ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল পেরিয়ে রসায়ন বিভাগের সামনে গেলে ইংরেজি ডি আকৃতির একটা বাগান চোখে পড়ে। বাগানটার চারপাশে রাস্তা। পূর্ব দিকের সোজা রাস্তাটার পাশে ছয়টা নাগকেশরগাছ আছে। বাগানটার মাঝখানে রয়েছে একটি দুর্লভ গাছ ‘সিলভার ওক’। এই সিলভার ওকগাছে ফুল ফুটেছে কি না, খোঁজ নিতে মাঝে মাঝে সেখানে যাই।
এবার কার্তিকের এক ভোরে সেখানে গিয়েছিলাম। সিলভার ওকগাছে ফুলের খোঁজ করলাম। ফুল ফোটেনি। তবে দেখলাম, ছয়টা নাগকেশরগাছে ফুল ফুটতে শুরু করেছে। কার্তিক মাস থেকে নাগকেশর ফুল ফোটা শুরু হয়। আর ফাল্গুন মাস পর্যন্ত তা অবিরাম ফুটতে থাকে। চৈত্র মাসেও অল্প কিছু ফুল থাকে। গত বছরের ফাল্গুনে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনার ভেতরে এ রকম ডি আকৃতির নাগকেশরগাছের দীর্ঘ সারির পুষ্পশোভিত গাছ দেখার সুযোগ হয়েছিল। ছাতার মতো ঘন সবুজ পত্রপল্লবের ভেতর যেন ফুলের খই ফুটছিল, অসাধারণ সেই সৌন্দর্য। হালকা মিষ্টি গন্ধে বাতাসটা মধুময় হয়ে উঠেছিল। আর ফুলে ফুলে ভিড় জমিয়েছিল অসংখ্য মৌমাছি।
চৈত্র মাসে নাগকেশরগাছে যেসব ফুল থাকে, সেসব কেবল পাপড়ি খসে পড়ার দলের। সবুজ ঘাসের ওপর ঝরে পড়ে সাদা সাদা পাপড়ি, সে শোভাও কম নয়। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার একটি গানে সেই সৌন্দর্যকে তুলে ধরেছেন এক ব্যথাতুর অভিব্যক্তিতে। লিখেছেন-
‘মালতী মঞ্জরি ফুটিবে যবে অলস বেলায়
প্রিয় হে প্রিয় মোরে স্মরিও সেই সন্ধ্যায়॥
ঝরা পল্লবে ফেলি দীর্ঘ শ্বাস
কাঁদিয়া ফিরিবে যবে চৈতী বাতাস,
নাগকেশরের ঝরা কেশর দলে খুঁজিও আমায়॥’
বাংলা, হিন্দি ও সংস্কৃত ভাষায় এ গাছের নাম নাগকেশর। তবে কন্নড় ভাষায় এর নাম নাগকেশরা আর তেলেগু ভাষায় নাগকেশরম। পূর্ব সিলেটের একটি লোকগীতিতেও নাগকেশরের নাম পাওয়া যায়- ‘নাচেন ভালো সুন্দরী লো/ বাঁধেন ভালা চুল,/ যেন হেলিয়া দুলিয়া পড়ে/ নাগকেশরের ফুল।’
সিলেটের নাগকেশর সম্পর্কে নিসর্গী দ্বিজেন শর্মা তার ‘শ্যামলী নিসর্গ’ বইয়ে লিখেছেন, ‘শ্রীহট্টের পূর্বাঞ্চলে গাছটি প্রায়ই চোখে পড়ে। এটি আমাদের প্রাকৃত তরু কি না বলা কঠিন। তবে অযত্নেও সিলেটে নাগেশ্বর জন্মে। দৃঢ়তা, গঠনসৌষ্ঠব, দীর্ঘ জীবন এবং উচ্ছ্বসিত সুগন্ধি প্রস্ফুটনের ঐশ্বর্যে ওর সমাদর সর্বত্র। বিশেষত এই ফুল হলো পূজা ও গৃহসজ্জার আকর্ষণীয় উপকরণ। তাই মন্দিরের অঙ্গন ও উদ্যান এ ছাড়া পূর্ণ নয়।’
এ ফুল যে দেবতার পূজায় লাগানো যায়, সে কথা নজরুলও জানতেন। তিনি তার রাজা হরিশচন্দ্র লেটোগানে লিখেছেন-
‘ফুল তুলিব সাজি ভরে, ফুল তুলিব আজ
পত্র ফুলে হবে এবে, দেব পূজার কাজ॥
নাগকেশর, কিংশুক ফুল,
মল্লিকা, যূথিকা দুল দুল,’
শোভা, সুগন্ধ, পবিত্রতা- এ তিনটিই নাগকেশর ফুলের আসল গৌরব। দুধসাদা ফুলগুলো যেন শুদ্ধতা ও শান্তির প্রতীক। গাছের ডালগুলো যেন মুক্ত বেণীর মতো, তাতে ফুলগুলো বাতাসে যেভাবে দোলে তাতে এ উপমা অযথার্থ মনে হয় না।
নজরুলের অগ্রন্থিত ‘মীরা’ কবিতাতে বসন্ত দিনে ফোটা নাগকেশর ফুলের সৌরভ যেন ছাপিয়ে গেছে তার সৌন্দর্যকে। ফাল্গুনের জ্যোৎস্নাভেজা রাতে সে সৌরভ যেন আরও তীব্র হয়ে মাতাল করে দেয়-
‘জ্যোস্না সিক্ত ফাল্গুন-বন-পুষ্প ছানি’
ভরেছ শিশির শীশমহলে সে খোসবু আনি।
নাগ কেশরের ফণা-ঘেরা মউ করিয়া খালি
সাজায়েছ তব গন্ধ উতল প্রীতির ডালি।’
নাগকেশর বা নাগেশ্বর চাঁপা চিরসবুজ প্রকৃতির বৃক্ষ। এটি আমাদের কাছে বেশি পরিচিতি পেয়েছে নাগেশ্বর নামে। এর উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Mesua ferrea ও গোত্র ক্লুসিয়েসী। ‘মেসুয়া’ এবং ‘ফেরিয়া’ অর্থ লৌহ।
নাগকেশরের আসল সৌন্দর্য ফুল নয়, তার গাছ। সুন্দর পিরামিড আকারের ঝোপালো গাছ, চিরসবুজ সরু বর্শা ফলার মতো মসৃণ পাতা নাগেশ্বর চাঁপার প্রাকৃতিক শ্যামলী রূপ। এর মরচে ধরা লোহা রঙের প্রধান কাণ্ড যেন একটি ত্রিভুজ সবুজ পিরামিড আকৃতির কোণ মাথায় নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এ গাছের যেমন ঔষধি গুণ আছে, তেমন আছে এর আসবাব মূল্য। এর উদ্ভিদতাত্ত্বিক নামেও সে পরিচয় মেলে।
তাই নাগেশ্বর চাঁপার ইংরেজি নাম সিলোন আয়রন উড। বাংলায় লোহা কাঠ বলতে যা বোঝায়, নাগেশ্বর চাঁপা যেন তাই। ঘুণপোকা ও উইপোকারাও এ কাঠের ক্ষতি করতে পারে না। কাঠ অত্যন্ত শক্ত, গাছ বাড়ে খুব ধীরে। বাঁচে অনেক বছর।
নাগকেশর ফুলকেও একেবারে হেলা করা যায় না। সাদা রঙের ফুল সুমিষ্ট গন্ধে মাতিয়ে তোলে দীর্ঘকাল। খাটো কেশরগুচ্ছের ছোট একটা চাকতির চারদিকে সাজানো থাকে সাদা রঙের চারটি পাপড়ি। লাটিমের মতো ছোট ফল হয়। বীজ বাদামি ও শক্ত। বীজের মাধ্যমে নাগকেশরের বংশবিস্তার হয়।
লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ