দুই দশকেরও বেশি আগে ইরানের গোপন পারমাণবিক কর্মসূচি আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনায় আসার পর তেহরান বারবার দাবি করেছিল, তাদের উদ্দেশ্য শান্তিপূর্ণ এবং তারা কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চায় না। দেশটির তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এমনকি ইসলামি আইনের আওতায় একটি ফতোয়া জারি করে পারমাণবিক অস্ত্র নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন।
কিন্তু গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় তার মৃত্যুর পর পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যেতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। অনেকের মতে, এতে করে ইরানের অভ্যন্তরে দীর্ঘদিনের কঠোরপন্থি গোষ্ঠীগুলো নতুন করে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পক্ষে অবস্থান নিতে পারে। ইতোমধ্যে দেশটির জনমত ও রাজনৈতিক আলোচনায় এ ধরনের প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ‘কুইয়েন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপন্সিবল স্টেটক্রাফট’-এর বিশ্লেষক ট্রিটা পার্সি বলেন, ‘পারমাণবিক ফতোয়া কার্যত মৃত। ইরানের অভিজাত শ্রেণি ও সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। আলোচনার মাঝেই দুই পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রের হামলার মুখে পড়ার পর এমন পরিবর্তন অস্বাভাবিক নয়।’
‘কৌশলগত ধৈর্য’ থেকে সম্ভাব্য নীতিগত পরিবর্তন
বিগত বছরগুলোতে খামেনি অভ্যন্তরীণ চাপ থাকা সত্ত্বেও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির অনুমোদন দেননি। বিশেষ করে ২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ইরান পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার পরও তিনি অপেক্ষাকৃত সংযত অবস্থান বজায় রাখেন।
বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, খামেনি ‘কৌশলগত ধৈর্য’ নীতি অনুসরণ করেছিলেন। এর আওতায় ইরান ধীরে ধীরে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি এগিয়ে নেয়, যা অস্ত্রমানের কাছাকাছি পৌঁছালেও সরাসরি বোমা তৈরির সীমা অতিক্রম করেনি।
নতুন নেতৃত্ব ও অনিশ্চয়তা
বর্তমানে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনি দায়িত্ব নিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে তার পারমাণবিক নীতির অবস্থান এখনো স্পষ্ট নয়। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সম্প্রতি বলেন, নতুন নেতার ধর্মীয় বা রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে তিনি নিশ্চিত নন। তিনি বলেন, ‘আমাদের ধারণা এটি আগের নীতির থেকে খুব বেশি আলাদা হবে না, তবে তার অবস্থান স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।’
এদিকে মোজতবা খামেনি জনসমক্ষে অনুপস্থিত রয়েছেন, যা তার শারীরিক অবস্থা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ ক্ষমতা নিয়ে জল্পনা বাড়িয়েছে। একই সময়ে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) দেশের ক্ষমতার ওপর আরও শক্ত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করছে।
যুদ্ধের প্রভাব: কঠোর অবস্থানের উত্থান
গত বছর ইসরায়েলের নজিরবিহীন সামরিক অভিযানে ইরানের বহু সামরিক ও পারমাণুবিষয়ক কর্মকর্তা নিহত হওয়ার পর থেকেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দাবি জোরালো হতে থাকে। পরবর্তী সময়ে ট্রাম্প প্রশাসনের নির্দেশে ইরানের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা এই চাপ আরও বাড়িয়ে দেয়।
এর আগেই ২০২৪ সালে আইআরজিসির একজন কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেছিলেন, ইরান তাদের পারমাণবিক নীতি পরিবর্তন করতে প্রস্তুত। তিনি ইঙ্গিত দেন, ‘আগের বিবেচনা থেকে সরে আসা এবং নীতির পরিবর্তন সম্ভাব্য।’ বর্তমানে ইরানের কাছে ৪০০ কেজির বেশি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে বলে ধারণা করা হয়, যা কয়েকটি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য যথেষ্ট হতে পারে, যদি নতুন নেতৃত্ব ফতোয়া পরিবর্তন করে।
অভ্যন্তরীণ চাপ ও রাজনৈতিক বাস্তবতা
ইরানের অভ্যন্তরে পারমাণবিক নীতি পরিবর্তনের দাবিও জোরদার হচ্ছে। কঠোরপন্থি বিশ্লেষক নাসের তোরাবি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলেন, ‘আমরা নতুন একপর্যায়ে প্রবেশ করেছি। যুদ্ধের পর ইরানকে বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে। আমাদের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পদক্ষেপ নিতে হবে।’
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে পারমাণবিক সংযমের একটি কারণ ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কা। তবে এখন যখন সেই হামলাই বাস্তবে ঘটেছে, তখন এই সংযমের যৌক্তিকতা অনেকটাই দুর্বল হয়ে গেছে।
বিশ্লেষক সিনা আজোদি বলেন, ‘যখন আক্রমণ যেভাবেই হোক ঘটেই গেছে, তখন তাদের কাছে আর সংযমের তেমন কোনো কারণ নেই। এই যুদ্ধ সবকিছু বদলে দিয়েছে।’
ইরান কি দ্রুত বোমা বানাতে পারবে?
পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ–ফতোয়া পরিবর্তন, পর্যাপ্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম এবং কার্যকর বোমা তৈরির প্রযুক্তি। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান চাইলে জটিল ক্ষেপণাস্ত্রবাহী পারমাণবিক অস্ত্রের বদলে তুলনামূলক সহজ একটি ‘ক্রুড’ বা প্রাথমিক বোমা তৈরি করতে পারে। এটি প্রযুক্তিগতভাবে কম জটিল হলেও বাস্তব বিস্ফোরণ ঘটাতে সক্ষম হবে।
তবে এই ধরনের অস্ত্রের সামরিক ব্যবহার সীমিত হবে। এর মূল উদ্দেশ্য হবে রাজনৈতিক–বিশ্বকে পারমাণবিক সক্ষমতা দেখানো এবং প্রতিরোধ তৈরি করা।
পারমাণবিক প্রতিরোধ কি কার্যকর হবে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, পারমাণবিক অস্ত্র থাকলেও ইরানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিরোধ করা সহজ হবে না। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের হাজার হাজার পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে, যেখানে ইরানের সম্ভাব্য অস্ত্রের সংখ্যা খুবই সীমিত হবে। আজোদি বলেন, ‘৫০টি পারমাণবিক অস্ত্র দিয়েও এমন একটি দেশকে প্রতিরোধ করা যায় না, যার কাছে ৫ হাজার অস্ত্র রয়েছে।’ ইরানের প্রতিরোধনীতি ঐতিহাসিকভাবে মূলত ইরাক, ইসরায়েল এবং সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবকে ঘিরে গড়ে উঠেছে।
আঞ্চলিক পারমাণবিক প্রতিযোগিতার আশঙ্কা
ইরান যদি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে এগোয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে সৌদি আরব দ্রুতই একই পথে হাঁটতে পারে। ২০১৮ সালে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, ‘ইরান যদি পারমাণবিক বোমা তৈরি করে, আমরা দ্রুতই সেটি অনুসরণ করব।’
সব মিলিয়ে ইরান এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। যুদ্ধ, নেতৃত্ব পরিবর্তন এবং অভ্যন্তরীণ চাপ–সব মিলিয়ে দেশটির পারমাণবিক নীতিতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। তবে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তেহরান কি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে হাঁটবে, নাকি আগের নীতি বজায় রাখবে, তা নির্ভর করছে নতুন নেতৃত্বের অবস্থান এবং চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির ওপর।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত শুধু ইরানের জন্য নয়, বরং পুরো বিশ্বের নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্যই বড় প্রভাব ফেলতে পারে।