেই শনাক্ত করতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের কোটা সংস্কার আন্দোলন, নেপালের ডিজিটাল নিষেধাজ্ঞাবিরোধী বিক্ষোভ এবং শ্রীলঙ্কার আর্থিক সংকটে গড়ে ওঠা ‘আরাগালায়া’- সব আন্দোলনেই তরুণদের নেতৃত্ব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার এবং বিকেন্দ্রীভূত সংগঠনের প্রবণতা ছিল স্পষ্ট।
অমিত শাহ এ বিষয়গুলোকে মাথায় রেখে নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে এসব আন্দোলনের কৌশল বিশ্লেষণের নির্দেশ দিয়েছেন। যাতে একই ধরনের ঘটনা ভারতেও ঘটলে তা শুরুতেই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়। এই গবেষণায় অংশ নিচ্ছে এনআইএ, বিএসএফ, নারকোটিক্স কন্ট্রোল ব্যুরোসহ কেন্দ্রীয় ও রাজ্যস্তরের একাধিক সংস্থা। এদের মাধ্যমে আন্দোলনের নেপথ্যের অর্থ, সংযোগ, পরিকল্পনা ও সম্ভাব্য নেতৃত্ব বিশ্লেষণ করা হবে।
অন্যদিকে, পাঞ্জাব অঞ্চলের জন্য আলাদাভাবে নির্দেশনা দিয়েছেন অমিত শাহ। তিনি চেয়েছেন, ধর্মীয় সমাবেশ ও খালিস্তানি উগ্রপন্থার মতো বিষয়গুলো নিয়ে গভীর পর্যবেক্ষণ চালাতে। বিশেষত যেসব ধর্মীয় জমায়েতে পদদলনের মতো দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে, সেসব নিয়েও আলাদা গবেষণা হবে। এর মাধ্যমে সমাবেশ পর্যবেক্ষণ, নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিক্রিয়া জানানোর জন্য একটি পৃথক এসওপি তৈরি করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রস্তুতির পেছনে রয়েছে ভারতের তরুণ সমাজের ভেতরে জমে থাকা ক্ষোভ। বেকারত্ব, দুর্নীতি, বৈষম্য, রাজনৈতিক স্বজনপ্রীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বহু তরুণের মাঝে গভীর হতাশা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, জেন জি প্রজন্ম ডিজিটাল যোগাযোগ, হ্যাশট্যাগ ক্যাম্পেইন এবং বিকেন্দ্রীভূতভাবে সংগঠিত হওয়ার ক্ষমতায় পারদর্শী। ফলে সরকার মনে করছে, পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকলে যেকোনো সময় বড় গণ-আন্দোলনের সূত্রপাত হতে পারে।
এ কারণে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভবিষ্যতের সম্ভাব্য অস্থিরতা রোধে তথ্যভিত্তিক প্রস্তুতি নিচ্ছে। পুরো পরিকল্পনার পেছনে মূল লক্ষ্য হলো- দেশে আর যেন কলম্বো, ঢাকা কিংবা কাঠমান্ডুর মতো দৃশ্য না দেখা যায়। ভারতের রাজনৈতিক মহলে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো-এই তরঙ্গ কি এবার দিল্লিতেও আছড়ে পড়বে?
কলম্বো থেকে ঢাকা হয়ে কাঠমান্ডু, জেন জি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মত
কয়েকদিন আগেই জেন জি বিক্ষোভে সরকার পতন হয় নেপালে। এর আগে ২০২৪ সালে বাংলাদেশে এবং ২০২২ সালে প্রতিবেশী দেশ শ্রীলঙ্কায় একই ঘটনা ঘটেছিল। এসব দেশে সরকারপ্রধানের বিলাসবহুল বাড়ি ছিল দুর্ভেদ্য ক্ষমতার এক প্রতীক, যা ছিল সাধারণের ধরাছোঁয়ার বাইরে। তবে সরকার পতনের সঙ্গে সঙ্গে সাময়িকভাবে সেই বাড়ির মালিক হয়ে ওঠেন জনগণ। দক্ষিণ এশিয়ায় তরুণদের বিক্ষোভে সম্প্রতি পতন হয়েছে একাধিক সরকারের। এ ঘটনা বিস্তৃত এক প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। ঘনবসতি দক্ষিণ এশিয়া কি জেনারেশন জেড (জেন-জি) বিপ্লবের গ্রাউন্ড জিরো বা বিপ্লবের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে?
যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক পল স্ট্যানিল্যান্ড দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক সহিংসতা এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নিয়ে গবেষণা করেন। তিনি সংবাদ মাধ্যম আল-জাজিরাকে বলেন, ‘এটি নিঃসন্দেহে চোখে পড়ার মতো ঘটনা। এখানে এক ধরনের নতুন অস্থিতিশীল রাজনৈতিক ধারা দেখা যাচ্ছে। এটি দক্ষিণ এশিয়ার জন্য একটি নাটকীয় পরিবর্তন।’ তিনি আরও বলেন, ‘এটি একেবারেই ভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক ধারা। যেখানে আগে রাজনৈতিক সংকট মানেই ছিল সামরিক অভ্যুত্থান বা অন্য ধরনের সংঘাত, সেখানে এখন একেবারে নতুন ধারা দেখা যাচ্ছে।’
স্ট্যানিল্যান্ড বলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়ায় তরুণদের নেতৃত্বে হওয়া আন্দোলনের সবচেয়ে সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো- একটি ভালো রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের কল্পনা করার ক্ষমতা, আর তাদের স্বপ্নের সঙ্গে বাস্তবতার বিশাল ফারাকটা দেখতে পাওয়া।’ তিনি আরও বলেন, ‘তরুণদের শক্তি ছিল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখা, বাস্তবতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করা, আর একে অপরের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ থাকার অনুভূতি।’
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলীর মতে, দক্ষিণ এশিয়ার তিন দেশে তরুণদের আন্দোলনে সরকার পতনের পেছনে একটি সাধারণ ভিত্তি রয়েছে। তা হলো অমীমাংসিত সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈষম্য আর রাজনৈতিক অভিজাতদের দুর্নীতি, যা তাদের তরুণ প্রজন্মের বাস্তব চ্যালেঞ্জগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিল।
জেন জিদের অনেকেই জীবনে দুটি বড় অর্থনৈতিক মন্দার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। প্রথমটি ২০০৮-০৯ সালে এবং দ্বিতীয়টি কভিড-১৯ মহামারির সময়। গাঙ্গুলি বলেন, ‘এ প্রজন্মকে আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ বছর কাটাতে হয়েছে একাকিত্বে, সহপাঠী ও বন্ধুদের থেকে শারীরিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে। তবে সেই মহামারির সময়ই তাদের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের মাত্রা নজিরবিহীনভাবে বেড়ে যায়।’
কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্স ইন ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স প্রোগ্রামের ফ্যাকাল্টি ডিরেক্টর রুমেলা সেন আল-জাজিরাকে বলেন, ‘তরুণপ্রধান জনসংখ্যা এবং ইন্টারনেট ব্যবহারের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার জেন জি প্রজন্ম সহজভাবেই কমিউনিটি, সংগঠন ও আত্মপ্রকাশের জন্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোকে কাজে লাগাতে পেরেছে। এসব দেশের সরকার ইন্টারনেট বা নির্দিষ্ট যোগাযোগ প্ল্যাটফর্ম বন্ধ করার চেষ্টা করলেও, তা উল্টো ফল বয়ে এনেছে।’
তিনি বলেন, ‘নেপালের তরুণ প্রজন্ম দেখছিল যে, কিছু সুবিধাভোগী পরিবার বা রাজনৈতিক অভিজাতদের সন্তানরা (নেপোকিড) বিলাসী জীবনযাপন করছে, বিদেশে পড়াশোনা করছে। কিন্তু এই সুযোগ-সুবিধার ভিত্তি গড়ে উঠেছে সাধারণ তরুণদের স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে। তাই তারা এসব অন্যায় আর চোখ বন্ধ করে এড়িয়ে যেতে চায়নি।’ এখন শেষ এবং একমাত্র প্রশ্ন হলো- এরপর জেন জি আন্দোলন কোথায়? সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, আল-জাজিরা