বর্তমান সরকারকে শুরু থেকেই আইনশৃঙ্খলার উন্নতি করতে হবে। শুরুতেই কঠোর না হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার শঙ্কা তৈরি হবে। তা ছাড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সঙ্গে দেশের অর্থনীতির একটি বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। নিরাপত্তা ছাড়া উন্নয়ন টেকসই হয় না, আবার অর্থনৈতিক স্বস্তি ছাড়া সামাজিক শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয় না।...
সাম্প্রতিক অতীতে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে যথেষ্ট উদ্বেগ ছিল। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে দেখা গেছে, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছিনতাই, ডাকাতি, ঘন ঘন খুন, চাঁদাবাজি, মব ভায়োলেন্স এবং অন্যান্য অপরাধের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল এবং তা জনমনে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি সৃষ্টি করেছিল। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ সালের একপর্যায়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় কয়েকটি খুনের মতো তথ্যও প্রকাশ হয়েছে, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ‘সন্তোষজনক নয়’ বলে জনমনে প্রতীয়মান হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দেশে যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে এ বিষয়ে দ্বিমতের অবকাশ নেই। জাতীয় নির্বাচনের আগে দেশের কোথাও না কোথাও প্রতিদিনই ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, মোটরসাইকেলে আগুন, প্রতিপক্ষের ওপর হামলা-পাল্টা হামলা, সর্বোপরি বিক্ষোভ মিছিল, মামলা, রাজপথ অবরোধসহ মানববন্ধনের ঘটনাও ঘটছে। এ ক্ষেত্রে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত, মারামারি, খুনোখুনি এমনকি সন্ত্রাসী কার্যকলাপসহ হতাহতের সংখ্যাও কম নয়। এর অনিবার্য নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে জনজীবনেও। যে কারণে নাগরিক জীবনে বিরাজ করেছে ভয়ভীতি, শঙ্কা, অনিশ্চয়তা এমনকি আতঙ্ক। চুরি-ডাকাতি, ছিনতাই, রাহাজানির ঘটনা বাড়ছে প্রায় প্রতিদিনই। নতুন সরকার দায়িত্বভার গ্রহণের পর অনেকের মনেই স্বস্তি আসতে শুরু করেছে এই ভেবে যে, দেশে এখন অন্তত মব ভায়োলেন্স বা যেখানে-সেখানে, যখন তখন সন্ত্রাস, রাহাজানির মতো ঘটনা সহজে ঘটবে না।
অনেকেরই আশা ছিল, ’২৪-এর জুলাই অভ্যুত্থানের পর এসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ও সমাজ ঘুরে দাঁড়াবে, অন্তর্বর্তী সরকার এতে নেতৃত্ব দেবে। বাস্তবে উল্টোটাই ঘটেছে বলে মনে হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে দরগা-মাজার ইত্যাদি স্থাপনায় যেসব হামলা-ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে, সেগুলোর কোনোটারই বিচার হয়নি।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি গণমাধ্যমে দেওয়া তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতারা বলেন, ১৮ মাস আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও মব সংস্কৃতির কারণে ব্যবসায় গুমট ভাব ছিল। নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসায় এর উন্নতি হবে। এ পরিস্থিতি শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষার বিষয়ই নয়; এর ফলে দেশের অর্থনৈতিক দৃঢ়তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতাও বিপদে পড়ছে। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, অপরাধ ও বিশৃঙ্খলা বেড়ে গেলে বিনিয়োগ কমে যায়, পর্যটনসহ বিভিন্ন খাতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয় এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হয়। বিগত ১৮ মাসে আমরা এমনটা দেখেছি অনেক ক্ষেত্রে। এ মুহূর্তে আমরা আশা করব দেশে একটি স্থিতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সূত্রপাত হবে, যাতে দেশের জনগণ স্বস্তিতে চলতে পারে।
বাংলাদেশে বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নের জন্য এখন সময় যেন শুধু আইন প্রয়োগ বৃদ্ধি করার নয়, বরং আইনের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা- এটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সাধারণ মানুষের কাছে নিরাপত্তা মানে শুধু পুলিশের উপস্থিতি নয়; তারা চায়, আদালতে দ্রুত বিচার ও বিচারের নিশ্চয়তা, প্রতিদিনের জীবনে নিরাপত্তা, রাজনৈতিক সংঘর্ষ থেকে মুক্ত পরিবেশ এবং সমাজে সবার জন্য সমান আইনের প্রয়োগ।
নতুন সরকার যদি এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে চায়, তাহলে তাদের প্রথম কাজ হওয়া উচিত আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর মধ্যে স্বচ্ছতা, দক্ষতা ও দায়িত্বশীলতা ফেরানো, যাতে তারা রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপ থেকে মুক্ত হয়ে কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি শুধু রাস্তায় নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনা নয়; বরং মানুষের বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা, এটাই দীর্ঘমেয়াদে দেশের শান্তি, উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতার মূল ভিত্তি।
বর্তমান পরিবর্তিত রাজনৈতিক ব্যবস্থায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোকে আরও সক্রিয় ও কার্যকর ভূমিকা রাখা প্রয়োজন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর জন্য নানা ধরনের ষড়যন্ত্র এবং অপচেষ্টা থাকতে পারে। দেশের সাধারণ মানুষ কোনোভাবেই দেশকে অস্থিতিশীল চায় না। দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হোক, এটাই সবার প্রত্যাশ্যা। অবশ্য সরকারের আগ্রহও প্রকাশ পাচ্ছে যে তারা আইনশৃঙ্খলার উন্নতি করতে চায়। নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে দেওয়া প্রথম ভাষণে বলেছেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং কঠোরভাবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনগণের মনে শান্তি-নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনাই হচ্ছে বিএনপি সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। দলীয় বা রাজনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তি অথবা জোরজবরদস্তি নয়, আইনের শাসনই হবে রাষ্ট্র পরিচালনার শেষ কথা।’ এ ছাড়া নবনিযুক্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, আমরা বাংলাদেশে মব কালচার পুরোপুরি বন্ধ করতে চাই। মব কালচার শেষ। দাবি আদায়ের নামে মব কালচার করা যাবে না।’
অনেক উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ও স্থায়িত্বে বিভিন্ন কাঠামোগত বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ওইসব দেশ প্রথমত, আইন প্রয়োগে স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যেমন- অনেক দেশেই পুলিশ বাহিনীর কার্যক্রম মানবাধিকার, আইনের শৃঙ্খলা ও সামাজিক পর্যাপ্ততা- এসব ভিত্তিতে নিয়মিতভাবে পর্যালোচনা করা হয়। পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর জনগণের আস্থা বাড়াতে পুলিশ সংস্কার, প্রশিক্ষণ ও আচরণগত কাঠামো উন্নয়ন করা হয়; যাতে তারা রাজনৈতিক চাপ থেকে স্বাধীনভাবে আইনের প্রয়োগ করতে পারে।
দ্বিতীয়ত, উন্নত দেশগুলোতে সামাজিক নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক ও সমাজভিত্তিক সহায়তা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নেও ভূমিকা রাখে। অর্থাৎ শুধু অপরাধ দমনই নয়; সামাজিক পরিদর্শন, যুবসম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা, কর্মসংস্থান ও শিক্ষা- এসব সুষ্ঠু ব্যবস্থার মাধ্যমে অপরাধ প্রবণতা কমানোর দিকে মনোযোগ দেওয়া হয়। অপরাধের শোরগোল কমে গেলে সমাজের নৈতিক পরিবেশও উন্নত হয়।
তৃতীয়ত, আইনের শাসন ও বিচারব্যবস্থার প্রতিপালন উন্নত রাষ্ট্রগুলোতে নির্বাচনি ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ। তারা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত করার অংশ হিসেবে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দেয়, যাতে যেকোনো অপরাধের তদন্ত ও বিচারে অবিচ্ছিন্ন ও সুবিচার নিশ্চিত হয়।
এ ছাড়া উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে সাধারণ নাগরিকের কাছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আস্থা বাড়ানোর জন্য জনগণ-সেবাকেন্দ্রিক অভিগম অবলম্বন করা হয়- পুলিশকে শুধু অপরাধ দমনকারী হিসেবেই নয়, বরং সমাজের সহযোগী রূপে গড়ে তোলা হয়।
বর্তমান সরকারকে শুরু থেকেই আইনশৃঙ্খলার উন্নতি করতে হবে। শুরুতেই কঠোর না হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার শঙ্কা তৈরি হবে। তাছাড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সঙ্গে দেশের অর্থনীতির একটি বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। নিরাপত্তা ছাড়া উন্নয়ন টেকসই হয় না, আবার অর্থনৈতিক স্বস্তি ছাড়া সামাজিক শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয় না। তাই নতুন সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত এ দুই খাতে সমন্বিত ও সময়োপযোগী কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ।
লেখক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়


