ঢাকা ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, রোববার, ০৭ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
বিসিবির পরিচালক তামিম ইকবাল রামুতে ছেলের গুলিতে বাবার মৃত্যু পঞ্চগড়ে পুকুরে ডুবে দুই মাদরাসা শিক্ষার্থীর মৃত্যু প্রোগ্রামিং ভাষা অধ্যায়ের ১৩টি বহুনির্বাচনি প্রশ্ন ও উত্তর, ৫ম পর্ব, এইচএসসির তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিশ্বের এই বৃহত্তম যৌথ পরিবারে দৈনিক লাগে ৯০ কেজি চাল প্রতিশ্রুতি প্রদানে মন্ত্রী-এমপিদের দায়িত্বশীল হওয়ার পরামর্শ দিলেন স্পিকার ঝিনাইদহে তেলবাহী ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত, ৯ ঘণ্টা পর স্বাভাবিক গানে আর ফিরবেন না রিংকু ওয়েমোর চালকহীন নতুন রোবোট্যাক্সি ‘ওজাই’ শাড়ির নিচে লুকিয়েও রক্ষা পেলেন না তৃণমূল নেতা কুষ্টিয়ায় ধর্ষককে গণধোলাই নোয়াখালীতে জেলি মিশ্রিত চিংড়ি ধ্বংস, লাখ টাকা জরিমানা টেসলার রোবোট্যাক্সি সেবায় ধীরগতি সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ এবং শত্রু-মিত্র খেলা এ যেন মাঠ ভরাট নয়, সম্প্রীতির উৎসব শেরপুরে প্রাইভেটকারে মদ, কারবারি আটক টেকনাফে সিএনজি-কাভার্ডভ্যান সংঘর্ষ, দুই এসআইসহ আহত ৪ নবাব সলিমুল্লাহর জন্মবার্ষিকী উদযাপন মজুরি বাড়াতে দৌলতপুরে বিড়ি শ্রমিকদের সড়ক অবরোধ গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে আরও ৭ শিশুর মৃত্যু রোগীর বেশে ইয়াবা পাচারের চেষ্টা, রামুতে তিন নারী আটক ৬ নবজাতকের প্রত্যেক পরিবারকে ৮০ লাখ টাকা করে আর্থিক সহায়তার ঘোষণা তোফায়েল আহমেদসহ ১৬ এমপির মৃত্যুতে শোকপ্রস্তাব কিছু মানুষের কারণে কেন অপমানিত হবে ১৮ কোটি বাংলাদেশি? ঘোড়ার মাংস খাওয়া নিয়ে জয়ার রিটে যা নির্দেশ দিল হাইকোর্ট মনোযোগ বাড়াতে চাইলে কী খেতে হবে রাঙামাটিতে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের ৬ দফা দাবিতে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি পটুয়াখালীর পৌর পার্ক এলাকা থেকে যুবকের মরদেহ উদ্ধার নতুন সরকারের প্রথম বাজেট অধিবেশন শুরু এবি ব্যাংকের এআই-চালিত ডিজিটাল লোনসেবা ‘এবি ই- লোন’ এর উদ্বোধন
Nagad desktop

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ জরুরি

প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৩:৫২ পিএম
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ জরুরি
ড. সুলতান মাহমুদ রানা

বর্তমান সরকারকে শুরু থেকেই আইনশৃঙ্খলার উন্নতি করতে হবে। শুরুতেই কঠোর না হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার শঙ্কা তৈরি হবে। তা ছাড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সঙ্গে দেশের অর্থনীতির একটি বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। নিরাপত্তা ছাড়া উন্নয়ন টেকসই হয় না, আবার অর্থনৈতিক স্বস্তি ছাড়া সামাজিক শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয় না।...

সাম্প্রতিক অতীতে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে যথেষ্ট উদ্বেগ ছিল। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে দেখা গেছে, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছিনতাই, ডাকাতি, ঘন ঘন খুন, চাঁদাবাজি, মব ভায়োলেন্স এবং অন্যান্য অপরাধের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল এবং তা জনমনে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি সৃষ্টি করেছিল। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ সালের একপর্যায়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় কয়েকটি খুনের মতো তথ্যও প্রকাশ হয়েছে, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ‘সন্তোষজনক নয়’ বলে জনমনে প্রতীয়মান হয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দেশে যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে এ বিষয়ে দ্বিমতের অবকাশ নেই। জাতীয় নির্বাচনের আগে দেশের কোথাও না কোথাও প্রতিদিনই ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, মোটরসাইকেলে আগুন, প্রতিপক্ষের ওপর হামলা-পাল্টা হামলা, সর্বোপরি বিক্ষোভ মিছিল, মামলা, রাজপথ অবরোধসহ মানববন্ধনের ঘটনাও ঘটছে। এ ক্ষেত্রে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত, মারামারি, খুনোখুনি এমনকি সন্ত্রাসী কার্যকলাপসহ হতাহতের সংখ্যাও কম নয়। এর অনিবার্য নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে জনজীবনেও। যে কারণে নাগরিক জীবনে বিরাজ করেছে ভয়ভীতি, শঙ্কা, অনিশ্চয়তা এমনকি আতঙ্ক। চুরি-ডাকাতি, ছিনতাই, রাহাজানির ঘটনা বাড়ছে প্রায় প্রতিদিনই। নতুন সরকার দায়িত্বভার গ্রহণের পর অনেকের মনেই স্বস্তি আসতে শুরু করেছে এই ভেবে যে, দেশে এখন অন্তত মব ভায়োলেন্স বা যেখানে-সেখানে, যখন তখন সন্ত্রাস, রাহাজানির মতো ঘটনা সহজে ঘটবে না।

অনেকেরই আশা ছিল, ’২৪-এর জুলাই অভ্যুত্থানের পর এসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ও সমাজ ঘুরে দাঁড়াবে, অন্তর্বর্তী সরকার এতে নেতৃত্ব দেবে। বাস্তবে উল্টোটাই ঘটেছে বলে মনে হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে দরগা-মাজার ইত্যাদি স্থাপনায় যেসব হামলা-ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে, সেগুলোর কোনোটারই বিচার হয়নি।

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি গণমাধ্যমে দেওয়া তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতারা বলেন, ১৮ মাস আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও মব সংস্কৃতির কারণে ব্যবসায় গুমট ভাব ছিল। নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসায় এর উন্নতি হবে। এ পরিস্থিতি শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষার বিষয়ই নয়; এর ফলে দেশের অর্থনৈতিক দৃঢ়তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতাও বিপদে পড়ছে। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, অপরাধ ও বিশৃঙ্খলা বেড়ে গেলে বিনিয়োগ কমে যায়, পর্যটনসহ বিভিন্ন খাতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয় এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হয়। বিগত ১৮ মাসে আমরা এমনটা দেখেছি অনেক ক্ষেত্রে। এ মুহূর্তে আমরা আশা করব দেশে একটি স্থিতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সূত্রপাত হবে, যাতে দেশের জনগণ স্বস্তিতে চলতে পারে।

বাংলাদেশে বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নের জন্য এখন সময় যেন শুধু আইন প্রয়োগ বৃদ্ধি করার নয়, বরং আইনের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা- এটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সাধারণ মানুষের কাছে নিরাপত্তা মানে শুধু পুলিশের উপস্থিতি নয়; তারা চায়, আদালতে দ্রুত বিচার ও বিচারের নিশ্চয়তা, প্রতিদিনের জীবনে নিরাপত্তা, রাজনৈতিক সংঘর্ষ থেকে মুক্ত পরিবেশ এবং সমাজে সবার জন্য সমান আইনের প্রয়োগ।

নতুন সরকার যদি এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে চায়, তাহলে তাদের প্রথম কাজ হওয়া উচিত আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর মধ্যে স্বচ্ছতা, দক্ষতা ও দায়িত্বশীলতা ফেরানো, যাতে তারা রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপ থেকে মুক্ত হয়ে কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি শুধু রাস্তায় নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনা নয়; বরং মানুষের বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা, এটাই দীর্ঘমেয়াদে দেশের শান্তি, উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতার মূল ভিত্তি।

বর্তমান পরিবর্তিত রাজনৈতিক ব্যবস্থায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোকে আরও সক্রিয় ও কার্যকর ভূমিকা রাখা প্রয়োজন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর জন্য নানা ধরনের ষড়যন্ত্র এবং অপচেষ্টা থাকতে পারে। দেশের সাধারণ মানুষ কোনোভাবেই দেশকে অস্থিতিশীল চায় না। দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হোক, এটাই সবার প্রত্যাশ্যা। অবশ্য সরকারের আগ্রহও প্রকাশ পাচ্ছে যে তারা আইনশৃঙ্খলার উন্নতি করতে চায়। নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে দেওয়া প্রথম ভাষণে বলেছেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং কঠোরভাবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনগণের মনে শান্তি-নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনাই হচ্ছে বিএনপি সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। দলীয় বা রাজনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তি অথবা জোরজবরদস্তি নয়, আইনের শাসনই হবে রাষ্ট্র পরিচালনার শেষ কথা।’ এ ছাড়া নবনিযুক্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, আমরা বাংলাদেশে মব কালচার পুরোপুরি বন্ধ করতে চাই। মব কালচার শেষ। দাবি আদায়ের নামে মব কালচার করা যাবে না।’

অনেক উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ও স্থায়িত্বে বিভিন্ন কাঠামোগত বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ওইসব দেশ প্রথমত, আইন প্রয়োগে স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যেমন- অনেক দেশেই পুলিশ বাহিনীর কার্যক্রম মানবাধিকার, আইনের শৃঙ্খলা ও সামাজিক পর্যাপ্ততা- এসব ভিত্তিতে নিয়মিতভাবে পর্যালোচনা করা হয়। পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর জনগণের আস্থা বাড়াতে পুলিশ সংস্কার, প্রশিক্ষণ ও আচরণগত কাঠামো উন্নয়ন করা হয়; যাতে তারা রাজনৈতিক চাপ থেকে স্বাধীনভাবে আইনের প্রয়োগ করতে পারে।

দ্বিতীয়ত, উন্নত দেশগুলোতে সামাজিক নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক ও সমাজভিত্তিক সহায়তা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নেও ভূমিকা রাখে। অর্থাৎ শুধু অপরাধ দমনই নয়; সামাজিক পরিদর্শন, যুবসম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা, কর্মসংস্থান ও শিক্ষা- এসব সুষ্ঠু ব্যবস্থার মাধ্যমে অপরাধ প্রবণতা কমানোর দিকে মনোযোগ দেওয়া হয়। অপরাধের শোরগোল কমে গেলে সমাজের নৈতিক পরিবেশও উন্নত হয়।

তৃতীয়ত, আইনের শাসন ও বিচারব্যবস্থার প্রতিপালন উন্নত রাষ্ট্রগুলোতে নির্বাচনি ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ। তারা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত করার অংশ হিসেবে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দেয়, যাতে যেকোনো অপরাধের তদন্ত ও বিচারে অবিচ্ছিন্ন ও সুবিচার নিশ্চিত হয়।

এ ছাড়া উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে সাধারণ নাগরিকের কাছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আস্থা বাড়ানোর জন্য জনগণ-সেবাকেন্দ্রিক অভিগম অবলম্বন করা হয়- পুলিশকে শুধু অপরাধ দমনকারী হিসেবেই নয়, বরং সমাজের সহযোগী রূপে গড়ে তোলা হয়।

বর্তমান সরকারকে শুরু থেকেই আইনশৃঙ্খলার উন্নতি করতে হবে। শুরুতেই কঠোর না হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার শঙ্কা তৈরি হবে। তাছাড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সঙ্গে দেশের অর্থনীতির একটি বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। নিরাপত্তা ছাড়া উন্নয়ন টেকসই হয় না, আবার অর্থনৈতিক স্বস্তি ছাড়া সামাজিক শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয় না। তাই নতুন সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত এ দুই খাতে সমন্বিত ও সময়োপযোগী কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ। 

লেখক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ এবং শত্রু-মিত্র খেলা

প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬, ০৫:১৭ পিএম
সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ এবং শত্রু-মিত্র খেলা
আনু মুহাম্মদ

যুক্তরাষ্ট্র গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য এসব দেশে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। শতভাগ ভুল কথা।  স্বৈরাচার সাম্রাজ্যবাদের জন্য কখনোই সমস্যা না, বরং বিশ্বে স্বৈরাচারী শাসকদের প্রধান অংশ তাদেরই তৈরি কিংবা তাদেরই লোক। স্বৈরশাসক তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে তারা বিরক্ত হয়।...

পুঁজিবাদের সম্প্রসারণে ঔপনিবেশিক ব্যবস্থা খুবই সহায়ক হয়েছিল। আর উপনিবেশগুলোতে রাজনৈতিক ক্ষমতা সম্প্রসারণে পশ্চিমা মিশনারিদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল, ভূমিকা ছিল স্থানীয় এক ধরনের ধর্মীয় নেতা ও ক্ষমতাবানদেরও। আবার ঔপনিবেশিক শাসনবিরোধী অবস্থানেও কোনো কোনো মিশনারি ও স্থানীয় কোনো কোনো ধর্মীয় নেতার ভূমিকা দেখা গেছে। উত্তর উপনিবেশকালে প্রান্তস্থ দেশগুলোতে খুঁটি ধরে রাখতে, বিপ্লব ঠেকাতে পুঁজিবাদীকেন্দ্র বা সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো ধর্মীয় শক্তি ব্যবহারে ব্যাপক সাফল্য দেখিয়েছে। মূলধারার চার্চ সাম্রাজ্যবাদের খুঁটি হিসেবে বরাবরই কাজ করেছে। তারা একদিকে মুসলিম রাজতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে সবরকম ব্যবস্থা নিয়েছে, অন্যদিকে ইসরায়েলকে একটি বিষফোঁড়া হিসেবে প্রতিষ্ঠার মধ্যদিয়ে তেলসমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান পাকাপোক্ত করেছে। মুসলিমপ্রধান দেশগুলোতে তাদের অনুগত ইসলামপন্থি দল ও ধর্মীয় নেতাদের মাধ্যমে বিপ্লববিরোধী আতঙ্ক সৃষ্টি করার কাজ সহজ ছিল। বস্তুত, এই ধর্মপন্থিরা এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার অনেক দেশে জনগণের মুক্তির লড়াই ঠেকাতে সামরিক বেসামরিক স্বৈরশাসকদের সমর্থন দেওয়ার মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদের আধিপত্যের পথই সুগম করেছে।

এভাবেই যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি আশির দশক পর্যন্ত বিভিন্ন অঞ্চলে অনেক ধর্মপন্থি সংগঠন, প্রভাবশালী ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকে ধর্মরক্ষার নাম করে নিজেদের আধিপত্য নিশ্চিত করার কাজে ব্যবহার করেছে। এর একটি বড় উদাহরণ আফগানিস্তান। প্রথমে মুজাহিদিনদের মাধ্যমে আফগানিস্তানে সোভিয়েত সমর্থিত সরকার উচ্ছেদ করে যুক্তরাষ্ট্র। সে সময় আফগান মুজাহিদিনদের সবরকম পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে, প্রশিক্ষণ দিয়েছে, অস্ত্র দিয়েছে, অর্থ দিয়েছে। এর অংশীদার ছিল সৌদি আরবও। ইউএসএইড সরবরাহ করেছে ইসলামের নামে সহিংস উন্মাদনা সৃষ্টির মতো বই, শিশুদের পাঠ্যপুস্তক। যার মধ্যে সোভিয়েত সৈন্যের চোখ উপড়ে ফেললে বেহেশতে যাওয়ার প্রতিশ্রুতিও ছিল।  আফগানিস্তানে সিআইএর এসব কার্যক্রম বাস্তবায়নে মাঠের ভূমিকা পালন করেছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী। সামরিক শাসনের মাধ্যমে জেনারেল জিয়াউল হকের মতো এক বাধ্য নিষ্ঠুর  সামরিক জেনারেলকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করা সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের খুব কাজে দিয়েছে।

মুজাহিদিনদের অস্থিতিশীল শাসনের সময়েই একপর্যায়ে আকস্মিকভাবে বিশাল শক্তি নিয়ে আবির্ভূত হয় তালেবান। মুজাহিদিনদের বিরুদ্ধে যাদের অস্ত্র, সরঞ্জাম, প্রশিক্ষণ এবং কৌশলগত সমর্থন সবই জোগান দিয়েছে সেই একই যুক্তরাষ্ট্র। প্রথম দফায় তালেবানরা আফগানিস্তানে ক্ষমতা দখলের সূচনা করে ১৯৯৭ সালের ২৪ মে। ঠিক তার আগের দিন যুক্তরাষ্ট্রের বৃহৎ ব্যবসা জগতের মুখপাত্র ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল আফগানিস্তান নিয়ে একটি সম্পাদকীয় প্রকাশ করে। সেখানে লেখা হয়: আফগানিস্তান হচ্ছে মধ্য এশিয়ার তেল, গ্যাস ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ রপ্তানির প্রধান পথ।... তাদের পছন্দ কর বা না কর ইতিহাসের এই পর্যায়ে তালেবানরাই আফগানিস্তানে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। দুই দিন পর অর্থাৎ ১৯৯৭ সালের ২৬ মে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃস্থানীয় পত্রিকা নিউইয়র্ক টাইমস লেখে: ক্লিনটন প্রশাসন মনে করে যে, তালেবানদের বিজয় ইরানের পাল্টা শক্তি হিসেবে দাঁড়াবে... এমন একটি বাণিজ্য পথ উন্মুক্ত করবে যা এই অঞ্চলে রাশিয়া ও ইরানের প্রভাবকে দুর্বল করবে।

মার্কিন তেল কোম্পানি ইউনোকল, যারা ১৯৯৯ থেকে ২০০৩ সময়ে বাংলাদেশ থেকে গ্যাস ভারতে রপ্তানির জন্য অনেক চেষ্টা করেছে, ক্লিনটন প্রশাসন ও ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের অবস্থানকে ‘খুবই ইতিবাচক অগ্রগতি’ বলে অভিহিত করে। এই কোম্পানি বিশ্ববাজারে বিক্রির জন্য তুর্কমেনিস্তান থেকে আফগানিস্তান হয়ে পাকিস্তান পর্যন্ত পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস ও অপরিশোধিত তেল নেওয়ার প্রকল্প নিয়ে অপেক্ষা করছিল।

১৯৯০-এর শুরুতে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বিশ্ব আধিপত্যের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শত্রুপক্ষ দরকার হয়। ১৯৯১ সালে প্রথম দফা ইরাক আক্রমণের মধ্যদিয়ে পরবর্তী কয়েক দশকের যাত্রাপথ নির্মিত হয়। একদিকে ‘গণতন্ত্র’ ও ‘শান্তি’র প্রতিপক্ষ ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে সবরকম বিদ্বেষী প্রচারণা, বৈষম্য ও আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হতে থাকে মধ্যপ্রাচ্য, আরব ও মুসলমান পরিচয়ের মানুষ। অন্যদিকে রাজা-বাদশাসহ মুসলিমপ্রধান দেশের শাসকদের দেখা যায় সাম্রাজ্যবাদী এ নকশা বাস্তবায়নে সক্রিয় ভূমিকা পালনে। এ সময় থেকে ‘ইসলামি সন্ত্রাসী’র তৎপরতাও বেশি বেশি দেখা যায়, যা এই নকশা এগিয়ে নিতে খুবই প্রয়োজনীয় ছিল।

২০০১ সালে নিউইয়র্কের ‘টুইন টাওয়ার’ হামলার পর থেকে এই কর্মসূচির অধিকতর সামরিকীকরণ ঘটে। ফুলিয়ে-ফাপিয়ে তোলা স্পষ্ট-অস্পষ্ট, ঘোষিত-অঘোষিত, ‘সন্ত্রাসী’দের  বিরুদ্ধে ২০০১ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে তথাকথিত ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ একটি বৈশ্বিক এজেন্ডার রূপ দেয়। আরব বিশ্বে রাজতন্ত্রকে ভর করেই এ সন্ত্রাসী আধিপত্য বিস্তৃত হয়। পাশাপাশি পুরোনো মিত্রদেরই সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করে যুক্তরাষ্ট্র, মিডিয়াসহ তাদের নানা সংস্থার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ইসলাম ও মুসলমানবিদ্বেষী প্রচারণা জোরদার হয়। এ প্রচারণার প্রতিক্রিয়ায় ধর্মীয় পরিচয় ও রাজনীতির ক্ষেত্রও উর্বর হতে থাকে। অন্যদিকে অপমান, বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে মুসলমানদের ক্ষোভের ওপর ভর করে বিশ্বজুড়ে ইসলামপন্থি রাজনীতির নতুনভাবে প্রসার ঘটে।

এ সূত্র ধরে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে নারী-পুরুষ-শিশুসহ বহু নিরীহ মানুষ খুন হয়েছে। মসজিদ, মন্দির গির্জা, মেলা, উৎসব, ভাস্কর্য আক্রান্ত হয়েছে। ইসলামের নাম নিয়ে এসব গোষ্ঠীর বর্বর দিগভ্রান্ত সন্ত্রাসী তৎপরতার কারণে বিশ্বব্যাপী মুসলিম জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তাহীনতা আরও বেড়েছে। রাষ্ট্রের দমনপীড়ন, সহিংসতা বেড়েছে, বিশ্বে অশান্তি বেড়েছে। এগুলোকে কেউ ‘জিহাদ’, কেউ ‘সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াই’ বলে মহিমান্বিত করতে চান। মোহমুক্ত থাকলে এসব বয়ান যে কত ভ্রান্ত তা উপলব্ধি কঠিন নয়। কারণ এসব আক্রমণ-সন্ত্রাস বিশ্বের ক্ষমতাবান রাষ্ট্র, ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা স্থাপনার বিরুদ্ধে দেখা যায় না। সে কারণে তাদের দুর্বলও করে না, বরং তাদের দমনপীড়ন ব্যবস্থার পক্ষে আরও বিস্তৃত যুক্তি তুলে ধরে। সেই সূত্র ধরেই গত আড়াই দশকে যুক্তরাষ্ট্রের অভিভাবকত্বে পরিচালিত সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের নামে দেশে দেশে জনগণের ওপর রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস-জুলুম আরও বেড়েছে। রাষ্ট্র আরও সশস্ত্র এবং নৃশংস হয়েছে।

অনেকে এও যুক্তি দিতে চেষ্টা করে যে, যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন এই ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ ‘ইসলামি জঙ্গি’দের বিরুদ্ধে সেকুলার শক্তির পক্ষে। এটিও আরেকটি বড় ভ্রান্তি। বস্তুত, নির্বাচিত এবং সেক্যুলার সরকার উচ্ছেদে মার্কিনি রেকর্ড অনেক। চিলিসহ ল্যাটিন আমেরিকায় এর দৃষ্টান্ত অনেক, বিশ্বের অন্য প্রান্তেও। যেমন, ’৭০ ও ’৮০-এর দশকে আফগানিস্তানে সেক্যুলার সরকারই ক্ষমতায় ছিল, কিন্তু তাদের অপরাধ তারা ছিল মার্কিনবিরোধী। অথচ এ সরকারগুলো আফগানিস্তানে ভূমি সংস্কার, নারী অধিকার, শিক্ষা ও চিকিৎসা সংস্কারে অনেক দূর অগ্রসর হয়েছিল। এদের উচ্ছেদ করে মার্কিন রাষ্ট্র এমন শক্তিকে একের পর এক ক্ষমতায় এনেছে যারা এগুলোর ঘোর বিরোধী।  ইরাক ও লিবিয়াতেও সেক্যুলার সরকারই ক্ষমতায় ছিল। তাদের কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার সমস্যা থাকলেও জাতীয় সক্ষমতা, শিক্ষা, চিকিৎসা, বিশুদ্ধ পানিসহ জনঅধিকারের ক্ষেত্রে সেখানে অনেক সাফল্য ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনে সাদ্দাম ও গাদ্দাফির শাসনব্যবস্থা উচ্ছেদের পর সেসব ব্যবস্থা তছনছ হয়েছে। আর সেখানে বিভিন্ন ধর্মপন্থি গোষ্ঠীর প্রভাব, সংঘাত বেড়েছে। সর্বশেষ সিরিয়াতেও তাই ঘটল।

এ রকমও কেউ কেউ বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য এসব দেশে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। শতভাগ ভুল কথা।  স্বৈরাচার সাম্রাজ্যবাদের জন্য কখনোই সমস্যা না, বরং বিশ্বে স্বৈরাচারী শাসকদের প্রধান অংশ তাদেরই তৈরি কিংবা তাদেরই লোক। স্বৈরশাসক তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে তারা বিরক্ত হয়।

লেখক: শিক্ষক, লেখক এবং ত্রৈমাসিক জার্নাল সর্বজনকথার সম্পাদক

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই নতুন উপ-উপাচার্য নিয়োগ

প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬, ১০:২৬ এএম
আপডেট: ০৭ জুন ২০২৬, ১০:৩০ এএম
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই নতুন উপ-উপাচার্য নিয়োগ
অধ্যাপক ড. মুহম্মদ নজরুল ইসলাম-অধ্যাপক ড. মো. শামসুল আলম

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) ও উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) পদে দুই অধ্যাপককে নিয়োগ দিয়েছে সরকার।

শনিবার (৬ জুন) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সরকারি সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা থেকে জারি করা পৃথক প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়।

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, গণিত বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহম্মদ নজরুল ইসলামকে উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) এবং সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শামসুল আলমকে উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলরের অনুমোদনক্রমে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ, ১৯৭৩-এর ধারা ১৩(১) অনুযায়ী তাদের এ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

নিয়োগের শর্ত অনুযায়ী, যোগদানের তারিখ থেকে চার বছর অথবা অবসরের তারিখ- যেটি আগে ঘটবে, ততদিন তারা নিজ নিজ পদে বহাল থাকবেন। উপ-উপাচার্য হিসেবে তারা তাদের বর্তমান পদের সমপরিমাণ বেতন-ভাতা পাবেন।

এছাড়া বিধি অনুযায়ী পদসংশ্লিষ্ট অন্যান্য সুবিধা ভোগ করবেন এবং সার্বক্ষণিক বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবস্থান করবেন। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও সংবিধি দ্বারা নির্ধারিত এবং উপাচার্য দ্বারা অর্পিত ক্ষমতা ও দায়িত্ব পালন করবেন।

প্রজ্ঞাপনে আরও উল্লেখ করা হয়, প্রয়োজনে রাষ্ট্রপতি ও চ্যান্সেলর যেকোনো সময় এ নিয়োগ বাতিল করতে পারবেন।

আমানউল্লাহ/ আজহার 

চামড়া নিয়ে দুর্ভোগ আর দুর্গতির শেষ কোথায়

প্রকাশ: ০৬ জুন ২০২৬, ০৭:৩৫ পিএম
চামড়া নিয়ে দুর্ভোগ আর দুর্গতির শেষ কোথায়
রাজেকুজ্জামান রতন

বছরে প্রায় ২৫ কোটি বর্গফুট চামড়া উৎপাদন হয় বাংলাদেশে। কিন্তু প্রক্রিয়াজাত করতে না পারার কারণে একটা কত বড় সম্ভাবনার মৃত্যু ঘটতে দেখছে বাংলাদেশ। পরিকল্পিত উদ্যোগ নিলে দেশের বাজার, কর্মসংস্থান, বিদেশে রপ্তানি এবং পরিবেশ দূষণ বন্ধ করা সম্ভব। দুর্দশা দৃশ্যমান, কিন্তু সমাধানের দায় নেবে কে?

দেশের অন্যতম প্রধান শিল্পের কাঁচামাল নিয়ে দুর্গতির শেষ কি হবে না? নাকি এটা এক পরিকল্পিত দুর্দশা, যার কবলে পড়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের চামড়াশিল্পের সম্ভাবনা? প্রতিবছর ঈদুল আজহা এলে এই প্রশ্ন আর হাহাকার তৈরি হয় দেশের মানুষের মধ্যে। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। প্রতিবারের মতো এবারের ঈদুল আজহায় কাঁচা চামড়ার দাম আবারও মারাত্মকভাবে পড়ে গেছে। এর ফলে মৌসুমি ব্যবসায়ী ও চামড়া সংগ্রহকারীরা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন, যার ফলে দেশের চামড়া খাতের দীর্ঘদিনের সংকট নতুন করে তীব্র আকার ধারণ করেছে। লাভের আশায় চামড়া কিনে অনেক ব্যবসায়ী কোনো ক্রেতা খুঁজে না পেয়ে শেষ পর্যন্ত অবিক্রীত চামড়া রাস্তার পাশে ফেলে দিতে বা মাটিতে পুঁতে ফেলতে বাধ্য হয়েছেন। শুধু এবার নয়, প্রায় এক দশক ধরে সংকটে বন্দি থাকা এই চামড়া খাতের স্থায়ী অব্যবস্থাপনা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ঈদের সংকটে।

এর কারণ কী? দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত কিন্তু সমাধানহীন সমস্যা হলো, সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে একটি সম্পূর্ণ কার্যকর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার বা সেন্ট্রাল এফ্‌লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (সিইটিপি) প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছে বাংলাদেশ। এ কারণে চামড়া খাতটি আন্তর্জাতিক পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স বা মানদণ্ড পূরণ করতে পারছে না, এ জন্য বৈশ্বিক রপ্তানি বাজারে প্রবেশাধিকার উন্মুক্ত হচ্ছে না। ফলে রপ্তানির সম্ভাবনা এখনো বাস্তবে রূপ নিতে পারছে না।

ধারণা করা হয়, দেশে উৎপাদিত কাঁচা চামড়া থেকে তৈরি চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ বছরে ১২ বিলিয়ন (১ হাজার ২০০ কোটি) ডলার আয় করার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু বর্তমানে তার চামড়াশিল্পের সম্ভাবনার মাত্র শূন্য দশমিক ২৬ শতাংশ কাজে লাগাতে পারছে। সম্ভাবনা এবং বাস্তবতার মধ্যে কত ফারাক! রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি ছিল ১ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা ১ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়, অর্থাৎ এক দশকে তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। অথচ একই সময়ে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৪০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। যদিও পোশাকশিল্পের কাঁচামাল আমদানি করতে হয় আর চামড়াশিল্পের কাঁচামাল দেশেই মজুত এবং নষ্ট হচ্ছে প্রতিদিন। কারণ পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স বা নীতিমালার উদ্বেগের কারণে বৈশ্বিক ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে চামড়া কেনেন না। কিন্তু অন্যান্য দেশ কী করছে? ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে ভিয়েতনামের চামড়া রপ্তানির পরিমাণ বাংলাদেশের কাছাকাছিই ছিল। কিন্তু ২০২৫ সালের মধ্যে ভিয়েতনাম ২৯ বিলিয়ন ডলারের জুতা রপ্তানি করে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম জুতা রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে, যা বাংলাদেশের চামড়া খাতের মোট রপ্তানি আয়ের চেয়ে প্রায় ২৫ গুণ বেশি। এটা কি জাদুমন্ত্রে সম্ভব হয়েছে? তা নয়। ভিয়েতনাম তাদের অবকাঠামো তৈরি করেছে, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করেছে। আর বাংলাদেশ কোনো বর্জ্য শোধনাগার বা স্যুয়ারেজ প্ল্যান্ট ছাড়াই একটি ট্যানারি শিল্পনগরী গড়ে তুলেছে। আমরা আমাদের জাতীয় সম্পদ এই কাঁচা চামড়াকে মাটিতে পুতে, নদীতে ফেলে ধ্বংস করে ফেলেছি।

সরকার-নির্ধারিত দাম এবং বাজারের মধ্যে বিরাট ফারাক। সরকার এ বছর ঢাকার জন্য লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৬২ থেকে ৬৭ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছিল, যা গত বছরের তুলনায় ২ টাকা বেশি। মাঝারি মানের একটি গরুতে সাধারণ ১৮-২০ বর্গফুট ও বড় গরু থেকে ২৪-২৬ বর্গফুট চামড়া পাওয়া যায়। ফলে সরকার-নির্ধারিত সর্বোচ্চ দাম প্রতি বর্গফুট ৬৭ টাকা হিসাবে মাঝারি মানের লবণযুক্ত একটি চামড়ার দাম দাঁড়ায় ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩৫০ টাকা, আর বড় চামড়ার ক্ষেত্রে ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা।

বাজারের চিত্র কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন। ঢাকায় আকার ও গুণমানের ওপর ভিত্তি করে এবার বেশির ভাগ কাঁচা চামড়া ৩০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। দেশের অন্যতম প্রধান চামড়া ব্যবসা কেন্দ্র পোস্তার ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, তারা ৬০০ থেকে ৭০০ টাকার বেশি দাম দিয়ে কোনো চামড়া কেনেননি। অথচ দুই দশক আগে একটি মাঝারি আকারের গরুর চামড়া ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হতো, এখন একই ধরনের চামড়ার দাম ৫০০ টাকারও কম। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি অনুযায়ী, বর্তমানে এই দাম ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা হওয়া উচিত ছিল।

আড়তদাররা মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সস্তায় চামড়া কিনে তা সংরক্ষণ করার পর ট্যানারিগুলোর কাছে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি করেন। তার মতে, প্রতি পিস চামড়া সংরক্ষণে খরচ হয় মাত্র ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা। ফলে ৪০০ টাকায় কেনা একটি চামড়া যখন ট্যানারিতে পৌঁছায়, তখন সব মিলিয়ে তার ৮০০ টাকা হয়ে যায়।

আড়তদাররা সারা বছর ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায় চামড়া বিক্রি করেন। কাঁচা এবং ওয়েট-ব্লু (আংশিক প্রক্রিয়াজাত) চামড়া রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় বাজার সীমিত, ফলে ঈদুল আজহার সময় উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ চামড়া ধরে রাখতে পারছেন না। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে চামড়া লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করলে তার মূল্য আছে। লবণ ছাড়া চামড়ার গুণ ও মান রক্ষা করা যায় না। ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে চামড়া খাতের সংকটকে বাড়িয়ে তোলা হয়েছে। ২০১৭ সালের এপ্রিলে হাজারীবাগের কারখানাগুলোর গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে সরকার ট্যানারি মালিকদের সাভারে স্থানান্তরিত হতে বাধ্য করে। তবে শিল্প-মালিকদের প্রতিনিধিদের দাবি, সাভার শিল্পনগরী পুরোপুরি প্রস্তুত হওয়ার আগেই এই স্থানান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছিল। ফলে অনেক ট্যানারি মালিক আর্থিক সংকট ও ঋণখেলাপির মুখে পড়েছেন। আর পরিবেশ দূষণ বুড়িগঙ্গা নদী থেকে এখন ধলেশ্বরী নদীতে স্থানান্তরিত হয়েছে।

ঈদুল আজহায় প্রতিবছর যে পরিমাণ চামড়া উৎপাদিত হয়, তা ধারণ বা প্রক্রিয়াজাত করার মতো সক্ষমতা আমাদের নেই। চীন, ব্রাজিল, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারত কাঁচা বা লবণযুক্ত এবং ওয়েট-ব্লু চামড়া আমদানি করে। চামড়া রপ্তানি বন্ধে নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে না, ফলে চোখের সামনে এই মূল্যবান কাঁচামাল পচে যাচ্ছে। অন্যদিকে সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে চামড়া সংগ্রহ ও পরিবহনের ক্ষেত্রে ব্যাপক অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা নজরে পড়েছে। নিষেধাজ্ঞা ছিল ঈদের পর সাত দিন রাজধানী অভিমুখে পরিবহনের ক্ষেত্রে। কিন্তু কে মানে সেই নিষেধাজ্ঞা! বিসিক কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীরা স্বীকার করেছেন যে, বিপুল পরিমাণ চামড়া ঈদের পর পরই সাভারে প্রবেশ করেছে। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) তথ্য অনুযায়ী, ঈদের দিন দুপুর থেকে পরদিন বেলা ১১টার মধ্যে ৪ লাখ ৯১ হাজার ৯৪৯টি কোরবানির পশুর চামড়া এই শিল্পনগরীতে প্রবেশ করেছে, যেখানে গত বছরের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৫৪ হাজার ৭৫২টি। গত বছর ঈদের প্রথম তিন দিনে শিল্পনগরীতে মোট কোরবানির পশুর চামড়া প্রবেশ করে ৩ লাখ ৭৯ হাজার ৮৭৭ পিস। যেখানে এ বছর ৩০ মে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত শিল্পনগরীতে মোট চামড়া প্রবেশ করেছে ৫ লাখ ২৭ হাজার ৮৭৫ পিস। ফলে এটি ধারণা করলে ভুল হবে না যে, সঠিক সংরক্ষণ বা লবণ দেওয়া ছাড়াই ঢাকার বাইরের একটি বড় অংশের চামড়া সরাসরি শিল্পনগরীতে ঢুকে পড়েছে। এই চামড়ার ভবিষ্যৎ কী?

বছরে প্রায় ২৫ কোটি বর্গফুট চামড়া উৎপাদন হয় বাংলাদেশে। কিন্তু প্রক্রিয়াজাত করতে না পারার কারণে একটা কত বড় সম্ভাবনার মৃত্যু ঘটতে দেখছে বাংলাদেশ। সংরক্ষণের অভাবে চামড়া পচে নষ্ট হয়, কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার তৈরি না করার কারণে বিশ্ববাজারে প্রবেশ করা যাচ্ছে না, কিন্তু দেশের বাজারে জুতা সস্তায় পাওয়া যায় না। সবাই বলছে, পরিকল্পিত উদ্যোগ নিলে দেশের বাজার, কর্মসংস্থান, বিদেশে রপ্তানি এবং পরিবেশ দূষণ বন্ধ করা সম্ভব। দুর্দশা দৃশ্যমান, কিন্তু সমাধানের দায় নেবে কে? 

লেখক: সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি 
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)
[email protected]

যৌক্তিক মূল্যে জ্বালানি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব

প্রকাশ: ০৬ জুন ২০২৬, ০৫:১৮ পিএম
যৌক্তিক মূল্যে জ্বালানি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব
ড. এম শামসুল আলম

ন্যূনতম ব্যয়ে বিদ্যুৎ ও প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা সরকারের কর্তব্য। সরকার যে কাজই করুক না কেন, তাতে পরিশেষে জনকল্যাণ নিশ্চিত হতেই হবে। ফলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি বা অন্য যেকোনো পণ্য কিংবা সেবাই হোক, জনগণ যেন তা ন্যূনতম ব্যয়ে পায়, তা নিশ্চিত করা সরকারের মৌলিক দায়িত্ব ও কর্তব্য।...

জ্বালানি মানব জীবনের জন্য একটি আবশ্যিক পণ্য। জ্বালানি নিরাপত্তার ঘাটতি, অর্থাৎ যেকোনো মৌলিক চাহিদার ঘাটতি যতটা-না বিপজ্জনক, এর থেকেও জ্বালানিঘাটতি অত্যধিক বিপজ্জনক। তাই এ ঘাটতি সৃষ্টি করা সংবিধানে প্রদত্ত মৌলিক অধিকার খর্ব করার শামিল। সুতরাং, দেশের প্রত্যেক নাগরিকের জন্য ন্যায্য ও যৌক্তিক মূল্যে জ্বালানিপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। বিগত সরকারের আমলে রাষ্ট্র তার এ দায়িত্ব পালন করতে পারেনি। বর্তমান সরকারের আমলেও সেই ধারাবাহিকতা অব্যাহত আছে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা আজও ভয়াবহ বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে। এ পরিস্থিতি উন্নতির কোনো লক্ষণ নেই।

কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী, গ্রাহকরা ৫০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে ইউনিটপ্রতি ৪ টাকা ৬৩ পয়সা থেকে ৬৯ পয়সা বাড়িয়ে ৫ টাকা ৩২ পয়সা, শূন্য থেকে ৭৫ ইউনিট ব‍্যবহারকারীর বিদ্যুতের দাম ৫ টাকা ২৬ পয়সা থেকে ৯২ পয়সা বাড়িয়ে ৬ টাকা ১৮ পয়সা এবং ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট ব্যবহারকারীদের ৭ টাকা ২০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৩০ পয়সা বাড়িয়ে ৮ টাকা ৫০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে। নতুন ঘোষণায় পাইকারি বিদ্যুতের দাম ৭ টাকা থেকে ১ টাকা ৩৯ পয়সা বৃদ্ধি করে ৮ টাকা ৩৯ পয়সা নির্ধারণ করেছে বিইআরসি। এ ছাড়া খুচরা পর্যায়ে ৯ টাকা ১১ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫২ পয়সা বাড়িয়ে ১০ টাকা ৬৩ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ গ্রাহক পর্যায়ে ইউনিটপ্রতি গড়ে ১ টাকা ৫২ পয়সা বেশি গুনতে হবে।

১৯৯০ সাল থেকে দেশের বিদ্যুৎ ও প্রাথমিক জ্বালানি খাতে যেসব সংস্কার তথা রূপান্তর হয়েছে এবং হচ্ছে, সেসবে রাষ্ট্রের নীতি বা আদর্শ না থাকায় এবং পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা অর্থবহ না হওয়ায় ‘সবার জন্য লোডশেডিংমুক্ত বিদ্যুৎ’ অবশেষে লোডশেডিং যুক্ত বিদ্যুতে পরিণত হয়েছে। এখানেই সরকার পরিকল্পনা-বিভ্রান্তির শিকার। পরিকল্পনা তৈরির আইনি এখতিয়ার সরকারের। বিগত ৩৩ বছরে বিদ্যুৎ ও প্রাথমিক জ্বালানি উপ-খাতসমূহ পরিচালনা ও উন্নয়নে বহু নীতি বা পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে। সেসব পরিকল্পনার কোনোটি মন্ত্রিপরিষদ কর্তৃক অনুমোদিত হয়েছে কি না আমার জানা নেই। এসব পরিকল্পনা মূলত তৈরি করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যুৎ এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উভয় বিভাগ। বাস্তবায়নও করে স্ব স্ব ক্ষেত্রে তারাই। ফলে পরিকল্পনা স্বার্থসংঘাতযুক্ত। পরিকল্পনা আইনের আওতায় বাস্তবায়িত না হলে বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহির আওতায় আনা যায় না। তাছাড়া পরিকল্পনা প্রণেতা যদি বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষ হয়, তাহলে বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষ নিয়ন্ত্রণহীন হয় এবং সরকার বিভ্রান্তিতে পড়ে। এভাবেই সরকার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে পরিকল্পনা-বিভ্রান্তির শিকার হয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ (বিশেষ বিধান) আইন ২০১০-এর আওতায় বিদ্যুৎ ও প্রাথমিক জ্বালানি উন্নয়নে প্রতিযোগিতাবিহীন দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়। বিদ্যুৎ ও প্রাথমিক জ্বালানি খাতে প্রতিযোগিতা কমিশন আইন ২০১২ কার্যকারিতা হারায়। ফলে বিদ্যুৎ, গ্যাস, কয়লা, তরল জ্বালানি ও নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন/আমদানি, সঞ্চালন/পরিবহন ও বিতরণে প্রতিযোগিতাবিহীন বিনিয়োগ অব্যাহত আছে। বাজারে প্রতিযোগিতা না থাকলে বাজার প্রকৃতপক্ষে মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা হারায়। বাজার এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ায় অলিগোপলির শিকার হয়। অর্থাৎ বাজারের ওপর নিয়ন্ত্রক সংস্থা তথা রাষ্ট্রের আর কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। আর যদি মন্ত্রী-এমপিরা ব্যবসায়ী হয়, তাহলে তো আর কোনো কথাই থাকে না। ব্যবসায়ীরা তাদের ইচ্ছেমতো মূল্য নির্ধারণের সুযোগ নেয় এবং জনগণের ওপর এক ধরনের লুণ্ঠন চালায়। ব্যবসায়ীরা এখন বাজারের ওপর সেই একক কর্তৃত্ব চালাচ্ছে। বাজারকে অলিগোপলি প্রতিষ্ঠিত করে তারা ইচ্ছেমতো মূল্য নির্ধারণ করছে। তেল-লবণ-চাল-আটা-ডালসহ যেকোনো ভোজ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির গতি-প্রকৃতি দেখে বোঝা যায়, কীভাবে তারা তা নিয়ন্ত্রণ করছে। আমদানিকৃত পণ্য বা দেশের অভ্যন্তরীণ পণ্য অথবা সেবা সবই নিয়ন্ত্রণ করছে ব্যবসায়ীরা। আর তারা তাদের ইচ্ছেমাফিক মূল্য বাড়াচ্ছে।

আইন অনুযায়ী সব ধরনের জ্বালানি তেলের মূল্যহার নির্ধারণের একক এখতিয়ার ছিল বিইআরসির, তা সত্ত্বেও বিপিসি নিজেই ফার্নেস অয়েলসহ অন্যান্য তরল জ্বালানি এবং ডিজেল, পেট্রোল ও কেরোসিনের মূল্যহার জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগকে দিয়ে যখন-তখন ইচ্ছেমাফিক বৃদ্ধি এবং নির্ধারণ করত। আইনানুযায়ী, এই মূল্যহার সরবরাহ ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হয়। বিনিয়োগ ব্যয় সমন্বয়ে সরবরাহ ব্যয় নির্ধারিত হয়। বিনিয়োগ প্রতিযোগিতাহীন হওয়ায় ন্যায্য ও যৌক্তিক ব্যয় অপেক্ষা সরবরাহ ব্যয় অনেক বেশি হয়। আর এই বেশি ব্যয়ের ওপর ভিত্তি করে বিপিসি নিজে এবং ক্ষেত্র বিশেষে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগকে দিয়ে ইচ্ছেমাফিক মূল্যহার বৃদ্ধি করে। এতে বোঝা যায়, তরল জ্বালানির বাজার কীভাবে সরকারি মালিকানাধীন ব্যবসায়ী বিপিসির কাছে জিম্মি তথা অলিগোপলির শিকার। এই একই কথা বিদ্যুৎ, গ্যাস, কয়লা, এলপিজি, এলএনজি ও নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের ক্ষেত্রে কমবেশি প্রযোজ্য।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) আইন ২০০৩-এর আওতায় জ্বালানির মূল্যহার গণশুনানির ভিত্তিতে নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণের একক ক্ষমতা দিয়ে সরকার স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘বিইআরসি’ প্রতিষ্ঠিত করে। জ্বালানি সরবরাহে সংশ্লিষ্ট সংস্থা/কোম্পানিগুলোকে বিইআরসির লাইসেন্সি হিসেবে বিইআরসির নিয়ন্ত্রণাধীনে আনা হয়। আবার ২০২৩ সালে ওই আইন সংশোধন করে মূল্যহার গণশুনানি ব্যতীত নির্ধারণের ক্ষমতায় মন্ত্রণালয়কে আনা হয়। আমরা যদি ভোক্তাদের দিক থেকে দেখি–রাষ্ট্র আমার এই অধিকারটুকু নিশ্চিত করবে, আমি যদি বাজার থেকে কোনো পণ্য বা সেবা কিনতে চাই, তাহলে সেই পণ্য বা সেবার মূল্য যেন ন্যায্য ও যৌক্তিক হয়। সেজন্য বাজার প্রতিযোগিতামূলক হতে হবে এবং সেটি নিশ্চিত করার দায়িত্ব প্রতিযোগিতা কমিশনের। অথচ এখানে কমিশন নিষ্ক্রিয়। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার দায়িত্ব বিইআরসির। কিন্তু বিইআরসি সেই প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একেবারেই নিষ্ক্রিয়। হাইকোর্টের রায়েও বিআরসির নিষ্ক্রিয়তাকে বেআইনি ও কর্তৃত্ববহির্ভূত বলা হয়েছে।

সরকারের দাবি, তারা দেশের বিদ্যুৎ ও প্রাথমিক জ্বালানি খাতে অনেক উন্নয়ন করেছে। তা আসলে কতটা সঠিক ও গ্রহণযোগ্য–এমন প্রশ্নের জবাব পাওয়া যায়, যখন দেখা যায় প্রতিযোগিতাবিহীন বাজার সৃষ্টি করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহে লুণ্ঠনমূলক ব্যয় এবং মুনাফা সমন্বয় করে অন্যায় ও অযৌক্তিক মূল্যহার বৃদ্ধি অব্যাহত। আবার প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহ সংকটের কারণে সিংহভাগ বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা অব্যবহৃত থাকায় প্রতি একক বিদ্যুতের সরবরাহ ব্যয়বৃদ্ধিতে মূল্যহার বৃদ্ধি ঘটে। যে রূপান্তরের পরিণতিতে জনগণ এমন পরিস্থিতির শিকার হয়, আমার বিবেচনায় তাকে কোনোভাবেই উন্নয়ন, কিংবা সঠিক ও যৌক্তিক রূপান্তর বলা যায় না। বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা ব্যবহার করার মতো প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত হতে হবে। এ জ্বালানি সরবরাহ সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধি করাই হলো বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষমতা অর্জন। এর পরিবর্তে কেবলমাত্র বিদ্যুতের অভিক্ষিপ্ত চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষমতা অর্জন বলা সম্ভব নয়।

ন্যূনতম ব্যয়ে বিদ্যুৎ ও প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা সরকারের কর্তব্য। সরকার যে কাজই করুক না কেন, তাতে পরিশেষে জনকল্যাণ নিশ্চিত হতেই হবে। ফলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি বা অন্য যেকোনো পণ্য কিংবা সেবাই হোক, জনগণ যেন তা ন্যূনতম ব্যয়ে পায়, তা নিশ্চিত করা সরকারের মৌলিক দায়িত্ব ও কর্তব্য। বর্তমান বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিদ্যুৎ ও প্রাথমিক জ্বালানি খাত উন্নয়ন ও পরিচালনায় এমন কোনো পরিকল্পনা নেই। ফলে জনসাধারণ অধিক মূল্যহারের শিকার হচ্ছে।

লেখক: জ্বালানি উপদেষ্টা

পাসপোর্ট ও বিদেশযাত্রার প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ০৩:২১ পিএম
পাসপোর্ট ও বিদেশযাত্রার প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে
ড. খলিলুর রহমান

যখন নাগরিকরা নিজেদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকেই ভয় করতে শুরু করে, তখন কোনো জাতি এগোতে পারে না। সরকার জনগণের সেবা করার জন্য–ভয় দেখানোর জন্য নয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজ মানুষের মধ্যে আস্থা, ন্যায়বিচার ও বিশ্বাস সৃষ্টি করা; আতঙ্ক ও সন্দেহ নয়।...
পাসপোর্ট পাওয়ার অধিকার কোনো রাজনৈতিক অনুগ্রহ নয়; এটি নাগরিকত্বের একটি মৌলিক অধিকার। পাসপোর্ট শুধু বিদেশ ভ্রমণের নথি নয়–এটি একজন নাগরিকের পরিচয়, জাতীয়তা এবং নিজের রাষ্ট্রের প্রতি তার বৈধ সম্পর্কের স্বীকৃতি। যখন কোনো সরকার রাজনৈতিক পরিচয়, সন্দেহ বা প্রশাসনিক পক্ষপাতের ভিত্তিতে এই অধিকার প্রয়োগ করে, তখন তা ন্যায়বিচার, সমতা ও গণতান্ত্রিক শাসনের মূল ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেয়।

গত রাতে আমার এক ঘনিষ্ঠ ব্যক্তির ফোন পেলাম, যাকে আমি কয়েক দশক ধরে চিনি। তিনি সততা, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে চার দশক ধরে দেশসেবা করে আসছেন। তিনি তার কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দিয়ে নতুন বাংলাদেশি পাসপোর্ট পাওয়ার জটিলতা নিয়ে আমার সহায়তা চাচ্ছিলেন। তার অভিজ্ঞতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি এমন একটি উদ্বেগজনক প্রবণতার প্রতিফলন, যা ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অনির্বাচিত প্রশাসনের সময়ে ব্যাপকভাবে দেখা গিয়েছিল।

বিষয়টির বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে যাওয়ার আগে একটি বাস্তবতা স্বীকার করা জরুরি। দীর্ঘদিন ধরে ধারাবাহিক সরকারগুলো কূটনৈতিক পাসপোর্টের মর্যাদা ও গুরুত্বকে ক্ষুণ্ন করেছে। অনেকে পেশাগতভাবে কূটনৈতিক পাসপোর্ট পাওয়ার যোগ্য ছিলেন না কিংবা পেশাদার কূটনীতিক ছিলেন না, তাদেরও এই সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে ঐতিহ্যগতভাবে রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্বকারী কূটনীতিকদের জন্য সংরক্ষিত এই নথির গুরুত্ব ও মর্যাদা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত রাতে যিনি আমার সহায়তা চেয়েছিলেন, তিনিও কূটনৈতিক সেবার বাইরে থেকেও কূটনৈতিক পাসপোর্ট পেয়েছিলেন তার রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের জন্য।

তবে কূটনৈতিক পাসপোর্টের অপব্যবহার সংশোধনের নামে কোনো নাগরিককে সাধারণ পাসপোর্ট থেকে বঞ্চিত করা কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। যেকোনো বাংলাদেশি নাগরিক, যার বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি দণ্ড বা আইনি নিষেধাজ্ঞা নেই, তার সমানভাবে পাসপোর্ট পাওয়ার অধিকার রয়েছে। এটি শুধু প্রশাসনিক বিষয় নয়; এটি সাংবিধানিক ও মানবাধিকারসংক্রান্ত প্রশ্ন।

দুঃখজনকভাবে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এমন কিছু চর্চা গড়ে ওঠে, যা দেখে মনে হয়েছে পূর্ববর্তী সরকারে কাজ করেছেন বা একসময় কূটনৈতিক পাসপোর্ট ধারণ করেছেন এমন ব্যক্তিদের শাস্তি দেওয়ার মানসিকতা কাজ করেছে। বহু সম্মানিত সরকারি কর্মকর্তা, পেশাজীবী, শিক্ষাবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে এক ধরনের অলিখিত সন্দেহ ও বঞ্চনার শিকার হতে হয়েছে। আইন ও বিধিমালার ভিত্তিতে আবেদন মূল্যায়নের পরিবর্তে রাজনৈতিক পরিচিতি ও ইচ্ছাকৃত প্রশাসনিক জটিলতা সৃষ্টি করা হয়েছে।

আরও দুঃখজনক হলো, ড. ইউনূস ও তার অনির্বাচিত প্রশাসন সমাজে বিভাজন সৃষ্টির রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছিল। মানুষকে পাশাপাশি দাঁড়াতে উৎসাহিত করার পরিবর্তে একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর প্রবণতা তারা উৎসাহিত করেছে।

আমি নিজেও ব্যক্তিগতভাবে এসব চর্চার প্রভাব প্রত্যক্ষ করেছি এবং একজন ভুক্তভোগী। শত শত মানুষ পাসপোর্ট পেতে অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব, জটিলতা ও অপমানজনক আচরণের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে, যখন সাবেক কূটনৈতিক পাসপোর্টধারীদের সাধারণ পাসপোর্ট প্রক্রিয়ায়ও জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর অস্বাভাবিক সম্পৃক্ততা যোগ করা হয়। এতে বৈধ নিরাপত্তা উদ্বেগ ও রাজনৈতিক নজরদারির সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে পড়ে।

অন্যদিকে, ড. ইউনূস ও তার ঘনিষ্ঠদের আমলে পাসপোর্ট দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রচলিত পুলিশ ভেরিফিকেশন ব্যবস্থা বাতিল করা হয়, যা একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত হিসেবে সমালোচিত হয়েছিল। যদিও অনেক নাগরিক আমলাতান্ত্রিক হয়রানি কমার কারণে এটিকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। তবু ক্রমে অভিযোগ ওঠে যে, অতিরিক্ত শিথিলতা অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করেছে। এমনো অভিযোগ সামনে আসে যে, পর্যাপ্ত যাচাই ছাড়াই বাংলাদেশে অবস্থানরত অনাগরিক বা বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের পাসপোর্ট দেওয়া হয়েছে।

কানাডায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা থেকে আমি বলতে পারি দক্ষতা ও জাতীয় নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। একটি পাসপোর্ট আন্তর্জাতিকভাবে রাষ্ট্রের সার্বভৌম নিশ্চয়তার প্রতীক। এর বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হলে তার প্রভাব শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আজ বিভিন্ন দেশের বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের ভিসা নাকচ হওয়ার ঘটনা এর একটি অন্যতম নিদর্শন। শুধু ভিসা প্রাপ্তিতে প্রতিবন্ধকতা নয়, দুর্বল যাচাই ব্যবস্থা প্রকৃত বাংলাদেশি নাগরিকদের বিদেশযাত্রা কঠিন করে তুলতে পারে এবং রাষ্ট্রকে কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।

ড. ইউনূসের অপশাসনের সময় আরেকটি উদ্বেগজনক বিষয় ছিল বিমানবন্দরে যাত্রীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও অন্যায় আচরণ। অভিযোগ রয়েছে, বিশেষ করে যারা আগে কূটনৈতিক পাসপোর্ট ধারণ করেছেন বা সরকারি দায়িত্বে ছিলেন, তাদের অনেককে বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তারা অপ্রয়োজনীয় জিজ্ঞাসাবাদ, বিলম্ব এবং ভীতিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি করেছেন। অনেক ক্ষেত্রে বৈধ নিরাপত্তা উদ্বেগ ছাড়াই যাত্রীদের যাত্রা বিলম্বিত বা আটকে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।

এর চেয়েও উদ্বেগজনক ছিল গণমাধ্যমের কিছু অংশের ভূমিকা। বিমানবন্দরের এসব ঘটনার পর কিছু যাত্রীকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও চাঞ্চল্যকর সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে জনসমক্ষে সন্দেহভাজন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। অনেক শিরোনাম ও প্রতিবেদন এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে নিরপেক্ষ তথা উপস্থাপনের চেয়ে ব্যক্তি বিশেষকে হেয় প্রতিপন্ন করার প্রবণতা বেশি ছিল। এটি শুধু পেশাগত নীতির পরিপন্থী নয়; বরং সমাজে ভয় ও বিভাজনের সংস্কৃতি তৈরি করে।

যখন নাগরিকরা নিজেদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকেই ভয় করতে শুরু করে, তখন কোনো জাতি এগোতে পারে না। সরকার জনগণের সেবা করার জন্য–ভয় দেখানোর জন্য নয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজ মানুষের মধ্যে আস্থা, ন্যায়বিচার ও বিশ্বাস সৃষ্টি করা; আতঙ্ক ও সন্দেহ নয়। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচন বহু নাগরিকের মধ্যে স্বস্তি ও নতুন আশার সঞ্চার করেছে। নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের প্রত্যাবর্তনকে অনেকে ড. ইউনূসের অনির্বাচিত প্রশাসনের বিতর্কিত চর্চাগুলো থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ হিসেবে দেখেছেন। এটি উৎসাহব্যঞ্জক যে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার এসব বিষয়ে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। সাবেক কূটনৈতিক পাসপোর্টধারীদের প্রতি তুলনামূলক মানবিক ও বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ এবং বিমানবন্দরে অপ্রয়োজনীয় হয়রানি কমানোর উদ্যোগ প্রশংসার দাবিদার।

বিশেষ করে ব্যক্তিগতভাবে আমি সন্তুষ্ট যে, এই উন্নয়নগুলো বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে হচ্ছে, যিনি ঘটনাচক্রে আমারই সিভিল সার্ভিস ব্যাচের কর্মকর্তা ছিলেন এবং প্রশাসনিক বাস্তবতা ও নাগরিক মর্যাদার গুরুত্ব সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা রাখেন। কার্যকর শাসনের জন্য শুধু ক্ষমতা নয়; প্রয়োজন প্রজ্ঞা, সংযম ও মানবিকতা।

তবে সংস্কার অর্ধেক পথে থেমে থাকলে চলবে না। বাংলাদেশ এখন এমন একটি আধুনিক, জবাবদিহিমূলক ও অধিকারভিত্তিক পাসপোর্ট ও অভিবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ পেয়েছে, যা জাতীয় নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করবে। এ ধরনের ব্যবস্থার জন্য কয়েকটি মৌলিক নীতি জরুরি।

প্রথমত, রাজনৈতিক পরিচয়, পেশাগত পটভূমি বা অতীত সরকারি সম্পৃক্ততা নির্বিশেষে সব নাগরিককে সমানভাবে বিবেচনা করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, নিরাপত্তা যাচাইয়ের প্রক্রিয়াকে অনানুষ্ঠানিক রাজনৈতিক বিবেচনার পরিবর্তে সুস্পষ্ট আইনি কাঠামোর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে।
তৃতীয়ত, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে পেশাদারত্ব ও সংযমের সঙ্গে কাজ করতে হবে, যাতে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ ছাড়া কোনো যাত্রী হয়রানির শিকার না হন।

চতুর্থত, বাংলাদেশি পাসপোর্টের মর্যাদা ও বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষায় পূর্বের যথাযথ যাচাই ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে অ-নাগরিকরা পাসপোর্ট না পায় বা পাসপোর্ট দেওয়ার ক্ষেত্রে অপব্যবহার রোধ করা যায়, আবার প্রকৃত নাগরিকরাও হয়রানির শিকার না হন।
সবশেষে, গণমাধ্যমকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা চরিত্র হননের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।

সম্ভবত ড. ইউনূসের অনির্বাচিত প্রশাসনের সবচেয়ে ক্ষতিকর উত্তরাধিকার ছিল নাগরিকদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি। তাদের সবচেয়ে বড় মেটিকুলাস ডিজাইন ছিল সমাজে মানুষকে সহনাগরিক নয়, প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখতে শেখানো। তবে এটি স্বস্তিদায়ক যে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের সময় সেই বিভাজনের রাজনীতি ধীরে ধীরে অবসানের দিকে যাচ্ছে। গণতন্ত্রে রাজনৈতিক মতপার্থক্য স্বাভাবিক; কিন্তু সন্দেহ, প্রতিশোধ ও সংঘাতনির্ভর শাসনব্যবস্থা জাতীয় ঐক্যকে দুর্বল করে।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে দীর্ঘ রাজনৈতিক মেরূকরণের জন্য বড় মূল্য দিয়েছে। এখন দেশের প্রয়োজন পুনর্মিলন, প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায়বিচার এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পুনঃপ্রতিষ্ঠা। নাগরিকদের উচিত জাতি গঠনের কাজে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ানো, মুখোমুখি সংঘাতে নয়।

যেকোনো সরকারের দায়িত্ব শুধু আইন পরিচালনা নয়; সামাজিক আস্থা ও জাতীয় সংহতি রক্ষা করাও। যখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা উভয়ই।

এখন জাতির প্রত্যাশা বাংলাদেশ আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, মানবিক ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে এগিয়ে যাবে; যেখানে নাগরিক অধিকার সম্মানিত হবে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নিরপেক্ষ থাকবে এবং প্রশাসন দলীয় স্বার্থের পরিবর্তে জাতীয় স্বার্থে কাজ করবে।

পরিশেষে, পাসপোর্ট কখনোই রাজনৈতিক অস্ত্র হওয়া উচিত নয়। এটি হওয়া উচিত সেই প্রতীক, যা প্রতিটি বাংলাদেশির নাগরিকত্ব, মর্যাদা ও সমঅধিকারের প্রতিনিধিত্ব করে।

লেখক: সাবেক রাষ্ট্রদূত ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব