এলপি গ্যাসের বাজারে চলছে নজিরবিহীন নৈরাজ্য। সরবরাহ সংকটের অজুহাতে নির্ধারিত মূল্যের দ্বিগুণ দামে বিক্রি হচ্ছে সিলিন্ডার। এতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। লাইনের গ্যাস সরবরাহে সংকটের কারণে এলপিজি সিলিন্ডারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন রাজধানীর বাসিন্দারা। দেশের অর্থনীতি ও শিল্পকে বাঁচাতে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে এ মুহূর্তে সরকারকে সমুদ্র অঞ্চলে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে মনোযোগ দিতে হবে।…
বর্তমানে তীব্র গ্যাসসংকট বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি জাতীয় বিপর্যয়ের রূপ নিয়েছে। এটি এখন একটি নৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সারা বছরই দেশবাসী এই ভোগান্তিতে আছে। গ্যাসের চাপে অনেকে ইট বসিয়ে রান্না করছে। কেউবা ঝুঁকিপূর্ণ বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করছে। কেরোসিনের চুলাও ব্যবহৃত হচ্ছে। লাইনের গ্যাসের সমস্যার কারণে অনেকে ইতোমধ্যে সিলিন্ডার গ্যাস সংগ্রহ করে নিচ্ছে। তাছাড়া হোটেল নির্ভরশীলতাও বেড়ে যাচ্ছে। এলপি গ্যাসের সংকটে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় এক রকম হাহাকার পড়ে গেছে। ভোক্তাদের ভোগান্তি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। তিতাস লাইনের গ্যাসও রাজধানীতে ঠিকমতো পাওয়া যায় না। দিনের বেশির ভাগ সময় মেলে না গ্যাস। চুলায় পাতিল উঠলেও রান্না শেষ হয় না। গ্যাসের সংকটে পড়ে অনেকেই হোটেল থেকে কেনা খাবার খেয়ে দিন পার করছেন। হঠাৎ লিকুইফাইড পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন ক্রেতারা। বেশি দাম দিয়েও গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। কয়েক দিন আগের ১২৫৩ টাকার এলপিজি গত শুক্রবার বিক্রি হয়েছে ১৮০০ থেকে ২৫০০ টাকায়। এরপরও অনেক এলাকায় মিলছে না এলপিজি সিলিন্ডার। খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, ডিলারদের কাছ থেকেও সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না, তাই এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এদিকে পাইপলাইনের গ্যাস নেই কিংবা চাপ না থাকায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানেই অনেকে এলপিজি ব্যবহার করে থাকেন। কয়েক দিন ধরে সংকট চলতে থাকায় বেশি দামে বিক্রি হয়েছে বলে বিক্রেতারা জানান। কিন্তু দুই-তিন দিন ধরে কোথাও এলপিজি মিলছেই না। এতে চরম বিপাকে পড়েছেন গ্রাহকরা। শীতের সময় বিশ্ববাজারে এলপিজির চাহিদা বেড়ে যায়। এতে দামও কিছুটা বাড়তি থাকে। এর সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে এলপিজি আমদানির জাহাজসংকট। বাংলাদেশ সাধারণত ওমান, কাতার, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এলপিজি আমদানি করে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র এলপিজি পরিবহনকারী কয়েকটি জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ায় পরিবহন সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে কিছু কোম্পানি এলপিজি আমদানি করতে পারছে না, যা বাজারে ঘাটতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজধানীতে গ্যাসের অভাবে হাহাকার তৈরি হয়েছে। দিনে-রাতে চব্বিশ ঘণ্টায় গ্যাসসংকটে রান্নার কাজে ব্যাহত হচ্ছে। তবে গ্যাসের চলমান সংকট নিরসনের সুষ্ঠু পথ খুঁজে পাচ্ছে না সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। উল্টো আগের নিয়মেই গ্যাসের বিল বাবদ গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা নিচ্ছে। এ নিয়ে জনমনে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। প্রেক্ষাপটে দেশীয় সার, গার্মেন্ট, টেক্সটাইল, নিট, ইস্পাত এবং সিমেন্ট কারখানায় সার্বিক সক্ষমতার প্রায় অর্ধেকে নেমেছে উৎপাদন। কারখানা তৈরি করেও আমদানিনির্ভর হয়ে আছে সারের জোগান। ছোট এবং মাঝারি শিল্পও ধুঁকছে একই সমস্যায়। ব্যবসার আকার আপাতত ছোট করতে বাধ্য হয়েছেন, হচ্ছেন অনেক বৃহৎ শিল্পমালিক ও উদ্যোক্তারা। এমনকি অন্য ব্যাবসায়িক ঝামেলায় থাকা কিছু ছোট-বড়-মাঝারি শিল্প উৎপাদন নিয়মিত রেখে টিকে থাকতে পারলেও এখন জ্বালানি সংকটে বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সরকার গ্যাস ঘাটতিতে এলএনজি আমদানি করে সংকট মোকাবিল করছে। এটি আপৎকালীন হতে পারে দীর্ঘ সময়ের জন্য নয়। তাই টেকসই পথ্য খুঁজতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে শিল্পকে উৎসাহিত করা যেতে পারে। গ্যাসের লাইনগুলো সংস্কার ও মেরামত করতে হবে। গ্যাস অনুসন্ধান, কূপ খনন ও বিতরণ কাজে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে গ্যাস সঞ্চালনের গতি বাড়ানোর ক্ষেত্রে সরকারের আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। সারা দিনে একবার গ্যাস আসছে না, হাঁড়িতে চড়ছে না চাল-ডাল। অনেকেই রেস্টুরেন্টের খাবার কিনে খেতে বাধ্য হচ্ছেন। কেউবা অপেক্ষা করছেন গভীর রাত পর্যন্ত। আবার গ্যাসের অভাবে বাসাবাড়ির মতো বাণিজ্যিক কার্যক্রমও স্থবির হয়ে পড়েছে। কোনো কোনো কারখানায় উৎপাদন প্রায় বন্ধ, কোথাও কমেছে বা স্থগিত করা হয়েছে। অসহনীয় এ গ্যাসসংকটে যেমন জনজীবন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি কমছে শিল্পের উৎপাদন। কারণ শিল্প-কারখানায় চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। পোশাকশিল্প, সিরামিক, সিমেন্ট খাতের মতো গ্যাসনির্ভরশীল উৎপাদন খাতগুলোয় উৎপাদন কমেছে। দেশের বড় রপ্তানি খাত পোশাকশিল্পে বিকল্প হিসেবে জেনারেটর ও বিদ্যুৎ ব্যবহারের ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। সার কারখানায় গ্যাসসংকটে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ফিলিং স্টেশনগুলোয় লাইন দীর্ঘায়িত হচ্ছে। প্রয়োজনীয় গ্যাস পাচ্ছেন না সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালকরা। অন্যান্য গ্যাসনির্ভরশীল প্রতিষ্ঠানে গ্যাসসংকটে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। গ্যাসের এই সংকটে দেশীয় শিল্পের মতোই বিদেশি বিনিয়োগও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিদেশি বিনিয়োগ নিরুৎসাহ হচ্ছে। প্রাকৃতিক গ্যাস আধুনিক জীবনের একটি অপরিহার্য জ্বালানি, যা মূলত রান্নাবান্না, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প-কারখানার কাঁচামাল, পরিবহন এবং ঘর গরম বা ঠাণ্ডা রাখতে ব্যবহৃত হয়। এটি একটি পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী জ্বালানি উৎস, যা কয়লা বা তেলের তুলনায় কম দূষণ সৃষ্টি করে। গ্যাস ব্যবহারের ওপর কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে অনেক সময় গ্যাসের চুলা অপ্রয়োজনে জ্বালিয়ে রেখে গ্যাস অপচয় করা হয়। এটা বিপজ্জনক। যেকোনো মুহূর্তে আগুন লেগে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। অন্যদিকে এলপি সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহারকারীরা পরিমাণভিত্তিক গ্যাস কেনার কারণে প্রয়োজন ছাড়া গ্যাস ব্যবহার করেন না। গ্যাস জাতীয় সম্পদ। তাই ব্যবহারের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হলে অপচয় রোধ হবে। গ্যাস ব্যবহারেও সচেতনতা বাড়বে।
এলপি গ্যাসের বাজারে চলছে নজিরবিহীন নৈরাজ্য। সরবরাহ সংকটের অজুহাতে নির্ধারিত মূল্যের দ্বিগুণ দামে বিক্রি হচ্ছে সিলিন্ডার। এতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। লাইনের গ্যাস সরবরাহে সংকটের কারণে এলপিজি সিলিন্ডারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন রাজধানীর বাসিন্দারা। এলপিজির দাম নিয়ে এমন নৈরাজ্য এখন রাজধানীজুড়েই। সংকটের অজুহাতে নির্ধারিত দামের প্রায় দ্বিগুণ দামে বিক্রি হচ্ছে সিলিন্ডার। সরকারি নির্ধারণ অনুযায়ী ১ হাজার ২৫০ টাকা দামের ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে গ্রাহকদের গুনতে হচ্ছে ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত। দাম বৃদ্ধিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন গ্রাহকরাও। তাদের অভিযোগ, দোকানভেদে এলপিজির দামে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। কেউ ১ হাজার ৯০০ টাকা চাইছে, কেউ আবার ২ হাজার ১০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত দাম হাঁকাচ্ছে। এলপিজির এমন অস্বাভাবিক দামে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়লেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নজরদারি নেই বলে অভিযোগ করছেন ভুক্তভোগীরা। দ্রুত বাজার তদারকি না বাড়ালে সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। মজুত গ্যাসও ফুরিয়ে আসছে আসছে। গ্যাস সংকটে চাহিদা ও জোগানের ভারসাম্য নষ্ট হবে। ফলে সাধারণ ভোক্তাদের জন্য পণ্যের দাম বেড়ে যাবে, যা মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়াবে। গ্যাসসংকট দূরীকরণে কোনো সরকারই যথেষ্ট মনোযোগ দেয়নি। সে কারণেই গ্যাসের এই করুণ দশা। এ রকম বাস্তবতায় দেশীয় উৎস থেকে গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর ওপর বিশেষ করে জোর দিতে হবে। সে ক্ষেত্রে সম্ভাব্য পুরোনো গ্যাস কূপগুলো সংস্কারের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা চালাতে হবে। পাশাপাশি নতুন কূপ আবিষ্কারই একমাত্র পথ। দেশের অর্থনীতি ও শিল্পকে বাঁচাতে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে এ মুহূর্তে সরকারকে সমুদ্র অঞ্চলে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে মনোযোগ দিতে হবে।
লেখক: কলাম লেখক ও সাবেক রেজিস্ট্রার, জাবিপ্রবি
[email protected]
.jpg)


