এ বছরের ৭ নভেম্বরের ঘটনা। সকালে ঢাকা থেকে বাসে খুলনার পথে রওনা হলাম। বাস এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে ছুটে চলেছে। কী চমৎকার রাস্তা! তার চেয়েও চমৎকার লাগছে দুই সড়কের মধ্যবর্তী বিভাজককে। সড়ক বিভাজকে ফুটে আছে গোলাপি ও সাদা করবী ফুল। থোকা থোকা করবী ফুল দ্রুত চলা গাড়ির হাওয়ায় অনবরত দুলছে। দেখে মনে হয়, ফুলগুলো একে অপরের সঙ্গে খুনসুটিতে মত্ত। যেন পথটা করবীর হৈমন্তী উচ্ছ্বাসে উদ্ভাসিত। তবে করবী একা নয়, তার সঙ্গে ফুটেছে হলুদ-কমলা রঙের রাধাচূড়া ও শ্বেতকাঞ্চন ফুল। এ ছাড়া সড়কের পাশ ধরে ফুটে আছে সোনারঙা আকাশমণি ফুল। সব মিলিয়ে সকালটা ফুলময় হয়ে উঠল। এই দৃশ্য ফরিদপুরের ভাঙ্গার প্রায় টোলপ্লাজা পর্যন্তই দেখা গেল। এরপর যেন সবই হাওয়া!
গত মাসে পূর্বাচলের ৩০০ ফুট সড়ক বিভাজকে অনেক করবী ফুল দেখেছিলাম। শীত আসছে, করবী ফুলও যেন ফুরিয়ে আসছে।
গত ২৮ অক্টোবর সকালে ফার্মগেটে তুলা ভবনের আঙিনায় করবী ফুলের দেখা পেয়েছিলাম। কয়েকটা ডালের আগায় অল্প কিছু ফুল ফুটেছিল। সেগুলো ছিল গোলাপি রঙের করবী। সেই একই প্রাঙ্গণেই গত বছর কয়েকটা সাদা করবী ফুটতে দেখেছিলাম। সেগুলোকে বলে শ্বেতকরবী। সর্বশেষে গত ১৩ নভেম্বর ভোরবেলায় রমনা পার্কে মসজিসংলগ্ন বাগানে একটা করবীগাছে অনেকগুলো ফুলের দেখা পেলাম। সে ফুলের রং টকটকে লাল। এই করবীকে বলে রক্তকরবী। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই রক্তকরবীর নামেই লিখেছিলেন ‘রক্তকরবী’ নাটক। আবার হলুদ রঙের করবী ফুলকেও বলা হয় হলুদ করবী। এ চার রঙের করবীর মধ্যে গোলাপি করবীটাই যেন বেশি সুন্দরী।
কিন্তু করবী সুন্দরী হলে কী হবে? ওর সারা গায়ে শুধু বিষ আর বিষ। বাস্তবে সে এক বিষাক্ত সুন্দরী।
করবীগাছের ফুল, পাতা, বাকল, ডাল ও শিকড় সবই বিষাক্ত। এ গাছের একটি পাতা শিশুর মৃত্যুর জন্য যথেষ্ট। ১০ থেকে ২০টি পাতার রস খেলে প্রাপ্তবয়স্কদের মৃত্যু হতে পারে। গবাদিপশুর ক্ষেত্রেও এরূপ। পাতা বা ডালের রস পেটে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রথমে ত্বক অসাড় হয়ে আসে। এরপর বমি হয়। রক্ত বমিও হতে পারে। সেই সঙ্গে শুরু হয় পাতলা পায়খানা। শেষে হৃদযন্ত্র বিকল হয়ে যায়।
করবীর সে বিষের কথা কবি নজরুল ইসলামও জানতেন। সেকালেও কেউ দুঃখ পেলে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে হয়তো করবীর সাহায্য নিত। নজরুলের একটি গানে সে কথার সাক্ষ্য পাওয়া যায়- ‘কেহ দুঃখ দিয়া গেল কেহ ব্যথা নিয়া গেল/ কেহ সুখ পিয়া গেল কেহ বিষ করবী তাহারা কোথায় আজ তাহারা কোথায়॥’কবি নজরুলের অসাধারণ পর্যবেক্ষণ দক্ষতার কথা ভেবে আশ্চর্য হই। তিনি তার আরেকটি গানে হেমন্তকে বরণ করতে গিয়ে করবীকে টেনে এনেছেন। তার মানে তিনি জানতেন, হেমন্তে করবী ফুল ফোটে।
লিখেছেন- ‘হেমন্তিকা এসো এসো হিমেল শীতল বন-তলে
শুভ্র পূজারিণী বেশে কুন্দ-করবী-মালা গলে॥’
শ্বেতকরবীও তার চোখ এড়ায়নি। তিনি মুসাফিরকে না চিনলেও শ্বেতকরবীকে ঠিকই চিনেছিলেন। তার ‘চক্রবাক’ কাব্যগ্রন্থের ‘তুমি মোরে ভুলিয়াছ’ কবিতায় শ্বেতকরবীর নাম পাই-
‘আমি তো কেতকী নহি, আমার কি লাভ
ওই শাওনের জলে? কদম্ব যূথীর
সখারে চাহি না আমি। শ্বেত-করবীর
সখি আমি। হেমন্তের সান্ধ্য কুহেলিতে
দাঁড়াই দিগন্তে আসি’, নিরশ্রু-সঙ্গীতে
ভ’রে ওঠে দশ দিক! আমি উদাসিনী।
মুসাফির! তোমারে ত আমি নাহি চিনি!’
করবী বহুবর্ষজীবী সপুষ্পক উদ্ভিদ। এটি চিরসবুজ গুল্মপ্রকৃতির উদ্ভিদ। এ গাছ দ্রুত বর্ধনশীল। এটি ৪ থেকে ৮ মিটার লম্বা হয়। ডাল-পাতা ভাঙলে দুধের মতো আঠালো কষ বের হয়। ডালপালা খাড়াভাবে জন্মে। পাতা সরু ও লম্বা, অগ্রভাগ তীক্ষ্ণ। গ্রীষ্ম থেকে হেমন্তকালে ডালের মাথায় থোকা ধরে সাদা, গোলাপি, লাল ইত্যাদি রঙের ফুল ফোটে।
সাদা, লাল, হলুদ ও গোলাপি করবী সবই অ্যাপোসাইনেসি গোত্রের গাছ। করবীর ইংরেজি নাম Oleander, উদ্ভিতাত্ত্বিক নাম Nerium oleander. করবীর জন্মভূমি উত্তর আফ্রিকা, পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় এলাকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া। বিষাক্ত হলেও করবীকে ফুলের সৌন্দর্যের জন্য বাগানে ও উদ্যানে এ গাছ লাগানো হয়।
লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ