২০২৪ সালজুড়েই দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে জনগণের নাভিশ্বাস উঠেছে। এ বছরে দ্রব্যমূল্য, বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে নির্ধারিত ও স্বল্প আয়ের মানুষকে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয়েছে। বিষয়টি বছরজুড়েই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারও ডিম, আলু, পেঁয়াজের দাম নির্ধারণ করে এবং বিভিন্ন পণ্যে আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার করে। তার পরও দাম কমেনি। চাল, আটা, পেঁয়াজ, মরিচ থেকে শুরু করে বছরের শেষ সময়ে সয়াবিন তেলের দাম বৃদ্ধি ভুগিয়েছে ভোক্তাদের।
২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর হঠাৎ করে চাল, আলু, আটা, ডিম, মুরগি ও গরুর মাংসের দাম বাড়তে শুরু করে। তারপর আর কমেনি দাম। এরপর ভারত পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ ঘোষণা করলে হঠাৎ করে তা সেঞ্চুরি হয়ে যায়। ডিমের দাম বেড়ে ১২৫-১৩০ টাকা ডজন ঠেকে। ক্রেতাদের এক কেজি আলু কিনতে হয় ৪৫-৫০ টাকায়, চিনির কেজি ১৪৫-১৫০ টাকা। চালের দাম কেজিতে ৫-৭ টাকা বেড়ে মিনিকেট ৭০-৭৬ টাকা, আটাশ ৫৩ টাকা ও মোটা স্বর্ণা চাল ভোক্তাদের ৫০ টাকা কেজি কিনতে হয়। বছরের প্রথমেই মুরগির মাংসের দামও বেড়ে যায়। ব্রয়লারের কেজি ২০০ টাকা, সোনালি মুরগি ৩০০-৩২০ টাকায় ঠেকে। সবজির দামও বেড়ে বেগুনসহ বিভিন্ন সবজি ১০০ টাকার ঘরে ওঠে।
এভাবে যত সময় যেতে থাকে, তত প্রায় সব নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে থাকে। ফেব্রুয়ারিতে সয়াবিন তেলের দাম বেড়ে ১৭৩ টাকা লিটার দাঁড়ায়। চিনির কেজি ১৪০-১৪৪ টাকা, গরুর মাংসের দামও বেড়ে ৭৫০ টাকায় ঠেকে। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই থেকে রমজান মাসে কম লাভ করতে বলা হলেও কথা রাখেননি অসাধু ব্যবসায়ীরা। ১২ মার্চ রমজান শুরুর আগেই খেজুরের দাম আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে। বস্তায় ভরা ১৪০ টাকা জাহিদি খেজুর ৩০০ টাকা ও মরিয়ম খেজুরের কেজি ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা হয়ে যায়। ভোক্তাদের ৯০ টাকা কেজির ছোলা ১১০ টাকায়, শসা ১৪০, পেঁয়াজ ১৩০ টাকায় কিনতে হয়। শুধু তা-ই নয়, রমজান মাসে চালের ব্যবহার কম হলেও দাম বেড়ে যায়।
চালের বাজারে শৃঙ্খলা ফেরাতে ৬ ফেব্রুয়ারি খাদ্য মন্ত্রণালয় ঘোষণা করে ‘মিল থেকে বাণিজ্যিকভাবে চাল সরবরাহের আগে বস্তার ওপর উৎপাদনকারী মিলের নাম, জেলা ও উপজেলার নাম, উৎপাদনের তারিখ, মিলগেটের মূল্য এবং ধান বা চালের জাত উল্লেখ করতে হবে। এসব তথ্য হাতে লেখা যাবে না। এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে ১৪ এপ্রিল থেকে। কিন্তু বছর শেষ হলেও তা কার্যকর হয়নি।
অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর চালে আমদানি শুল্ক কমালেও কমেনি দাম। বরং নভেম্বরে আমন ধান উঠলেও ধান শেষের অজুহাতে কেজিতে ২-৪ টাকা বাড়িয়েছেন মিলমালিকরা। খুচরা বিক্রেতারা মিনিকেট ৭২-৭৬ টাকা, আটাশ চাল ৬০-৬২ ও মোটা চাল ৫২-৫৫ টাকা কেজি বিক্রি করেন।
বাংলাদেশ অটো রাইস মিল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এ কে এম খোরশেদ আলম খবরের কাগজকে বলেন, ‘অবশ্যই করপোরেটরা চালের দাম বাড়াচ্ছেন। তারা বিভিন্ন ব্যাংক থেকে বেশি করে ঋণ নিয়ে ধান-চাল মজুত করছেন। তারা সেই চাল প্যাকেটজাত করেই ভোক্তাদের কাছ থেকে কেজিতে ৫-১০ টাকা পর্যন্ত বেশি নিচ্ছেন। বিভিন্ন মিল মনিটরিং করা হলে কমবে চালের দাম। খাদ্যসচিব মো. মাসুদুল হাসান বলেন, ওপেন টেন্ডারের মাধ্যমে পিপিআর ২০০৮ আইন ফলো করে খাদ্য আমদানি করা হচ্ছে। কোনো মনোপলি হচ্ছে না। যে কেউ চালসহ খাদ্য আমদানি করতে পারবেন।’ তার পরও চাল আমদানি হচ্ছে না। বরং আমন ধান উঠলেও বেশি দামেই ভোক্তাদের কিনতে হচ্ছে চাল।
জুলাই ও আগস্ট মাসে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সারা দেশে জ্বালাও-পোড়াও, অগ্নিসংযোগ শুরু হলে পরিবহনব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। এর প্রভাবে নিত্যপণ্যের দাম লাগামহীন হয়ে পড়ে। খাদ্যে মূল্যস্ফীতি সব রেকর্ড ছাড়িয়ে ১৪ শতাংশে পৌঁছে। ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করার পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকারীরা দ্রব্যমূল্য সহনীয় পর্যায়ে আনার চেষ্টা করলেও তা সম্ভব হয়নি। এমনকি সরকার চাল, পেঁয়াজ, আলু, ডিম আমদানিতে শুল্ক প্রত্যাহার করার পরও কমেনি এসব পণ্যের দাম।
জুলাইয়ে রাজনৈতিক সহিংসতা ভয়াবহ আকার ধারণ করে। গত নভেম্বরেও খাদ্যে মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে প্রায় ১৫ শতাংশের রেকর্ড করেছে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকারীরা পণ্য কেনাবেচায় পাকা রসিদ সংরক্ষণ, পণ্যের মূল্যতালিকা প্রদর্শন করা, চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেট বন্ধ করে দ্রব্যমূল্য জনসাধারণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনার আলটিমেটাম দেয়। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে সমন্বয়ক বিন ইয়ামিন মোল্লা বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ১২টি প্রস্তাব দিয়ে হুঁশিয়ার করেন। বাংলাদেশ দোকানমালিক সমিতি ও শীর্ষ ব্যবসায়ীরা একে সাধুবাদ জানালেও সুফল পাননি ভোক্তারা।
অন্য পণ্যের মতো মুরগির সিন্ডিকেটও মাথা চাড়া দেয়। বাধ্য হয়ে সরকার তথা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর খুচরা পর্যায়ে ডিমের ডজন ১৪৪ টাকা, ব্রয়লার মুরগি ১৮০ ও সোনালি মুরগির দাম ২৭০ টাকা কেজি বেঁধে দেয় এবং যৌক্তিক মূল্য সঠিকভাবে বাস্তবায়নের জন্য নির্দেশনা দেয়। কিন্তু চোর না শোনে ধর্মের কাহিনি। ভোক্তাদের ১৮০-১৯০ টাকা ডজন ডিম, ব্রয়লার মুরগি ২৮০ ও সোনালি মুরগি ৩৮০ টাকা কেজি কিনতে হয়। বছরের শেষ সময়েও নির্ধারিত দরে এসব পণ্য পাননি ভোক্তারা।
দেশে প্রতিদিন প্রায় পাঁচ কোটি ডিমের চাহিদা রয়েছে। ডিমের দামে হইচই পড়লে নভেম্বরে ডিম আমদানির অনুমোদন দেয় সরকার। তার পরও আশানুরূপ দাম না কমায় ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ১৪টি স্থানে সুলভ মূল্যে করপোরেট প্রতিষ্ঠান ডিম বিক্রি করে। কিন্তু তা চাহিদার তুলনায় খুবই অপ্রতুল হওয়ায় বছরের শেষ সময়েও ১৪৫-১৫০ টাকার কমে ভোক্তারা পাননি।
রাজধানীর কারওয়ান বাজারে সবজির আড়তেও কেউ পণ্য সরবরাহ ও বিক্রির জন্য আইনকানুন মানেন না। বিক্রেতারা পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের রসিদও দেন না। ফলে খুচরা বিক্রেতারাও ইচ্ছামতো দাম আদায় করছেন ভোক্তাদের কাছ থেকে। এ জন্য জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর গভীর রাতে অভিযানে গেলে তা ধরা পড়ে। বাধ্য হয়ে কারওয়ান বাজার কাঁচামাল আড়ত ব্যবসায়ী সমিতিকে অনিয়মের জন্য কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। তার পরও সহনীয় হয়নি সবজির বাজার। কচুরলতি ১৪০ টাকা কেজি, বরবটি ১৬০, বেগুন ১৪০ টাকা কেজি কিনতে হয় ভোক্তাদের। কাঁচা মরিচের কেজি ৪০০ টাকা ছুঁয়ে যায়।
অক্টোবরে নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে ব্যবসায়ীদের যৌক্তিক মুনাফা করার আহ্বান জানান এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. হাফিজুর রহমান। তার পরও পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতারা সে পর্যায়ে আসতে পারেননি। তাই নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য কৃষি মন্ত্রণালয় ডিমসহ সবজি কম দামে বিক্রির উদ্যোগ নেয়। গত ১৫ অক্টোবর খাদ্য ভবনের সামনে এই কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়। রাজধানীর ২০ স্থানে ৬৫০ টাকায় ১০টি পণ্য দেওয়ার কথা থাকলেও অনেকেই পান না। হতাশ হয়ে খালি হাতে ফিরে যান।