রাজস্ব বাড়ানোর জন্য অবশ্যই পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। এজন্য বর্তমান করদাতাদের ওপর চাপ না বাড়িয়ে নতুন করদাতা শনাক্ত করা জরুরি। তাদের কর নেটওয়ার্কের আওতায় আনতে হবে। অন্যদিকে কর ফাঁকি রয়েছে। যেমন ভ্যাট আদায়ের ক্ষেত্রে অনেক দোকানদার রসিদ দেয় না। তারা টাকা আদায় করলেও সরকারের কোষাগারে জমা দেয় না।...

দেশে জিডিপির তুলনায় কর আদায়ের যে হার তা তুলনামূলকভাবে অনেক কম। পৃথিবীর যেসব দেশের কর-জিডিপি অনুপাত সবচেয়ে কম, বাংলাদেশ তাদের মধ্যে অন্যতম। এ ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কর আদায়ের হার বাড়ছে না, বরং আরও কমছে। এটি খুবই উদ্বেগজনক। দেশে বিদ্যমান আর্থ-সামাজিক অবস্থায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা ইত্যাদি খাতে বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, স্বাস্থ্য খাতে প্রয়োজনের তুলনায় বরাদ্দ অনেক কম। এরপর যে বরাদ্দ দেওয়া হয়, সেটাও ব্যয় হয় না। ফলে সরকারি অর্থ ব্যবহারের জন্য যেসব প্রতিষ্ঠানের ওপর দায়িত্ব আছে, ওই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। ফলে বরাদ্দ অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত হবে। ঘাটতি মোকাবিলায় ব্যাংকের ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। কারণ, সরকারি বাজেট বাস্তবায়নে ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ কমে যাবে। এতে বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ফলে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। সামষ্টিক অর্থনীতির কিছু সূচক, বর্তমানে সন্তোষজনক পরিস্থিতিতে নেই। এরপর রয়েছে ব্যাংক খাতের উচ্চ খেলাপি ঋণ। বাড়ছে মূল্যস্ফীতি। নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশ্বের অনেক দেশে মূল্যস্ফীতি কমছে। কারণ, উন্নত দেশগুলো তাদের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যবস্থা নিচ্ছে। সীমিত সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করে প্রতিটি দেশই চায় কীভাবে সর্বাধিক জনকল্যাণ নিশ্চিত করা যায়। বিপরীতে বিভিন্ন খাতে সরকারের ব্যয় বাড়ানোর দরকার আছে। সে ক্ষেত্রে ঋণ না নিয়ে কীভাবে রাজস্ব আহরণের মাধ্যমে বাড়তি ব্যয় মেটানো যায়, সেটি সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। দেশে এখনো করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) আছে, কিন্তু কর দেন না এ সংখ্যাটা বিশাল। তাদের কাছ থেকে কর আদায়ের ব্যবস্থা করতে হবে। ভ্যাটের ক্ষেত্রেও আদায়ের ঘাটতি আছে। অনেক পণ্য কিনলে ভ্যাটের রসিদ দেওয়া হয় না। এই রসিদ দেওয়া নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে দেশের তৃণমূল পর্যায়ের দোকানপাটেও ভালো বেচাকেনা হয়। তারা ভ্যাটের আওতায় আসার যোগ্য। তাই তাদের ভ্যাটের আওতায় আনতে হবে। এভাবেই করের পরিধি বাড়াতে হবে।
বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য বেশ কিছু করণীয় আছে। প্রথমত, দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখন পর্যন্ত খুব একটা সন্তোষজনক নয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবশ্যই ভালো করতে হবে। দ্বিতীয়ত, অবকাঠামো, ট্রান্সপোর্ট ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইত্যাদি ক্ষেত্রেও নানা রকমের সমস্যা আছে। তৃতীয়ত, ইজ-অব-ডুয়িং-বিজনেস যে সূচকে আছে, সেই সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান অনেক নিচে। এর মধ্যে বেশ কিছু সাব-ইন্ডিকেটরস আছে। সেগুলোর উন্নতি হওয়া দরকার। এ বিষয়গুলো যদি আমরা সমন্বয় করতে পারি, তাহলে আশা করা যায় যে, অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি বাড়বে। আর অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে হলে বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণ করতেই হবে।
দেশের সাধারণ জনগণ প্রচণ্ড চাপের মধ্যে আছে। তার কারণ হচ্ছে, মূল্যস্ফীতি বাড়লে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যে কারণে উচ্চমধ্যবিত্তের মানুষ হয়তো তাদের সঞ্চয় ভেঙে জীবনযাত্রার মানটা রক্ষা করতে পারে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কোনো সঞ্চয় নেই। এ মানুষগুলোর জীবনমান ক্রমশই নিম্নমুখী হচ্ছে। এখানে যা করতে হবে; সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় যেসব প্রকল্প আছে তা যেন সুষ্ঠুভাবে কার্যকর করা যায়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
রিজার্ভ বাড়ানোর জন্য আমাদের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি সন্তোষজনক নয়। ফলে রপ্তানি আরও বাড়াতে হবে। এ ক্ষেত্রে পণ্যের বহুমুখীকরণ জরুরি। কারণ, এখনো আমাদের রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। ফলে এখানে নতুন নতুন পণ্য কীভাবে যোগ করা যায়, সেজন্য চেষ্টা করতে হবে। আমাদের রিজার্ভ বৃদ্ধির আরেকটি খাত হলো রেমিট্যান্স (প্রবাসী আয়)। এই রেমিট্যান্সের অবস্থা ভালো নয়। যদিও জনশক্তি রপ্তানি অনেক বাড়ছে, কিন্তু রেমিট্যান্স বাড়ছে না। বর্তমানে রেমিট্যান্স পাঠালে প্রণোদনা দেওয়া হয়। এটিও তেমন কাজ করছে না। এই রেমিট্যান্স বাড়াতে পদক্ষেপ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে কীভাবে সহজে রেমিট্যান্স পাঠানো যায়, সে ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ছাড়া দেশ থেকে বিভিন্নভাবে অর্থ পাচার হচ্ছে। বিনিয়োগ বাড়ছে না। রপ্তানি আয় কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের নিচে। আরেকটি বিষয় হলো আমাদের মুদ্রার বিনিময় হার বেশি। অর্থাৎ ডলারের বিপরীতে ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে টাকা। তবে ডলারের দাম মূল্যস্ফীতি আমাদের প্রভাবিত করে। কাঁচামাল, মধ্যবর্তী পণ্য, মূলধনি যন্ত্রপাতি এবং কিছু খাদ্যও আমরা আমদানি করে থাকি। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে আমরা সম্পৃক্ত। তবে অভ্যন্তরীণ চাহিদা কমিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কাম্য নয়। মূল্যস্ফীতির কারণে নিম্নআয়ের মানুষের যাতে ক্ষতি না হয়, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। অন্যদিকে দেশে বৈষম্য বাড়ছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো আঞ্চলিক বৈষম্য। সে ক্ষেত্রে সামাজিক নিরাপত্তা বাড়াতে হবে। তবে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে যেসব বরাদ্দ দেওয়া হয়, তার সুবিধা প্রকৃত লোকজন পায় না। তাই এখানে দুর্নীতি বন্ধে পদক্ষেপ নিতে হবে।
দেশের ব্যাংক খাতে সুশাসনের অভাব আছে। ফলে খেলাপি ঋণ বেপরোয়াভাবে বেড়েছে। ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে পারস্পরিক আঁতাত ছিল। এর মানে হলো পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যমে এক ব্যাংকের মালিকপক্ষ অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে। তারাও আবার নিজেদের ব্যাংক থেকে ওই মালিকদের ঋণ দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত কোনো পক্ষই এই ঋণ পরিশোধ করেনি। রাজনৈতিক নেতা, ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং ঋণ গ্রহীতার পারস্পরিক যোগসাজশে এসব ঋণ দেওয়া হয়েছে। এসব কারণে ব্যাংকিং খাতে বড় সংকট তৈরি হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি।
দেশ থেকে বেপরোয়াভাবে অর্থ পাচার হয়েছে। এর মধ্যে আমদানিতে মূল্য বেশি দেখানো (ওভার ইনভয়েসিং) এবং রপ্তানিতে পণ্যমূল্য কম দেখানো (আন্ডার ইনভয়েসিং) অন্যতম। বৈশ্বিক সংস্থা জিএফআইর (গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি) রিপোর্টে বাংলাদেশ থেকে বাণিজ্যের আড়ালে টাকা পাচারের কথা বলা হয়েছে। এগুলো চিহ্নিত করা খুব বেশি কঠিন কাজ নয়। কারণ, কোন পণ্যের দাম কী তা অনলাইনের মাধ্যমে জানা যায়। ফলে পণ্য আমদানি-রপ্তানিতে যে ঘোষণা দেওয়া হয়, তা বাস্তবসম্মত কি না চিহ্নিত করা যায়। কাজেই সবদিকেই আমাদের সুনজর দিতে হবে।
রাজস্ব বাড়ানোর জন্য অবশ্যই পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। এজন্য বর্তমান করদাতাদের ওপর চাপ না বাড়িয়ে নতুন করদাতা শনাক্ত করা জরুরি। তাদের কর নেটওয়ার্কের আওতায় আনতে হবে। অন্যদিকে কর ফাঁকি রয়েছে। যেমন ভ্যাট আদায়ের ক্ষেত্রে অনেক দোকানদার রসিদ দেয় না। তারা টাকা আদায় করলেও সরকারের কোষাগারে জমা দেয় না। আয়করের ক্ষেত্রে যাদের টিআইএন যাদের আছে, আয়কর রিটার্ন জমা দেয় তার অর্ধেক। বাকি অর্ধেককে কেন পাওয়া যাচ্ছে না, তা আমার কাছে বোধগম্য নয়। ফলে আমাদের করদাতা বাড়ানো জরুরি।
লেখক: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ
