মশার জন্য গবেষণার প্রতিষ্ঠানে আমাদের কমতি নেই, কিন্তু কমতি হচ্ছে মশা নিয়ন্ত্রণে কাজটা করা। মশা নিয়ন্ত্রণে আমরা কোনো অগ্রগতি দেখছি না। এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, জিকার নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে ম্যালেরিয়া নির্মূলের মতো সর্বাত্মক প্রচেষ্টা দেখছি না।...

৬০ বছর আগে আমরা সফলভাবে মশাবাহিত রোগ ম্যালেরিয়াকে নির্মূল করতে পেরেছিলাম। এখন আধুনিক জ্ঞান রয়েছে, অথচ আমরা এখনও এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছি। যেভাবে ম্যালেরিয়াকে সম্মিলিতভাবে নিয়ন্ত্রণে কাজ হয়েছে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সে রকম দেখছি না। গতানুগতিকভাবে হাসপাতালে রোগী ভর্তি হলে যেভাবে চিকিৎসা করা হয় আমরা সেভাবে দেখছি। মশা নিয়ে গবেষণার ইনস্টিটিউট আছে। নতুন করে তা করার বিষয় না। ম্যালেরিয়া ইনস্টিটিউট যেটা এখন আইইডিসিআর, সেটার প্রথম যে ডিপার্টমেন্ট ছিল সেটা কীটতত্ত্ব বিভাগ। সেটা কীটপতঙ্গ নিয়ে কাজ করে। নিপসমে কীটতত্ত্ব বিভাগ আছে। এ দুই প্রতিষ্ঠানে কীটতত্ত্ব বিভাগে গবেষণা হচ্ছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে কীটতত্ত্ব বিভাগ রয়েছে। তারা কাজ করছে, গবেষণা করছে। মশার জন্য গবেষণার প্রতিষ্ঠানে আমাদের কমতি নেই, কিন্তু কমতি হচ্ছে মশা নিয়ন্ত্রণে কাজটা করা। মশা নিয়ন্ত্রণে আমরা কোনো অগ্রগতি দেখছি না। এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, জিকার নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে ম্যালেরিয়া নির্মূলের মতো সর্বাত্মক প্রচেষ্টা দেখছি না।
জনস্বাস্থ্যের মূলনীতি অনুযায়ী কীটতত্ত্ববিদ, জনস্বাস্থ্যবিদ, পরিবেশবিদ- সবাই মিলে এটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। একে অপরকে দোষারোপ করা হচ্ছে। একটা কেন্দ্র থেকে ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণের মতো যে কাজটা করা হয়েছিল সেটা কিন্তু ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে করা হচ্ছে না। এর ব্যর্থতা অবশ্যই যারা সিদ্ধান্ত নেন সেসব কর্তৃপক্ষের। যারা এ বিষয়ে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক এবং যারা কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেন তাদের এখানে ব্যর্থতা আছে। জনসংখ্যার বিস্তার, আবহাওয়ার বিষয়, অপরিচ্ছন্নতা- আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের কলকাতায়ও একই অবস্থা। আমাদের আরেক পাশের দেশ মিয়ানমারের একই অবস্থা। থাইল্যান্ডে একই অবস্থা। সেখানে যদি মশা নিয়ন্ত্রণ হতে পারে আমরা কেন পারব না? আমাদের অপরিকল্পিত নগরায়ণ থেকে পরিকল্পিত নগরায়ণে যেতে হবে। আমরা পরিকল্পনা নিলে করতে পারি হয়তো তবে সময় লাগবে। নগরায়ণের পরিকল্পনা এই মুহূর্ত থেকে করতে হবে। যতটুকু অপরিকল্পিত নগর আছে সেখানে পরিচ্ছন্নতা অভিযানের পরিকল্পনা করে চেষ্টা করতে হবে। নতুন যেসব নগর হচ্ছে সেখানে শুরু থেকে পরিচ্ছন্ন করে গড়ে তোলার আহ্বান করব। শুধু নগর তো না, আমাদের গ্রামেও এক ধরনের নগর হয়ে গেছে। যার ফলে গ্রামেও অপরিচ্ছন্নতা ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানেও পলিথিনের ব্যবহার, প্লাস্টিকের ব্যবহার হচ্ছে। সেখানেও এডিস মশার প্রকোপ। গ্রামেও কিন্তু এডিস মশার দংশনে মানুষ ডেঙ্গুতে মারা যাচ্ছে, চিকুনগুনিয়ায় ভুগছে।
’২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের পরে স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত নেতৃত্বরা বরখাস্ত হয়েছে। কিন্তু দেশের কাজ করতে হাজার হাজার ছাত্র-তরুণ-তরুণী, তারা কিন্তু প্রস্তুত ছিল। কিছুদিন তারা ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের কাজ করেছে। জনসাধারণ তাদের যত্ন করেছে। কাজেই মশা নিয়ন্ত্রণকাজে যদি ছাত্র-তরুণদের কাজে লাগানো যেত তাহলে ডেঙ্গু ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যেত। গণ-অভ্যুত্থানের ফলে দেশপ্রেমের একটা মনোভাব জেগে উঠেছিল, এটাকে কাজে লাগাতে হবে। যারা পরিবেশবিজ্ঞানী এবং জনস্বাস্থ্যবিজ্ঞানী তারাই ছাত্র-তরুণদের ট্রেনিং দেবেন। তিন দিন থেকে পাঁচ দিন যথেষ্ট। তারপর তারা কার্যক্রমে মাঠে নামত। তা হলে কয়েক বছরের ভেতরে শহর, গ্রাম- সব জায়গায় আমরা একটা স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারতাম।
ঢাকা বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। ঢাকার সঙ্গে বাংলাদেশের অন্যান্য অংশের যোগাযোগ আছে। এর মাঝখানে বিশাল পাহাড় বা সমুদ্র নেই। কাজেই মানুষ ও এডিস মশার চলাচল সমান্তরাল রয়েছে। মানুষের চলাচলের সঙ্গে মশাও চলাচল করছে। ডেঙ্গু রোগীর চলাচল হচ্ছে। মশা এবং ডেঙ্গু রোগী দুটি যদি এক হয়ে যায় তাহলে মানুষ থেকে মানুষে ডেঙ্গু রোগটা ছড়ায়। ঢাকাকে যদি আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারতাম তাহলে ঢাকার বাইরে আর ছড়াত না। ঢাকা যেহেতু নিয়ন্ত্রণ করেনি ফলে এটা ধীরে ধীরে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
এখন যে গবেষণা হচ্ছে না, তা না। গবেষণার সঙ্গে কাজের সম্পর্ক বা মিলটা হচ্ছে না। গবেষকরা বলেই যাচ্ছেন। যারা দায়িত্বে আছেন তারা গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী কাজ করছেন না। কাজের পরিকল্পনার সঙ্গে আপনার সংশ্লিষ্ট গবেষণাটা লাগবেই। সেটা হচ্ছে না। যদি একটা কেন্দ্রে সম্মিলিতভাবে কাজটা করত, তাহলে সফল হতো। অবশ্যই গবেষণার জন্য অর্থ বরাদ্দ দিতে হবে। আমাদের যারা কীটতত্ত্ববিজ্ঞানী আছেন, জনস্বাস্থ্যবিজ্ঞানী আছেন, পরিবেশবিজ্ঞানী আছেন তারা গুরুত্বসহকারে গবেষণার কাজগুলো করতেন।
কলকাতা থেকে আমাদের প্রধান পার্থক্য আমাদের প্রশিক্ষিত ইন্টার্নি আছে, জনস্বাস্থ্যবিদ আছে, পরিবেশবিজ্ঞানী আছে, কিন্তু আমাদের যেটা নেই সেটা হলো কলকাতার মেয়রের মতো অঙ্গীকারবদ্ধ মেয়র। সেখানকার সরকার, রাজ্য সরকার গুরুত্ব দিয়ে কাজ করেছে। বিশেষ করে সিটি করপোরেশনের মেয়র সেখানে অনেক স্বায়ত্তশাসন ভোগ করে। তারা ব্যাপকভাবে জনগণকে সম্পৃক্ত করে হাজার হাজার ভলান্টিয়ার নিয়ে একেবারে বাড়িভিত্তিক, পাড়াভিত্তিক কাজ করেছে। আমরা সেই কাজটি করছি না। বিশেষ করে যারা নিম্ন আয়ের মানুষ এভাবে তাদের সম্পৃক্ত করে দিনের পর দিন কাজ করে গেছে। ফলে কলকাতায় তারা ডেঙ্গু নির্মূল করতে পেরেছে। আমাদের জনগণকে সম্পৃক্ত করে কাজ করানো, এটা কিন্তু আমরা করছি না।
এডিশ মশার কারণে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হতে পারে, চিকুনগুনিয়া হতে পারে। দরকার হচ্ছে জনগণকে দিয়ে কাজটা করানো। সেটা কিন্তু জনগণ নিজে থেকে করতে পারে না। সরকারি সিদ্ধান্ত লাগে। প্রয়োজন প্রত্যেকটি ওয়ার্ডভিত্তিক ভলান্টিয়ার সংগ্রহ করে তাদের দিয়ে, জনগণকে নিয়ে মশার উৎপত্তিস্থল ধ্বংস করা। তরুণ-যুবক ছেলেমেয়েদের দিয়ে কাজটা করানো স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে। এভাবে কাজটা হলে বাস্তবায়ন করা যেত। জনগণ কিন্তু যথেষ্ট সচেতন। সচেতনতার কোনো ঘাটতি নেই। আপনি একটা উচ্চবিত্ত এলাকায় যান বা মধ্যবিত্ত এলাকায় যান, নিম্নবিত্ত এলাকায় যান- সবাই বলবে যে এডিস মশা থেকে ডেঙ্গু হয়। আমরা ডেঙ্গুর বিপদ সম্পর্কে জানি। জনগণকে উদ্যমী ভূমিকায় নিয়ে কাজটা কিন্তু আমরা করছি না। জনগণকে দিয়ে কাজটা করাতে হবে। গ্রামাঞ্চলে কমিউনিটি ক্লিনিক আছে। সেসব ক্লিনিকে রক্ত সংগ্রহ করার ব্যবস্থা থাকতে হবে। যে গ্রামে বা যে পাড়ায় ডেঙ্গু রোগী আছে, এক কিলোমিটার ব্যাসার্ধের ভেতর যারা জ্বর নিয়ে আছে বা শরীরটা খারাপ লাগছে, রক্তের নমুনা তারা পাঠাতে পারে জেলা হাসপাতালে। গ্রামাঞ্চলে কাঠামো আছে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যকাঠামো হিসেবে কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র। মাধ্যমিক স্বাস্থ্যকাঠামো হিসেবে উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্স ও জেলা হাসপাতাল। আর তৃতীয় পর্যায় তো আছেই, যেগুলো মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। ঢাকা মহানগরীতে তৃতীয় পর্যায়ের হাসপাতালগুলো হচ্ছে ঢাকা মেডিক্যাল, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, মিটফোর্ড হাসপাতাল, মুগদা হাসপাতাল। এসব হাসপাতালে একসঙ্গে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও তৃতীয় পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হয়। কিন্তু এটা বিকেন্দ্রীকরণ না। বড় বড় হাসপাতালে তিন পর্যায়ের সুবিধা আছে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা হিসেবে এখানে টেস্ট করে। মাধ্যমিক সেবা হিসেবে পর্যবেক্ষণের জন্য হাসপাতাল বেডও আছে। কিন্তু তৃতীয় পর্যায়ের সেবা হিসেবে ক্রিটিক্যাল রোগীর জন্য চাহিদার তুলনায় বেড খুব কম। মাধ্যমিক সেবার অংশ হিসেবে ডেঙ্গু রোগী পর্যবেক্ষণের জন্য ঢাকা শহরে হাসপাতাল হতে পারে। মানুষের মধ্যে একটা ধারণা, যে হাসপাতালে ব্রেন অপারেশনের, হার্টের জন্য অপারেশন থিয়েটার নেই, যে হাসপাতালে এমআরআই মেশিন নেই, এটা কোনো হাসপাতাল না। রোগী পর্যবেক্ষণ করার জন্য মাধ্যমিক পর্যায়ের হাসপাতাল দরকার। সেখানে অক্সিজেন আছে, ব্লাডপ্রেসার মেশিন আছে, স্যালাইন দিতে পারে। এগুলো মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে। পর্যাবেক্ষণ করতে পারে ডেঙ্গু রোগীদের। যেসব ডেঙ্গু রোগী ঝুঁকিপূর্ণ বয়সের বা গর্ভবতী নারী, তাদেরকে তারা পর্যবেক্ষণ করতে পারে। এভাবে শহর অঞ্চলে স্তরভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা করা দরকার খুবই দ্রুত। এতে রোগী অনুপাতে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর হার কমানো যাবে। নতুবা ডেঙ্গুতে বাংলাদেশে রোগী অনুপাতে সর্বোচ্চ মৃত্যুহার- এ বদনাম থেকে, এ কলঙ্ক থেকে আমরা নিজেদের মুক্ত করতে পারব না।
ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিকভাবে মোকাবিলা করতে হবে। সামাজিকভাবে পাড়া-মহল্লার ময়লা-আর্বজনা পরিষ্কার করার জন্য যৌথ উদ্যোগ নিতে হবে। এ বিষয়ে জোর দিতে হবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বা সেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে নিয়ে। তারা মশা নিয়ন্ত্রণের কাজের পাশাপাশি রোগী শনাক্তের কাজ করবে। আর ডেঙ্গু রোগীকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা রাখবে। শহর, নগর এবং গ্রামগঞ্জ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করতে হবে। এ ব্যাপারে সরকারের গুরুত্ব দেওয়া উচিত। কমিউনিটি ক্লিনিক পর্যায়ে যদি স্বাস্থ্যসেবাটা দেওয়া যায়, তাহলে মানুষের রোগটা খারাপ জায়গায় আর যাবে না বা বড় বড় হাসপাতালে চাপটা বেশি হবে না। তাই কমিউনিটি পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া উচিত। ইউনিয়ন স্বাস্থ্য উপকেন্দ্র, পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্র, উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্স- এখানে যদি আমরা অধিকাংশ মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা দিতে পারি এবং রোগ প্রতিরোধের উপদেশ দিতে পারি- তাহলে বাংলাদেশে মৃত্যুহার অনেক কমে যাবে। অসুস্থতার হারও কমে যাবে। কাজেই এখানে যদি কোনো ঘাটতি থেকে থাকে সে ঘাটতি জরুরি ভিত্তিতে পূরণ করা উচিত। ডেঙ্গু অধ্যুষিত এলাকায় যেন ল্যাবরেটরি টেস্ট এবং চিকিৎসার কোনো রকম ঘাটতি না হয় সে বিষয়ে জরুরিভাবেই মনোযোগ দিতে হবে।
লেখক: জনস্বাস্থ্যবিদ ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, রোগতত্ত্ব রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)
.jpg)


