গত সাড়ে ১৫ বছরে সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ছিল কার্যত পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের নিয়ন্ত্রণে। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো সরকারের আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল জাতীয় রাজস্বও (এনবিআর)। চলতি বছরের (২০২৪) পুরো সময়ই রাজস্ব আদায়ে ছিল ঘাটতির হিসাব। বছরের শেষ সময়ে রাজস্ব আদায়ে বিগত দিনের ধারাবাহিকতা থেকে বের হয়ে আসতে নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন পদক্ষেপ।
বছরের শেষভাগে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্বে আসার পর আমূল বদলে যায় এনবিআরের চিত্র। রাজনৈতিক চাপমুক্ত হয়ে বড় সংস্কারের পথে হাঁটছে প্রতিষ্ঠানটি। অন্তর্বর্তী সরকার এনবিআর, করবহির্ভূত ও এনবিআরবহির্ভূত- তিন খাত থেকেই রাজস্ব আদায় বাড়াতে গুরুত্ব দিয়েছে।
এনবিআর-সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করে বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকার রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে যে পরিবর্তন এনেছে বা আনতে কাজ করছে তার সুফল পাওয়া যাবে নতুন বছরে (২০২৫)। এতে রাজস্ব আদায় বাড়বে, ঘাটতি কমবে। এসব পদক্ষেপের প্রস্তুতি এ বছর থেকেই শুরু হয়েছে।
এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের প্রধান তিনটি উৎস হচ্ছে– আয়কর, মূল্য সংযোজন কর (মূসক বা ভ্যাট) ও শুল্ক। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে ভ্যাট-কর-শুল্ক না বাড়িয়ে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে নির্দেশ দিয়েছে। সারা দেশে নতুন রাজস্ব দপ্তর স্থাপন করে আরও বেশিসংখ্যক মানুষকে করের আওতায় আনতে বলা হয়েছে। এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে সততা নিশ্চিত করতে জোর বাড়াতে এবং সাধারণ করদাতাদের হয়রানি না করার কথা বলা হয়েছে।
একসময়ে প্রয়োজন থাকলেও এখন নেই, এমন রাজস্ব অব্যাহতি প্রত্যাহার করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ভ্যাট আদায়ে যন্ত্রের ব্যবহার বাড়াতে ও মিথ্যা ঘোষণায় আমদানি-রপ্তানি বন্ধে পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে। রাজস্ব ফাঁকি বন্ধে এবং বকেয়া আদায়ে কঠোরতা আনতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে করবহির্ভূত রাজস্ব, যা সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ আদায় করে। যেটাকে সরকার বলে করবহির্ভূত প্রাপ্তি (নন-ট্যাক্স রেভিনিউ)। সংক্ষেপে তা এনটিআর নামে পরিচিত। বর্তমান সরকার সরকারি বিভিন্ন সেবার ফি ও কর প্রতি তিন বছর পরপর বাড়াতে মন্ত্রণালয়, বিভাগ, দপ্তর ও সংস্থাগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সরকার, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও সরকারি কর্মচারীকে দেওয়া ঋণের সুদও করবহির্ভূত রাজস্ব হিসেবে গণ্য হয়। অনিয়ম প্রতিরোধে ও সময়মতো করবহির্ভূত রাজস্ব আদায়ে সরকারের বিভিন্ন সেবার বিপরীতে অর্থ আদায়ের দিনই সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
বিশেষভাবে বিভিন্ন প্রশাসনিক ফি; স্বায়ত্তশাসিত, আধা স্বায়ত্তশাসিত, সংবিধিবদ্ধ সংস্থা, করপোরেশন, সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানির নিট মুনাফা থেকে সরকারের অংশ; সরকারের বিভিন্ন পরিষেবা ও পণ্যের মূল্য; সরকারি জমি, খনি এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ ইজারা বা লিজের মাধ্যমে আয়; সরকারি মালিকানাধীন প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের রয়্যালটি; সড়ক ও সেতু থেকে আদায় করা টোল, জরিমানা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উদ্বৃত্ত অর্থ করবহির্ভূত রাজস্ব হিসেবে সরকারের কোষাগারে জমা দিতে হবে।
আগস্টে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিব এবং এনবিআর চেয়ারম্যান হিসেবে যোগদান করেন মো. আবদুর রহমান খান। দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি এনবিআরের দুর্নীতি কমাতে সবচেয়ে জোর দেন।
তিনি খবরের কাগজে বলেন, ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠন করা হয়েছে। এই সরকারের কাছে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনেক। সরকারের আয়ের অন্যতম উৎস রাজস্ব আদায়। এনবিআর এবং এনবিআরবহির্ভূত সব ধরনের রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হচ্ছে। বিশেষভাবে দুর্নীতি বন্ধ করতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘কতটা রাজস্ব আদায় হয়েছে তা নিয়ে বিগত সরকার বানোয়াট পরিসংখ্যান দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করেছে। নতুন সরকার সব কাজেই স্বচ্ছতা এনেছে। বছরের শেষ সময়ে রাজস্ব আদায়ের গতি আনতে অনেক কাজ শুরু করা হয়েছে। আশা করি এসব পদক্ষেপের ফলে রাজস্ব ঘাটতি কমবে।’
এনবিআর চেয়ারম্যান আরও বলেন, রাজস্ব আদায়ের সব খাতেই প্রযুক্তির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হবে। এতে করদাতারা সহজে রাজস্ববিষয়ক সেবা নিতে পারবেন। অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীও দুর্নীতি করার সুযোগ পাবে না। কোনোভাবেই সৎ করদাতাদের হয়রানি করার সুযোগ পাবে না। রাজস্ব ফাঁকিবাজদের দিন শেষ হতে চলছে।
গত (২০২৩-২৪) অর্থবছরের শেষ ছয় মাস (জুলাই-ডিসেম্বর) এবং চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাস (জানুয়ারি-জুন) নিয়েই চলতি বছর ২০২৪ সাল।
গত অর্থবছরের মাঝামাঝি এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা সংশোধন করে কমিয়ে ৪ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়।
বর্তমান সরকার রাজস্ব আদায়ে গতি আনতে রাজস্ব আদায়সংক্রান্ত কার্যক্রম এনবিআরের ওপর রাখলেও রাজস্বনীতি প্রণয়নের দায়িত্ব অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওপর দেওয়ার জন্য প্রস্তাব করেছে।
এ বিষয়ে এনবিআর সদস্য (নীতি) এ কে এম বদিউল আলম খবরের কাগজকে বলেন, রাজস্ব আদায়সংক্রান্ত কার্যক্রম এনবিআর পরিচালনা করে থাকে। একই সঙ্গে রাজস্বসংক্রান্ত নীতিও এনবিআর প্রণয়ন করে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠান থেকে রাজস্বনীতি প্রণয়ন ও রাজস্ব আদায়ের কাজ আলাদা প্রতিষ্ঠানের ওপর দায়িত্ব দেওয়ার জন্য পরামর্শ দিয়েছে। বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন এবং শুল্ক, ভ্যাট ও আয়কর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ে গঠিত বিভিন্ন সংগঠন থেকেও একই দাবি জানানো হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এই বছর ভিন্ন দুটি প্রতিষ্ঠান কীভাবে নীতি ও আদায় সম্পর্কিত কার্যক্রম পরিচালনা করবে তার রূপরেখা নির্ধারণ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। নতুন বছরে তার চূড়ান্ত করা হতে পারে।
২০২৪ সালে বাজারে পণ্য সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে রাজস্ব ছাড় দিয়ে ভোজ্যতেল, ডিম, আলু, পেঁয়াজ, চাল ও কীটনাশক আমদানির ওপর শুল্ককর ও ভ্যাট কমানো এবং তুলে দেওয়া হয়।
এ ছাড়া সংস্কার ও অটোমেশনে চোখ ছিল এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খানের। এ বছর রাজস্ব আদায়ের তিনটি অনুবিভাগের কর্মচারী-কর্মকর্তাদের জন্য ১৪টি নির্দেশনা ও মনিটরিং, ব্যবসায়ী ও করদাতাবান্ধব পরিবেশ তৈরি, রাজস্ব সংস্কারে তিনটি পৃথক কমিটি, অনিয়মে জড়িত কর্মকর্তাদের শাস্তি, চট্টগ্রাম কাস্টমের ঝুঁকিপূর্ণ অতিদাহ্য কনটেইনার নিলামে খালাস, বন্ডের অপব্যবহার বন্ধ করার পাশাপাশি ভোগান্তি কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।
অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমা দিতে জোর বাড়ানো হয়। কল সেন্টারে সার্বক্ষণিক সেবা পাওয়া নিশ্চিত করতে চেষ্টা করা হচ্ছে। ই-রিটার্ন জনপ্রিয় করতে এ বছর চার সিটি করপোরেশন, তফসিলি ব্যাংক ও চারটি মোবাইল অপারেটর এবং ছয়টি বহুজাতিক কোম্পানির সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর অনলাইনে রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
আইভাসের সঙ্গে ই-চালান ও ই-ইনভয়েসিংয়ের আন্তসংযোগ এবং সিস্টেমের ক্যাপাসিটি বাড়াতে নতুন স্টোরেজে ডেটা মাইগ্রেশন, ই-ভিডিএস সিস্টেমের সমন্বয়বিষয়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে। ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডোর (এনএসডব্লিউ) সঙ্গে অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ডের এপিআই, এনএসডব্লিউ ও আইভাস সিস্টেমে বিন-এর তথ্য সংযোগ, আমদানি-রপ্তানিতে ১৯টি দপ্তরকে একক প্ল্যাটফর্মের অধীনে আনা, ই-আপিল ও অ্যাডভান্স রুলিংয়ের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা হয়েছে। ভোমরা, সোনামসজিদ, হিলি ও বুড়িমারী স্থলবন্দরের অকশন মডিউল চালু, ৪৫টি এইচএস কোডে ভ্যালুয়েশন মডিউল চালু করা হয়েছে।
ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অনলাইনে ভ্যাট নিবন্ধন, ভ্যাট আইন ও বিধি সংস্কারে আট সদস্যের কমিটি, ই-ইনভয়েস চালু, জেনেক্স ইনফোসিসকে চুক্তি ভঙ্গের জন্য নোটিশ পাঠানোসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কাস্টম হাউসের জটিলতা কমাতে ১২টি ব্যাখ্যা জারি, ৪৫টি অ্যাডভান্স রুলিং এবং আটটি শ্রেণিবিন্যাস-সংক্রান্ত রুলিং জারি করেছে কাস্টমস অনুবিভাগ। স্বর্ণ চোরাচালান রোধ এবং ব্যাগেজ ব্যবস্থায় স্বর্ণ আমদানি নিরুৎসাহ করতে ব্যাগেজ রুল সংশোধন করার উদ্যোগ, ইএক্সপি ছাড়া পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে মানি লন্ডারিংয়ের ঝুঁকি নিরসনে ১০০ কেজি বা তার বেশি ওজনের পণ্য চালান বাধ্যতামূলক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় আনা হয়েছে।
বন্ডব্যবস্থা সহজ করতে নতুন কাস্টমস আইনের অধীনে ছয়টি বিধিমালা প্রণয়ন, পোশাকশিল্প ব্যতীত অন্যান্য ওয়্যারহাউস লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের সাব-কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনার আদেশ জারি করা হয়েছে।