গত ৪ জুলাই ছুটির দিন। বর্ষাকাল বলে মাঝে মাঝেই আকাশ থেকে বৃষ্টি ঝরছে। রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে সকালে গেলাম শেরেবাংলা নগরে বৃক্ষমেলায়। সকাল ১০টা বেজে ১০ মিনিট। মেলায় ঢোকার আগেই বাংলাদেশ চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র পেরিয়ে রাস্তার ধারে জন্মানো একটা বুনো ঝোপের দিকে হঠাৎ চোখ পড়ল। অর্জুন গাছ, তার পাশে একটি তালের চারাগাছ। তালপাতায় জড়াজড়ি করছে অমললতা বা অনললতা, কিছু ঘাসও জন্মেছে গোড়ার মাটিতে। এসব ঝোপের ভেতর কমলা রঙের কিছু পোকা উড়াউড়ি করছে, অমললতায় হেঁটে বেড়াচ্ছে। ছবি তুলতে গেলেই মনে হয় আমার উপস্থিতি টের পেল পোকাগুলো। ঝুপ করে পড়ে গেল সেখান থেকে মাটিতে, লুকিয়ে পড়ল ঘাসপাতার ভেতরে। অসুবিধে নেই। আরও কয়েকটা তো রয়েছে দেখছি। একটা তালপাতার ওপর তিনটে পোকা বসে মনে হলো ঝিমুচ্ছে, প্রায় নিশ্চল হয়ে বসে রয়েছে। ওগুলোর গায়ে গাছের ছায়া পড়ায় সে জায়গা কিছুটা অন্ধকার হয়ে রয়েছে। লতা ও পাতা সরাতে সাহস হলো না, যদি আবার টুপ করে পড়ে যায়! ওই অবস্থাতেই পোকাটার ছবি তুললাম। এ পোকা এর আগে কখনো আমার চোখেও পড়েনি।
বাংলাদেশের পোকামাকড়ের তালিকায় এটি নথিভুক্ত কি না, তাও নিশ্চিত হতে পারলাম না। একটা খটকা লাগল মনের ভেতর। বৃক্ষমেলায় তো অনেক গাছপালা আনা হয় থাইল্যান্ড থেকে। সেসব গাছের কোনো একটির সঙ্গে এ পোকাও এ দেশে চলে আসেনি তো? একটি অপোষক উদ্ভিদ অমললতার (Cayratia trifolia) ওপর ২০১৮ সালে থাইল্যান্ডে প্রথম এ পোকা দেখার পর তা নতুন পোকা হিসেবে রেকর্ড করা হয়।
বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞান কোষ বইয়ের ২২তম খণ্ডে বিটল পোকার বর্ণনা রয়েছে। সেখানে এ প্রজাতির পোকার কোনো উল্লেখ নেই। তবে ইনসেক্টস অব বাংলাদেশ ফেসবুক গ্রুপের ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখের একটি পোস্ট থেকে জানা গেল যে, কুষ্টিয়ায় পদ্মা নদীর ধারে সে বছর জুনের ২০ তারিখে দহকুলায় তারা এ পোকাটির দেখা পেয়েছিলেন। এ কথা সত্যি হলে এ পোকা নিশ্চয়ই এ দেশে আছে। সেখানে বনকার্পাস বা ঝাপি টেপারি (Hibiscus vitifolius ) গাছকে এ পোকার পোষক বা আশ্রয়দাতা উদ্ভিদ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্তর্জাল ঘেঁটে রিসার্চগেটে প্রকাশিত ট্রেভর ও আরও দুজন গবেষকের করা একটি গবেষণাপত্র থেকে জানা গেল থাইল্যান্ডের উবন রাতচাথানি প্রদেশে ২০১৮ সালে এ প্রজাতির পোকাটির প্রথম দেখা ও নথিভুক্ত করার কথা। সে গবেষণাপত্রের ভূমিকাতে এ পোকাটি সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, বৈশিষ্ট্যপূর্ণ চকচকে কমলা রং ও দুটি কালো ফোঁটা দেখে সহজেই এ পোকাটিকে চেনা যায়। এ জন্য এ পোকার ইংরেজি নাম রাখা হয়েছে টু স্পটেড লিফ বিটল। ইংরেজি নামের সঙ্গে মিলিয়ে আমরা এর বাংলা নামকরণ করতে পারি দুই ফোঁটাযুক্ত পাতা বিটল। এ পোকার বিশদ বর্ণনা খুব কমই পাওয়া যায়। তবে এটি যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পোকা তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
এ পোকাটি এ দেশে দেখা অন্যান্য পাতার বিটলদের চেয়ে আকারে বড়, দেহের দৈর্ঘ্য প্রায় ১১ থেকে ১৩ মিলিমিটার, ডানার রং চকচকে কমলা, ডানার পিছনের দিকে বড় দুটো ডিম্বাকার কালো ফোঁটা রয়েছে। দেহটা উপবৃত্তাকার, পিছনের প্রান্ত কিছুটা সুচালো। এরা সাধারণত পাতার ওপরে থাকে। তবে প্রতিকূল অবস্থা বুঝলে কখনো কখনো তারা পাতার নিচের পিঠে চলে যায়, এমনকি পাতা থেকে ঝাঁপ দিয়ে নিচে পড়ে শুকনো পাতার মধ্যে লুকিয়ে পড়ে। এরা পর্ণভোজী। প্রাপ্তবয়স্ক পোকা ও তার বাচ্চারা অমললতা গাছের কচি পাতা ফুটো করে খেতে পছন্দ করে। অমললতা এ দেশে একটি লতানো বিরুৎ শ্রেণির আগাছা। বাচ্চাদের দেহের রং হলদে ও লম্বাটে। মে থেকে জুলাই মাসে এদের বেশি দেখা যায়। প্রবল বৃষ্টিতেও এদের কোনো অসুবিধা হয় না। তখন তারা ঘন পাতার আড়ালে আশ্রয় নেয়। বাচ্চারা পরিপূর্ণভাবে বড় হলে মূককীট বা পুত্তলি দশায় যাওয়ার জন্য গাছ থেকে মাটিতে নেমে পড়ে ও হামাগুড়ি দিয়ে সুবিধাজনক কোনো জায়গা খুঁজতে থাকে। সে ধরনের জায়গা পেলে মাটিতে পুত্তলি দশায় যায় ও সেখানে কিছুদিন কাটানোর পর পূর্ণাঙ্গ পোকা হয়ে বেরিয়ে আসে এবং গাছে উঠে খাদ্যের সন্ধানে ঘুরতে থাকে।
পাতা বিটল পোকা কলিওপ্টেরা বর্গের ক্রাইসোমেলিডি গোত্রের Oides palleata প্রজাতির একটি পোকা। ভারত, মায়ানমার, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, লাওস, ভিয়েতনাম, চীন ও তাইওয়ানে এ পোকা আছে। বাংলাদেশে এ পোকাটি নিয়ে বিশদ গবেষণা করা যেতে পারে। কোনো ফসলের ক্ষতি করে কি না, তা খতিয়ে দেখা যেতে পারে। কেননা, এ গণের পোকারা ফ্যাবেসি, পোয়েসি, রুবিয়েসি, কিউকারবিটেসি, মালভেসি, রোজেসি, রুটেসি ইত্যাদি গোত্রের উদ্ভিদের খাদক বলে জানা গেছে। পোকাটি এ দেশের পোকামাকড়ের তালিকায় নথিভুক্ত না হয়ে থাকলে সে উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশবিদ