যখন বাঙালির একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে গেছে, সমাজ কাঠামোর ভেতরে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে, তখন আপনাকে চিন্তা করতে হবে, আপনি একা এবং এই একা একজন শক্তিধর মানুষ। আপনার সাহস, আপনার মেধা, বুদ্ধি, যোগ্যতা ও ধীশক্তিই আপনার পাথেয়। আপনি ছুটে চলুন নতুনকে আহ্বান জানিয়ে, নতুন আলো অন্যরকম। তাকান, দেখুন আপনার দ্বারে দাঁড়িয়ে আছে- নতুন আলো।...
রবীন্দ্রনাথ লিখলেন, ‘ওরে নবীন, ওরে আমার কাঁচা,/ ওরে সবুজ, ওরে অবুঝ,/ আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা...’ আর নজরুল লিখলেন, ‘ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কাল্-বোশেখির ঝড়।/ তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!/ তোরা সব জয়ধ্বনি কর্’!! বাংলা কবিতার এই প্রাতস্মরণীয় দুই মহিরুহ কবিই কি শুধু নতুনের বা তারুণ্যের জয়গান এবং আগমনির প্রবল জোয়ারের কথা বলেছেন? না, নতুন বা নব বা নবীন বা নব্য বা তরুণ বা আধুনিক বা টাটকা’কে আহ্বান জানিয়েছেন, বা জয়গান করেছেন পৃথিবীর সব ক্ষেত্রের সব মনীষীই অর্থাৎ সব মানুষই নতুনকে দেখে চঞ্চল হয়ে ওঠেন। প্রশ্ন যদি করি, কেন নতুন আমাদের চোখে তারুণ্যের হাতছানি দেয়, চঞ্চল করে, শিহরণ জাগায়, আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে, অজানা সৌন্দর্যে আক্রান্ত করে? করে এজন্য যে, মানুষের জীবনের প্রবণতাই হলো একটা নান্দনিক ও নিটোল সময় এবং বস্তুকে আঁকড়ে ধরে রাখতে চায় এবং তা অনন্ত সময় ধরে। জানি না এটি সৃষ্টির শুরু থেকেই কি না? কারণ, প্রকৃতির মধ্যে এমন অনাবিল সুখ লুকিয়ে থাকে, যা আহরণ করার জন্যই বোধহয় প্রতিটি মানুষের ভেতর থাকে এ প্রবণতা! আবার যদি রবীন্দ্রনাথের কাছেই আসি, দেখবেন (মহাত্মা গান্ধীর দেওয়া উপাধি) গুরুদেব স্বয়ং বলেছেন, ‘মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে, মানবের মাঝে আমি বাঁচিবার চাই...’। ওই যে বললাম, মানুষ তার জীবন নিয়ে সেই প্রবল প্রবণতা অর্থাৎ ভেতরে ভেতরে সবাই বেঁচে থাকতে চায়- যার নাম নতুন, যার নাম টাটকা আর মানুষ পুরোনোকে মলিন ভেবে প্রত্যাখান করতে চায়, জরাজীর্ণকে মুছে ফেলতে চায়, তাই বারবার স্বাগত জানায় নতুনকে। নতুনও আসে বারবার।
নতুনের আকর্ষণ অফুরন্ত। যেমন ধরুন, বাবা তার ছেলে বা মেয়ের জন্য যখন নতুন পোশাক কিনে আনলেন, সেই নতুন পোশাক হাতে নিয়ে সেই ছেলেটি বা মেয়েটি আনন্দে লাফিয়ে ওঠে, তখন তার চোখে-মুখে ফুটে ওঠে সুন্দরের আচরণ। আপনি যদি বৃক্ষের নতুন কচি বা সবুজ পাতার দিকে তাকান তখন আপনার মন ভরে যায়- যায় না? যায়। আবার একই বৃক্ষের পাতারা যখন ঝরে যায়, তখনো আপনার মনে হয়তো সেই ঝরা পাতার মর্মরে নিজের অজান্তেই গেয়ে ওঠেন- ‘ও ঝরা পাতা ও ঝরা পাতাগো/ তোমার সাথে আমার রাত পোহানো কথাগো/ তোমার সাথে আমার দিন কাটানো কথা...’। এই পুরোনো পাতার জন্য বেদনা হলেও, তাকে হারাতেই হয়। এ হারানো থেকে বা পাতার রং হলুদ থেকে চোখ সরিয়ে তাকাতে হয় সবুজ পাতার দিকে। এই যে রঙের খেলা- এটি চিরন্তন। এটি প্রকৃতির অমোঘ নিয়ম।
আবার আসুন, অতিবাহিত আমাদের প্রতিদিনের কথায়? আমরা কী দেখছি? দেখছি প্রতিদিন সূর্য উঠছে, আলো ছড়াচ্ছে, আমাদের সঞ্চারিত করছে আবার সূর্য অস্ত যাচ্ছে, আমরা বিদায়ও জানাচ্ছি। আরও একবার রবীন্দ্রনাথ হয়ে আসি- অনেকেই জানেন, বাংলাদেশে তিনি যখন জমিদারি কাজে নাগর, ইছামতী ও পদ্মার পাড়ে অবস্থান করেছেন। এ অবস্থানকালে তিনি প্রায়শই পড়ন্ত বিকেলে তার ছোট্ট নৌকাটি নিয়ে নদীতে বেড়াতেন তীরের কাছ ধরে এবং নৌকায় বসেই ওই দিনের সূর্যকে তিনি বিদায় জানাতেন এবং তখনই মনে মনে হয়তো প্রত্যাশা করতেন পরের দিনের নতুন সূর্যটির কথা। এই যে যেমন, সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের কথা বললাম, তেমনি বছরও। আমরা বারবার বিদায় জানাই পুরোনো বছরকে আর আহ্বান জানাই নতুন সূর্যের নতুন একটি বছরকে। এই নতুন বছর, বাঙালিদের বাংলা নববর্ষ পয়লা বৈশাখ আর বাংলাদেশসহ সারা পৃথিবীতে পালিত হয় ইংরেজি নতুন বছর ১ জানুয়ারি। বছর হলো জন্ম আর মৃত্যুর মতো। পুরোনো যে বছরটিকে আমরা হারিয়ে ফেলি, সেটি যেমন নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার মতো আমাদের জীবন থেকে একবারে মুছে যায়- আমরা কেবল ওই বছরটির জন্য স্মৃতির কোঠাকে নাড়াই। তেমনি ওই যে বললাম, নতুন বছরের আগমনে আমরা নতুন করে জীবনকে সাজাতে চাই।
২.
বারে বারে: নতুন আসে দ্বারে, হ্যাঁ আরেকটি নতুন বছর এল আমাদের জীবনে। ইংরেজি এই নতুন বছর ২০২৬ আর আমরা পেছনে ফেলে এলাম ২০২৫। আমরা কি প্রতিবারই পুরোনো ও নতুনের অঙ্ক কষি? যদি কষি, সেটা কতটা সফল করি? হয়তো করতে পারি অথবা পুরোটা পারি না। কারণ জীবন অঙ্ক কষে কষে হয় না। কেউ হয়তো বছরে কিছুটা সফল হয়, কেউ হয়তো পারে না। এতে দুঃখ নেই। কেননা, আমরা কেউ চেষ্টার ত্রুটি করি না। চেষ্টা যে করতে হয়, পরিকল্পনাও থাকতে হয়, থাকতে হয় আশা, থাকতে হয় স্বপ্ন। আর নতুন বছরকে নিজের ভেতরের রং দিয়ে সাজাতে হয়। এ সাজানোটা হবে নিজের জন্য, পরিবারের জন্য, পড়শির জন্য, সমাজের জন্য, রাষ্ট্রের জন্য। নিজেকে সুন্দর করে তোলার মধ্যদিয়ে রাষ্ট্রকে সুন্দর করা- নাগরিক হিসেবে মনে করি আপনার, আমার দায়িত্ব। কারণ, আপনার জীবনকে আপনাকেই সাজাতে হবে। আপনি তো আর দুবার জন্মগ্রহণ করতে পারবেন না? তাই, একবার এক জীবনকে উপভোগ করা বা আনন্দ আয়োজনের মাধ্যমে সুন্দর করে কাটিয়ে দেওয়াটাই নতুনের অঙ্ক কষা। ধরুন, আপনার জীবন একটা ট্রেন। একটি ট্রেন একটা স্টেশন থেকে যাত্রা শুরু করে, যেতে যেতে অন্য একটি স্টেশনে থামে আবার সেখান থেকে যাত্রা করে। এই ট্রেন ধাবমান ও গতিময় একটি যান। আপনি যদি চলন্ত বা ধাবমান ট্রেনের জানালা দিয়ে বাইরে তাকান, দেখবেন- দুপাশে শালবন, সবুজ প্রান্তর, নদী, পাহাড়, সমুদ্র কিংবা অবারিত শস্যভূমি আর দিগন্তজুড়ে সাদা-কালো মেঘের খেলা। এই বিচিত্র খেলা, চারপাশের প্রকৃতি ও নিসর্গের সৌন্দর্য আপনাকে অন্যরকম শিহরণ দেয়। ওই শিহরণই জীবন। কবিতা করে বলি- জীবনানন্দ দাশ থেকে নিয়ে- ‘যখন ঝরিয়া যাব হেমন্তের ঝড়ে’/ পথের পাতার মতো তুমিও তখন/ আমার বুকের ’পরে শুয়ে রবে?/ অনেক ঘুমের ঘোরে ভরিবে কি মন/ সেদিন তোমার!/ তোমার এ জীবনের ধার/ ক্ষ’য়ে যাবে সেদিন সকল’?
৩.
অনেকেই বলে- অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যৎকে সাজাতে হয়। কথাটাকে লক্ষ্য করেই আমরা যদি আগাই তাহলে, বিগত বছরের সব ব্যর্থতা, না পাওয়া ইত্যাদি থেকে উতরিয়ে সামনের নতুন বছরকে সাজাতে হবে এবং সফল হতে হবে। এ সাফল্য আনতে হবে, কেননা জীবন গতিময়, জীবন কখনো থেমে থাকে না, ছুটে চলে সময় ও নদীর মতো। পেছনের পিছুটান, ব্যর্থতা, না পারা কিংবা পুরোনো স্মৃতিকে আঁকড়ে না ধরে থেকে নতুন স্রোতের সঙ্গে এগিয়ে চলাই জীবন। কারণ আপনি ভাবুন, যে পথ একবার হেঁটে পেছনে ফেলে এসেছেন, সেই পেছনের পথে গেলে আপনার সময় কি আগাবে না পেছাবে? সুতরাং সময়কে বা বয়সকে ধরে রাখতে হলে আপনাকে যতটুকু পথ হেঁটে এসেছেন, তা পেছনে রেখে আপনাকে সামনের পথটুকুই শেষ করতে হবে। আপনাকে মনে রাখতে হবে, পেছনের পথে যতটুকু পেয়েছেন, দেখেছেন বা অর্জন করেছেন, তা অর্জিত হয়েছে, কাজেই সামনেরটুকু অর্জন করুন। সামনেও আছে অনেক অনেক অনেক কিছু। সেখানেও আছে আনন্দ। তবে সামনেও সমস্যা থাকতে পারে, পথ সব সময় মসৃণ নয়, পথ কখনো কণ্টকাকীর্ণ, কখনো শত্রু-সংকুল হতে পারে? সে সমস্যা মোকাবিলা করে, পথের কাঁটা শক্ত হাতে সরিয়ে এগিয়ে চলাই জীবনের জয়। এবং সেই জয়টুকু নিয়ে আপনাকে তৃপ্ত থাকতে হবে। আপনি কারোর কাছে কিছু আশা করবেন না? কারুর সঙ্গে নিজের জীবনকে তুলনা করবেন না? যখন বাঙালির একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে গেছে, সমাজ কাঠামোর ভেতরে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে, তখন আপনাকে চিন্তা করতে হবে, আপনি একা এবং এই একা একজন শক্তিধর মানুষ। আপনার সাহস, আপনার মেধা, বুদ্ধি, যোগ্যতা ও ধীশক্তিই আপনার পাথেয়। আপনি ছুটে চলুন নতুনকে আহ্বান জানিয়ে, নতুন আলো অন্যরকম। তাকান, দেখুন আপনার দ্বারে দাঁড়িয়ে আছে- নতুন আলো।
লেখক: কবি