ওয়ার্ল্ড আরবানাইজেশন প্রস্পেক্টাস ২০২৫-এর জরিপ অনুসারে, ২০২৫ সালে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল নগর ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা। এরপরই ঢাকার অবস্থান। জাপানের টোকিওকে পেছনে ফেলেছে জাকার্তা ও ঢাকা। তৃতীয় স্থানে থাকা টোকিওর পর তালিকায় আছে যথাক্রমে ভারতের নয়াদিল্লি ও চীনের সাংহাই। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার জনসংখ্যা ও পরিধি দিন দিন বাড়ছে। বিশ্বের অন্য শহরের তুলনায় ঢাকায় মানুষের আনাগোনা বাড়ছে। জনসংখ্যার দিক থেকে জাপানের টোকিওকে পেছনে ফেলে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহরের তালিকায় উঠে এসেছে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা। জাতিসংঘের নতুন এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তালিকায় বর্তমানে প্রথম স্থানে রয়েছে ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তা। যে গতিতে জনসংখ্যা বাড়ছে তাতে ২০৫০ সাল নাগাদ ঢাকাই হবে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল শহর। জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ক বিভাগের (ইউএন ডিইএসএ) ‘ওয়ার্ল্ড আরবানাইজেশন প্রসপেক্টাস ২০২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল শহরের তালিকায় ২০০০ সালে শীর্ষস্থানে উঠে আসে টোকিও। কিন্তু এবারের প্রতিবেদনে জাপানের রাজধানী নেমে গেছে তৃতীয় স্থানে। টোকিওর জনসংখ্যা এখন ৩ কোটি ৩৪ লাখ। অন্যদিকে, তালিকার নবম স্থান থেকে এক লাফে দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসা ঢাকার বর্তমান জনসংখ্যা ৩ কোটি ৬৬ লাখ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। আর ৪ কোটি ১৯ লাখ জনসংখ্যা নিয়ে বিশ্বের বৃহত্তম শহর এখন জাকার্তা। বর্তমানে কর্মের টানে দেশের অধিকাংশ মানুষ ঢাকামুখী। দেশের প্রধান প্রধান অফিস, আদালত, শিল্পকারখানা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসহ প্রধান ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো ঢাকাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠায় বিভিন্ন পেশার মানুষ মূলত কর্মের তাগিদেই ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও নিজেদের ঘরবাড়ি ফেলে নগরীতে বসবাস এবং মানবেতর জীবনযাপন করছে। বাংলাদেশে গ্রাম কিংবা মফস্বল থেকে দিন দিন ঢাকামুখী মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। গ্রামাঞ্চল থেকে ঢাকায় অভিবাসনের হার আমাদের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের দ্বিগুণেরও বেশি। গ্রামাঞ্চলে কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত। অনেকেই কাজের খোঁজে ঢাকায় আসেন। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত পরিবেশগত ঝুঁকির কারণেও মানুষ ঢাকামুখী হচ্ছেন।
জনসংখ্যার চাপে পিষ্ট হচ্ছে রাজধানী ঢাকা। দিন দিন বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে রাজধানী। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী বহু আগে বাসযোগ্যতা হারিয়েছে মেগা সিটি ঢাকা। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রাজধানীতে প্রতি একরে ৭০০ থেকে ৮০০ জন মানুষ বাস করেন। এ নগরীর চারটি এলাকা বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘনবসতিপূর্ণ। এ চারটি এলাকা হচ্ছে- লালবাগ, বংশাল, গেন্ডারিয়া এবং সবুজবাগ। জনসংখ্যার চাপে পিষ্ট ঢাকায় প্রতিনিয়ত বাড়ছে জনসংখ্যা। এটি নিয়ন্ত্রণে নানা সময় বিভিন্ন ধরনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু ফল মিলেছে কম। সব ধরনের সেবা রাজধানীকেন্দ্রিক হওয়ায় সবাই ভিড় জমাচ্ছে এখানে। সরকারি অফিস-আদালত, ব্যাংকের হেড অফিসসহ বিভিন্ন ধরনের সেবা কেন্দ্রীভূত হওয়ায় মানুষের সামনে বিকল্পও নেই। এ ছাড়া শিল্পকারখানার অধিকাংশই রাজধানী এবং এর আশপাশে হওয়ার কারণে বিশাল জনগোষ্ঠীর বাস এখানে। বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়গুলো সহজেই স্থানান্তর বা বিকেন্দ্রীকরণ করা যায়। বিভাগ ও অন্য জেলাগুলোয় কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করলে মানুষ আপনা-আপনিই ঢাকা থেকে স্থানান্তরিত হবে। এতে ধীরে ধীরে বাসযোগ্যতা ফিরে পাবে ঢাকা। দেশে বহুদিন ধরেই বিকেন্দ্রীকরণ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। বসবাসের সূচকে ঢাকার তলানিতে থাকার অন্যতম কারণ হচ্ছে অতিরিক্ত জনসংখ্যা ও অধিক জনঘনত্ব। উন্নয়ন পরিকল্পনায় জনঘনত্ব এবং অবকাঠোমো ও নাগরিক সুযোগ-সুবিধার আলোকে নগরের ভার বহনক্ষমতা বিবেচনা করা না হলে এ নগর আরও বাসযোগ্যতা হারাবে।
বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, করপোরেশন সবগুলোর অবস্থান ঢাকাতেই। প্রাণের শহর রাজধানী ঢাকা দিনকে দিন নগরবাসীর কাছে বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠছে। বায়ুদূষণ, পানি, শব্দ ও আলোদূষণের পাশাপাশি যানজটে স্থবির জনজীবন। রাজধানী ঢাকাকে নাগরিকবান্ধব ও বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে হলে একটি ভালো পরিকল্পনার প্রয়োজন। সময়মতো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা না গেলে আমাদের সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে। যেকোনো উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সামাজিক সাম্য, সামাজিক ন্যায়বিচার, আর্থসামাজিক অবস্থা, পরিবেশ, আর্থিক সামর্থ্য ইত্যাদি বিবেচনায় এনে সঠিকভাবে শহরের অন্তর্ভুক্তিমূলক জনবান্ধব পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। ঢাকাকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলতে ১৯১৭ সালে নগরপরিকল্পনাবিদ স্যার প্যাট্রিক গেডিসকে দিয়ে একটি মাস্টারপ্ল্যান করেন ব্রিটিশরা। এটাকে মাস্টারপ্ল্যানের ধারণাপত্র বলা হয়। এর নাম ছিল ‘ঢাকা টাউন প্ল্যান’। ঢাকা সমতল আর বৃষ্টিপ্রবণ শহর। এ দুটো বাস্তবতা ধরে বিশদ পরিকল্পনার সুপারিশ করেন ওই নগরপরিকল্পনাবিদ। কিন্তু ওই সুপারিশ আর বাস্তব রূপ পায়নি। সে সময় ঢাকার চারদিকে চারটি নদীর পাশাপাশি শহরে অনেক খালও ছিল। একসময় শহরে ছড়িয়ে থাকা প্রায় ৫০টি প্রাকৃতিক খাল দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়ে নদীতে পড়ত। ফলে জলাবদ্ধতা হতো না। সে সময় ঢাকার জনসংখ্যা ছিল ৮-১০ লাখ। এরপর পাকিস্তান আমলে ১৯৫৯ সালে ঢাকার জন্য আরেকটি মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা হয়। এ মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী বেশ কিছু অবকাঠামো, আবাসিক এলাকা, বাণিজ্যিক এলাকা তৈরি করা হয়। তবে পুরো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়নি। ১৯৫৯ সালে ঢাকার জনসংখ্যা ছিল ১৫ লাখ। বাংলাদেশে পরিকল্পনাবিদদের সমন্বয়ে ঢাকার জন্য প্রথম মাস্টারপ্ল্যান তৈরি হয় ২০১০ সালে। সে সময় ঢাকার জনসংখ্যা প্রায় দেড় কোটি ধরা হতো। রাজউকের নেতৃত্বে প্রণয়ন করা এ মাস্টারপ্ল্যানের নাম ড্যাপ। মাস্টারপ্ল্যানটি পরিকল্পিত ও বাসযোগ্য নগর গঠনের সূচকের বিবেচনায় ৭০ শতাংশ সঠিক ছিল। তবে ৩০ শতাংশ নিয়ে নানা প্রশ্ন ছিল। ২০১৫ সালে ড্যাপের মেয়াদ শেষ হয়। এর পর ২০১৬ থেকে ২০৩৫ সালের জন্য ড্যাপ সংশোধন করা হয়। ২০২২ সালের আগস্ট মাসে সংশোধিত ড্যাপ গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়। এবারের ড্যাপে ঢাকার জনঘনত্ব কমানোর সুপারিশ করা হয়েছে। উন্নত বর্জ্যব্যবস্থাপনা সিস্টেমের গুরুত্ব অপরিসীম, যেখানে নগরীর বর্জ্য সংগ্রহকে অপটিমাইজ করতে এবং আবর্জনা কমাতে সেন্সর ব্যবহার করতে হবে। এ নগরীতে প্রয়োজন সুপরিকল্পিত ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম যা পানির ব্যবহার নিরীক্ষণ ও পরিচালনা এবং বর্জ্য কমাতে সহায়তা করবে। প্রয়োজন উন্নত পরিবহনব্যবস্থা, যা যানজট কমাতে সাহায্য করবে। এরপর প্রয়োজন শক্তিশালী এনার্জি সিস্টেম; যা শক্তির অপচয় এবং কার্বন নির্গমন কমাতে সাহায্য করবে রিয়েল-টাইম ডেটা ব্যবহার করে। একটি সময়োপযোগী সিটির লক্ষ্য হলো প্রযুক্তি ব্যবহার করে তার নাগরিকদের জীবনমান উন্নত করা, অর্থনৈতিক সুযোগ বৃদ্ধি করা এবং আরও টেকসই এবং দক্ষ শহুরে পরিবেশ নিশ্চিত করা।
দেশে দ্রত নগরায়ণ হলেও বিপুল মানুষকে ধারণ করার জন্য নগরগুলো মোটেই প্রস্তুত নয়। আবাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগসহ নানা পরিষেবায় নগরগুলো বেশ পিছিয়ে। এ অবস্থায় ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা কঠিন হয়ে পড়বে। নগরায়ণের সঙ্গে জনসংখ্যা বৃদ্ধির লাগাম টানা, পরিবার-পরিকল্পনা কর্মসূচির সম্প্রসারণ, বেকারত্ব ও প্রজননহার কমানোর বিষয়গুলো জড়িত। এর সঙ্গে দরকার কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর লভ্যাংশকে কাজে লাগানো। বাংলাদেশে তা যথাযথভাবে হচ্ছে না। রাজধানী ঢাকা অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে। ঢাকায় বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে যত মানুষ মারা যাবে, তার কয়েক গুণ বেশি মারা যাবে আগুনে পুড়ে ও বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে। ভূমিকম্পের পর গ্যাসলাইনে বিস্ফোরণ ঘটবে। সেই আগুনে পুড়ে পুড়ে পুরো নগর দাউ দাউ করে জ্বলে উঠবে। ভূগর্ভস্থ পানি ও আশপাশের নদী-জলাশয়ের পানি নগরে বন্যার সৃষ্টি করবে। উপড়ে পড়া বিদ্যুতের খুঁটির তারের সংস্পর্শে এসে সেই পানি বিদ্যুতায়িত হবে। বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে বিধ্বস্ত ঢাকানগরীতে আক্রান্তদের উদ্ধারের লোক খুঁজে পাওয়া যাবে না। উদ্ধারকাজে সাধারণ সময়ে যারা মূল ভূমিকা রাখেন, সেই ফায়ার সার্ভিসের অস্তিত্ব থাকবে কি না, তা নিয়েও সন্দেহ আছে। রাজধানী ঢাকা শহরে তেমন আশঙ্কা বুকে চেপে রেখে আমরা দিনরাত পার করছি। দিনে দিনে রাজধানী ঢাকার আয়তন যেভাবে বাড়ছে তেমনি বাড়ছে জনসংখ্যা। বাড়তি মানুষের চাপে ঢাকা বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠছে। নানা সংকটে জর্জরিত নগরবাসীর নাভিশ্বাস চরমে উঠছে। যানজট, পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ সংকট, মাদকের আগ্রাসন, চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মশার উপদ্রব প্রভৃতি সমস্যাকে নিত্যসঙ্গী করে বসবাস করছেন সবাই। আমরা মনেপ্রাণে চাই, ঢাকা একটি চমৎকার বাসযোগ্য স্বস্তিকর জীবনের শান্ত সুনিবিড় আন্তর্জাতিক মানের শহর হিসেবে গণ্য হোক বিশ্বজুড়ে।
লেখক: কলাম লেখক ও সাবেক রেজিস্ট্রার, জাবিপ্রবি
.jpg)


