৯ বছর আগের কথা। তারিখটি স্পষ্ট মনে আছে, ২০১৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর। পাখি-প্রাণীর সন্ধানে মৌলভীবাজারের একটি সংরক্ষিত বনে যাব। ঢাকা থেকে আমরা দুজন এবং চট্টগ্রাম থেকে একজন ইতালিয়ানসহ দুজন, মোট চারজন। ভোরে ঢাকা থেকে রওনা হয়ে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার আদমপুর বাজারে পৌঁছাতে পৌঁছাতে দুপুর হয়ে গেল। ক্ষিদে পেট চোঁ চোঁ করছে। আদমপুর বাজারে তেমন কোনো ভালো রেস্তোরাঁ নেই। ভাতের হোটেল মাত্র দু-তিনটি। আলু ভর্তা আর ডিম তরকারি আছে। এ ছাড়াও আছে মাছের তরকারি। আলু ভর্তা আর ডিম তরকারি দিয়ে ভরপেট খেলাম। প্রচণ্ড ক্ষুধা থাকায় অমৃতের মতো স্বাদ লাগল!
দুপুরের খাবার সেরে সিএনজিচালিত অটোরিকশাযোগে আদমপুর বিটের কাউয়ার গলা এলাকায় এলাম। বনবিভাগের রেস্ট হাউসটি টিলার ওপরে। রাস্তা এক জায়গায় কাটা। তাই অটোরিকশা নিয়ে রেস্ট হাউস পর্যন্ত যেতে পারলাম না। মাঝ রাস্তায় নেমে যেতে হলো। এরপর পিঠে ও হাতে ব্যাগ নিয়ে প্রায় সিকি কিলোমিটার পথ হাঁটলাম। ভরপেট খাওয়ার পর মালপত্রসহ হাঁটতে কিছুটা কষ্টই হলো। রেস্ট হাউসে এসে ব্যাগপত্র রেখে হাত-মুখ ধুয়ে বনে যাওয়ার কেমো ড্রেস পরে ক্যামেরা গলায় রওনা হলাম। রুম থেকে বের হয়ে পাশের গাছে একটি পাখি ক্যামেরার ভিউ ফাইন্ডারে চোখ রেখে ক্লিক করছি, কিন্তু ক্লিক হচ্ছে না। এরপর বহু চেষ্টা করেও ক্যামেরাটিকে সচল করা গেল না। পুরো ট্যুরটাই নষ্ট হয়ে যাওয়ার অবস্থা।
মূল ক্যামেরা অর্থাৎ ডিএসএলআরটি নষ্ট হলেও সঙ্গে একটি বিকল্প পয়েন্ট অ্যান্ড শুট ক্যামেরা ছিল। তবে সেটা দিয়ে ঠেকা কাজ চললেও ভালো ছবি তোলা কঠিন। তারপরও মন্দের ভালো। যেহেতু ঢাকা না যাওয়া পর্যন্ত ডিএসএলআর ক্যামেরাটি ঠিক করা যাচ্ছে না, কাজেই আগামী দুদিন এই ক্যামেরার ওপরই নির্ভর করতে হবে। ক্যামেরাসংক্রান্ত জটিলতার কারণে প্রায় আধঘণ্টা সময় নষ্ট হয়ে গেল। আর দেরি করা যাবে না। রোদটুকু চলে গেলে ছবি ভালো হবে না।
রেস্ট হাউস থেকে বের হতে হতে বিকেল সাড়ে ৩টা বেজে গেল। প্রথমেই একটি ভ্যাদাটুনির দেখা পেলাম। এরপর ছোট ছোট হলদে পাকা নাম না জানা বুনো ফলভর্তি এক গাছে একঝাঁক ছোট হরিয়ালের দেখা মিলল। পাকা ফলে সমানে ঠোঁট চালাচ্ছে আর উদর পূর্তি করছে পাখিগুলো। এমনিতেই ক্যামেরাটি তেমন একটা ভালো না। তাই ধীরে-সুস্থে ও সাবধানে ওদের কিছু ছবি তুললাম। একেবারে মন্দ হলো না।
চারটা বেজে দু-মিনিট। সামনের দিকে হাঁটা দিলাম। প্রায় মিনিট পনের হাঁটলাম। বুলবুলি, ফিঙ্গে আর দোয়েল ছাড়া তেমন কোনো পাখি চোখে পড়ল না। হাঁটতে হাঁটতে বনের পাশের একটি ধানী জমির সামনে চলে এলাম। জমির বেড়ার ওপর কালচে-হলুদ রঙের এক পতঙ্গের দেখা পেলাম। পতঙ্গটিকে আগে কখনো দেখেছি বলে মনে হলো না। ওর ছবি তোলার পর কাছেপিঠে গাঢ় হলুদ রঙের একই আকার ও চেহারার আরেকটি পতঙ্গের দেখা পেলাম। যদিও পতঙ্গ দুটিকে আগে দেখেছি বলে মনে হলো না, কিন্তু পাখির খোঁজে থাকায় ওদেরকে তেমন একটা গুরুত্ব দিলাম না। তবে দু-তিনটি সাক্ষী ছবি নিয়ে রাখলাম। এরপর আরেকটি পতঙ্গের দেখা পেয়ে ওর ছবি তুলে রেস্ট হাউসের দিকে ফিরতি পথ ধরলাম।
এতক্ষণ কালচে-হলুদ ও গাঢ় হলুদ রঙের যে পতঙ্গ দুটির কথা বললাম ওরা এদেশের এক দুর্লভ প্রজাতির ফড়িং। প্রথমটি পুরুষ ও দ্বিতীয়টি স্ত্রী। প্রজাতিটির কোনো বাংলা নাম নেই। ইংরেজি নাম Black Stream Glider, Black Marsh Glider বা Indigo Dropwing। যেহেতু শাব্দিক অর্থ কালো জলচারী, তাই আমি এটির নাম দিয়েছি কৃষ্ণ জলচারী। লিবেলুলিডি (Libellulidae) গোত্রের ফড়িংটির বৈজ্ঞানিক নাম Trithemis festiva (ট্রিথেমিস ফেস্টিভা)। দুর্লভ এই ফড়িংটি বিশ্বব্যাপী ব্যাপক বিস্তৃত। গ্রিস থেকে সাইপ্রাস, তুরস্ক হয়ে বাংলাদেশসহ পুরো এশিয়া হয়ে নিউগিনি পর্যন্ত দেখা যায়।
কৃষ্ণ জলচারীর উদর ২২ থেকে ২৮ মিলিমিটার। পেছনের ডানা ২৬ থেকে ৩২ মিলিমিটার। পুরুষের বুক গাঢ় নীল ও কমলা দাগসহ উদর নীলচে; বেগুনি আভাসহ চোখের ওপরটা গাঢ় বাদামি ও পা কালো। বুকে গাঢ় দাগছোপসহ স্ত্রী বাদামি-হলুদ। উভয় লিঙ্গের ডানাই স্বচ্ছ।
ফড়িংটিকে দেশের উত্তরপূর্ব (সিলেট বিভাগ), দক্ষিণপূর্ব (চট্টগ্রাম বিভাগ) ও মধ্যাঞ্চলে (ঢাকা বিভাগ) দেখা যায়। এটি গহিন বনের ভেতরে জলধারা, নদী ও খালের কাছে বাস করে। জলধারা, নদী ও খালের পাশে পাথরের ওপর বসে থাকতে দেখা যায়। এ ছাড়াও জলজ উদ্ভিদ ও শুকনো ডালপালায়ও দেখা যায়। মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ওড়াউড়ি করে। ধীরে প্রবহমান জলধারা ও নদীতে প্রজনন করে।
লেখক: পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ