পাখিটিকে প্রথম দেখি রাঙামাটি জেলার কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানে এক যুগেরও বেশি আগে। উদ্যানের বড় ছড়ার পাশে ঝরা পাতার ওপর বসে রোদ পোহাচ্ছিল। ধূসরাভ-সাদার ওপর বিভিন্ন ডিজাইনের কালচে ফুটকি ও দাগছোপে চমৎকার লাগছিল ক্ষুদ্র পতঙ্গটিকে। সাধারণের চোখ এড়িয়ে গেলেও আমরা যারা বন্যপ্রাণী নিয়ে কাজ করি তাদের চোখ এদেরই খুঁজে বেড়ায়। কাজেই ক্ষুদ্র পতঙ্গটির সঙ্গে কিছুটা সময় কাটালাম। ওর স্বভাব-চরিত্র বোঝার চেষ্টা করলাম। বিভিন্ন অ্যাঙ্গেলে কিছু ছবি তুলে বিরল ও দুর্লভ পাখি-প্রাণীর সন্ধানে সামনের দিকে এগিয়ে চললাম।
এরপর বহু বছর কেটে গেছে। ২০১৬ সালের পর থেকে এসব পতঙ্গের পেছনে তেমন একটা সময় দিইনি। অবশ্য বছরখানেক ধরে আবারও ওদের খোঁজে মাঠে নেমেছি। গত ১ ও ২ ডিসেম্বর গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষ প্রাণী চিকিৎসার শিক্ষার্থীদের বন্যপ্রাণী প্রজনন ও রোগব্যাধিসংক্রান্ত ব্যবহারিক ক্লাসে পাখি-প্রাণী পর্যবেক্ষণের একপর্যায়ে ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট অনুষদের আমলকী বাগানের উল্টো পাশের ঝোপঝাড়ে বুনো ডেইজি বা ভৃঙ্গরাজ (সিঙ্গাপুর ডেইজি) ফুলের রস পানরত অবস্থায় পতঙ্গটিকে আবারও দেখলাম। পরের দিন ক্লাস শেষে ফেরার পথে বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাবাগানের কাছে একটি বুনো উদ্ভিদের পাতার ওপর বসে থাকতে দেখা গেল পতঙ্গটিকে। দুই দিনে বেশ কটি চমৎকার ছবি তুললাম। বহুদিন পর চমৎকার এ পতঙ্গ দেখে মন-প্রাণ উজ্জীবিত হয়ে উঠল।
এতক্ষণ ক্ষুদ্র ও চমৎকার যে পতঙ্গটির গল্প বললাম সে এ দেশের বহুল দেখা ও স্বল্প ঝুঁকিসম্পন্ন প্রজাপতি তিলামদন। পশ্চিমবঙ্গে তুরা নামে পরিচিত। ইংরেজি নাম Lime Blue (লাইম ব্লু)। লাইসিনিডি (Lycaenidae) গোত্রের প্রজাপতিটির বৈজ্ঞানিক নাম Chilades lajus (চিলাডেস লাজুস)। বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এটির দেখা মেলে।
তিলামদন ছোট্ট আকারের প্রজাপতি। প্রসারিত অবস্থায় এক ডানা থেকে অন্য ডানার বিস্তার মাত্র ২৬ থেকে ৩০ মিলিমিটার। এটি একটি লেজবিহীন প্রজাপতি। এর দুটি রূপ রয়েছে, বর্ষা বা আর্দ্র মৌসুম রূপ ও শুকনো মৌসুম রূপ। দুই রূপের প্রজাপতির বর্ণে কিছুটা পার্থক্য চোখে পড়ে।
বর্ষাকালীন রূপের পুরুষ প্রজাপতির ডানার ওপরের অংশ নীলচে বেগুনি, সামনের ডানার পক্ষমূল বা গোড়া ও পার্শ্বপ্রান্তে ফ্যাকাশে নীল আভা এবং প্রান্তে সরু বাদামি রেখা দেখা যায়। পেছনের ডানার পার্শ্বপ্রান্ত কালচে; পার্শ্বপ্রান্তের চুল বা সিলিয়া সাদা ও মাঝখানে বাদামি রেখাযুক্ত। ডানার নিচের অংশ একনজরে ধূসর। সামনের ডানায় সাদা-সীমাবদ্ধ বাদামি দাগের আড়াআড়ি সারি এবং উপপ্রান্তীয় লম্বাটে দাগ রয়েছে। পেছনের ডানায় চারটি উপপক্ষমূলীয় কালো দাগ, একটি বড় উপপার্শ্বপ্রান্তীয় দাগ এবং শৃঙ্গলাকৃতির ধূসর-বাদামি দাগের সারি দেখা যায়।
অন্যদিকে এই রূপের স্ত্রী প্রজাপতির ডানার ওপরটা গাঢ় বাদামি। তবে সামনের ও পেছনের ডানার পক্ষমূল থেকে উজ্জ্বল নীল আভা ছড়িয়ে থাকে, যা ডানার বাইরের প্রান্তে পৌঁছায় না। পেছনের ডানায় অনেক সময় অস্পষ্ট সাদা বহিঃআঁচলীয় অর্ধচন্দ্রাকৃতির দাগের সারি ও বাইরে সাদা সীমাবদ্ধ কালো উপপ্রান্তীয় রেখা দেখা যায়। ডানার নিচের অংশে পুরুষের মতোই একইভাবে দাগ রয়েছে। স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে বুক-পেটে বাদামির ওপর নীল আঁশ দেখা যায়।
শুকনো মৌসুম রূপের প্রজাপতি দেখতে বর্ষাকালীন রূপের মতো হলেও ডানার ওপরের দিক তুলনামূলকভাবে ফ্যাকাশে। ডানার নিচের দিকে উভয় লিঙ্গেই পেছনের ডানার পেছন দিকে একটি বড়, ফ্যাকাশে বাদামি দাগ লক্ষণীয়। অনেক সময় ডানার নিচের অংশের রং আরও ফ্যাকাশে বা প্রায় সাদা দেখায়, বিশেষ করে স্ত্রী প্রজাপতির ক্ষেত্রে।
তিলামদন দেশব্যাপী বিস্তৃত। বনাঞ্চল ও লেবুসহ ফলের বাগানে ঘুরঘুর করতে দেখা যায়। পোষক গাছের পাশে ও ভূমির কাছাকাছি ডানা ঝাপটে উড়ে বেড়ায়। ফুলের রস পান করে। এ ছাড়া পাখির মল ও ভিজা মাটির রসও চুষে খায়, বিশেষ করে পুরুষ প্রজাপতিগুলো।
তিলামদন সারা বছর উড়ে বেড়ালেও বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী মৌসুম ছাড়া প্রজনন করে না। এরা সচরাচর লেবু, কাগজি লেবু, জাম্বুরা (বাতাবি লেবু), কমলা ইত্যাদি গাছে জীবনচক্র সম্পন্ন করে। স্ত্রী প্রজাপতি এসব গাছের কচি পাতার নিচের দিকে এককভাবে নীলচে আভাসহ ফ্যাকাশে সবুজ চাকতি আকারের ডিম পাড়ে। ডিম ফুটে কালো ও সাদা বলয়যুক্ত শূককীট বের হয়। শূককীট গাছের পাতা খেয়ে বড় হয়। ডিম থেকে শূককীট, মূককীট ও পূর্ণাঙ্গ প্রজাপতি হতে অর্থাৎ জীবনচক্র সম্পন্ন করতে ১৯ থেকে ২২ দিন সময় লাগে। তবে পূর্ণাঙ্গ প্রজাপতি মাত্র এক থেকে দুই সপ্তাহ বেঁচে থাকে।
লেখক: পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ
গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়