রাজবাড়ী শহর থেকে সাত কিলোমিটার দুরে সদর উপজেলার বাণিবহ ইউনিয়নের শিবরামপুর গ্রামের নিভৃতপল্লির একটি পুরনো বাড়ি। তার নাম ‘কর বাড়ি’। চারদিকে সবুজ গাছপালা, মাঝখানে এক শান্ত পুকুর। আর সেই পুকুরপাড়ের প্রতিটি গাছ যেন এখন পাখিদের রাজ্য। সকাল-বিকেলে চোখ মেললেই দেখা যায় সাদা আর ধূসর পাখির ঝাঁক কখনো গাছের ডালে বসে, কখনো দল বেঁধে আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছে।
গত সাত-আট মাস ধরে এই বাড়ির প্রতিটি গাছে বাসা বেঁধেছে হাজারো অতিথি পাখি। কোনটি ডিম দিয়েছে, কোনটি আবার বাচ্চা ফুটিয়েছে। গাছের পাতার আড়ালে ডজন ডজন বাসা, চারপাশে কিচিরমিচির শব্দ যেন প্রকৃতির এক জীবন্ত চিত্রকর্ম।
কর বাড়ি ঘুরে দেখা যায়, বাড়িটিতে আম, কাঁঠাল, মেহগনি, শিশু, কড়ইসহ অসংখ্য গাছ। বাড়ির পেছনে রয়েছে বড় একটি পুকুর। তার চারদিকের গাছেই বাসা বেঁধেছে পাখিরা। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কিচিরমিচির শব্দে মুখর থাকে গোটা এলাকা।
শিবরামপুরের কর বাড়ি এখন শুধু একটি গ্রামীণ বাড়ি নয়, পরিণত হয়েছে প্রকৃতিপ্রেমীদের ভ্রমণস্থলে। প্রতিদিনই স্থানীয় মানুষ, শিক্ষার্থী ও দূর-দূরান্ত থেকে আগত দর্শনার্থীরা ভিড় করছেন পাখি দেখতে। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ পাখিদের শব্দ রেকর্ড করছেন।
কর বাড়ির সদস্য আকাশ কর জানান, গত আট মাস ধরে অতিথি পাখিরা এখানে অবস্থান করছে। দিনের বেলায় খাবারের খোঁজে যায়, বিকেলে আবার ফিরে আসে। সারাক্ষণ কিচিরমিচির শব্দে বাড়িটা প্রাণবন্ত লাগে। আমরা কেউই তাদের বিরক্ত করি না। পাখিদের যেন নিরাপদে থাকতে পারে, সেটি দেখার চেষ্টা করি।
তিনি আরও বলেন, 'একসময় কিছু শিকারি রাতে এসে পাখি শিকার করতেন। আমরা সবাই মিলে তাদের বাধা দিয়েছি। এখন কেউ আর আসে না।'
দর্শনার্থী নেহাল আহমেদ বলেন, 'এমন দৃশ্য জীবনে প্রথম দেখলাম। শত শত পাখির কিচিরমিচির শুনে মন ভরে গেছে। এগুলো যেন নিজের মতো করে থাকতে পারে এটাই চাই। কেউ যেন তাদের বিরক্ত না করে।'
তবে স্থানীয় পাখিপ্রেমীরা বলছেন, অনেকেই ড্রোন ব্যবহার করে পাখির ছবি তুলছেন, যা তাদের আতঙ্কিত করছে।
পাখিপ্রেমী সাংবাদিক লিটন চক্রবর্তী বলেন, 'ড্রোনের শব্দে পাখিরা ভয় পায়। আমরা যারা পাখি দেখতে আসি, তাদের উচিত সচেতন থাকা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।'
রাজবাড়ী সরকারি আদর্শ মহিলা কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর মোহাম্মদ নুরুজ্জামান জানান, পরিযায়ী পাখি মূলত শীতপ্রধান দেশ থেকে আসে। ওরা এখানে আসে খাবার ও বংশ বিস্তারের উপযোগী পরিবেশ খুঁজে। ছোট মাছ, শামুক, পোকামাকড় খেয়ে তারা জীবনধারণ করে। এরা পরিবেশের জন্য অত্যন্ত উপকারী। তাদের মল মাটির উর্বরতা বাড়ায়। ফলে স্থানীয় প্রতিবেশ ব্যবস্থার ভারসাম্য বজায় থাকে।
তিনি আরও বলেন, 'বালিহাঁসসহ নানা প্রজাতির পরিযায়ী পাখি দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে মাইগ্রেট করে। বাংলাদেশে এই কর বাড়ির মতো স্থানগুলো তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থল।'
রাজবাড়ী বন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মীর সায়েদুর রহমান জানান, 'আমাদের একজন স্টাফ প্রতিদিন বিকেলে সেখানে যান। এলাকার মানুষদের সচেতন করা হচ্ছে। একটি সাইনবোর্ডও দেওয়া হবে। আগে পাখি শিকারের প্রবণতা ছিল, কিন্তু এখন সেটি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়েছে।
তিনি বলেন, 'এ ধরণের উদ্যোগ যদি সারাদেশে নেওয়া যায়, তাহলে পরিযায়ী পাখিদের নিরাপদ আবাসস্থল আরও বাড়বে।'
রাজবাড়ীর কর বাড়ি আজ শুধু একটি গ্রামের প্রতীক নয়, এটি হয়ে উঠেছে প্রকৃতি আর মানুষের সহাবস্থানের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। হাজারো পরিযায়ী পাখির কিচিরমিচিরে মুখর এই বাড়ি যেন বলে দেয় যেখানে ভালোবাসা ও নিরাপত্তা থাকে, সেখানেই প্রকৃতি তার সুর তোলে সবচেয়ে সুন্দরভাবে।
সুমন বিশ্বাস/মৌসুমী/