দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। একই সঙ্গে বেকারত্ব বা কর্মসংস্থানের একটা ভয়াবহ অবস্থা। মানুষের মধ্যে অস্থিরতা প্রচণ্ড। আমাদের লক্ষ্যমাত্রায় যে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ, ইনসাফ শব্দটা এত জনপ্রিয় হলো, কিন্তু ইনসাফ প্রতিষ্ঠার পথ হিসেবে আমরা প্রতিশোধকেই মাধ্যম হিসেবে নিলাম। লক্ষ্য ও উপায়ের মধ্যে এই যে অমিল, প্রতিশোধস্পৃহাকে সমাজের মধ্যে বড় করে জাগিয়ে তুলে আমরা কোথায় সেই ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে পারব?...

দেশের রাজনীতিতে বড় ধরনের পট-পরিবর্তন হয়েছে। সামষ্টিক অর্থনীতি যেভাবে ভঙ্গুর অবস্থায় চলে গিয়েছিল, সেখানে বর্তমানে অনেকটা স্থিতিশীল হয়েছে। এটা নিঃসন্দেহে আশার কথা। দুটি সূচক এখনো উদ্বেগজনক। এর মধ্যে একটি হলো মূল্যস্ফীতি, অপরটি বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ। এখানে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি। অগ্রগতি না হওয়ার অন্যতম কারণ, দেশের অর্থনীতিকে যেভাবে গোষ্ঠীতন্ত্রের কবলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সেখান থেকে এখনো সম্পূর্ণ উত্তরণ হয়নি। অর্থাৎ আগের সরকার বিদায় নিয়েছে, আর গোষ্ঠীতন্ত্র চলে গেছে, বিষয়টি এমন নয়।
দেশের দারিদ্র্য বিমোচন, কৃষকের সমস্যা মেটানো এবং মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির গতি স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে নিয়ে আসা অন্যতম। প্রথমত, দেশে সম্পদের স্বল্পতা। রাজস্ব আহরণ কম এবং নানাভাবে বিদেশে অর্থ পাচার হয়েছে। এটি একটি বাস্তবতা। দ্বিতীয়ত, বিশাল পট-পরিবর্তন হয়েছে। ফলে মানুষের মধ্যে নানা ধরনের চাহিদা বা আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হয়েছে। এর একটি চাপ আছে। আবার এই দুই বাস্তবতার মধ্যে আমলাতান্ত্রিক গতানুগতিকতা পরিহার করে উদ্ভাবনী নেতৃত্ব (লিডারশিপ) দেখানোর সুযোগ আছে। সুযোগের মানে এই নয় যে, হঠাৎ করে বিশাল কোনো প্রকল্প নিতে হবে। আরেকটি বিষয় হলো- অর্থ বরাদ্দের আকার। এ আকার অবশ্যই বাস্তবসম্মত হবে। পাশাপাশি বাড়াতে হবে ব্যয়ের দক্ষতা। বছর শেষে সংশোধিত বাজেটে বিভিন্ন খাতের বরাদ্দের আকার কমিয়ে আনা হয়েছে। ইতিবাচক খবর হলো- এবার বাজেটের আকার বাড়ানোর মোহ থেকে মুক্ত হয়েছে। অনেকে মেগা প্রকল্পের সমস্যার কথা বলেন। মেগা প্রকল্প বড় সমস্যা নয়। সমস্যা হলো ব্যয়ের দক্ষতা ছিল না। মূল্যস্ফীতি কিন্তু অবাস্তব নয়। মূল্যস্ফীতি কমানো তো একটা যৌক্তিক চাওয়া; এবং সেটা কীভাবে কমাতে পারি, সেটার সুস্পষ্ট নীতিমালা দরকার। এটা তো অবাস্তব চাওয়া নয়। সম্পদের সীমাবদ্ধতার মধ্যে বোঝাপড়াটা কীভাবে করব, এ জায়গায় পরিষ্কার নজর দেওয়া দরকার। আমাদের অনুন্নয়ন ব্যয়, যাকে পরিচালন ব্যয় বলে, এখানে আসলে কৃচ্ছ্রসাধন কীভাবে করা যায় সেটা দেখতে হবে।
অগ্রাধিকার খাত বা সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর ব্যাপারে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি কী তা স্পষ্ট করে জানাতে হবে। অর্থাৎ সব খাতে বরাদ্দ বাড়ানো সম্ভব না হলেও পলিসি সাপোর্ট (নীতিসহায়তা) দেওয়া জরুরি। কর্মসংস্থান বাড়াতে নিতে হবে কার্যকর পদক্ষেপ। কর্মসংস্থানের মানে এই নয় যে, সরকার নিজেই কর্মসংস্থান বাড়াবে। জনআকাঙ্ক্ষা এমন নয় যে, অবাস্তব কিছু করো। বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির প্রক্রিয়ায় গত তিন-চার দশক ধরে দুটি চালকই প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে। একটি হলো তৈরি পোশাক এবং অন্যটি রেমিট্যান্স (প্রবাসী আয়)। এ দুটি থাকবে। এর সঙ্গে প্রবৃদ্ধির নতুন চালক তৈরি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কৃষি, ওষুধ খাত, আইটি সেবা এবং চামড়াশিল্প অন্যতম। অবশ্যই আয়ের খাতগুলো দুর্বল। এ অবস্থার উত্তরণ জরুরি। সে ক্ষেত্রে ঋণ নেওয়া একটি কৌশলগত দিক। শুধু ঋণ নিলে হবে না। বেসরকারি খাতের বিকাশে সরকারকে নীতিসহায়তা দিতে হবে। কৌশলের ক্ষেত্রে আমার কিছু প্রত্যাশা আছে। এটি বাস্তবায়নে গভীর কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজন নেই। যেমন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাড়াতে হবে। চূড়ান্ত কথা হলো সম্পদের নানা সীমাবদ্ধতা থাকলেও আকাঙ্ক্ষা বিশাল। এটি মাথায় রাখতে হবে। অপচয় কীভাবে কমানো যায়, সে ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি ব্যয় যৌক্তিকীকরণ করতে হবে। এ ছাড়া আয় বাড়াতে নিতে হবে কার্যকর পদক্ষেপ। বেসরকারি খাতে নীতিসহায়তা দিয়ে ব্যবসার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার জরুরি।
এখন আমাদের ফ্রেমিং হতে হবে পাওনার হিসাব এবং উত্তরণের পথরেখা। পাওনার হিসাবটা খুবই জরুরি। বিচার, সংস্কার, নির্বাচন- এ বিষয়গুলোতে কী কী হলো, সেই পাওনার হিসাবটা আজকে মূল কথা হতে হবে। করণীয় কথা যদি বলি, মানুষকে গণনার বাইরে ফেলে দিয়েছে, মানুষ যে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে; এখন দর্শক, এত বিশাল একটা পরিবর্তনে অংশগ্রহণকারী নয়- মূল কাজ হতে হবে এই মানুষকে কীভাবে দর্শক থেকে সক্রিয় অংশগ্রহণকারীর পর্যায়ে আবার নিয়ে আসা যায়। সেটার একটা মাধ্যম অবশ্যই নির্বাচন। এ ছাড়া সক্ষমতায় যে ধস নেমেছে, এ ব্যাপারে আমাদের একটা চিৎকার দিতে হবে। প্রয়োজন হলে এটাকে বিদায় জানাতে হবে। যারা দায়িত্বে আছেন, তাদের এটা শুনতে হবে। তাদের শুনতে হবে, সক্ষমতার এ ধস পাল্টাতে হবে। মানুষকে গণনার বাইরে নিয়ে যাওয়া যাবে না। কাগুজে প্রক্রিয়ায় আমাদের মেধা ও মনোযোগ সবকিছু আটকে রেখে জাতীয় ঐক্যকে পশ্চাতে ফেলে দেওয়া যাবে না।
দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির একটা ভয়াবহ বাস্তবতা আছে। একই সঙ্গে বেকারত্ব বা কর্মসংস্থানের একটা ভয়াবহ অবস্থা। আমাদের লক্ষ্যমাত্রায় যে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ, ইনসাফ শব্দটা এত জনপ্রিয় হলো, কিন্তু ইনসাফ প্রতিষ্ঠার পথ হিসেবে আমরা প্রতিশোধকেই মাধ্যম হিসেবে নিলাম। লক্ষ্য ও উপায়ের মধ্যে এই যে অমিল, প্রতিশোধস্পৃহাকে সমাজের মধ্যে বড় করে জাগিয়ে তুলে আমরা কোথায় সেই ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে পারব? আমাদের দৈনন্দিন বাস্তবতায় আইনশৃঙ্খলার একটা ভয়াবহ অবনতি হয়েছে। এমন নয় যে, কাঠামো নেই। মানুষের মধ্যে অস্থিরতা প্রচণ্ড। নারী নির্যাতনের পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, নির্যাতনকারীর অধিকাংশ হচ্ছে তরুণ। আগামী রমজানের আগে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন করতে চায় সরকার। এবারের নির্বাচন যেন আনন্দ-উৎসব, শান্তিশৃঙ্খলা, ভোটার উপস্থিতি এবং সৌহার্দ্য ও আন্তরিকতার দিক থেকে দেশের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকে, সেজন্য আমরা সবাই মানসিক প্রস্তুতি নেব ও প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজন শুরু করব। অনেক জল্পনা-কল্পনার পর দেশের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা করা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে নির্বাচন অনুষ্ঠানের সুনির্দিষ্ট সময়ের কথা বলেছেন। আমরা তার এ ঘোষণাকে স্বাগত জানাই। সরকারের প্রায় দেড় বছরের শাসনকালে দেশের ক্রমাবনতিশীল পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বিভিন্ন সময়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছিলেন। অবশেষে প্রধান উপদেষ্টার ঘোষণার মধ্যদিয়ে সে অনিশ্চয়তা কেটে গেছে। সবকিছু অতিক্রম করে দেশ এখন নির্বাচনি সড়কে। নির্বাচন মানেই উৎসব। আগামী নির্বাচন সুন্দর ও সফল হোক- একটি গণতান্ত্রিক সরকার দেশ পরিচালনায় আসুক। দেশে গণতন্ত্রের শাসন ফিরে আসুক জাতি হিসেবে আমরা সেই প্রত্যাশা করি।
লেখক: অর্থনীতিবিদ, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এবং চেয়ারম্যান [পিপিআরসি]
.jpg)


