ঢাকা ৬ আষাঢ় ১৪৩১, বৃহস্পতিবার, ২০ জুন ২০২৪

যানজট এড়াতে ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরযানের ব্যবহার সীমিত রাখতে হবে

প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৪, ১২:০৭ পিএম
আপডেট: ২৪ মে ২০২৪, ১২:০৭ পিএম
যানজট এড়াতে ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরযানের ব্যবহার সীমিত রাখতে হবে
নজরুল ইসলাম

মহানগরী বলতে বেশ একটি বড় এলাকা বা অঞ্চলকে বোঝায়। আমরা যাকে পুরান ঢাকা বলে জানি, তার বিস্তৃতি বুড়িগঙ্গার উত্তর পাড় থেকে পুরোনো রেললাইন সড়ক পর্যন্ত। অর্থাৎ এর উত্তর প্রান্তে অবস্থিত নগর ভবন বা ঢাকা সিটি করপোরেশন ভবন। পৃথিবীর যেকোনো মহানগরীর তুলনায় এই ঘনত্ব অত্যন্ত বেশি, এমনকি মুম্বাই কিংবা হংকংয়েও এত বেশি ঘনত্ব চোখে পড়ে না। ঢাকার উচ্চ জনঘনত্ব গড়ে উঠেছে নিচু উচ্চতার ঘরবাড়িতে। প্রধানত পুরোনো দুই-তিন-চারতলা দালান অথবা বস্তির একতলা সেমিপাকা বাড়ি, কাঁচা ঘর বা ঝুপড়ি হচ্ছে পুরান ঢাকার আবাসিক ধরন। 

ব্যবসা-বাণিজ্যও পরিচালিত হচ্ছে একই ধরনের ভবনাদি বা দালানে। সম্প্রতি পুরান ঢাকার বিভিন্ন স্থানে পুরোনো বাড়ি ভেঙে নতুন বহুতল দালান তৈরি হচ্ছে। ঢাকা মূলত গড়ে উঠেছে ষোলো থেকে উনিশ শতকের মাঝামাঝি সাড়ে ৩০০ বছরে। একেবারে গোড়ার দিকের কিছু ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভবন বা মসজিদ বা দুর্গ এখনো টিকে আছে। ঢাকার বেশির ভাগ বাড়িঘর বিগত এক শ থেকে দেড় শ বছরের মধ্যে নির্মিত। পুরান ঢাকার প্রায় গোটা এলাকাই গড়ে উঠেছে প্রাক-শিল্প বা প্রাক-মোটরযান যুগের শহর হিসেবে। এতে সড়কবিন্যাস অত্যন্ত অগোছালো, এলোমেলো। 

অধিকাংশ রাস্তাই আঁকাবাঁকা এবং সরু, এমনকি খুবই সরু। প্রশস্ত সড়ক বলতে ছিল শুধু উত্তর-দক্ষিণ জনসন রোড, নবাবপুর রোড এবং পূর্ব-পশ্চিশে ইসলামপুর-পাটুয়াটুলী রোড ও মদনমোহন বসাক রোড। এসব সড়কের প্রশস্ততা বড়জোর ২০-৪০ ফুট। অন্যান্য রাস্তা আসলে গলি, এগুলোর প্রস্থ ২০ ফুটের নিচে। অনেক গলি আছে, যার প্রস্থ ৪-৬ ফুট। ১৯৫০-এর আগে পর্যন্ত এ ধরনের সড়কব্যবস্থা নিয়েই শহর চলত। কেননা তখন শহরের লোকসংখ্যা ছিল অনেক কম; বর্তমানের ডিসিসি এলাকার ৭৫ লাখের জায়গায় মাত্র ৩ লাখ, পুরান ঢাকার বর্তমান ২০ লাখের জায়গায় বড়জোর ২ লাখ। যানবাহনের সংখ্যাও ছিল খুব কম। অধিকাংশ মানুষ ঘোড়ার গাড়ি, রিকশা, হেঁটে বা সাইকেলে চলাফেরা করত।

১৯৪৭ থেকে ২০০৩ সাল- এই দীর্ঘ সময়ে পুরান ঢাকার নতুন সড়ক তৈরি হয়েছে একেবারে হাতে গোনা কয়েকটি, যেমন- ধোলাইখাল সড়ক (পূর্ব-পশ্চিম প্রলম্বিত), নর্থ-সাউথ রোড (উত্তর-দক্ষিণ প্রলম্বিত), নারিন্দা, যাত্রাবাড়ী সড়ক এবং পুরোনো রেললাইন সড়ক। এখন বুড়িগঙ্গার ওপর দুটি সেতু তৈরি হয়েছে, এই সেতু দুটি দিয়ে হাজার হাজার গাড়ি প্রতিদিন নদী পার হচ্ছে এবং এগুলো পুরান ঢাকার ভেতর দিয়েই যাতায়াত করে। পুরান ঢাকায় অনেক পাইকারি বাজার অবস্থিত। এ ছাড়া কাঁচাবাজার, খুচরা ব্যবসার বাজার, কোর্ট-কাচারি, হাসপাতাল, স্কুল-কলেজও রয়েছে। যেহেতু পুরান ঢাকা পাইকারি ব্যবসা-বাণিজ্যেরও কেন্দ্র, সে কারণে এখানে দূরপাল্লা এবং মাঝারি ও নিকটবর্তী নানান সাইজের ট্রাক আসা-যাওয়া করে, বিভিন্ন স্থানে পার্কিংও করে।

পুরান ঢাকার অধিকাংশ রাস্তাই এত সরু যে, ফুটপাত বা সাইডওয়াক রাখার কোনো সুযোগই থাকে না। সাধারণত একটি বড় শহরের মোট ভূমির ১৫-২৫ ভাগ বরাদ্দ করতে হয় রাস্তার জন্য। সে জায়গায় ঢাকা মহানগরীতে রাস্তার পরিমাণ বড়জোর ৮ ভাগ, পুরান ঢাকায় এই অনুপাত আরও কম, সম্ভবত ৫-এর বেশি নয়। অন্যদিকে জনসংখ্যার ঘনত্ব অস্বাভাবিক রকম বেশি। ফলে সব সময়েই পুরান ঢাকায় যানজট লেগে থাকে। অধিকাংশ সড়ক এতই সরু যে, সেগুলো দিয়ে মোটরযান চলাচল করতে পারে না, অথবা বড়জোর একদিকে চলতে পারে। রিকশার সংখ্যাও এত বেশি যে, ‘পিক আওয়ারে’ পিঁপড়ার মতো পিল পিল করে একটার পেছনে একটা এগোতে পারে। শুধু যে রাস্তার দৈর্ঘ্য-প্রস্থ কম তাই নয়, অধিকাংশ রাস্তার সারফেসের অবস্থাও ভালো নয়, ফলে যান চলাচলে অসুবিধা হয়। গতিও শ্লথ হয়ে যায়। ছোটখাটো দুর্ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার।

ঢাকার সড়কব্যবস্থা কিংবা যানজট পরিস্থিতির উন্নতি করা খুব একটা সহজ কাজ নয়। উপরন্তু জনসংখ্যা বেড়েই চলেছে, পুরান ঢাকার এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায়, অথবা নতুন ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তাও বাড়ছে। ঢাকার কোনো সড়ক প্রশস্ত করা বা ভূমি অধিগ্রহণ করে নতুন সড়ক নির্মাণ করা প্রায় অসম্ভব। ব্যাপক স্কেলের ‘আরবান রিনিউয়াল’ বা ‘নগর নবায়ন’ ছাড়া পুরান ঢাকার যানজট হ্রাস করা কঠিন। দীর্ঘ মেয়াদে সদরঘাট থেকে উত্তরের টঙ্গী, গাজীপুর বা আরও দূরবর্তী কোনো স্থানের সঙ্গে (অত্যন্ত ব্যয়বহুল) পাতাল রেল বা উড়াল সড়ক (ওভারহেড এক্সপ্রেসওয়ে) যোগাযোগ হয়তো সমস্যা কিছুটা লাঘব করতে পারবে। বিকল্প হিসেবে পুরান ঢাকা থেকে বেশ কিছু ব্যবসা-বাণিজ্য ও অন্যান্য কর্মকাণ্ড বাইরে স্থানান্তর করতে হবে, মানুষও সরাতে হবে। শুধু বিকল্প নয়, অন্য উপায়ের পাশাপাশি এ কাজটি করতে হবে।

ঢাকার যানজটের সঙ্গে বাতাসদূষণের সম্পর্ক নতুন ঢাকার চেয়ে সম্ভবত কিছুটা কম সংকটাপন্ন এ কারণে যে, পুরান ঢাকায় মোটরযানের ব্যবহার বা চলাচল তুলনামূলকভাবে কম। তবে ডিজেল ব্যবহারকারী ট্রাক পুরান ঢাকায় যথেষ্ট চলাচল করে, মিনি ট্রাকের ব্যবহারও যথেষ্ট রয়েছে। এসব যানবাহন থেকে ধোঁয়া নির্গমনের মাধ্যমে বাতাসদূষণ হচ্ছে। দুই স্ট্রোকের বেবিট্যাক্সিও বাতাসদূষণের জন্য দায়ী ছিল। 

সম্প্রতি এ ধরনের যান নিষিদ্ধ করায় পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। যানবাহনের হর্নের কারণে যে শব্দদূষণ, তারও প্রকোপ নতুন ঢাকার তুলনায় পুরান ঢাকায় কম। উদাহরণস্বরূপ একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, মগবাজার, ফার্মগেট কিংবা মৌচাকে যখন শব্দদূষণ মাত্রা ১০৩-১০৪ ডেসিবেল, সদরঘাটে তখন ৮৭। বলা বাহুল্য, এই মাত্রাও গ্রহণযোগ্য মাত্রার অনেক ওপরে। ঢাকায় চলাচলকারী ট্রাক, মিনিট্রাক ইত্যাদিও অধিকাংশ বেশ পুরোনো এবং সত্যিকার অর্থে ফিটনেসহীন। বায়ুদূষণ হ্রাস করতে হলে ফিটনেসহীন বা ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন চলাচল বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি পেট্রল বা গ্যাসোলিনের মানও নিশ্চিত করতে হবে। তবে কাজটি মোটেও সহজ নয়। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে, যানজট নিরসনে মোটরযানের ব্যবহার সীমিত রাখার দিকেই দৃষ্টি দিতে হবে। (বই সূত্র: ঢাকা এখন ও আগামীতে)

লেখক: নগরবিদ এবং ইমেরিটাস অধ্যাপক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় 

বাংলাদেশে নগরায়ণ, প্রাইমেট সিটি ঢাকা এবং বিকেন্দ্রীকরণ চিন্তা

প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৪, ১০:৫৬ এএম
আপডেট: ২০ জুন ২০২৪, ১০:৫৬ এএম
বাংলাদেশে নগরায়ণ, প্রাইমেট সিটি ঢাকা এবং বিকেন্দ্রীকরণ চিন্তা
নজরুল ইসলাম

বাংলাদেশে নগরায়ণের গতি ও ধরন দীর্ঘদিন ধরে দেশের ভূগোলবিদ এবং নগর পরিকল্পনাবিদদের আলোচনার বিষয়। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদরাও তাদের চিন্তাশীল বিশ্লেষণ এবং মতামত প্রদানের জন্য তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন।

বাংলাদেশের নগরায়ণের ওপর সুচিন্তিত লেখার একজন অনুসরণকারী হিসেবে আমি সব সময় পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক অধ্যাপক নাফিস আহমদের আকর প্রবন্ধটির প্রসঙ্গ উল্লেখ করি। The Urban Pattern in East Pakistan শিরোনামের প্রবন্ধটি ১৯৫৭ সালে The Oriental Geographer-এ প্রকাশিত হয়েছিল। সেখানে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের নগরকেন্দ্রগুলোর স্থানিক বিন্যাস বিশ্লেষণ করা হয়েছিল।

তারপর থেকে আমি এবং অধ্যাপক কে. মওদুদ এলাহী, অধ্যাপক সৈয়দ আবু হাসনাত এবং খুব সম্প্রতি অধ্যাপক নাসরীন রফিকের মতো ভূগোলবিদরা বাংলাদেশের নগরায়ণ-প্রক্রিয়া এবং নগরবিন্যাসের গঠনমূলক বিশ্লেষণ করেছি। আমরা সবাই নগরায়ণ এবং দ্রুত নগর বৃদ্ধির প্রসঙ্গ তুলে ধরেছি। আমরা বৃহৎ অঞ্চল (অর্থাৎ প্রশাসনিক বিভাগ ও জেলা) বা ক্ষুদ্র অঞ্চল (উপজেলাগুলোর মতো) উভয়েরই নগরায়ণ মাত্রার ধরনটি তুলে ধরেছি। নগরায়ণের আঞ্চলিক বৈষম্যের বিষয়টিও আমাদের লেখালেখিতে গুরুত্ব পেয়েছে। তা ছাড়া ঢাকাকে কেন্দ্র করে একটি নিয়ন্তা নগর বা প্রাইমেট সিটি বৃদ্ধির প্রশ্নটি ভূগোলবিদ এবং পরিকল্পনাবিদদের মতো এখন অর্থনীতিবিদরাও পর্যালোচনা করছেন। আমাদের নগরায়ণ বিশ্লেষণে বিকেন্দ্রীকরণের মতো বিষয়ও গুরুত্ব পেয়েছে। বাংলাদেশে নগরায়ণ ধারা (অর্থাৎ গ্রামীণ থেকে শহুরে জনসংখ্যায় পরিবর্তনের প্রক্রিয়া) স্বাধীনতার পরবর্তী ৫ দশকে অত্যন্ত দ্রুত হয়েছে। ১৯৭৪ সালে নগরায়ণ মাত্রা ছিল মাত্র ৭%; এখন ৩৩%-এর বেশি। বৃদ্ধিহার প্রায় ৪%। নগরে জনসংখ্যার আকার বিশাল- ৫০ মিলিয়ন বা ৫ কোটিরও বেশি। 

জাতীয় নীতিমালা, যেমন- পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (১৯৭৩ সাল থেকে) বা জাতীয় হ্যাবিট্যট (মানববসতি) প্রতিবেদনসমূহেও (১৯৭৬ সালে শুরু) দ্রুত নগরায়ণ এবং ঢাকার উচ্চ প্রাধান্যের বিষয়টি উপস্থাপিত হয়েছে। সরকারের খসড়া জাতীয় নগরনীতি (২০১১ ও ২০২৪), প্রাইমেট সিটি সমস্যা এবং সেই সঙ্গে নগরায়ণে আঞ্চলিক বৈষম্যের বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে দেখানো হয়েছে কেন্দ্রীয়ভাবে অবস্থিত ঢাকা বিভাগে/জেলায়, প্রান্তিক বিভাগ এবং জেলার তুলনায় উচ্চহারে নগরায়ণ হয়েছে। অবশ্য এদিকে নিয়ন্তা/মেগাসিটি ঢাকার পাশে অবস্থিত মানিকগঞ্জের মতো একটি জেলায় নগরায়ণের নিম্নহারের উপস্থিতির বিষয়টি আশ্চর্যজনক।

অর্থনীতিবিদ ড. হোসেন জিল্লুর রহমান অর্থনীতিবিদদের মধ্যে প্রথম, যিনি বাংলাদেশে নগরায়ণের বৈষম্য এবং উন্নয়ন-প্রক্রিয়ায় অপ্রধান শহরগুলোর ভূমিকার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেন। সম্প্রতি পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) অর্থনীতিবিদ ড. আহমদ আহসান বাংলাদেশের নগরায়ণ ধারা এবং মেগাসিটি ঢাকার ‘অতিবৃদ্ধি’/ ‘ওভারগ্রোথ’ বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি নগরায়ণের এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপের পরামর্শ দেন এবং রাজধানী শহরের অতিবৃদ্ধির নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে সতর্ক করেন। আরেকজন প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদ এবং পরিবেশবিদ ড. এস নজরুল ইসলাম (বাপা-বেন-এর) ড. আহমদ আহসানের কাজ অনুসরণ করেছেন এবং সতর্ক করেছেন যে ঢাকার ‘অতিবৃদ্ধি’ বিপরীত উৎপাদনশীলতা এবং অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হতে পারে এবং দেশে আরও বৈষম্য তৈরি করতে পারে। এ বিষয়ে প্রতিকার হিসেবে তারা বিকেন্দ্রীকরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। উল্লেখ্য, অতিবৃদ্ধি বা ‘ওভারগ্রোথ’ বলতে তারা মূলত ঢাকার জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রসঙ্গটি তুলে ধরেন।

তবে দুই অর্থনীতিবিদ কীভাবে ‘ঢাকা’কে সংজ্ঞায়িত করেছেন তা স্পষ্ট নয়। এটি কি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন সমন্বিতভাবে যে কেন্দ্রীয় মহানগর বা মেট্রোপলিটন শহর ঢাকা, যার আয়তন মাত্র ৩০৪ বর্গকিলোমিটার ও বর্তমান আনুমানিক জনসংখ্যা প্রায় ১২ মিলিয়ন, নাকি এটি ঢাকা মেগাসিটি অর্থাৎ রাজউকের রাজধানী মহানগর বা মেট্রোপলিটন অঞ্চল, যার আয়তন প্রায় ১৫৩০ বর্গকিলোমিটার এবং আনুমানিক জনসংখ্যা ২০ মিলিয়নেরও বেশি। এই মেগাসিটি অঞ্চলটিতে রয়েছে চারটি সিটি করপোরেশন (ঢাকা দক্ষিণ, ঢাকা উত্তর, নারায়ণগঞ্জ এবং গাজীপুর) এবং সাভারের মতো বেশ কয়েকটি পৌরসভা এবং অসংখ্য ইউনিয়ন পরিষদ ও গ্রামীণ এলাকা। উল্লেখ্য, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর সিটি করপোরেশন বা সাভার পৌরসভার অধিবাসীরা নিজেদের ঢাকাবাসী বা ঢাকার মানুষ হিসেবে পরিচয় দিতে চাইবেন না, যদিও তারা ঢাকা মহানগর অঞ্চল তথা ঢাকা মেগাসিটির অধিবাসী। 

জাতীয় নগর ক্রমে/হাইআরকিতে দেশের বৃহত্তম শহর ঢাকার প্রাধান্য স্পষ্ট। ১৯৬১ সালেই ঢাকায় ছিল দেশের মোট নগর জনসংখ্যার ২০%। ১৯৭৪ সালে দেশের ৬২.৭ লাখ নগর লোকসংখ্যার মধ্যে ১৭.৭ লাখ, যা দেশের মোট নগর লোকসংখ্যার ২৮.৩% বসবাস ছিল ঢাকা নগরে। এ সংখ্যা ছিল দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর চট্টগ্রাম অপেক্ষা ১.৯৯ গুণ বেশি। ১৯৮১ সালে ঢাকার প্রাধান্য তুলনামূলকভাবে কিছুটা কমে যায়। এ সময় ঢাকায় ছিল দেশের মোট নগর জনসংখ্যার ২৫.৭%। ঢাকার প্রাধান্য পরবর্তী দশকে আবার প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৯১ সালে দেশের মোট নগর জনসংখ্যার ৩০.৫% ছিল এই নগরে। ২০০১ সালে এ হার বেড়ে দাঁড়ায় ৩৪% এবং ২০১১ সালে ৩৩% মোটামুটি একই উচ্চ প্রাধান্য ছিল। ১৯৯১ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরের তুলনায় ঢাকার প্রাধান্য ছিল স্পষ্ট। যথাক্রমে ৩.১৬ গুণ ও ৩.৮০ গুণ (BBS, ২০১১)। ২০২২ সালে (২০২১-এর শুমারি ২০২২ সালে অনুষ্ঠিত হয়) বাংলাদেশে নগর জনসংখ্যা ছিল ৫২ মিলিয়ন। এর মধ্যে উত্তর ও দক্ষিণ উভয় সিটি করপোরেশন মিলে ঢাকায় নগর জনসংখ্যা ছিল ১০.২ মিলিয়ন, যা দেশের মোট নগর জনসংখ্যার ১৯.৬২%। অবশ্য বৃহত্তর ঢাকার আনুমানিক প্রায় ২০ মিলিয়ন জনসংখ্যা হিসেবে মেগাসিটি ঢাকার নগর জনসংখ্যা দাঁড়ায় দেশের মোট নগর জনসংখ্যার  ৩৮.৪৬%, অর্থাৎ অতিমাত্রায় প্রাইমেট পরিস্থিতি। 

পরিকল্পনাবিদ, ভূগোলবিদ, অর্থনীতিবিদ এবং সমাজবিজ্ঞানীরা সবাই মেগাসিটির দ্রুত অর্থনৈতিক ও সামাজিক শক্তির কার্যকর বিকেন্দ্রীকরণের সুপারিশ করেন। এ ধরনের অবস্থান যুক্তিযুক্ত এবং প্রশংসনীয়। তবে এর সঙ্গে নগর ব্যবস্থাপনা বা সুশাসনের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া দরকার। উন্নত দেশ জাপানের রাজধানী বিপুলাকার মেগাসিটি টোকিও বসবাসযোগ্য। কারণ সে শহরে ব্যবস্থাপনা সুচারু। মধ্যম আয়ের দেশ থাইল্যান্ডের অতিমাত্রার প্রাইমেট মেগাসিটি ব্যাংককও বসবাসযোগ্য। কেননা সেখানে নগর পরিচালন বা ব্যবস্থাপনা উত্তম।

বাংলাদেশে আজ নিয়ন্তা নগর/প্রাইমেট সিটি এবং অন্যান্য মাঝারি কিংবা ছোট শহর উভয়ই বসবাস অযোগ্য হয়ে পড়েছে। ময়মনসিংহের মতো একটি মাঝারি শহরও মেগাসিটি ঢাকার মতো বসবাসের অযোগ্য হিসেবে গণ্য হচ্ছে। মূল সমস্যা অবশ্যই শহরগুলোর ব্যবস্থাপনার গুণমান। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা বা পরিচালন পরিকল্পিত নগর/শহর উন্নয়নের অপরিহার্য উপাদান হওয়া প্রয়োজন। যা-ই হোক, এই ধারণাটি অবশ্য নগরায়ণ-প্রক্রিয়া এবং উন্নয়ন বিকেন্দ্রীকরণের বিষয়ের গুরুত্বকে কোনোভাবেই কমিয়ে দেয় না।

জাতীয় নগর নীতিমালার (২০১১ ও পরিমার্জিত ২০২৪) খসড়াতে বিকেন্দ্রীকরণের বিষয়টি যথার্থভাবে তুলে ধরা হয়েছে। নীতিমালার অন্য ধারাগুলোও যথেষ্ট ভাবনাচিন্তা করে রচিত হয়েছে। আমরা সরকারকে অবিলম্বে নীতিটির অনুমোদন এবং বিশেষ করে বিকেন্দ্রীকরণ এবং শক্তিশালী নগর পরিচালনের ওপর জোর দিয়ে বাস্তবায়নে দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানাই। 

বিকেন্দ্রীকরণ বিষয়ে দুটি প্রসঙ্গ আলোচিত হয়ে থাকে। প্রথমে বৃহৎ ও মাঝারি অঞ্চলভিত্তিক (অর্থাৎ বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে) বিকেন্দ্রীকরণ। দ্বিতীয়ত, নগর/শহরভিত্তিক (আরবান সেন্টার) বিকেন্দ্রীকরণ অর্থাৎ ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী ইত্যাদি বিভাগীয় শহরে বিকেন্দ্রীকরণ।

বিকেন্দ্রীকরণ চিন্তায় ড. আহমদ আহসান বেশ চরম ধারণা দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, যথার্থ বিকেন্দ্রীকরণের জন্য সব জেলাকে (৬৪) প্রদেশে উন্নীত করতে হবে। এ প্রসঙ্গে বিকেন্দ্রীকরণের বাকশাল সময়ের জেলা গভর্নর নিয়োগের কথা স্মরণীয়। ড. এস নজরুল ইসলাম অবশ্য প্রদেশ চিন্তা করেননি। তিনি রাজধানীর সঙ্গে জেলা ও উপজেলায় উন্নত রেল যোগাযোগের সুপারিশ করেন। প্রস্তাবিত ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের যথাযথ উন্নয়নের কথা বলেন। তা ছাড়া মৌলিকভাবে জেলা পর্যায়ে বিকেন্দ্রীকরণের সুপারিশ করেন। এ ক্ষেত্রে আমি তার সমমনা। 

নগরায়ণ বিকেন্দ্রীকরণের অপর একটি ধারণা হলো In situ urbanization বা অকুস্থল নগরায়ণ তথা বিচ্ছুরিত নগরায়ণ। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ধারণা- ‘গ্রাম হবে শহর’ বা ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ এক অর্থে ইন-সিটু আর্বানাইজেশনের সমরূপী ধারণা। অবশ্য মাঝারি বা বড় শহরে প্রবৃদ্ধি অনেক ক্ষেত্রেই থাকবে প্রকৃত বাস্তবতা। দেশের নগরায়ণ ধারায় বিভিন্ন কারণে কোনো কোনো নগর বা শহরে জনসংখ্য বৃদ্ধির স্থবিরতা, এমনকি সংখ্যা হ্রাসের মতো বাস্তবতাও ঘটে, যেমন ঘটেছে খুলনা শহরের ক্ষেত্রে।

দেশের জেলা শহর সমৃদ্ধিতে নানা রকম অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিনিয়োগ কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে। শিল্পায়ন ও উন্নত মানের হাসপাতাল ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা অন্যতম উদাহরণ।

নগরায়ণ বিকেন্দ্রীকরণের অপর একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো, মেগাসিটি ঢাকাসহ অন্যান্য বড় ও মাঝারি শহরে প্রশাসনিক ও উন্নয়ন কাজে বিকেন্দ্রীকরণ করা। জোনাল ও ওয়ার্ড পর্যায়ে এ ধরনের বিকেন্দ্রীকরণ ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা আবশ্যক। পুনরায় উল্লেখ্য, বিকেন্দ্রীকরণ ধারণার সঙ্গে নগরের সার্বিক ব্যবস্থাপনার মান উন্নয়ন অতি আবশ্যক।

লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সাম্মানিক চেয়ারম্যান, নগর গবেষণা কেন্দ্র, ঢাকা

অর্থনৈতিক বাজেট অনৈতিক প্রবণতা

প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৪, ১০:৫০ এএম
আপডেট: ২০ জুন ২০২৪, ১০:৫১ এএম
অর্থনৈতিক বাজেট অনৈতিক প্রবণতা
রাজেকুজ্জামান রতন

স্বাধীনতার পর ৫৩তম বাজেট ঘোষিত হয়েছে। প্রতিবার বাজেটের সময় বলা হয়, এবারের বাজেট স্বাধীনতার পর সর্বোবৃহৎ বাজেট। এবারও তাই হয়েছে। বলা হচ্ছে, সংকটকালের বাজেট কিন্তু সংকটের কারণ চিহ্নিত হলেও দূর করার পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। অর্থনীতির সংকটের লক্ষণগুলো কী? অব্যাহত মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক রিজার্ভের পতন, রাজস্ব সংগ্রহের স্বল্পতা, রপ্তানি ও রেমিট্যান্স প্রবাহের স্থবিরতা, পুঁজি পাচার, ব্যাংকিং খাতের বিশৃঙ্খলা, সর্বব্যাপী দুর্নীতি ও সরকারি ব্যয়ের অনিয়ম-অপচয়, জবাবদিহিহীনতার সংস্কৃতি এবং বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ খাতের ঋণের সুদ পরিশোধের ক্রমবর্ধমান দায়। এর ওপর আছে  বিদ্যুৎ খাতের ক্যাপাসিটি চার্জের বাড়তি বোঝা।

এসব সংকট আড়ালে রেখে আগামী অর্থবছরের জন্য ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে, যা গত বাজেটের তুলনায় টাকার অঙ্কে ৩৫ হাজার ২১৫ কোটি টাকা বেশি। এই বাজেটে ৫ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা হচ্ছে কর। করের মধ্যে এনবিআর নিয়ন্ত্রিত অংশ ৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা এবং এনবিআরবহির্ভূত অংশ ১৫ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া করবহির্ভূত প্রাপ্তির লক্ষ্যমাত্রা ৪৬ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে। আর অনুদান পাওয়া যাবে বলে ধরে নেওয়া হয়েছে ৪ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। ফলে বাজেটে ঘাটতি থাকছে। অনুদান ছাড়া বাজেট ঘাটতি ধরা হচ্ছে ২ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা। তবে অনুদানসহ সামগ্রিক ঘাটতি দাঁড়াবে ২ লাখ ৫১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা।

ঘাটতি মেটানোর দুটি খাত আছে। প্রথমত, বৈদেশিক ঋণ; দ্বিতীয়ত, দেশের ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ঋণ নেওয়া। বৈদেশিক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ১ লাখ ২৭ হাজার ২০০ কোটি টাকা। এই ঋণ থেকেই বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করা হবে ৩৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। ফলে নিট বৈদেশিক ঋণ দাঁড়াবে ৯০ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। বাকি ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ ঋণ নেওয়া হবে ১ লাখ ৬০ হাজার ৯০০ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের মূল অভ্যন্তরীণ ঋণের লক্ষ্যমাত্রা থেকে ৪ হাজার ৭০৫ কোটি টাকা বেশি। অভ্যন্তরীণ ঋণের মধ্যে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে নেওয়া হবে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, আর সঞ্চয়পত্র বিক্রিসহ ব্যাংকবহির্ভূত ঋণ নেওয়া হবে ২৩ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।

ফলে গত অর্থবছরে যেমন সরকারকে বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করতে হয়েছে ঋণ ও সুদ পরিশোধে, সেই ধারা চলবে আগামী অর্থবছরেও। ইতোমধ্যেই সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান সুদ পরিশোধ একটা বড় মাথাব্যথা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই মাথাব্যথা কমবে না বরং বাড়বে।  

মাথাব্যথা আরও বাড়িয়ে তুলবে খেলাপি ঋণ, যা ক্রমাগত বাড়ছে। গত মার্চের শেষে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ৮২ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা মোট ঋণের ১১ দশমিক ১১ শতাংশ। দেশে এর আগে খেলাপি ঋণ বেড়ে কখনো এতটা হয়নি। একদিকে ঋণখেলাপি বাড়ছে, অন্যদিকে সরকার দেশের ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ফলে দেশের অর্থনীতিতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে। 

শিক্ষা খাতে যে বাজেট বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, তা গতানুগতিক। একই বৃত্তে ঘুরছে শিক্ষার বাজেট। টাকার অঙ্কে বরাদ্দ কিছুটা বাড়লেও বাজেটে তা দাঁড়াচ্ছে ১১.৯ শতাংশ। দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় বাজেটের ২০ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দের দাবি থাকলেও সেটি পূরণ হয়নি। আবার শিক্ষার যে বরাদ্দ, তার মধ্যে উন্নয়ন ব্যয়ের বেশির ভাগই ব্যয় হয় অবকাঠামোয়। আর পরিচালন ব্যয়ের বেশির ভাগ খরচ হয় বেতন-ভাতা বাবদ। ফলে মানসম্মত শিক্ষা অর্জনের জন্য এবারের শিক্ষা খাতের বাজেটে প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটেনি।

বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪১ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা। এটি প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের ৫ দশমিক ১৯ শতাংশ। দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুরবস্থা নিরসনে এই বরাদ্দ যথেষ্ট নয়। আবার বাজেট যখন সংশোধিত হয়, তখন দেখা যায় স্বাস্থ্যের বরাদ্দের এই হার আরও কমে যায়। গত অর্থবছর, অর্থাৎ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ছিল জাতীয় বাজেটের ৪ দশমিক ৯৯ শতাংশ। সংশোধিত বাজেটে তা কমে হয় ৪ দশমিক ১৬ শতাংশ। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না বলে ধারণা করলে ভুল হবে না। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) জানিয়েছে, দেশে শিশুমৃত্যু বাড়ছে। অনেক বছর ধরে মোট প্রজনন হার এক জায়গায় স্থির হয়ে আছে। পাশাপাশি চিকিৎসা করাতে গিয়ে ব্যক্তিপর্যায়ে ব্যয় অনেক বেশি,  প্রায় ৭০ শতাংশ। এই হার প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বেশি। ফলে চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে। স্বাস্থ্যে কম বরাদ্দ পরিস্থিতি আরও খারাপ করে তুলবে।  

কৃষি খাতে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ১১.৫ শতাংশ বরাদ্দের সম্ভাব্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও বাজেটে এ খাতে উন্নয়নে বরাদ্দ হয়েছে মাত্র ৪.৯৯ শতাংশ। কৃষিতে একটা নেতিবাচক প্রবণতা লক্ষ কারা যাচ্ছে, যা বিপজ্জনক। বিবিএসের হিসাবে বছরের ব্যবধানে ২০২৩ সালে কৃষকের সংখ্যা কমেছে প্রায় ১৫ লাখ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রান্তিক চাষি যারা লাভবান হচ্ছেন না বা পণ্যের মূল্য পাচ্ছেন না, তারা অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। কৃষি উৎপাদন করতে গিয়ে কৃষকদের সব দিক দিয়েই খরচ বাড়ছে। বিশেষ করে শ্রমিকের খরচ বাড়ছে। কিন্তু এই চিত্র প্রতিবছরই দেখা যাচ্ছে যে, কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না, তাদের উৎপাদন খরচ উঠছে না।  

একদিকে ডিজিটাল বাংলাদেশের স্লোগান, অন্যদিকে ক্রমাগত মুঠোফোনে কথা বলা ও ইন্টারনেট সেবার ওপর ক্রমবর্ধমান ভ্যাট আরোপের ফলে ১০০ টাকার টক টাইম পেতে এখন গ্রাহককে দিতে হবে ১৩৯ টাকা। বহুল প্রচারিত মেট্রো রেলেও ভ্যাট আরোপ করা হচ্ছে, যা জনজীবনে ভোগান্তি বাড়াবে। 

কর্মসংস্থান কোনো গুরুত্ব পায়নি বাজেটে। ফলে শ্রমবাজারে যে ২২ লাখ শ্রমশক্তি আসবে তাদের কর্মসংস্থান কী হবে?     
দুর্নীতি, মূল্যস্ফীতি, টাকা পাচার, ব্যাংক লুটের যে মিলিত চক্রে দেশের মানুষের দুর্দশা বাড়িয়েছে, তা নিরসনে কোনো উদ্যোগ না নিয়ে বরং জনগণের ওপর করের বোঝা চাপানো হয়েছে। বাজেট নিয়ে সরকারি মহলের বাগাড়ম্বর দিয়ে অর্থনীতির সংকট দূর হবে না।

দেশের দুর্নীতি নিয়ে কথা বললেই শাসক দলের নেতারা বলেন, এ রকম দুর্নীতি সব দেশেই আছে। কিন্তু দেশের নাগরিকরা তো বিদেশের সঙ্গে তুলনা করবে না। তারা ভুক্তভোগী হিসেবে দেখছেন যে, কোনো সরকারি সেবা নিতে গেলেই দুর্নীতির শিকার হতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে আবার সেবা গ্রহণকারীরাও কোনো অন্যায় সুযোগ, যেমন কর ফাঁকি দেওয়ার জন্যই দুর্নীতি করেন। তারা ঘুষ দেন। ফলে কেউ ঘুষ দেয় বাধ্য হয়ে আর কেউ দুর্নীতিকে আড়াল করার জন্য ঘুষ দেন। আর ঘুষ নেওয়া অপরাধ হলেও ঘুষ দেওয়া অপরাধ বলে প্রচারিত হয় না।

বাংলাদেশের দুর্নীতির কারণ ও উৎস নিয়ে যারা গবেষণা করেন তারা সবাই বলবেন, এ দেশে দুর্নীতি-অনিয়মের সবচেয়ে বড় উৎস হলো ক্ষমতার রাজনীতি। আর দুর্নীতির বিস্তৃতি ঘটছে অনুগত স্বার্থগোষ্ঠীর মধ্যে অন্যায় সুযোগ-সুবিধা বিতরণ করার ফলে। এ কারণেই সম্পদের অসম বণ্টন বাড়ছে, অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ছে এবং এভাবেই দেশ চলবে,  এই ধারণা শক্তিশালী হচ্ছে দিন দিন।

বাঘ যখন হরিণের পালে আক্রমণ করে, তখন দুর্বল হরিণটিকেই শিকারের জন্য বেছে নেয়। বাজেটের করনীতি সে রকমেরই। সাধারণ মানুষের ওপর জ্বালানি ও বিদ্যুৎ- এসব সেবার বাড়তি খরচ চাপানো যেমন সহজ, মোবাইল ফোনের ইন্টারনেট ব্যবহারে ভ্যাটের ওপর সম্পূরক শুল্ক আরও বাড়িয়ে দেওয়াও তেমনি সহজ উপায় মনে করা হয়েছে। কিন্তু ফোন তো এখন নিত্যব্যবহার্য সেবা। আয়করের উচ্চতম হার বাড়িয়ে ৩০ শতাংশ করা হয়েছে। যারা সঠিক সম্পদের হিসাব দেন, তাদের ক্ষেত্রে সারচার্জসহ এ হার আরও বেশি। কিন্তু কালোটাকা বা অপ্রদর্শিত আয়কে ১৫ শতাংশ হারে কর দিয়ে বিনা প্রশ্নে বৈধ করার সুবিধা  অন্যায্য ও অনৈতিক। তবে কি আমরা ক্রমে একটা নৈতিকতাহীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার পথ বেছে নিচ্ছি?     

লেখক: সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)

কোরবানি: বাজারের পশু ও মনের পশু

প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৪, ০২:২৫ পিএম
আপডেট: ১৬ জুন ২০২৪, ০২:২৫ পিএম
কোরবানি: বাজারের পশু ও মনের পশু
ড. তোফায়েল আহমেদ

হে নবী! ওদের বলুন, আমার সালাত, আমার কোরবানি, আমার জীবন, আমার মরণ- আমার সবকিছুই বিশ্বজাহানের প্রতিপালক আল্লাহরই জন্যে। তিনি একক ও অদ্বিতীয়। এ আদেশই আমি পেয়েছি। আমি সমর্পিতদের মধ্যে প্রথম।-সুরা আনআম, আয়াত ১৬২-১৬৩

কোরবানি ও ঈদুল আজহার আনন্দ এক যুগলবন্দি ইবাদত। তার মাঝখানে থাকে মুসলিম মিল্লাতের পিতা হযরত ইব্রাহিম (আ.) ও হযরত ইসমাইল (আ.)-এর পুণ্য স্মৃতির স্মরণ। যার প্রধান মর্মবাণী- সর্বোচ্চ ত্যাগ ও আত্মসমর্পণ। সব কিছুর ওপরে আল্লাহর ইচ্ছা ও নির্দেশের প্রাধান্য প্রদান। মহান আল্লার ইচ্ছায় যে পরম ও চরম ত্যাগের পরাকাষ্ঠা দুই মহান নবী- হযরত ইব্রাহিম (আ.) ও হযরত ইসমাইল (আ.) প্রদর্শন করেন এবং তাকে রোজ কেয়ামত পর্যন্ত স্মরণীয় করে রাখা  কোরবানি ও হজের নানা নিয়মকানুনের মধ্য দিয়ে অনুশীলন করা হয়। পিতা সন্তানকে কোরবান করছেন এবং সন্তান স্বেচ্ছায় আল্লাহর ইচ্ছায় পিতার হাতে কোরবান হয়ে যাচ্ছেন। মাঝখানে মহান স্রষ্টার কেরামতে পশু কোরবানি হয়ে গেল। শেষ নবী হযরত মোহাম্মদ (স.)-এর উম্মতদের ওপর পশু কোরবানির আদেশ হয়। পূর্বের আরও নবী- রসুলের উম্মতের ওপরও কোরবানির বিধান ছিল।

প্রতিটি ধর্মীয় বিধিবিধান কালক্রমে নানা জাতি তার সামাজিক রীতিনীতি, সংস্কৃতি ও সভ্যতার অংশ করে নিয়ে থাকে। উপমহাদেশ তথা বাংলাদেশেও নানা ইসলামি বিধি-বিধান ও আচার-অনুষ্ঠানের দেশীয়করণ বা সামাজিক আত্তীকরণ হয়েছে। আমাদের দেশে কোরবানির ঈদ ও গরু বেচাকেনা একটি মহা বড় অনুষঙ্গ। পৃথিবীর কোনো মুসলিম দেশে কোরবানির পশু জবাইতে গরুকে এত বড় ভূমিকায় দেখা যায় না। অনুমান করা হচ্ছে, কম-বেশি এক কোটি সাত লাখ গরু বাংলাদেশে ঈদুল আজহা উপলক্ষে জবাই হবে। বিশ্বব্যাপী ছাগল, ভেড়া, দুম্বা, উট, মহিষ কোরবানি হয়। কিন্তু সংখ্যায় গরু এবং বড় পশু কোরবানিতে সম্ভবত বাংলাদেশই প্রথম।

কোরবানির বহুবিধ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। তার মধ্যে একটি অত্যন্ত গঠনমূলক আলোচনা হচ্ছে, ‘‌কোরবানির অর্থনীতি’র আলোচনা। এক. পশুপালন কর্মকাণ্ড। এ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে বহু অর্থ লেনদেন এবং বহু মানুষের কর্মসংস্থান ও জীবন-জীবিকা সম্পৃক্ত। অবশ্য পশু চোরাচালানও হয়। দুই. ঈদুল আজহার এই একটি সপ্তাহে পশু কেনাবেচায় হাজার কোটি টাকার নগদ লেনদেন। তিন. পশুর চামড়া, হাড় প্রভৃতি শিল্পপণ্য হিসেবে বাজারে আসা। তিন. পরোক্ষভাবে মসলা, লবণ এবং ঈদে ব্যবহার্য নানা খাদ্য ও বিলাসসামগ্রীর বাজার। সব মিলিয়ে ঈদের অর্থনীতি একটি বিশাল আলোচনার বিষয় হতে পারে। কিন্তু আমাদের ধ্রুপদী অর্থনীতিবিদরা এসব বিষয় সেভাবে আলোচনায় আনেন না। এখানে অপচয়, অনিয়ম, দুষ্কৃতি ও দুর্নীতি রোধ করা গেলে এ অর্থনীতির সুফল পুরো জাতি পেত। ঈদুল আজহার একটি বড় দুষ্কর্ম হচ্ছে নানা জাতের চাঁদাবাজি। পরিবহনে চাঁদাবাজি, গরুর হাটে চাঁদাবাজি। তেল, লবণ, মসলার বাজারে কারসাজি, চামড়াশিল্প ও চামড়ার বাজার নিয়ে নানা অনিয়ম ও ধান্দাবাজি। একটি পবিত্র সময়কে কালো ব্যবসায়ী ও চাঁদাবাজরা কলুষিত করে।

সমাজ-সংস্কৃতিচর্চার ক্ষেত্রেও আসামঞ্জস্যতার শেষ নেই। প্রথমেই চেষ্টা করা হয়েছে এ কথাটি বলার জন্য যে, ঈদুল আজহা কোনো সামাজিক অনুষ্ঠান নয়। এটি ধর্মীয় কোনো অনুষ্ঠান বিশেষও নয়। এটি একটি মহান ইবাদত বা উপাসনা। উপাসনা করার জন্য যে পরম পবিত্রতা, হালাল রুজি ও খাঁটি নিয়তের শর্ত- তা এক্ষেত্রেও পরিপূর্ণভাবে প্রযোজ্য। ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম স্তম্ভ হজ। হজ এ সময়ের একটি মহান ইবাদত। সে হজব্রত শেষে হাজিরা কোরবানি করেন। যারা হজ করছেন না, তাদের মধ্যে সামর্থ্যবানরা পশু কোরবানি করেন। পশুর মাংস খাওয়া ও বিতরণ কোরবানির প্রধান কোনো রীতি বা অঙ্গ নয়। এটি আনুষঙ্গিক বা ঐচ্ছিক বিষয়। পশু জবাই করে রক্ত বইয়ে দেওয়াটাই কোরবানি। নিয়ত সঠিক হলে জবাই করা পশুর রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই কোরবানি কবুল হয়ে যায়। মাংস, চামড়া, হাড়গোড় দিয়ে কী করবেন, এর সঙ্গে কোরবানির সম্পর্ক খুবই গৌণ। তাই পবিত্র কোরআন শরিফে বলা হয়েছে, ‘কিন্তু মনে রেখো কোরবানির মাংস বা রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না, আল্লাহর কাছে পৌঁছায় শুধু তোমাদের নিষ্ঠাপূর্ণ আল্লাহ-সচেতনতা। এ লক্ষ্যেই কোরবানির পশুগুলোকে তোমাদের অধীন করে দেওয়া হয়েছে। অতএব আল্লাহ তোমাদের সৎপথ প্রদর্শনের মাধ্যমে যে কল্যাণ দিয়েছেন, সে জন্যে তোমরা আল্লাহর মহিমা ঘোষণা করো। হে নবী! আপনি সৎকর্মশীলদের সুসংবাদ দিন যে, আল্লাহ বিশ্বাসীদের রক্ষা করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো বিশ্বাসঘাতক, অকৃতজ্ঞকে পছন্দ করেন না।’-সুরা হজ, আয়াত ৩৭-৩৮।

হালাল খাদ্যসামগ্রী ও অন্যান্য উপজাত, যা সমাজের উপকারে আসবে- তা ফেলে দেওয়া বা অপচয় করা নিশ্চয়ই  উচিত হবে না। তাই তা নিজে, পরিবার, আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, গরিব-দুঃখী সবার মধ্যে বণ্টন-বিতরণ অবশ্যই পুণ্যের কাজ। তা কীভাবে করা ভালো, তারও বিধান রয়েছে। সমাজে তার চর্চাও হচ্ছে। কিন্তু এখানে আমার এ বিষয়ে লেখার মূল আবেদনটি হচ্ছে, গরিবের নিকট মাংস বিতরণ, একাধিক গরু-মহিষ জবাই করে সামাজিক ভোজ, জৌলুস করে গরু কেনা এবং গরুর পিছনে যেভাবে সময়, সামর্থ্য ও সামাজিক প্রাধান্য দিয়ে বাংলাদেশি সমাজ ঈদুল আজহাকে এক ‘গরু জবাই উৎসব’ হিসেবে পালন করে, তাতে কোরবানির মূল পবিত্রতা ও একটি মহান ইবাদতের বিষয়টি চরমভাবে উপেক্ষিত।

যার ফলে পশু কোরবানি সঠিকভাবে হয় না। ভালো খাওয়া-দাওয়া, উৎসব আয়োজন হয়। সবার ঘরে ( যারা মাংস খায়) কিছু না কিছু মাংস পৌঁছায়। অনেকে বলেন, গরিবের প্রোটিন ঘাটতি পূরণ হয়। কিন্তু অন্তরের পশুটি কোরবানি হয় না। সে পশু যথাস্থানে অবস্থান করে এবং যথাসময়ে হানা দেয়। সে পশু নদীর বালু, জলাধার, পরের জমি, ঘরবাড়ি দখল করে। ছিনতাই-রাহাজানি, অবৈধ কন্ট্রাক্ট, নির্মাণে সিমেন্ট-বালু অনুপাত ঠিক রাখে না, রডের বদলে বাঁশ, ওষুধে ভেজাল, ফাইল ঠেকিয়ে অর্থ আদায়, সোনা চোরাচালান, মানিলন্ডারিং, বিনাভোটে বা ভোট চুরি করে নেতা হয়। প্রতি বছর হাতির মতো গরু, মহিষ, উট কোরবানি করে। কিন্তু তার চেয়েও বড় পশু বা পাশবশক্তিকে ভেতরে রীতিমতো লালন-পালন করা হয়। সে শক্তি সমাজকে তছনছ করে।

ধর্ম বা ধর্মের অন্তর্নিহিত গূঢ বিষয়কে বিকৃত আনুষ্ঠানিকতার মোড়কে ঢেকে ফেলায় আমাদের জুড়ি নেই। আনুষ্ঠানিকতা ও আচার সত্যিকারের ধর্ম নয়। হজ-উমরা পালন এবং ঈদুল আজহায় গরু জবাই উৎসবের ক্ষেত্রে বিষয়টি এখন প্রায় ধর্মীয় আবেদনের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে আমার ব্যক্তিগত ধারণা। একই বিচ্যুতি রমজানেও আমাদের হয়। রমজানের শুদ্ধতা ও সংযমের চেয়ে বাহারি ইফতারে এবং ঈদের কেনাকাটায় বাজার ও বিজ্ঞাপন আমাদের বেশি প্রভাবিত করে। আত্মশুদ্ধি ও সংযমবিযুক্ত রোজা নিছক উপবাস। তাতে হয়তো মেদ হ্রাস হতে পারে বা অন্যান্য শারীরিক উপকার হতে পারে, কিন্তু রমজানের আধ্যাত্মিকতা ও শুদ্ধাচারী হওয়ার যে সুফল, তা আসবে না। একইভাবে নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং সামাজিক কল্যাণমুখী কাজ হিসেবে কোরবানি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে সরকার ও জনগণ দেখতে পারে, কিন্তু ব্যক্তি মুসলমানের সত্যিকারের ধর্মীয় তাৎপর্য ও ইবাদতের বিষয়টি ভূলুণ্ঠিত হতে থাকবে।

লেখক: শিক্ষক ও স্থানীয় শাসন বিশেষজ্ঞ
[email protected]

বিজেপি জোট সরকার কতদিন টিকবে?

প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৪, ০২:২২ পিএম
আপডেট: ১৬ জুন ২০২৪, ০২:২২ পিএম
বিজেপি জোট সরকার কতদিন টিকবে?
সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত

ভারতবর্ষের ১৮তম লোকসভা নির্বাচন শেষ। একদলীয় শাসনব্যবস্থার পক্ষে জনগণ রায় দেয়নি। তাই নরেন্দ্র মোদিকে জোট সরকার গঠন করতে হলো। এই জোটের যেসব শরিক তাকে ‘আপাতত’ সমর্থন করেছেন, সেই সমর্থন কতদিন বজায় থাকবে- সেই প্রশ্ন কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত ঘুরে বেড়াচ্ছে।

এতদিন ধরে ভারতবর্ষ জানত, ধর্মীয় সংগঠন আরএসএস পরোক্ষে সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করে। হঠাৎ নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর দেখা গেল, আরএসএস-প্রধান মোহন ভাগবত সাংবাদিক বৈঠক ডেকে নরেন্দ্র মোদির কঠোর সমালোচনা করলেন। 

অপরদিকে কংগ্রেসের মুখপাত্র জয়রাম রমেশ মোদিকে কটাক্ষ করে বলেছেন, মোদি ২০১৪ সালে ক্ষমতায় এসে বলেছিলেন, আমি ৫৬ ইঞ্চি ছাতি নিয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাব। কিন্তু ভোটের পর ওনার ছাতির মাপ অর্ধেক হয়ে গেছে। আমরা আরও লক্ষ্য রাখছি ওনার বুকের ছাতির ‘মাপের ওপর’।

মোদি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী, অথবা ভারতের প্রধানমন্ত্রী- তিনি বরাবরই দলকে পেছনে ঠেলে নিজেকেই জাহির করে গেছেন। ইন্ডিয়া জোটের যেসব শরিক তাকে সমর্থন করেছে, তারা এবার প্রকাশ্যে বলতে শুরু করেছেন, এই সরকার ইন্ডিয়া সরকার। মোদি সরকার নয়। তিনি ক্ষমতার দম্ভে নির্বাচনি প্রচারে কার্যত নিজের বাবা-মাকে অস্বীকার করে বলেছিলেন, ভগবান স্বয়ং তাকে ধরাধামে পাঠিয়েছিলেন। তাই তিনি ২০৪৭-এর ১৫ আগস্ট পর্যন্ত নাকি দেশ শাসন করবেন।

কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী বলেছেন, মোদি ভোটপর্বে ‘পরিবারতন্ত্র’ নিয়ে গলা ফাটিয়েছেন। কিন্তু তার মন্ত্রিসভাতেই সদস্য হয়েছেন এমন ১২ জন, যারা কোনো না কোনো রাজনৈতিক পরিবার থেকে এসেছেন।

প্রথমত উল্লেখ্য, বাংলাদেশের কিছু বুদ্ধিজীবীও নরেন্দ্র মোদির সরকারের প্রতি নরম মনোভাব নিয়ে চলতেন। তাদেরও হঠাৎ ধারণা হয়েছিল- কংগ্রেস নয়, মোদির সরকারই পারবে বাংলাদেশের নতুন বন্ধু হয়ে উঠতে। কিন্তু মোদির শপথগ্রহণের পর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা হয় কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া, রাহুল এবং প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর সঙ্গে। সেই আবেগঘন মুহূর্তের ছবি গণমাধ্যম মারফত গোটা বিশ্ব দেখেছে। সেই ছবি প্রকাশিত হওয়ার পর বাংলাদেশের সেই বুদ্ধিজীবীরা এখন কী বলবেন, সেটাই জানার।

বিজেপি ও সঙ্ঘ পরিবারের মধ্যে যে বিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে, তাতে গোটা ভারতবর্ষের বুদ্ধিজীবীদের একাংশ মনে করছেন- মোদি নামেই প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। তিনি দেশের স্থিতিশীলতা রক্ষা করতে পারবেন না। ফলে সরকার কতদিন টিকবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। 

এদিকে মোহন ভাগবত মোদির সমালোচনা করলেও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির প্রশংসা করেছেন। তার দাবি, স্বাধীনতার পর মমতা ক্ষমতায় না আসা পর্যন্ত আরএসএস পশ্চিমবঙ্গে একটিও শাখা সংগঠন তৈরি করতে পারেনি। কিন্তু মমতার সরকার আসার পর থেকে আরএসএস পশ্চিমবঙ্গে ১৮ হাজার শাখা খুলতে পেরেছে।

ওয়াকিবহাল মহলের খবর হলো, মহারাষ্ট্রের নাগপুরের মতোই আরেকটি আরএসএস সদর দপ্তর খুলতে চাইছেন উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। তিনিও একজন প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী। যেহেতু মোদির প্রকাশ্য সমালোচনা করেছেন ভাগবত, তাই প্রবল অস্বস্তিতে পড়েছে বিজেপি। প্রকাশ্যে না বলা হলেও, বিজেপির সদর দপ্তরেই শোনা যাচ্ছে, ভাগবত ভুল কিছু বলেননি। তিনি প্রকৃত রাষ্ট্রনায়কের মতো পথ দেখাতে চেয়েছেন।

এ নিয়ে কংগ্রেসের কটাক্ষ- যাকে নিয়ে এই কথা বলা, তিনি কি আদৌ শুনবেন? নিজেকে সংশোধন করবেন?
অনেকেই মনে করছেন, এতদিন বিজেপি শক্তিশালী থাকায় সেভাবে মুখ খোলেনি সঙ্ঘ নেতৃত্ব। এবার ভোটের পরই স্পষ্ট, বিজেপির সেই সংখ্যার জোর আর নেই। তারা এখন শরিকনির্ভর। সে কারণেই প্রকাশ্যে মুখ খুলতে শুরু করেছে আরএসএস। এমনকি ভোটের পরই প্রকাশ্যে নাম না করে মোদি সরকারের সমালোচনা করে সঙ্ঘকর্মীদের ক্ষোভ সামনে তুলে ধরেছেন মোহন ভাগবত।

নাগপুরে সঙ্ঘের একটি সভায় এই বোমা ফাটিয়েছিলেন মোহন ভাগবত। তার পরামর্শ ছিল- শত্রু নয়, বিরোধীদের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখতে হবে। তার মতে, বিরোধীরা অন্য ভাবনা তুলে ধরেন। তাই রাজনীতিতে বিরোধীদের গুরুত্ব দিতে হবে। মোদি সরকারের প্রথম দুটি পর্বে সংখ্যাধিক্যের জোরে বিরোধী মতকে শুধু অগ্রাহ্য করাই নয়, গুঁড়িয়ে দেওয়ার মনোভাব দেখা দিয়েছে। বিগত সরকারের শেষদিকে মোদি যেভাবে বিরোধীদের নির্বিচারে সাসপেন্ড করে বিনা আলোচনায় বিল পাস করিয়েছেন, তা বিজেপির অনেক নেতাই ভালোভাবে নেননি। এবার প্রতিপক্ষকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলে বুঝিয়ে দিয়েছেন, এভাবে বিরোধীদের ওপর বুলডোজার চালানো সঙ্ঘ সমর্থন করে না।

কিন্তু তাতেও মোদির মানসিক পরিবর্তন হবে বলে মনে করে না কংগ্রেস। কংগ্রেস সাংসদ গৌরব গটস বলেছেন, আমার মনে হয় না, এরপরও নরেন্দ্র মোদি মোহন ভাগবতের কথায় কোনো গুরুত্ব দেবেন। বিহারের আরজেডি নেতা তেজস্বী যাদব বলেছেন, মোহন ভাগবত মুখ খুললেন বটে; কিন্তু অনেক দেরিতে।

এবারের নির্বাচনে কু-কথার ফুলঝুরি ছুটিয়েছেন অনেকেই। জাতপাত তুলে মন্তব্য করার জন্য নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধেও নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ জমা পড়েছে। সঙ্ঘপ্রধান বলেন, ভোটে লড়ার সময় একটা মর্যাদা থাকা উচিত। সেই মর্যাদা পালন করা হয়নি। এক বছর ধরে অশান্ত হয়ে থাকা মণিপুর পরিস্থিতি নিয়েও সরব হয়েছেন ভাগবত।

কংগ্রেস নেতা কপিল সিবাল বলেছেন, আমাদের কথা শোনা তো মোদির ধাতে নেই। এবার মোহন ভাগবতের কথা তো অন্তত শুনুন।
প্রথমবার ক্ষমতায় আসার সময় থেকেই নরেন্দ্র মোদি-বাহিনীর কয়েকটা নির্দিষ্ট এজেন্ডা ছিল। তার মধ্যে ছিল- রামমন্দির নির্মাণ, কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা রদ, তিন তালাক বন্ধ, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি পাস করানো; ‘এক দেশ এক ভোট’ নীতি চালু করা ইত্যাদি।

এর মধ্যে রামমন্দির নির্মাণ, কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা বিলোপ এবং তিন তালাকের মতো এজেন্ডা পূরণ হয়েছে। রামমন্দির তৈরি করেও উত্তরপ্রদেশে ভোটবাক্সে তার কোনো সুফল বিজেপি পায়নি। তারপরও আইনমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়ে প্রথম সাক্ষাৎকারেই অর্জুন মেঘওয়াল বলেছেন, নতুন সরকারের লক্ষ্যই হবে- ‘এক দেশ এক ভোট’ এবং ‘অভিন্ন দেওয়ানি বিধি’ লঘু করা। কিন্তু জোট সরকারের শরিক ও শক্তপোক্ত বিরোধীদের চাপে পড়ে তা কতটা সফল হবে, তা নিয়ে সন্দিহান রাজনৈতিক মহল। তারা এও মনে করছেন, নরেন্দ্র মোদি যত তাড়াতাড়ি জোটের নেতাদের কাছে আত্মসমর্পণ করবেন, ততই ভালো। কিন্তু আদৌ কি তিনি তা করবেন? নাকি টিডিপি নেতা চন্দ্রবাবু নাইডু এবং জেডিইউ নেতা নীতিশ কুমারের সঙ্গে সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হবে মোদির, সেটাই এখন দেখার।

লেখক: ভারতের সিনিয়র সাংবাদিক

শিক্ষা খাতে ব্যয় যথাসময়ে হতে হবে

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৪, ১১:০৩ এএম
আপডেট: ১৫ জুন ২০২৪, ১১:০৩ এএম
শিক্ষা খাতে ব্যয় যথাসময়ে হতে হবে
রাশেদা কে চৌধূরী

২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাজেট প্রণয়নে সরকারের অনেক সদিচ্ছার অভিপ্রকাশ আমরা দেখেছি। বাজেট টাকার অঙ্কে বেড়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীর সংখ্যাও বেড়েছে। কিন্তু সে অনুপাতে শিক্ষার্থীপ্রতি বরাদ্দ বাড়েনি। উদাহরণস্বরূপ উপবৃত্তির কথা বলা যায়। উপবৃত্তি আগে যা ছিল তাই আছে। টাকার যে মূল্যমান তাতে সেটা কোথায় নেমে গেছে, সেটা আমাদের ভেবে দেখা দরকার। 

এখানে কোনো পরিবর্তন করা হয়নি। আমাদের নানা ধরনের কর্মসূচি আছে। সব জায়গায় একই কথা প্রযোজ্য যে, ইনফ্লেশানের বিচার করা। বাজেটে অনেক সদিচ্ছার কথা পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। আরেকটি ব্যাপার হলো, আমরা যেটা বরাবর দেখেছি ইনফ্লেশান জিডিপির অনুপাতে বাড়েনি। এই সাইকেল থেকে আমরা কেন বের হতে পারছি না, জানি না। সবচেয়ে দুঃখের ব্যাপার হলো, সরকার বলতে থাকে পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই একই রকম অবস্থা। 

সরকারের সদিচ্ছার বহিঃপ্রকাশ আমরা আইসিটিতে দেখেছি। আইসিটি মাধ্যমে তথ্য-উপাত্ত যেটুকুন পাওয়া যায়, বিশেষ করে সেখানে ডিজিটাল ল্যাব করা হয়েছে কিন্তু বাস্তবতা হলো, সেখানে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত প্রশিক্ষক নেই। মফস্বল শহরগুলো পর্যন্ত ঠিক আছে। কিন্তু গ্রামগঞ্জে প্রত্যন্ত অঞ্চলে তা কতটুকু কার্যকর হচ্ছে তার কোনো নিরীক্ষণ নেই। এবারও যা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, সেটা কতটুকু কাজে লাগছে, সেটা নিয়েও প্রশ্ন থেকে যাবে। 

অনেক জায়গায় শিক্ষক প্রশিক্ষণের কথা বারবার বলা হয়েছে। এ প্রশিক্ষণগুলো শ্রেণিকক্ষে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, শিক্ষকরা যেটুকু প্রশিক্ষণ অর্জন করলেন, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিশেষ করে নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন করতে গেলে সেটা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, সে ক্ষেত্রে মনিটরিংয়ের অভাব থেকেই যাচ্ছে। 

মনিটরিং করতে গেলে সে ক্ষেত্রে তথ্য-উপাত্ত নিয়ে সেগুলোর বিচার-বিশ্লেষণের মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থাকে উন্নত করা। কীভাবে এটা করা যায়, সে ক্ষেত্রে আমরা কোনো দিকনির্দেশনা দিচ্ছি না। প্রতিবারের মতো আমরা যে বিষয়টি দেখেছি প্রতিবছরই টাকা ফেরত যায়। 

এবারও এডিপির পর্যালোচনায় সবচেয়ে বড় দুটি খাত মনে করা হয়েছে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য। শিক্ষায় ১২ হাজার কোটি টাকা এবং স্বাস্থ্য ৪ হাজার কোটি টাকা। একটি প্রশ্ন এসেই যায় যে, বাজেট ব্যবহারে আমাদের কি দক্ষতা নেই? সেটার ব্যাপারে আমাদের করণীয় কী হবে? অথবা নির্দেশনা কোথা থেকে আসবে? 

মানবসভ্যতা বিনির্মাণের বড় দুটি প্রিয় পিলার শিক্ষা ও স্বাস্থ্য। সেখানে যদি আমরা যথাযথভাবে বাজেট ব্যবহার করতে না পারি, সেটা পর্যালোচনা করে দেখা দরকার কেন পারছি না। এখানেই প্রধানমন্ত্রী বারবার একটি কথা বলেন, আমরা কবে সক্ষম হব। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, এবারও শিক্ষা গবেষণায় তেমন বরাদ্দ হয়নি। 

বাংলাদেশের অর্জনের একটি জায়গা আছে, সেটা হলো কৃষি গবেষণায় আমরা ভালো ফল পেয়েছি। শিক্ষা গবেষণায় আমরা সেটা করে দেখাতে পারিনি। আমরা দেখেছি যে, শিক্ষা গবেষণায় তথ্য-উপাত্ত নিয়ে এসে পরিকল্পনা করে গবেষণা করলে সেটি বেশি ফলপ্রসূ হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, এবার সিলেটে প্রায় ৩ লাখের মতো শিক্ষার্থী ফেল করল। কেন করল? প্রধানমন্ত্রী নিজে বলেছেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখা দরকার। কিন্তু কীভাবে দেখবে? গবেষণা উপাত্ত সংগ্রহ না করে? বিষয়গুলো আমাদের ভাবতে হবে।

শিক্ষকদের বেতন এবং অবকাঠামো নির্মাণের পর্যাপ্ত ব্যয় বরাদ্দ হলেও সঠিকভাবে ব্যবহৃত হয় না। যেখানে প্রয়োজন নেই, সেখানে ব্যয় করার কিছু নেই। কিন্তু যেখানে প্রয়োজন, সেখানে যেন এটা সঠিকভাবে হয়। 

মনে রাখতে হবে, যথাযথ ব্যয় যথাস্থানে যথাসময়ে। এ জন্য সঠিক মনিটরিং দরকার। তা ছাড়া শুধু বরাদ্দ দিলেই হবে না, বরাদ্দের ব্যবহার জানতে হবে। নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন করতে গেলে অগ্রসর মুখে যে বাজেট দরকার ছিল, সেটা এবারের বাজেটে অনুপস্থিত। নতুন শিক্ষাক্রম ব্যবহার বাস্তবায়ন করতে গেলে শুধু প্রশিক্ষণ দিলে হবে না, প্রশিক্ষণ যথাযথ ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, সেই নিরীক্ষণ এবং গবেষণা আমাদের দেখতে হবে। আমি মনে করি, শিক্ষার মানের দিকে যথাযথ দৃষ্টি দিতে হবে। 

শিক্ষা শিক্ষার্থীর কোনোই কাছে আসবে না যদি না আমরা বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেতে পারি। উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি, সিলেট বোর্ড ফলাফলের দিক থেকে এবার সবচেয়ে পিছিয়ে আছে। দক্ষতা বিচক্ষণতা অনুযায়ী যথাযথ বিষয়ে দক্ষ শিক্ষক যদি না থাকে, তাহলে কীভাবে হবে? একদিকে শিক্ষকসংকট, অন্যদিকে দক্ষ শিক্ষকের অভাব। দুটিই আমাদের খুবই দরকার।

বেতন-ভাতা বাড়িয়ে কিছু হবে না। অবকাঠামো পরিবর্তন-পরিবর্ধন দিয়েও হবে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন রকম কার্যকলাপ পরিলক্ষিত হচ্ছে। যেখানে আমাদের নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ভীষণ রকম পরিলক্ষিত। শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আমরা দূষণমুক্ত রাখতে পারতাম কিন্তু পারিনি। আমি মনে করি, শিক্ষার মানের দিকে দৃষ্টি দেওয়া দরকার। 

সিলেট বোর্ড কেন সবচেয়ে পিছিয়ে? প্রথমত, দক্ষ শিক্ষক নেই। দ্বিতীয়ত, দক্ষ শিক্ষক প্রশিক্ষণ নেই। শিক্ষকসংকট এবং একই সঙ্গে দক্ষ শিক্ষকের অভাব আমাদের দেশে দুটিই খুব প্রকট। তবে একই সঙ্গে আমি যে কথাটি বলতে চাই, শিক্ষকদের নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ হতে হবে। সেটা কখনো বাজেট দিয়ে পূরণ হবে না। মানবিক মূল্যবোধ গড়তে পারিবারিক শিক্ষার অনেক বড় একটি ভূমিকা রয়েছে। 

প্রশিক্ষণের ওপর তা নির্ভর করবে। যোগ্য শিক্ষক নিয়োগের ওপর নির্ভর করবে এবং প্রশিক্ষণের মধ্যে নৈতিক মূল্যবোধের বিষয় শিক্ষক প্রশিক্ষণ সিলেবাসে কতটুকু আছে সেটিও দেখা দরকার। আমরা কেন কোনোটাই বাস্তবায়ন করতে পারছি না, সেটা দেখা দরকার। শিক্ষা জাতির ভিত নির্মাণ করে। কাজেই শিক্ষা খাতকে কখনোই দূষিত করা উচিত নয়। আজকাল আমরা শিক্ষক পাই না। 

শিক্ষকদের শিক্ষক মনে হয় না। আরেকটি বিষয়ে আমি উল্লেখ করতে চাই, শিক্ষকদের নানা ধরনের সরকারি কাজে ব্যবহার করা হয়। এ রকমও দেখা গেছে, ক্লাসরুমে শিক্ষক নেই। প্রশ্ন করে জানা গেছে, উপজেলা নির্বাচনে গেছে। এগুলো কেন হয় অথবা হচ্ছে আমাদের ভাবতে হবে। শুধু গার্মেন্ট শিল্প দিয়ে অথবা প্রবাসী আয় দিয়ে জাতির ভিত নির্মাণ করা সম্ভব নয়। 

দেখা যাচ্ছে, আমাদের গার্মেন্ট সেক্টরে ম্যানেজমেন্ট লেভেলে শিক্ষিত কর্মকর্তা নেই। শ্রীলঙ্কা, নেপাল এদের নিয়ে নেয়। প্রকৃতপক্ষে আমরা দেশে মেধা তৈরি করতে পারছি না। আমরা দক্ষ জনশক্তি করতে পারছি কি না, এই প্রশ্নটা আমাদের নিজেদের করা উচিত।

লেখক: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা