নির্বাচন ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলোর নানা দাবিতে শুরু হয়েছিল ২০২৪ সাল। সময় যত যেতে থাকে, দীর্ঘ হতে থাকে দাবির তালিকা। বছরের মাঝামাঝিতে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার দাবিতে সবচেয়ে বড় আন্দোলন শুরু হয়। এ আন্দোলনের জেরে পতন ঘটে আওয়ামী লীগ সরকারের। এরপর দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার।
নতুন সরকারের কাছে দাবি জানাতে সরব হয় শতাধিক গ্রুপ। যেখানে যুক্ত ছিলেন শিক্ষার্থী, শিক্ষক, চিকিৎসক, আনসার থেকে পুলিশ, বিভিন্ন স্তরের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী থেকে শুরু করে রিকশাচালক পর্যন্ত। তারা হাজারেরও বেশি দাবি তুলে ধরেন। এসব কর্মসূচি থেকে বিক্ষোভ জানানোর পাশাপাশি অবরোধও করা হয়। প্রধান উপদেষ্টার বাসভবনের সামনেও অবস্থান নেওয়ার ঘটনা ঘটে। শুধু অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বের ১০০ দিনের মধ্যে শতাধিক সংগঠনের পক্ষ থেকে হাজারের বেশি দাবি জানানো হয়। বছরজুড়ে এত দাবির ঘটনায় অনেকেই ২০২৪ সালকে ‘দাবির বছর’ হিসেবে অ্যাখ্যা দিয়েছেন।
বছরের শুরুতে ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচন বাতিলের দাবিতে বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে সরকারের কাছে দাবি জানানো হয়। ডামি নির্বাচন অ্যাখ্যা দিয়ে ৮ জানুয়ারি নির্বাচন বাতিলের দাবিতে সমাবেশ করে বাম গণতান্ত্রিক জোট। ভাতা বৃদ্ধি ও বকেয়া পরিশোধের দাবিতে মার্চ মাসে কর্মবিরতিতে নামেন পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ট্রেইনি চিকিৎসকরা। এ মাসেই সরকার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীসহ রাষ্ট্রায়ত্ত, স্বায়ত্তশাসিত, স্বশাসিত ও বিধিবদ্ধ সংস্থায় নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের জন্য সর্বজনীন প্রত্যয় স্কিম চালুর ঘোষণা দেয়। বিষয়টি নিয়ে ধারাবাহিকভাবে আন্দোলনে নামেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা।
জুলাইয়ে কর্মবিরতির কারণে উচ্চ শিক্ষাঙ্গনে তৈরি হয় অচলাবস্থা। অন্যদিকে এক রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সালের ৫ জুন কোটা বাতিলের প্রজ্ঞাপনকে অবৈধ ঘোষণা করেন হাইকোর্ট এবং কোটা পুনর্বহাল করেন। তখন প্রজ্ঞাপন পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা।
৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে ৮ আগস্ট দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। এর পরই নিরাপত্তা ও হামলার বিচারসহ আট দাবিতে ৯ আগস্ট রাজধানীর শাহবাগ মোড় অবরোধ করেন সনাতন ধর্মের অনুসারীরা। বেতন-ভাতা নিয়ে বৈষম্য দূর করার দাবি জানিয়ে ৮ আগস্ট থেকে কর্মবিরতি পালন করেন মেট্রোরেলের দশম-বিশ গ্রেডের কর্মচারীরা। ২০ আগস্ট তারা কাজে যোগ দেন। একই দিন স্থগিত থাকা সব পরীক্ষা বাতিলের দাবিতে সচিবালয়ে অবস্থান নেয় একদল শিক্ষার্থী। তাদের আন্দোলনের কারণে পরীক্ষা বাতিলের ঘোষণা দেওয়া হয়।
চাকরি জাতীয়করণের দাবিতে সচিবালয়ে ঢুকে বিশৃঙ্খলা করেন আনসার সদস্যরা। ২৫ আগস্ট সচিবালয় ঘেরাও করলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়। ২৬ আগস্ট পৃথকভাবে শাহবাগ মোড় অবরোধ করেন প্যাডেল ও ব্যাটারিচালিত রিকশাচালকরা। বেতন গ্রেড পরিবর্তনের দাবিতে ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে কর্মবিরতি পালন করেন অডিটররা। ফলে বেতন-ভাতাসংক্রান্ত কাজ থমকে যায়। ৩০ সেপ্টেম্বর চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৫ বছর করার দাবিতে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনার সামনে অবস্থান নেন আন্দোলনকারীরা।
অক্টোবরে এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ হলে অটোপাসের দাবিতে আবার আন্দোলনে অংশ নেয় পরীক্ষার্থীদের একটি অংশ। এ ছাড়া ছাত্রলীগ নিষিদ্ধ এবং রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর পদত্যাগ দাবিতে কর্মসূচি ঘোষণা করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন।
বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করার দাবিতে আন্দোলন করেন রাজধানীর সরকারি সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা। পৃথকভাবে কর্মসূচি পালন করেন সরকারি তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থীরা। তাদের অবরোধ থেকে চলন্ত ট্রেনে ঢিল নিক্ষেপ করা হলে শিশুসহ অনেকেই আহত হন। ১৫ অক্টোবর চাকরি জাতীয়করণের দাবিতে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা। দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের কাজ নিয়ে ১১ নভেম্বর তিন দফা দাবিতে অবরোধ করেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
এর বাইরে সচেতন নার্স ও মিডওয়াইফ সমাজ, বিডিআর কল্যাণ পরিষদ, পুলিশের অধস্তন কর্মচারী পরিষদ, কমিউনিটি ক্লিনিকের মাল্টিপারপাস হেলথ ভলান্টিয়ার, ইমারত নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়ন, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের ক্ষতিগ্রস্ত ঠিকাদার সমন্বয় কমিটি, বৈষম্যবিরোধী মুদ্রণ ব্যবসায়ী, শিক্ষানবিশ আইনজীবী, প্রাথমিক শিক্ষক সমন্বয় পরিষদ, স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা শিক্ষক সমিতি, বৈষম্যবিরোধী প্রাথমিক শিক্ষক সমন্বয় পরিষদ, সমতলের আদিবাসী ছাত্র-যুব ও সাধারণ জনগণ, প্রবাসী অধিকার পরিষদ, পোশাক শ্রমিক, ক্ষুব্ধ নারী সমাজ, সম্পাদক পরিষদ, অহিংস গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশ নামে বিভিন্ন সংগঠন একাধিক দাবিতে রাজপথে কর্মসূচি পালন করে।