চাকরি জাতীয়করণের দাবিতে সচিবালয় অবরুদ্ধ করে ভাঙচুর ও হামলার মামলায় আনসার বাহিনীর ৩৭৭ সদস্যকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত।
সোমবার (২৬ আগস্ট) ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালত এই আদেশ দেন। সিএমএম আদালতে দায়িত্বরত পুলিশের ওসি (হাজত) মুরাদ হোসেন খবরের কাগজকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
এর আগে গত রবিবার (২৫ আগস্ট) রাতে সচিবালয়ের ভেতর ও বাইরে থেকে প্রথমে তাদের আটক করে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। পরে পুলিশ বাদী হয়ে তাদের নামে রাজধানীর ৪টি থানায় মামলা করে। এর মধ্যে শাহবাগ থানায় ১৯১ জন, রমনা থানায় ৯৮ জন, পল্টন থানায় ৯৫ জন, বিমানবন্দর থানায় ৬ জনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে বলে জানা গেছে। পরে পুলিশ তাদের মধ্যে ৩৭৭ জনকে আদালতে হাজির করে। এই ৪ থানায় ৪৩০ জনের নাম উল্লেখ ছাড়াও অন্তত ৪ হাজার অজ্ঞাতনামা আনসার সদস্যকে আসামি করা হয়েছে।
সোমবার তাদের আদালতে হাজির করে কারাগারে পাঠানোর আবেদন করে পুলিশ। আর আনসার সদস্যদের পক্ষে জামিন চেয়ে আবেদন করা হয়। আদালত উভয় পক্ষের শুনানি নিয়ে আসামিদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। সিএমএম আদালতে দায়িত্বরত ওসি মুরাদ হোসেন জানান, কারাগারে পাঠানো আসামিদের মধ্যে শাহবাগ থানার ১৯১ জন, রমনা থানার ৮৫ জন, পল্টন থানার ৯৫ জন ও বিমানবন্দর থানার ৬ জন রয়েছেন।
সোমবার শুনানিকালে আদালতকে জানানো হয়েছে, আনসার সদস্যরা বেআইনি সমাবেশ করেছেন। লাঠিসোঁটা নিয়ে দাঙ্গা সৃষ্টি ও সচিবালয়ে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেছেন।
তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগে বলা হয়েছে, ৮-১০ হাজার আনসার সদস্য অনুমতি না নিয়ে সচিবালয়ে প্রবেশ করেন। সেই সঙ্গে তারা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অমান্য করে সচিবালয়ে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবরুদ্ধ করেন। সচিবালয়ে ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করে সরকারি কাজে বাধা দেন। মামলায় আনসার সদস্যদের বিরুদ্ধে সচিবালয়ে গাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগও আনা হয়েছে।
আন্দোলনকারী আনসার সদস্যরা নিজেদের চাকরি জাতীয়করণসহ কয়েকটি দাবিতে কয়েক দিন ধরে রাজধানীতে বিক্ষোভ করছিলেন। এর মধ্যে রবিবার তারা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সচিবালয় ঘেরাও করে রাখেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে চাকরি জাতীয়করণের ঘোষণা দেওয়ার দাবি জানান। সচিবালয় ঘেরাও করে রাখায় সেখান থেকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বের হতে পারছিলেন না।
এর মধ্যে রাতে খবর ছাড়িয়ে পড়ে যে, সচিবালয়ে আনসার সদস্যরা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক ও অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম, সমন্বয়ক সারজিস আলম, হাসনাত আবদুল্লাহসহ অনেককে আটকে রেখেছেন। এমন খবরে শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) বিভিন্ন হল থেকে এবং রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে টিএসসির রাজু ভাস্কর্যে জড়ো হন। সেখান থেকে তারা সচিবালয়ে যান। এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় হাসনাত আবদুল্লাহসহ অন্তত ৪০ জন আহত হন। তাদের মধ্যে কয়েকজন আনসার সদস্যও রয়েছেন।
শাহবাগ থানা সূত্রে জানা গেছে, সচিবালয়ের ঘটনায় শাহবাগ থানায় পুলিশ বাদী হয়ে একটি মামলা করেছে। মামলা নম্বর-১১। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, সচিবালয়ের সামনে আনসার সদস্যরা বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে বেআইনিভাবে সচিবালয়ের মধ্যে ঢুকে পড়েন এবং সবাইকে জিম্মি করে ফেলেন। তারা সরকারি কাজে বাধা দেন এবং গাড়ি ভাঙচুর করে ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করেন। মামলার আসামিরা হলেন, নাসির মিয়া (২৬), মনিরুজ্জামান (৩৮), আহসান হাবিব (২৭), শফিকুল ইসলাম (৩৮), হাসিবুর রহমান (২৯), আসগর আলী (২৯), পিয়েল মিয়া (২৫), নিলয় দে (২৫), আব্দুস সালাম (২২), সোহরাব হোসেন (২২), জহরুল ইসলামসহ (২৭) ১৯১ জনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। শাহবাগ থানার ওসি আজাহারুল ইসলাম জানান, শাহবাগ থানায় করা মামলায় ২০৮ জন আনসার সদস্যের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অজ্ঞাত হিসেবে ২ থেকে ৩ হাজার আসামি করা হয়েছে।
রমনা থানা সূত্রে জানা গেছে, রমনা থানার এসআই শহিদুল হক বাদী হয়ে রমনা থানায় একটি মামলা করেন। মামলার আসামিরা হলেন, সবুজ মিয়া (২২), আসাদুল মোল্লা (৩০), সবুজ আলী (৩০), পারভেজ মিয়া (২৫), আব্দুল মতিন (৪০) লিটন আহমেদ (৩৫), রাজিব (৩০), হুমায়ুন কবীর (২২), দুলাল চন্দ্র দাস (২৫), আব্দুল কাদেরসহ (৪০) ৯৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলার এজাহারে পুলিশের কাজে বাধাদান, আক্রমণ, পুলিশ ও ছাত্র-জনতাকে হত্যার উদ্দেশ্যে মারধর করার অভিযোগ আনা হয়েছে। ডিএমপির রমনা বিভাগের ডিসি সারোয়ার জাহান জানান, রমনা থানায় ৯৮ জনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
এদিকে পল্টন থানাও আন্দোলনরত আনসার সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। মামলায় এজাহারনামীয় আসামি ৯৫ জনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। মামলার এজাহারে সচিবালয়ে হামলা, ভাঙচুরের অভিযোগ আনা হয়েছে। এই মামলাও অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়াও বিমানবন্দর থানার পুলিশ জানায়, সচিবালয়ের ঘটনায় ৬ জন আনসার সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের আদালতে পাঠানো হয়েছে।
সচিবালয় ঘিরে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা
এদিকে সোমবার সরকারি ছুটির দিন বাংলাদেশ সচিবালয় ছিল একেবারে ফাঁকা। সচিবালয়ের সব গেটের সামনে পুলিশ নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করে। পুলিশের পাশাপাশি সেনাবাহিনীকেও মোতায়েন থাকতে দেখা গেছে। পাশাপাশি সাদাপোশাকে পুলিশের সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেছেন।
সোমবার সচিবালয়ে আনসার সদস্যদের দেখা যায়নি।
পুলিশ ধারণা করেছিল যে, বিক্ষুব্ধ আনসার সদস্যরা আবারও সচিবালয় অবরোধ করতে পারেন। তবে কালকে সেখানে কাউকে দেখা যায়নি।