হিজবুল্লাহর সঙ্গে গত মাসে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার পর গত বুধবার প্রথমবারের মতো বৈরুতে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। ইসরায়েলের দাবি, শহরের দক্ষিণ উপশহরে হিজবুল্লাহর অভিজাত রাদওয়ান বাহিনীর এক কমান্ডারকে লক্ষ্য করে ওই হামলা চালানো হয়।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ যৌথ বিবৃতিতে হামলার কথা ঘোষণা করেন। ইসরায়েলি গণমাধ্যম জানায়, ওই কমান্ডার হামলায় নিহত হয়েছেন। তবে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বা হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা হয়নি।
লেবাননের যুদ্ধবিরতি বৃহত্তর যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করছিল। বৈরুতে ইসরায়েলি হামলা বন্ধ রাখা ছিল ইরানের অন্যতম প্রধান দাবি। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই বলছে, তাদের চলমান উত্তেজনা নিরসনে একটি চুক্তির দিকে অগ্রগতি হচ্ছে। কিন্তু নতুন এই হামলা বৈরুতকে ঘিরে যুদ্ধবিরতিকে হুমকির মুখে ফেলেছে। এর মধ্যেই লিতানি নদীর দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি সেনারা অবস্থান ধরে রেখেছে এবং দক্ষিণ লেবাননে হামলাও অব্যাহত রয়েছে।
ইরানের মিত্র হিজবুল্লাহ পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েলি সেনাদের লক্ষ্য করে রকেট ও সশস্ত্র ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এর আগে ইসরায়েল লিতানি নদীর উত্তরের কয়েকটি গ্রামের বাসিন্দাদের এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেয়। বিশ্লেষকদের মতে, এটি ইসরায়েলের সামরিক তৎপরতার পরিধি আরও বাড়ানোর ইঙ্গিত হতে পারে।
ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে আলোচনা চললেও তা মূলত দুই দেশের যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূতদের পর্যায়েই সীমাবদ্ধ রয়েছে। লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম বুধবার বলেন, লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের বিষয়ে এখনই কথা বলা সময়োপযোগী নয়।
রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা এনএনএর বরাতে সালাম বলেন, যুদ্ধবিরতি শক্তিশালী করাই হবে ওয়াশিংটনে লেবানন ও ইসরায়েলি প্রতিনিধিদের সম্ভাব্য নতুন আলোচনার ভিত্তি। গত মাসে ওয়াশিংটনে ইসরায়েল ও লেবাননের রাষ্ট্রদূতদের মধ্যে দুটি বৈঠকের আয়োজন করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। হিজবুল্লাহ এসব যোগাযোগের তীব্র বিরোধিতা করে আসছে।
২ মার্চ ইরানের সমর্থনে হিজবুল্লাহ হামলা শুরু করার পর থেকেই যুদ্ধের সূচনা হয়। এরপর প্রধানমন্ত্রী সালাম ও প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউনের নেতৃত্বাধীন লেবানন সরকার কয়েক দশকের মধ্যে ইসরায়েলের সঙ্গে সর্বোচ্চ পর্যায়ের যোগাযোগ শুরু করে। এতে হিজবুল্লাহ ও তাদের বিরোধীদের মধ্যে গভীর বিভক্তি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
২৩ এপ্রিল যুদ্ধবিরতির মেয়াদ তিন সপ্তাহ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, তিনি শিগগিরই নেতানিয়াহু ও আউনকে আতিথ্য দেওয়ার অপেক্ষায় আছেন এবং এ বছর দুই দেশের মধ্যে শান্তিচুক্তির ‘বড় সম্ভাবনা’ দেখছেন।
সালাম বলেন, লেবানন ‘ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে নয়, বরং শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে’ চায়। তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের ন্যূনতম দাবি হলো ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের একটি সময়সূচি।’ পাশাপাশি সরকার রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা অস্ত্র সীমিত করার পরিকল্পনা তৈরি করবে বলেও জানান তিনি। এই পদক্ষেপ মূলত হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার প্রচেষ্টার অংশ।
এদিকে প্রেসিডেন্ট আউন বলেন, নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠকের জন্য এখন উপযুক্ত সময় নয়। তার ভাষায়, ‘প্রথমে আমাদের নিরাপত্তা চুক্তি এবং ইসরায়েলি হামলা বন্ধ নিশ্চিত করতে হবে, এরপর বৈঠকের প্রশ্ন আসবে।’
ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননের ভেতরে প্রায় ১০ কিলোমিটার গভীর পর্যন্ত একটি স্বঘোষিত নিরাপত্তা অঞ্চল তৈরি করেছে। তাদের দাবি–বেসামরিক এলাকায় অবস্থান নেওয়া হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের হাত থেকে উত্তর ইসরায়েলকে সুরক্ষা দিতেই এই ব্যবস্থা।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, বুধবার দক্ষিণ লেবাননের জেলায়া শহরে ইসরায়েলি বিমান হামলায় চারজন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে দুই নারী ও এক বৃদ্ধ রয়েছেন। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দাবি, হিজবুল্লাহ দক্ষিণ লেবাননে অবস্থানরত ইসরায়েলি সেনাদের লক্ষ্য করে বিস্ফোরকবাহী ড্রোন ও রকেট ছুড়েছে। এতে দুই ইসরায়েলি সেনা আহত হয়েছেন।
তারা আরও জানায়, ইসরায়েলের আকাশসীমায় ঢোকার আগেই একটি শত্রু বিমান প্রতিহত করা হয়েছে এবং লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় হিজবুল্লাহর অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ২ হাজার ৭০০রও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দাবি, একই সময়ে হিজবুল্লাহ শত শত রকেট ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। দক্ষিণ লেবাননে ১৭ জন ইসরায়েলি সেনা এবং উত্তর ইসরায়েলে দুই বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার কথাও জানিয়েছে তারা। সূত্র: রয়টার্স